খুঁজুন
                               
, ,
           

স্লো ওভার রেটে শাস্তি ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজের

ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
স্লো ওভার রেটে শাস্তি ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজের

অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হয়। নিউ চণ্ডিগড়ে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে স্লো ওভার রেটের কারণে সেই শাস্তিই পেল ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে দুই দলের শাস্তির মাত্রা এক নয়। নির্ধারিত সময়ে ওভার শেষ করতে ভারতের দেরি হয়েছে বেশি, তাই তাদের জরিমানাও হয়েছে বেশি।

আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, স্লো ওভার রেটের কারণে ভারতের খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফির ২০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফির ১০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে।

৪ ওভার পিছিয়ে ভারত

নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ভারত চার ওভার পিছিয়ে ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ পিছিয়ে ছিল দুই ওভার। এ কারণে দুই দলের বিরুদ্ধেই স্লো ওভার রেটের অভিযোগ আনা হয়।

মাঠের আম্পায়ার জয়ারামন মাদানাগোপাল ও স্যাম নোগাজস্কি, তৃতীয় আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ এবং চতুর্থ আম্পায়ার বীরেন্দ্র শর্মা দুই দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন।

পরে ম্যাচ রেফারি প্রকাশ ভাট বিষয়টি পর্যালোচনা করে দুই দলের জন্য জরিমানার সিদ্ধান্ত জানান।

ভারতের অধিনায়ক শুবমান গিল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক শাই হোপ নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নেন। ফলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শুনানির প্রয়োজন হয়নি।

সিরিজ অবশ্য ভারতের

স্লো ওভার রেটের শাস্তির পাশাপাশি তৃতীয় ওয়ানডেতে অবশ্য ভারতের জন্য ফল ছিল হতাশার। প্রথমে ব্যাট করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ৩৫২ রানের বড় লক্ষ্য দিয়েও ম্যাচটি ৫ উইকেটে হেরে যায় ভারত।

তবে শেষ ম্যাচে হারলেও সিরিজ হাতছাড়া হয়নি ভারতের। প্রথম দুই ওয়ানডেতে জয় পাওয়ায় সিরিজ আগেই নিজেদের করে নিয়েছিল ভারত। ফলে তৃতীয় ম্যাচের পরও সিরিজের ট্রফি থাকছে ভারতের কাছেই।

কালের আলো/এসএ

প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে বিষপানে স্ত্রীর মৃত্যু

বরিশাল সংবাদদাতা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে বিষপানে স্ত্রীর মৃত্যু

প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে বিষপানে ঝুমুর খানম সেতু (২৭) নামে এক সন্তানের জননীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার (ঝুমুর) মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা।

মৃত ঝুমুর খানম সেতু বরিশালের গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী এলাকার মৃত হারুন কাজীর ছেলে কুয়েত প্রবাসী শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী।

আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের মেয়ে ঝুমুরের সাথে প্রায় সাড়ে পাঁচবছর পূর্বে সামাজিকভাবে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের বিয়ে হয়েছিল। তাদের দাম্পত্য জীবনে চার বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

মৃতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে বিষপান করা এক সন্তানের জননী ঝুমুরকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেল পাঁচটার দিকে ঝুমুর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এর পূর্বে রোববার দিবাগত রাত এগারোটার দিকে ওই গৃহবধূ বিষপান করেন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে ও পরে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সোমবার বেলা এগারোটার দিকে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে ওই গৃহবধূর স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঝুমুরকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

ঝুমুরের বাবা করিম খান জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকে মেয়ে জামাতা, তার মা, বোন ও বোন জামাতা কারণে অকারণে ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে আসছে। এরই মধ্যে ঝুমুরের স্বামী কর্মের সুবাদে কুয়েত গমন করে।

পরবর্তীতে তার (শাহারিয়া) মা রুনু বেগম, বোন নাজমিন বেগম, শারমিন, রিয়া ও নাজমিনের জামাতা সাইদুল হাওলাদারের প্ররোচনায় ঝুমুরের ওপর মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় শাহারিয়া। একপর্যায়ে স্বামীর বাড়ি থেকে ঝুমুরকে তার মেয়েসহ তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে ঝুমুর তার কন্যাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

করিম খান আরও জানিয়েছেন, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেওয়া, পাঁচশ বরযাত্রীকে না আনাসহ ঝুমুর দেখতে সুন্দরী না হওয়ার অজুহাত তুলে দীর্ঘদিন থেকে শাহারিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে আসছিল। ঘটনার দিন (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে শাহারিয়া ভিডিও কল দিয়ে ঝুমুরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। একপর্যায়ে তাকে (ঝুমুর) বিষপান করে মরে যাওয়ার কথা বলে। স্বামীর এ মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে পরিবারের সবার অজান্তে ঝুমুর স্বামীকে ভিডিও ফোনে রেখে বিষপান করে। এ ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানান।

আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, গত কয়েক মাস পূর্বে ঝুমুর খানম সেতুর ২০ বছরের একমাত্র ভাই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ছেলের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ঝুমুর খানম সেতুর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারসহ ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কালের আলো/এম/এএইচ

‘আপনারা এক পা এগিয়ে এলে আমিও দুই পা এগিয়ে যাব’: রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫০ অপরাহ্ণ
‘আপনারা এক পা এগিয়ে এলে আমিও দুই পা এগিয়ে যাব’: রাষ্ট্রপতি

দেশের সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উন্নয়ন, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে বঙ্গভবনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মৃগেন হাগিদকের নেতৃত্বে ৫২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান।

সাক্ষাৎকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিষয় রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে নিজেদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকেও আরও উদ্যোগী হতে হবে। নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আপনারা এক পা এগিয়ে এলে আমিও দুই পা এগিয়ে যাব।’ একই সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের অধিকার রক্ষায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে আরও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগী হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় খাসিয়া পুঞ্জির পানগাছ কাটার ঘটনা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ ও মানোন্নয়নের পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। আগামী পহেলা বৈশাখে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বঙ্গভবনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাবেও তিনি ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন।

সৌজন্য সাক্ষাৎকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিশির দিওসহ কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন জেলা কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিবও উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

শিক্ষক: একটি জাতির আত্মার নির্মাতা

আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার:
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৯ অপরাহ্ণ
শিক্ষক: একটি জাতির আত্মার নির্মাতা

আজ শিক্ষক দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো সভ্যতা নেই, যেখানে শিক্ষকের ভূমিকা অস্বীকার করা হয়েছে। কারণ শিক্ষক কেবল একটি পেশার মানুষ নন; তিনি একটি জাতির চিন্তা, চেতনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর। একজন শিক্ষক একটি শিশুকে শুধু অক্ষরজ্ঞান দেন না, তিনি তাকে পৃথিবীকে দেখার চোখ দেন, প্রশ্ন করার সাহস দেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার শক্তি দেন।

শিক্ষক দিবস তাই শুধু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা কেমন শিক্ষক চাই? আমরা শিক্ষকদের কী ধরনের মর্যাদা দিতে পারছি? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কী ধরনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই?

আমার নিজের জীবনের সঙ্গে শিক্ষকতার সম্পর্কটি বিশেষভাবে গভীর। আমি নিজে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার সহধর্মিনীও একজন শিক্ষক। আর আমার বাবা ছিলেন একজন হাইস্কুল শিক্ষক। ফলে শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু একটি পেশাগত পরিচয় নয়; এটি আমার পারিবারিক স্মৃতি, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের অংশ।

ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যখন হাট-বাজার কিংবা শহরের পথে বের হতাম, তখন একটি বিষয় আমাকে খুব বিস্মিত করত। বাবা ছিলেন না কোনো বড় আমলা, রাজনীতিবিদ বা ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর হাতে ছিল না ক্ষমতার কোনো দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু পথে দেখা হলে মানুষ তাঁকে সম্মান করত, সালাম দিত, শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলত।

শিশুমনে তখন প্রশ্ন জাগত—বাবার এমন সম্মানের কারণ কী?

একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আব্বু, তোমাকে এত মানুষ সালাম দেয় কেন?”

বাবা হেসে বলেছিলেন, “শিক্ষকেরা রাবণের গোষ্ঠী। এদের সবাই সম্মান করে। ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি না থাকলেও শিক্ষকের মর্যাদা থাকে।”

তখন কথাটির গভীরতা বুঝিনি। আজ বুঝি, বাবা একটি বড় সত্য খুব সহজ ভাষায় বলে গিয়েছিলেন। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদ নয়, তাঁর আয় নয়, তাঁর সামাজিক ক্ষমতাও নয়। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—কত মানুষের জীবনে তিনি আলো জ্বালাতে পেরেছেন।

একজন শিক্ষক চলে যান, কিন্তু তাঁর শিক্ষা থেকে যায়। তিনি হয়তো একটি বিদ্যালয়ের ছোট্ট কক্ষে বসে পাঠদান করেন, কিন্তু তাঁর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু দূর পর্যন্ত।

আমার নিজের শিক্ষাজীবনের দিকে ফিরে তাকালে এমন অসংখ্য শিক্ষকের মুখ মনে পড়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের অনেকেই শুধু শিক্ষক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন বন্ধু, অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও জীবনদর্শনের নির্মাতা।

আমি যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেছিলাম, সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪০ সালে। আমি যখন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন একজন নতুন শিক্ষক আমাদের স্কুলে বদলি হয়ে এসেছিলেন। তাঁর নাম মনিমোহন রায়।

তিনি এসেছিলেন যেন একটি নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আস্থা আমাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল। সেই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর পর আমি প্রথমবারের মতো বৃত্তি লাভ করি।

একজন শিক্ষকের অবদান কখনো শুধু একটি ফলাফলে পরিমাপ করা যায় না। একটি ভালো ফলাফলের পেছনে থাকে তাঁর অদৃশ্য শ্রম, তাঁর উৎসাহ, তাঁর বিশ্বাস এবং একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার ওপর তাঁর আস্থা।

মনিমোহন রায় স্যার আমার জীবনে সেই শিক্ষকদের একজন, যাঁরা প্রমাণ করেছেন—একজন শিক্ষক কখনো কখনো একটি শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।

কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তাঁর বিখ্যাত কবিতা “শিক্ষকের মর্যাদা”-তে শিক্ষককে যে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা আমাদের সমাজের গভীর মূল্যবোধের প্রতিফলন। কবিতার মূল বক্তব্য হলো—ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজকীয় প্রভাবের চেয়েও জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মর্যাদা বড়।

একজন প্রকৃত শিক্ষক সমাজের বিবেক। তিনি শুধু তথ্য দেন না, তিনি বোধ তৈরি করেন। তিনি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার পথ দেখান না, তিনি জীবনে ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখান।

কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি শিক্ষকের সেই ঐতিহ্যগত মর্যাদা ধরে রাখতে পারছি?

সমাজ বদলেছে। পরিবার বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। শিক্ষার্থীদের চিন্তার ধরন বদলেছে। একসময় শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানের প্রধান উৎস। এখন তথ্যের জন্য শিক্ষার্থীকে শুধু শিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হয় না; ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে তথ্য এখন সহজলভ্য।কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক বিষয় নয়।

তথ্য মানুষকে জানায়, কিন্তু শিক্ষা মানুষকে বুঝতে শেখায়। তথ্য দক্ষতা তৈরি করে, কিন্তু শিক্ষা বিবেক তৈরি করে। আর এই বিবেক তৈরির কাজটি একজন শিক্ষকই করেন।

আজকের দিনে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও কঠিন। তাঁকে শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করতে হয় না; তাঁকে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে হয়, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না, মত প্রকাশ করবে কিন্তু অন্যের মতকে সম্মান করবে, প্রতিযোগিতা করবে কিন্তু মানবিকতা হারাবে না।

বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যেমন অগ্রগতি হয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে, শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয় উঠে এসেছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকের ভূমিকা এখন নতুনভাবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি চিন্তা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান তৈরির কেন্দ্র। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে তাই পাঠদানের পাশাপাশি গবেষক, চিন্তক ও সমাজের একজন দায়িত্বশীল বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মী হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হয়।

বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। নানা ধরনের বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও মূল্যবোধের সংকটের সময়ে শিক্ষককে তরুণদের মধ্যে যুক্তিবোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতা তৈরি করতে হয়।

শিক্ষকই শেখান—প্রশ্ন করা অপরাধ নয়; বরং প্রশ্ন থেকেই জ্ঞানের শুরু। ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়; বরং যুক্তির মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানই সভ্যতার পথ।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হয়। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের প্রশাসক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ ও সমাজনেতা হবে। তাই একজন শিক্ষকের হাতে শুধু একটি শ্রেণির শিক্ষার্থী নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ থাকে।

আমরা প্রায়ই দেশের উন্নয়নের কথা বলি। উন্নত অবকাঠামো, প্রযুক্তি, অর্থনীতি—সবই প্রয়োজন। কিন্তু এসবের ভিত্তি হলো দক্ষ ও মানবিক মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির প্রথম কারিগর হলেন শিক্ষক।

আজ শিক্ষক দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমার সকল শিক্ষককে। যাঁরা আমাকে অক্ষর চিনিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, চিন্তা করতে শিখিয়েছেন, নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার সাহস দিয়েছেন—তাঁদের ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।

শ্রদ্ধা জানাই আমার বাবা, আমার সহধর্মিনী এবং পৃথিবীর সকল শিক্ষককে।

তাঁরা হয়তো সবসময় ইতিহাসের পাতায় স্থান পান না, কিন্তু ইতিহাসের মানুষগুলো তৈরি হয় তাঁদের হাত ধরেই।

একজন শিক্ষক হয়তো একদিনে পৃথিবী বদলে দিতে পারেন না; কিন্তু তিনি এমন মানুষ তৈরি করেন, যারা একদিন পৃথিবী বদলে দিতে পারে।

লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলঃ asmnh.04@ru.ac.bd