যুদ্ধ থামাতে ইরানকে যে শর্ত দিল যুক্তরাষ্ট্র
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে তেহরানকে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ‘অর্থপূর্ণভাবে’ কমাতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর ভাষ্য, শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধকরণ কমানোর প্রমাণ দিতে হবে।
আলাস্কার ফেয়ারব্যাংকস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রয়টার্সকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির অন্যতম মৌলিক শর্ত হবে দেশটির পরমাণু সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা কমানো।
‘৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানির প্রয়োজন কী?’
ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করতে চায়, তাহলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ভ্যান্স বলেন, ‘আপনারা যদি পারমাণবিক অস্ত্র না–ই চান, তবে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানির কী প্রয়োজন? আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি যদি দিতেই হয়, তবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ করুন। এটি একেবারেই প্রাথমিক একটি শর্ত।’
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন শুধু কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো সমঝোতায় যেতে চায় না। ইরানকে বাস্তবে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও চাপ
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এর পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন ট্রাম্প।
ইরানের সিদ্ধান্ত কে নেন, জানে না যুক্তরাষ্ট্র?
শুধু পরমাণু কর্মসূচি নয়, ইরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন ভ্যান্স।
তিনি বলেন, তেহরানে প্রকৃতপক্ষে কারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করলেও দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁদের প্রকৃত কর্তৃত্ব কতটা, তা স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভ্যান্সের ভাষায়, ‘আমরা যে বিষয়টি বুঝতে পেরেছি, তা হলো, তাঁদের দেশ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।’
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে দাবি করেছেন, ইরানের প্রতিনিধিরা কারা এবং দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা ভালোভাবেই অবগত।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় নিজের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি ভ্যান্স। তবে হোয়াইট হাউসের প্রধান আলোচক হিসেবে প্রায়ই তাঁর নাম সামনে আসে।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই আলোচনায় জড়িত। তবে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিতে সামরিক বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন বলেও জানান ভ্যান্স। গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের কথাও তিনি নাকচ করে দেন।
ভ্যান্সের দাবি, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে মাঝেমধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম হলেও জলপথটি ব্যবহার করে জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের নেই।
চলমান সংঘাতের রাজনৈতিক চাপও কম নয়। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array