সুদূর অতীতকালের কোনো এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘তুমি যখন অন্যদের ভয় পাও, তাদের থেকে দূরে পালিয়ে যাও। আর যখন আল্লাহকে ভয় পাও, তখন তার দিকেই তুমি ছুটে যাও।’ ইসলামী ভাবধারায় আল্লাহভীতির এই ধারণা মানুষের সঙ্গে তার সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ককে গভীরভাবে তুলে ধরে।
হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহভীতির অন্যতম আদর্শ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একটি হাদিসে তার বক্তব্য হিসেবে এসেছে, তিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি জানেন এবং মানুষের মধ্যে তাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় করেন। আল-আলবানি হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতার কথা উল্লেখ করেছেন।
ইসলামী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ আল্লাহতায়ালা, তার গুণাবলি এবং তার সর্বব্যাপী জ্ঞান সম্পর্কে যত বেশি জানতে পারে, ততই তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয়, ভক্তি ও শ্রদ্ধা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিজের সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি সম্পর্কে উপলব্ধিও মানুষকে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আরও বিনয়ী করে তোলে।
আল্লাহভীতি ও বিনয়
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনযাত্রায় আল্লাহর প্রতি ভয় ও সচেতনতার বিষয়টি বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে। আল্লাহ সবকিছু দেখছেন—এই বিশ্বাস তার জীবনযাপন ও আচরণে প্রতিফলিত হতো বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তার অন্তর আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ভয় ও আত্মসমর্পণে পরিপূর্ণ ছিল বলে বর্ণনা রয়েছে।
কোরআন তেলাওয়াতের সময়ও তার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার কথা বিভিন্ন হাদিসে পাওয়া যায়। শেষ বিচারের দিনের ভয়াবহতার বর্ণনা তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলত বলে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি সূরা হুদসহ কয়েকটি সূরার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তার চুল পেকে যাওয়ার বিষয়টিও হাদিসের বর্ণনায় এসেছে।
আল্লাহভীতি তার মধ্যে অহঙ্কারের পরিবর্তে বিনয় সৃষ্টি করেছিল। এ কারণেই নিজের প্রশংসা ও মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে অনুসারীদের বাড়াবাড়ি না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
‘আমি আল্লাহর একজন বান্দা’
সহিহ বুখারিতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বাণী বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি তার প্রশংসার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করেছেন। খ্রিস্টানরা হজরত মরিয়মের সন্তান ঈসা (আ.)-এর বিষয়ে যেভাবে বাড়াবাড়ি করেছে, তার মতো বাড়াবাড়ি না করে তাকে আল্লাহর বান্দা ও রাসুল হিসেবে উল্লেখ করতে বলেছেন।
সাহাবিদের সঙ্গেও তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আচরণ করতেন। নিজেকে আল্লাহর একজন বান্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের মতো আহার করা ও বসার কথা বলেছেন বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
পরিবারের কাজেও তিনি সহযোগিতা করতেন। ঘরের কাজে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করার বিষয়টি বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়। এতে তার বিনয়ী ও সহযোগিতাপূর্ণ জীবনযাপনের চিত্র ফুটে ওঠে।
কথা ও কাজে ছিল সামঞ্জস্য
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের কথা ও কাজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। তিনি সত্য কথা বলতেন এবং তার বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল।
ব্যক্তিগত কারণে কারও ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা তার ছিল না বলেও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। তবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘিত হলে তিনি তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতেন।
প্রাকৃতিক ঘটনাতেও আল্লাহর স্মরণ
ঝড়-ঝঞ্ঝা, আকাশে মেঘের ঘনঘটা কিংবা সূর্যগ্রহণের মতো প্রাকৃতিক ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণেও আল্লাহভীতির প্রকাশ ঘটত বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
এসব ঘটনা তাকে আল্লাহর শক্তি ও অতীতের অবাধ্য জাতিগুলোর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তখন তিনি আল্লাহর শরণাপন্ন হতেন, নামাজ ও ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন।
আল্লাহভীতি তাকে দুর্বল করেনি
আল্লাহকে ভয় করা মানে দুর্বল বা ভীতু হওয়া নয়—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেই এর একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বলে ইসলামী ঐতিহ্যে তুলে ধরা হয়। সাহাবিদের বর্ণনায় তার সাহস ও দৃঢ়তার কথা রয়েছে। যুদ্ধের ময়দানেও তিনি সাহসিকতার সঙ্গে সামনে থাকতেন।
অর্থাৎ তার আল্লাহভীতি ছিল দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার ভয় নয়; বরং সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, জবাবদিহির অনুভূতি এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা।
ইবাদতের পাশাপাশি ছিল স্বাভাবিক জীবন
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আল্লাহভীতির অর্থ সংসার ও পার্থিব জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ছিল না। তার স্ত্রী-সন্তান ছিল, তিনি সুগন্ধি পছন্দ করতেন এবং কিছু খাবারও তার পছন্দের ছিল।
তবে তার ও তার পরিবারের জীবন সবসময় স্বাচ্ছন্দ্যে কাটেনি। ইসলামী বর্ণনায় রয়েছে, অনেক সময় পরপর দুই দিন গমের রুটি দিয়ে পেট ভরে খেতে পারেননি তিনি ও তার পরিবার। কখনো কখনো দিনের পর দিন তার ঘরে রান্নার জন্য চুলাও জ্বলত না।
তিন ব্যক্তিকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন
একবার তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইবাদত ও জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে এসেছিলেন। তার ইবাদতের ধরন সম্পর্কে জানার পর তারা নিজেদের জন্য আরও কঠোর জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
তাদের একজন বলেন, তিনি সারা রাত ইবাদত করবেন এবং ঘুমাবেন না। দ্বিতীয়জন বলেন, তিনি বিয়ে করবেন না। তৃতীয়জন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি অবিরাম রোজা রাখবেন।
তাদের এ ধরনের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের এমন চিন্তা থেকে বিরত থাকতে বলেন। তিনি জানান, তিনি তাদের তুলনায় বেশি আল্লাহভীরু। এরপর তিনি বলেন, তিনি রোজা রাখেন আবার রোজা ভাঙেন, রাতে ইবাদত করেন আবার ঘুমান এবং বিয়েও করেছেন।
এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন, আল্লাহভীতি মানে স্বাভাবিক জীবন ও পারিবারিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং ইবাদত, পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জীবনের জন্য অনুসরণীয় ভারসাম্য
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনযাত্রার বিভিন্ন বর্ণনায় আল্লাহর প্রতি ভয়, ভালোবাসা, বিনয়, সাহস, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটি ভারসাম্য ফুটে ওঠে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আল্লাহভীতি মানুষকে হতাশ বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য নয়; বরং নিজের কাজের ব্যাপারে সচেতন, বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করে তোলার শিক্ষা দেয়। আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনকে মুসলমানদের জন্য সেই ভারসাম্যের অন্যতম অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array