চলনবিলে পাখি শিকার থামছে না, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিল এলাকায় অভিনব ও নিষ্ঠুর কৌশলে চলছে দেশি ও পরিযায়ী পাখি শিকার। ধানক্ষেত ও জলাশয়ঘেঁষা এলাকায় একটি পাখিকে ফাঁদে আটকে তার ডাকের মাধ্যমে অন্য পাখিদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। পরে জালে আটকে পড়া পাখিগুলো ধরে খাঁচায় রাখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, শিকার করা এসব পাখি প্রকাশ্যেই স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন এভাবে পাখি শিকার চললেও নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান না থাকায় তা বন্ধ হচ্ছে না। এতে শীত মৌসুমে পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির অন্যতম বিচরণক্ষেত্র চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও নিরাপদ আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়ছে।
সম্প্রতি তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়িপাড়া মৌজার একটি ধানক্ষেতে পাখি শিকার করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। নয়ন হোসেন ও সাগরের হাতে ছিল বড় পাতা দিয়ে তৈরি দুটি ফাঁদ। ফাঁদের সঙ্গে কয়েকটি পাখি বাঁধা ছিল। পাশেই কলাপাতা দিয়ে তৈরি খাঁচায় রাখা হয়েছিল শিকার করা আরও কয়েকটি পাখি। পরে এসব পাখি প্রতিটি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয় বলে জানা গেছে।
শিকারিদের ব্যবহৃত কৌশলটি বেশ অভিনব। প্রথমে লতাপাতা দিয়ে ঝোপের মতো কাঠামো তৈরি করে তার ওপর জালের ফাঁদ বসানো হয়। এরপর একটি পাখির পা চিকন সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে সেটিকে গাছের মগডালে রাখা হয়। বাঁধা পাখিটি ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটালে আশপাশের পাখিরা তার কাছে আসার চেষ্টা করে। তখনই তারা জালে আটকা পড়ে।
শিকারি মোতালেব শেখ জানান, একই পদ্ধতিতে তিনি গত তিন-চার বছর ধরে শখের বসে বিভিন্ন স্থানে পাখি শিকার করছেন। এ সময়ে তাকে কেউ বাধা দেয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিকারি জানান, প্রতিদিন নিজের এলাকা ও আশপাশে ঘুরে ছয় থেকে সাতটি পাখি শিকার করেন তিনি। প্রতিটি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করে দিনে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় করেন বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাখি আকৃষ্ট করার জন্য ফাঁদে একটি পাখিকে আটকে রাখা হয়। অনেক সময় শিকার করা পাখির চোখ অন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে ধরা পড়া পাখি স্থানীয় হাট-বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হয়।
এক পাখি ক্রেতা জানান, দেশীয় বক ও অতিথি পাখিসহ কয়েকটি পাখি তিনি ২ হাজার টাকায় কিনেছেন। শিকারিরা পাখিগুলো জবাই করে পরিষ্কার করে ব্যাগে করে নিয়ে যেতে বলেন। রাস্তায় তল্লাশির সময় ঝামেলা এড়াতেই এমনটি করা হয় বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছর শীত মৌসুমে চলনবিলে বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। বিল, জলাশয় ও গাছপালাকে ঘিরে এসব পাখির বিচরণ। তবে শিকারিদের নানা কৌশলের কারণে পাখিগুলো নিরাপদে বিচরণ করতে পারছে না।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্বিচারে পাখি শিকার চলতে থাকলে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর।
চলনবিলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও উল্লাপাড়া, নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর এবং পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ায় পাখি শিকার বন্ধে কাজ করছে ‘চলনবিল জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সাল থেকে তারা পাখি শিকার বন্ধে কাজ করছেন। গত পাঁচ বছরে অন্তত ২ হাজার শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছেন তারা। তবে শিকারিরা ভয় না পাওয়ায় পুরোপুরি শিকার বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ জন্য প্রশাসনের আরও নজরদারি প্রয়োজন।
সমাজকর্মী ও ‘দি বার্ডস সেফটি হাউজ’-এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা পাখি রক্ষায় কাজ করছেন। শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হলেও তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে স্থায়ীভাবে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিকারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্য পরিযায়ী ও দেশীয় পাখি চলনবিলে আসে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে। পাখি নিধন দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তিনি শিকার বন্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা অপরাধ। এ অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাখি শিকারের তথ্য পেলে অভিযান চালিয়ে তা বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নিয়ামুর রহমান বলেন, ফাঁদ পেতে এভাবে পাখি শিকার করা অন্যায়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে পাখি শিকারিদের জরিমানা ও দণ্ডের বিধান রয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অসাধু শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে আইন, অভিযান ও সচেতনতামূলক প্রচারের কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে পাখি শিকার ও প্রকাশ্য বেচাকেনার অভিযোগ বন্ধ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে নজরদারি ও প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array