কে সাংবাদিক, কে ‘ভুয়া’—ফয়সালার উদ্যোগ
সাংবাদিকতার পরিচয় ও পেশাগত স্বীকৃতির সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণে এবার নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানাল সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি বলেছেন, কারা সাংবাদিক এবং কাদের সাংবাদিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এ বিষয়ে এখন আর অস্পষ্টতার সুযোগ নেই। অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য যেমন হুমকি তৈরি করছে, তেমনি তা জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
- পরিচয়ের অপব্যবহার শুধু সাংবাদিকতা নয়, জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি: ইয়াসের খান
- অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া সাংবাদিকতা ঠেকাতে সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রস্তাব চাইল সরকার
রোববার (৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নির্বাহী কমিটির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে তিনি এসব কথা বলেন। সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সম্মিলিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর সরকার তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তিনি।
‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের আড়ালে কারা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নানা ধরনের প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। ফেসবুক পেজ কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। এই বাস্তবতাকেই সামনে এনে পেশাটির একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন প্রতিমন্ত্রী।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় ও পেশাগত সংজ্ঞা নির্ধারণ জরুরি। ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড শুধু প্রকৃত সাংবাদিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, সাধারণ মানুষকেও বিভ্রান্ত ও হয়রানির মুখে ফেলছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপরও পড়তে পারে।
সাইবার আইন: স্বাধীনতা নাকি নিরাপত্তা?
মতবিনিময়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে সাংবাদিক নেতাদের উদ্বেগও উঠে আসে। জবাবে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ কিংবা সাংবাদিকদের লেখার স্বাধীনতা খর্ব করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়। সাইবার জগতে জনগণ ও সাংবাদিকদের নিরাপদ রাখাই আইনের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সাইবার সিকিউরিটি শুধু কাউকে নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর উদ্দেশ্য। সাংবাদিকদের মতামত নিয়ে আইনটির কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
গণমাধ্যমের জন্য বিশেষ সুরক্ষার ভাবনা
সাইবার সুরক্ষা আইনে গণমাধ্যমের জন্য বিশেষ সুরক্ষা রাখার একটি প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। সাংবাদিক নেতাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল বা নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালে ভুলবশত এমন কিছু প্রকাশিত হলে, যা আইনের ব্যত্যয় ঘটায়, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতির বিধান রাখা যেতে পারে।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবটি সরকার বিবেচনা করছে। বিষয়টি আইনে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং এর ভাষা কী হবে, তা নিয়ে কাজ চলছে।
ভুয়া অ্যাকাউন্টের আড়ালে হয়রানি ও গুজব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে মানুষকে হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনাও উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। এসব ঘটনায় কেউ কেউ আত্মহত্যাপ্রবণ পর্যায়েও চলে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানোর প্রবণতা ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁর ভাষ্য, সাংবাদিকদের নিরাপদ না রেখে গণমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাংবাদিকদের সাইবার নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ
মতবিনিময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও জোরালোভাবে তুলে ধরেন ডিইউজে নেতারা। সভাপতি মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও অনেকেই ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চান তিনি।
ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। ফেসবুক পেজ খুলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. দিদারুল আলম দিদার অবিলম্বে দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করে না—এমন পত্রিকা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় শেষে সাংবাদিক নেতাদের দাবি ও প্রস্তাব লিখিতভাবে দেওয়ার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। লিখিত প্রস্তাব পেলে সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া সহজ হবে বলে জানান তিনি।
কালের আলো/এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array