রাড্ডা সেন্টার দখলে ‘৪০ জনের চক্র’
রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলচেষ্টার ঘটনায় নেপথ্যের একটি বড় নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দারা। ইন্ধনদাতা, অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী ও হামলা বাস্তবায়নকারীদের সমন্বয়ে প্রায় ৪০ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তালিকাভুক্তদের ধরতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২০ জন। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং দোকানদার সমবায় সমিতির সদস্য রয়েছেন। তবে তদন্তের মূল লক্ষ্য এখন সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বাইরে গিয়ে ঘটনার নেপথ্যে থাকা অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হামলার ‘মাথা’ হিসেবে যারা কাজ করেছে, তাদের ধরতে পারলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। শাহ আলী থানায় করা মামলাটি গত রবিবার (০৪ অক্টোবর) ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। যদিও ঘটনার শুরু থেকেই ডিবি তদন্তে যুক্ত ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
- মাঠে ভাড়াটে, পেছনে অর্থ ও প্রভাবশালীরা
- ইন্ধনদাতা-অর্থদাতা-পরিকল্পনাকারী শনাক্ত; ২০ গ্রেপ্তার
- নেপথ্যের হোতাদের ধরতে দেশজুড়ে অভিযান
৪০ জনের তালিকা, দেশজুড়ে অভিযান
ডিএমপির গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানিয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রায় ৪০ জনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় থাকা আট থেকে ১০ জন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকিদের ধরতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকে ঘটনার পরপরই এলাকা ছেড়ে ঢাকার বাইরে চলে গেছেন। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে কেউ যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সে বিষয়েও নজরদারি রাখা হয়েছে।
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির গতিবিধিও পর্যবেক্ষণে রেখেছে গোয়েন্দারা। ডিসি রাকিব খান বলেন, সরকার এ ঘটনায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
দখলের পর বহুতল ভবনের পরিকল্পনা
তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা বলছেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার উচ্ছেদ করে জায়গাটি দখলে নেওয়াই ছিল স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি অংশের মূল লক্ষ্য। শুধু দখল নয়, পরে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনায় কয়েকজন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন সেই অর্থের উৎস এবং বিনিয়োগকারীদের পরিচয় খুঁজছে গোয়েন্দারা।
তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন—কেন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গা দখলে এত বড় আয়োজন? জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের আড়ালে কি বড় কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জমির মালিকানা, আগের বিরোধ ও সম্ভাব্য ভবন নির্মাণ পরিকল্পনার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
২৫০ অজ্ঞাত আসামির আড়ালে কারা
শাহ আলী থানায় করা মামলায় এজাহারনামীয় একমাত্র আসামি হানিফ মিয়া। তিনি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। মামলায় আরও প্রায় ২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, অজ্ঞাত আসামিদের বড় একটি অংশ ছিল ভাড়ায় আনা লোক। ভবন ভাঙচুর ও দখলচেষ্টায় অংশ নিতে অর্থের বিনিময়ে তাঁদের ঘটনাস্থলে আনা হয়েছিল।
এতে তদন্তে সরাসরি হামলাকারী ও নেপথ্যের সংগঠকদের মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে। মাঠে থাকা লোকজনের পরিচয় বের করার পাশাপাশি তাঁদের কে সংগঠিত করেছিল, কে অর্থ দিয়েছিল এবং কার নির্দেশে তারা কাজ করেছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
হামলার রাতে মাইক্রোবাসে ‘নির্দেশনা’
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, ঘটনায় তিন রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য আবু হানিফ, শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ লেলিন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, ঘটনার রাতে তাঁরা একটি মাইক্রোবাসে করে ঘটনাস্থলে যান। সেখান থেকে হামলাকারীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। ওই গাড়িতে আরও দুই থেকে তিনজন ছিলেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এই তিনজনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। ডিবি জানিয়েছে, তাঁদের ধরতে অভিযান চলছে এবং তাঁরা পলাতক।
রাজনীতি ও দোকানদার সমিতির যোগসূত্র
ডিসি রাকিব খান জানিয়েছেন, ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। আরেকটি অংশ দোকানদার সমিতির সঙ্গে যুক্ত।
হামলা ও ভাঙচুরে যে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, সেই সমিতির চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সম্পাদক শাহ আলম ও অফিস সহকারী শাহাদাত রয়েছেন। অন্য দুজন হলেন সদস্য আতিকুর ও কামরুল। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, সমিতির নাম ব্যবহার করে হামলাটি কীভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগাযোগ কতটা ছিল।
২০ গ্রেপ্তার, নজর ‘মাথাদের’ দিকে
ঘটনায় ডিবি ও পুলিশ মিলে এখন পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে শাহ আলী থানার ওসি মো. রাজীব হোসেন জানিয়েছেন। তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা-কর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পশ্চিম শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিব আহমেদ সোহেল, জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের ঢাকা জেলা শাখার সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন মিশু মোল্লা এবং শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম খোকন। এ ছাড়া শ্রমিক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
নেপথ্যের অর্থের সন্ধানে তদন্ত
রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঘটনাটি শুধু আকস্মিক হামলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থাগুলো। দখলের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য, বিপুলসংখ্যক লোকের উপস্থিতি, অর্থের জোগান এবং রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
ডিবির ভাষ্য, সরাসরি হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করাই এখন অগ্রাধিকার। কার অর্থে হামলাকারীরা মাঠে নেমেছিল, কার পরিকল্পনায় দখলের উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতে জায়গাটি কীভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললেই রাড্ডা সেন্টারকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র সামনে আসবে। তদন্ত এখন তাই হামলাকারীদের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছেছে নেপথ্যের সেই ‘৪০ জনের’ কাছে—যাদের হাত ধরেই রাড্ডা সেন্টার দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।
কালের আলো/এএএন/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array