সৌদি হামলায় তুরস্ক-পাকিস্তানের দ্রুত সেনা মোতায়েন
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো কার্যকর হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। হুতিদের হামলার জবাবে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় এবং সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েনে সম্মত হয়েছে তিন দেশ।
সোমবার (৫অক্টোবর) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। ৭ আগস্ট মক্কায় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটিই জোটটির প্রথম বড় ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ।
হামলা হলে সবার ওপর হামলা
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে এ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানান, ইরানপন্থী হুতিদের হামলা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের জবাব দিতে জোটের আওতায় ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ সক্রিয় করার বিষয়ে তিন দেশ একমত হয়েছে।
তিনি বলেন, সৌদি আরব ও পবিত্র স্থানগুলোর ওপর হামলা মোকাবিলায় তিন দেশের সংহতি ও ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়েছে।
দ্রুত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী তিন দেশ তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা সরবরাহ করবে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সৌদি আরবে এসব বাহিনী দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করা হবে।
তবে এসব প্রতিশ্রুতি সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমোদিত চুক্তি ও নিজস্ব আইনের আওতাতেই বাস্তবায়ন করা হবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
ইয়েমেনে পাল্টা অভিযান
হুতিদের দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনর্দখলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করার ঘোষণা আসে।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখল করেছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইয়েমেনি বাহিনীর অভিযানে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জোটের প্রায় ১০০টি যুদ্ধবিমান অভিযানে সহায়তা করছে বলে জানানো হয়েছে।
সৌদিতে হামলার দাবি হুতিদের
এদিকে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং উপকূলীয় শহর রাবিগে আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। পাশাপাশি একটি বিমানবন্দর, বিমানঘাঁটিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবিও করেছে তারা।
তবে হুতিদের এসব দাবির বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
বড় সামরিক শক্তির জোট
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক অনুযায়ী, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্মিলিত সক্রিয় সামরিক সদস্য প্রায় ১৪ লাখ। তিন দেশের কাছে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ সামরিক বিমান, ৬ হাজার ট্যাংক এবং ৩৪০টির বেশি নৌযুদ্ধের সরঞ্জাম।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের দিকে হুতিদের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ নন-রেসিডেন্ট ফেলো আবদুল আজিজ আলঘাশিয়ানের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের হামলা ও উসকানি জোটটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবার বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ইয়েমেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই সামরিক সমন্বয় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array