একটি বল, একটি জার্সি, একটি জীবন—মেসির বিদায়ে শেষ হলো রূপকথার অধ্যায়
মনুমেন্টালজুড়ে সেদিন যেন ফুটবল নয়, জমেছিল স্মৃতির মেলা। গ্যালারির কোথাও অশ্রুসিক্ত চোখ, কোথাও উচ্ছ্বাস, কোথাও আবার অবিশ্বাস—আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসিকে আর দেখা যাবে না! যে মানুষটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি দেশের ফুটবল-স্বপ্নের সঙ্গে মিশে ছিলেন, সেই মানুষটির জাতীয় দলের অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য দেখতে ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক ভরে দিয়েছিলেন বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম।
মেসিও জানতেন, এটি আর দশটি ম্যাচের মতো নয়। তাই জাতীয় সংগীতের সময়ই চোখে জমেছিল পানি। ম্যাচের ১০ মিনিটে যখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তার প্রতি সম্মান জানাল, তখন আবেগ সামলাতে পারেননি ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি। শেষ বাঁশির পরও ছিল একই দৃশ্য—চোখে পানি, মুখে হাসি, আর চারপাশে শুধু ‘ধন্যবাদ মেসি’।
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়টি তাই শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের ফল নয়। এটি ছিল ২১ বছরের এক আন্তর্জাতিক রূপকথার শেষ অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের শেষ পাতাতেও মেসি নিজের স্বাক্ষর রেখে গেলেন—এক গোল, দুই অ্যাসিস্ট এবং অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে।
শেষ ম্যাচের চিত্রনাট্যও লিখলেন মেসি
ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগেই বোঝা যাচ্ছিল, রাতটি অন্যরকম। মাঠে নামার আগে মেসিকে ঘিরে ছিল বিশেষ আয়োজন। পরিবারের সদস্যরা ছিলেন গ্যালারিতে, মাঠে ছিল তার ১০ নম্বর জার্সির বিশাল প্রতিকৃতি। পুরো আয়োজনজুড়ে বারবার ফিরে আসছিল একটি শব্দ—‘Gracias’।
মেসির বিদায়ী ম্যাচকে ঘিরে আবেগের পাশাপাশি ফুটবলটাও কম হয়নি। আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ নেয়। সতীর্থরা যেন বারবার মেসির পায়ে বল তুলে দিতে চাইছিলেন। শেষ ম্যাচে অধিনায়ককে একটি গোল উপহার দেওয়ার তাড়না ছিল সবার মধ্যে।
শেষ পর্যন্ত গোল এলো ৭১ মিনিটে। পেনাল্টি বক্সে ফাউলের পর পেনাল্টির বাঁশি বাজান চিলির রেফারি ফার্নান্দো ভেজার দিয়াস। বল হাতে নিয়ে স্পটে দাঁড়ালেন মেসি। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি পেনাল্টি মিস করার স্মৃতি তখনও ছিল। কিন্তু বিদায়ী রাতে ভুল করার কোনো সুযোগ রাখলেন না তিনি। ঠান্ডা মাথায় শট নিলেন পোস্টের বাঁ-দিকের ওপরের কোণে। গোলরক্ষক মার্সেল দানজিনুর কোনো সুযোগই ছিল না। বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হলো মনুমেন্টাল। সতীর্থরা ছুটে এলেন মেসির দিকে। আর গ্যালারিতে যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো দুই দশকের জমে থাকা ভালোবাসা।
গোলের সঙ্গে দুই অ্যাসিস্ট
বিদায়ী ম্যাচে শুধু গোল করেই থামেননি মেসি। আর্জেন্টিনার ৩-০ জয়ের পথে তিনি করেছেন দুটি অ্যাসিস্টও। অর্থাৎ শেষ ম্যাচেও দলের তিনটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। ম্যাচে ৯১ বার বল স্পর্শ করেছেন মেসি। তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরিসংখ্যানই যেন বলে দেয়—বয়স ৩৯ হলেও বল পায়ে তার প্রভাব এতটুকুও কমেনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে গোল করে মেসি নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ১২৬-এ। একই সঙ্গে এটি ছিল তার রেকর্ড-ভাঙা ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও সর্বোচ্চ গোল—দুটি রেকর্ডই এখন তার নামে।
‘জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই আমার জীবনের সেরা ঘটনা’
শেষ ম্যাচের পর মাইক্রোফোন হাতে যখন মেসি কথা বলতে শুরু করলেন, মনুমেন্টালে তখন নেমে এলো নীরবতা। তিনি প্রথমেই স্মরণ করলেন প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসিকে। জানালেন, দুই দশকের বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলতে পারা তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মানগুলোর একটি। তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল কৃতজ্ঞতা। তিনি মনে করিয়ে দেন, কঠিন সময়েও কখনো লড়াই থামাননি। পরাজয়, সমালোচনা কিংবা ব্যর্থতা—কোনোটিই তাকে জাতীয় দল থেকে দূরে সরাতে পারেনি। বরং বারবার ফিরে এসেছেন। আর সেই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় পুরস্কার কী? মেসির নিজের ভাষায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই ছিল তার জীবনে ঘটা সেরা ঘটনা।
‘আমি সারাজীবন ফিরে আসতে চাইতাম’
মেসির কথায় বারবার ফিরে এসেছে একটি অনুভূতি—তিনি যেতে চান না। কিন্তু তিনি এটাও বুঝেছেন, প্রতিটি রূপকথারই একসময় শেষ অধ্যায় আসে। ২০২৬ বিশ্বকাপের পরই জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে হারের পরও মেসি জানিয়েছিলেন, তিনি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, এবার সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে। তার বিদায়ী বক্তব্যেও ছিল সেই দ্বন্দ্ব—একদিকে জাতীয় দলের জার্সি ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেওয়ার বাস্তবতা।
যে ছেলেটি ছোট ছিল, তার স্বপ্ন ছিল অনেক বড়
আজকের মেসিকে বোঝার জন্য ফিরে যেতে হবে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে। ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেওয়া লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করতেন। পরিবারের প্রায় সবাই ফুটবলপাগল ছিলেন। চার বছর বয়সে স্থানীয় গ্রান্দোলি ক্লাবে বল পায়ে নেওয়া শুরু করেন তিনি। আট বছর বয়সে যোগ দেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব একাডেমিতে।
কিন্তু মেসির পথটা সহজ ছিল না। শৈশবেই তার শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। বয়সী অন্য শিশুদের তুলনায় শারীরিকভাবে ছোট ছিলেন তিনি। নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল, আর সেই চিকিৎসার খরচ পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখনই ফুটবল হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বল পায়ে মেসি ছিলেন অন্যরকম। ছোট শরীর, নিচু ভারকেন্দ্র, অসাধারণ ভারসাম্য, বাঁ পায়ের জাদু এবং চোখের পলকে দিক বদলে ফেলার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তাকে আলাদা করে ফেলেছিল।
১৩ বছর বয়সে বদলে গেল জীবন
২০০০ সালে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসির জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে। বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় সুযোগ পান তিনি। পরিবারকে নিয়ে পাড়ি জমান স্পেনে। বার্সেলোনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি হওয়ায় নতুন দেশে শুরু হয় তার সংগ্রাম। নিজের দেশ, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে অন্য দেশে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু ফুটবলের প্রতি তার একাগ্রতা তাকে দ্রুতই অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
লা মাসিয়ার একের পর এক বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে উঠে আসেন মূল দলে। ২০০৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম দলের একটি প্রীতি ম্যাচে অভিষেক। পরের বছর, ২০০৪ সালে, আনুষ্ঠানিকভাবে বার্সেলোনার সিনিয়র দলের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মাঠে নামেন। তারপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
বার্সেলোনায় শুরু হয় রাজত্ব
বার্সেলোনায় মেসি শুধু একজন তারকা হননি, হয়ে উঠেছিলেন পুরো একটি যুগের প্রতীক। রোনালদিনহোর ছায়া থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে নিজেই হয়ে ওঠেন দলের প্রাণ। গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেছেন, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙেছেন, রেকর্ড ভেঙেছেন—একসময় মনে হয়েছে, ফুটবলের নিয়মই যেন তার জন্য একটু আলাদা।
বার্সেলোনার হয়ে তিনি জিতেছেন অসংখ্য ট্রফি। চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ, ১০টি লা লিগাসহ ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধ্যায়গুলোর সঙ্গে তার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। ক্লাবটির হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোলের রেকর্ডও তার ক্যারিয়ারের বিশালত্বের সাক্ষ্য। ২০০৯ সালের ট্রেবল, ২০১১ সালের আরেকটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ২০১৫ সালের ট্রেবল—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। আর ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকা? সেটিও যেন আলাদা একটি বই। আটটি ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য গোল্ডেন বুট, রেকর্ডের পর রেকর্ড—মেসি ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ে যান ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের আলোচনার কেন্দ্রে।
কিন্তু আর্জেন্টিনার গল্প ছিল অনেক কঠিন
ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের পর সাফল্য এলেও জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির পথ ছিল কাঁটায় ভরা। ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হার—বারবার শিরোপার কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। একসময় এমনও মনে হয়েছিল, মেসির ভাগ্যে হয়তো জাতীয় দলের বড় ট্রফি নেই। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালের পর হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য ফিরে এসেছিলেন। সেই ফিরে আসাই পরে বদলে দেয় ইতিহাস।
২০২১: অভিশাপ ভাঙার শুরু
২০২১ কোপা আমেরিকা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনাল। মারাকানায় অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার গোল। আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর মেসির হাতে আন্তর্জাতিক বড় ট্রফি। সেদিন শুধু একটি শিরোপা জেতেনি আর্জেন্টিনা; মেসির কাঁধ থেকেও নেমে গিয়েছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ব্যর্থতার বোঝা। এরপর এল ফিনালিসিমা। ইতালিকে হারিয়ে আরেকটি ট্রফি। এরপর সেই স্বপ্নের মুহূর্ত, যার জন্য আর্জেন্টিনার মানুষ ৩৬ বছর অপেক্ষা করেছিল।
২০২২: কাতারের সেই রাত
কাতার বিশ্বকাপ। মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। গ্রুপপর্বে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু। তারপর একের পর এক বাধা পেরিয়ে ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। ম্যাচের ৯০ মিনিটে ২-২, অতিরিক্ত সময়ে ৩-৩। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার। আর সেখানে আর্জেন্টিনার জয়। মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
যে ট্রফিটি নিয়ে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, সেটিও অবশেষে তার হাতে। ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে মেসি যেন নিজের রূপকথার শেষ অসম্পূর্ণ অধ্যায়টিও পূর্ণ করেন।
কাতার বিশ্বকাপ তাকে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেনি; ফুটবল ইতিহাসে তার অবস্থানও আরও দৃঢ় করেছে। FIFA-ও তার বিশ্বকাপ, দুই কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ের কথা তুলে ধরে তাকে তার প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
২০২২-এর পর মেসি আর শুধু একজন খেলোয়াড় ছিলেন না
বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক যেন আরও গভীর হয়ে যায়।
দেশের মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আনন্দের প্রতীক। মনুমেন্টাল থেকে রোজারিও—যেখানেই জাতীয় দল খেলেছে, সেখানেই ছিল মেসিকে দেখার উন্মাদনা।
নিজের বিদায়ী বক্তব্যেও মেসি সেই ভালোবাসার কথা স্মরণ করেছেন। বলেছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খেলতে গিয়ে কখনো মনে হয়নি তিনি বাইরে খেলছেন। প্রতিটি স্টেডিয়ামই যেন ছিল তার নিজের ঘরের মাঠ।
২০২২ বিশ্বকাপের পর মনুমেন্টালে ফিরে আসার সেই রাতকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেই স্মৃতি আজও ভিডিওতে দেখলে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন—এমন কথাও বলেছেন বিদায়ী বক্তব্যে।
বাবা হোর্হের কথা মনে পড়ল শেষ রাতেও
মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আবেগের মধ্যে সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গাটি ছিল তার প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসিকে ঘিরে।
বিদায়ী বক্তব্যের শুরুতেই বাবার কথা মনে পড়ে যায় তার। কারণ মেসির ক্যারিয়ারের শুরু থেকে পরিবার ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
রোজারিওর ছোট্ট ছেলেটি যখন চিকিৎসার সমস্যায় ভুগছিল, তখন পরিবারই তার পাশে ছিল। ১৩ বছর বয়সে স্পেনে যাওয়ার সিদ্ধান্তেও পরিবার ছিল সঙ্গে। এরপর বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ওঠার পুরো যাত্রায় বাবা হোর্হে ছিলেন তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের রাতে হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বাবাকে স্মরণ করা ছিল যেন মেসির জীবনের পুরো যাত্রার দিকে একবার পেছনে ফিরে তাকানো।
শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষও হয়ে গেল শ্রদ্ধার অংশ
বেনিনের খেলোয়াড়রাও ম্যাচ শেষে মেসিকে অভিবাদন জানান।
এটি ছিল মেসির ক্যারিয়ারের এক বিশেষ দিক—তার প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনা বা বার্সেলোনার সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের কাছেও তিনি ছিলেন সম্মানের প্রতীক।
জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচে মেসির পাশে ছিলেন নিকোলাস ওতামেন্দির মতো দীর্ঘদিনের সতীর্থরা। ওতামেন্দির জন্যও এটি ছিল বিদায়ের রাত। ফলে ম্যাচটি কার্যত একটি প্রজন্মের সমাপ্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।
১০ নম্বর জার্সির শেষ রাত
মেসির বিদায়ী ম্যাচে শুধু একটি খেলোয়াড় বিদায় নেননি। বিদায় নিয়েছে একটি যুগ।
১০ নম্বর জার্সি, বাঁ পা, দুই-তিনজন ডিফেন্ডারকে একসঙ্গে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, অসম্ভব কোণ থেকে গোল, নিখুঁত পাস, মাঠের মাঝখান থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সঙ্গে মেসির নাম এতটাই জড়িয়ে গেছে যে তার অনুপস্থিতি এখন থেকেই কল্পনা করা কঠিন।
কিন্তু ফুটবলের নিয়ম এমনই। একদিন প্রত্যেক কিংবদন্তিকেই থামতে হয়। মেসিও থামলেন।
‘আমি অন্য প্রান্তে আপনাদের সঙ্গেই থাকব’
বিদায়ী ভাষণে মেসি শুধু অতীতের কথা বলেননি। ভবিষ্যতের কথাও বলেছেন। জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ালেও আর্জেন্টিনার পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সমর্থন করার কথা বলেছেন। তার বিশ্বাস, দল ঐক্যবদ্ধ থাকলে বড় বাধাও পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এ যেন অধিনায়কের শেষ নির্দেশনা। তিনি নিজে মাঠে থাকবেন না, কিন্তু দলের সঙ্গে থাকবেন অন্যভাবে। আর এটাই হয়তো মেসির বিদায়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক—তিনি শুধু নিজের অধ্যায় শেষ করেননি; পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য দরজাটিও খুলে দিয়ে গেছেন।
মেসি চলে গেলেন, কিন্তু গল্প শেষ হলো না
একটি শিশুর হাতে বল। রোজারিওর ছোট্ট মাঠ। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব দল। ১৩ বছর বয়সে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বার্সেলোনায় যাওয়া। লা মাসিয়ার সবুজ মাঠ। বার্সেলোনার ১০ নম্বর জার্সি। অসংখ্য গোল। অসংখ্য ট্রফি। আর্জেন্টিনার হয়ে কান্না। ফাইনালে হার। অবসর ঘোষণা। ফিরে আসা। কোপা আমেরিকা জয়। ফিনালিসিমা। বিশ্বকাপ। আর শেষ পর্যন্ত মনুমেন্টালে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের সামনে চোখের পানি মুছে বিদায় বলা।
এই পুরো গল্পটিই লিওনেল মেসি। একজন ফুটবলারের গল্পের চেয়েও বড়। এটি একটি প্রজন্মের গল্প।
যে প্রজন্ম মেসিকে দেখে বড় হয়েছে, তার গোল দেখে চিৎকার করেছে, হারের রাতে কেঁদেছে, ২০১৪-এর ফাইনালে হতাশ হয়েছে, ২০১৬-এর পর অবসরের খবরে ভেঙে পড়েছে, ২০২১-এ কোপা আমেরিকা জিতে উল্লাস করেছে এবং ২০২২-এ বিশ্বকাপ হাতে মেসিকে দেখে বিশ্বাস করেছে—কিছু স্বপ্ন সত্যিই পূরণ হয়। শেষ ম্যাচের পর ড্রোন শোতে আকাশে ভেসে উঠেছিল মেসির ছবি। আলো, আতশবাজি আর হাজারো মানুষের কণ্ঠে তখন একটাই অনুভূতি—কৃতজ্ঞতা।
মেসি আর আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন না। আর কোনো বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তার পায়ে বল দেখে অপেক্ষা করতে হবে না। মনুমেন্টালে ১০ নম্বর জার্সি পরে তার সেই পরিচিত দৌড় আর দেখা যাবে না। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যারা অবসর নিলেও খেলা থেকে কখনো অবসর নেন না। লিওনেল মেসি তেমনই একজন। কারণ মেসির গল্প কোনো শেষ বাঁশিতে শেষ হওয়ার নয়। তিনি ফুটবল খেলেছেন। ফুটবলকে বদলেছেন। আর শেষ পর্যন্ত ফুটবলও তাকে অমর করে দিয়েছে। মনুমেন্টালের সেই রাত তাই বিদায়ের রাত ছিল না শুধু—ছিল একটি যুগকে ধন্যবাদ জানানোর রাত। ধন্যবাদ, মেসি। একটি বলকে জাদুতে পরিণত করার জন্য। একটি জার্সিকে স্বপ্নে পরিণত করার জন্য। আর কোটি মানুষের শৈশবকে ফুটবলের সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার জন্য।
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array