ঢাকার সড়কে এবার ‘জট কাটার’ অভিযান
মালিবাগ থেকে বাংলামোটর—১০ থেকে ১৫ মিনিটের পথ। অথচ যানজটে আটকে সেই পথ পাড়ি দিতে কখনো গুনতে হয় ঘণ্টা। রাজধানীর এই চিরচেনা দুর্ভোগ কাটাতে এবার সড়ক বাড়ানোর চেয়ে সড়কের ওপর চাপ কমানোর পরিকল্পনায় জোর দিচ্ছে সরকার। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, রাস্তার পাশের বাস পার্কিং সরানো, কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট স্থানান্তর, উন্নয়নকাজে সমন্বয় এবং মহাখালী টার্মিনালের বাস পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়ার মতো একাধিক পদক্ষেপ সামনে এসেছে। এখন বড় প্রশ্ন—বারবার নেওয়া পরিকল্পনার মতো এবারও কি আটকে যাবে বাস্তবায়ন, নাকি সত্যিই গতি ফিরবে ঢাকার সড়কে?
- ফুটপাত দখলমুক্ত থেকে বাস পার্কিং সরানো—যানজট কমাতে একসঙ্গে একাধিক পদক্ষেপ
- রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে লাগাম দিয়ে ফেরানো হবে নগরীর গতি
ফুটপাত ফিরবে পথচারীর
ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ সড়কের কার্যকর জায়গা কমে যাওয়া। ফুটপাত দখল হয়ে গেলে পথচারীরা মূল সড়কে নেমে আসেন। এতে যানবাহন ও পথচারী একই জায়গা ব্যবহার করায় গতি কমে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। এ কারণে ফুটপাত হকারমুক্ত রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মিরপুর-১০ এলাকায় হকার উচ্ছেদের পর সড়কের চিত্রে যে পরিবর্তন দেখা গেছে, সেটিকে এই উদ্যোগের প্রাথমিক ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু উচ্ছেদ নয়, ফুটপাত যাতে আবার দখল না হয়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
সড়ক থেকে সরবে বাস
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে যত্রতত্র বাস দাঁড়িয়ে থাকা যানজটকে আরও তীব্র করে। এ সমস্যা কমাতে বঙ্গবাজার থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশে বাস পার্কিং সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মহাখালী বাস টার্মিনালে অপেক্ষমাণ বাসগুলো পূর্বাচল ডিপোতে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে টার্মিনাল ও আশপাশের সড়কে বাসের চাপ কমানোর পাশাপাশি পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত সড়কের অংশও যান চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে।
রাস্তা কাটাকাটিতে লাগাম
প্রতি বছর বর্ষাকালে ঢাকার যানজট বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীন উন্নয়নকাজে একই সড়ক বারবার কাটা হয়। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়ে যান চলাচলের জায়গা। অর্থবছর পরিবর্তনের কারণে আগামী বর্ষায় ঢাকায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি না করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলমান উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনাও রয়েছে। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে বর্ষায় যানজটের একটি বড় উৎস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।
সরানোর তালিকায় কারওয়ান বাজার
রাজধানীর যানজটের চাপ কমাতে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকায় ব্যবসা, পণ্যবাহী যান, ক্রেতা ও পথচারীর সমন্বিত চাপ তৈরি হয়। ফলে বাজারের কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারলে ওই এলাকার সড়কে চাপ কমার সুযোগ তৈরি হবে। তবে স্থানান্তরের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও পার্কিংয়ের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে যানজট এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
সাত নির্দেশনা, নজরে বাস্তবায়ন
ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী গত ৩০ আগস্ট এক বৈঠকে সাতটি নির্দেশনা দেন। সেগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আবারও বৈঠক হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনাও এসেছে, যাতে রাজধানীর প্রবেশপথে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমানো যায়। তবে যানজট নিয়ন্ত্রণে অতীতের অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নের অভাবে থেমে গেছে। স্কুল বাস চালু, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো কিংবা জোড়-বিজোড় নম্বরের গাড়ি চলাচলের মতো পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
অটোরিকশায় নতুন চাপ
এর বাইরে রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও নতুন সমস্যা তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যানবাহন ট্রাফিক আইন না মেনে চলাচল করে এবং মোড় বা ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে। এতে যান চলাচলে বিঘ্নের পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ে। তাই যানজট নিরসনের পরিকল্পনায় শুধু অবকাঠামো নয়, গণপরিবহন ও ছোট যানবাহনের চলাচলও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা প্রয়োজন।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array