ব্রিটেন ছাড়ছেন অতিধনীরা
ধনীরা দেশ ছাড়লে শুধু বাড়ির ঠিকানা বদলায় না—সরে যেতে পারে করের টাকা, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটেনে এখন সেই আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে। লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর গত দুই বছরে এক ডজনের বেশি অতিধনী দেশ ছেড়েছেন কিংবা ব্রিটেনের সঙ্গে তাঁদের কর-আবাসনের সম্পর্ক কমিয়েছেন। তাঁদের সম্মিলিত সম্পদের মূল্য প্রায় ১২০ বিলিয়ন পাউন্ড।
অঙ্কটি অবশ্য ব্রিটেন থেকে ১২০ বিলিয়ন পাউন্ড নগদ বেরিয়ে যাওয়ার হিসাব নয়। এটি সংশ্লিষ্ট ধনীদের মোট সম্পদের মূল্য। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় উদ্বেগ—যাঁরা চলে যাচ্ছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ আয়, কর, বিনিয়োগ ও ব্যয়ের কতটা আর ব্রিটেনে থাকবে?
- ১২০ বিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদের মালিকদের দেশত্যাগে বাড়ছে রাজস্ব হারানোর শঙ্কা
- করনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক
- সরকারের সামনে কঠিন ভারসাম্য
একের পর এক বদলাচ্ছে ঠিকানা
দেশত্যাগী অতিধনীদের তালিকায় সবচেয়ে বড় নাম ইস্পাত ব্যবসায়ী লক্ষ্মী মিত্তাল। ৩০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সম্পদের মালিক মিত্তাল গত বছর তাঁর কর-আবাসন সুইজারল্যান্ডে সরিয়েছেন এবং অধিকাংশ সময় দুবাইয়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ডেভিড রুবেনও গ্রীষ্মে মোনাকোয় চলে গেছেন। তাঁর সম্পদের মূল্য প্রায় ৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড। আর হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী ক্রিস রোকোস গ্রিসে কর-আবাসন সরাচ্ছেন। বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৫ সালে প্রায় ৩৩ কোটি পাউন্ড কর দিয়ে তিনি ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম ব্যক্তিগত করদাতা হয়েছিলেন। অর্থাৎ ব্রিটেন শুধু একজন ধনী বাসিন্দাকে হারাচ্ছে না; হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে ভবিষ্যতের বড় অঙ্কের করও।
‘নন-ডম’ সুবিধা বন্ধেই চাপ বাড়ল
ধনীদের ঠিকানা বদলের পেছনে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ব্রিটেনের ‘নন-ডম’ করব্যবস্থা বাতিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে দীর্ঘদিনের এই বিশেষ সুবিধা তুলে দেওয়া হয়। এর আওতায় ব্রিটেনে বসবাস করেও বিদেশকে স্থায়ী আবাস হিসেবে দেখানো কিছু ব্যক্তি বিদেশি আয় ও সম্পদের ওপর বিশেষ করসুবিধা পেতেন।
নতুন ব্যবস্থায় সেই সুবিধা সংকুচিত হওয়ায় অতিধনীদের করের দায় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে মূলধনি মুনাফা, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার করের চাপ নিয়ে উদ্বেগ যোগ হয়েছে। ফলে ব্রিটেনে থাকা এখন অনেক অতিধনীর কাছে শুধু জীবনযাপনের পছন্দ নয়, বড় আর্থিক সিদ্ধান্তও।
ক্ষতি শুধু করভান্ডারে নয়
একজন অতিধনী দেশ ছাড়লে রাষ্ট্রের ক্ষতি তাঁর ব্যক্তিগত আয়করেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় ব্যয়, কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অন্য দেশে সরে যেতে পারে।
ফোনসফোরইউ প্রতিষ্ঠাতা জন কডওয়েল এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে মন্তব্য করেছেন। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গ্রেশাম হাউসের প্রধান টনি ডালউডের মতে, ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর কর বাড়তে থাকলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির স্বাভাবিক চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখানেই ব্রিটেনের জন্য আসল ঝুঁকি। একজন ধনী চলে যাওয়ার অর্থ শুধু একজন করদাতাকে হারানো নয়; তাঁর সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশও হারানোর আশঙ্কা তৈরি হওয়া।
সরকারের যুক্তি উল্টো
তবে ব্রিটিশ সরকার এই প্রবণতাকে অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের দাবি, স্থিতিশীল করব্যবস্থা, শক্তিশালী পুঁজিবাজার, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং দক্ষ কর্মশক্তির কারণে ব্রিটেন এখনো আন্তর্জাতিক প্রতিভা ও বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয়।
সরকারের এই অবস্থানের পেছনে যুক্তিও আছে। কোনো দেশের করব্যবস্থা শুধু ধনীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি হতে পারে না; করের ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি অতিধনী ও উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ বিকল্প আবাস খুঁজে নেয়, তাহলে রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ—দুই দিকেই চাপ তৈরি হতে পারে।
সামনে কঠিন সমীকরণ
তাই ব্রিটেনের সামনে এখন দ্বিমুখী সমীকরণ। একদিকে করব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও রাজস্ব বাড়াতে হবে, অন্যদিকে এমন পরিবেশও ধরে রাখতে হবে যাতে অতিধনী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা দেশ ছাড়ার প্রয়োজন অনুভব না করেন।
১২০ বিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ তাই শুধু একটি বড় সংখ্যা নয়। এটি ব্রিটিশ অর্থনীতির সামনে থাকা প্রশ্নেরও প্রতীক—কর বাড়িয়ে কতটা রাজস্ব আদায় করা যাবে, আর সেই করের চাপের কারণে কতটা সম্পদ, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ রাজস্ব দেশের বাইরে চলে যেতে পারে? শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের সাফল্য নির্ভর করবে এই ভারসাম্য কতটা দক্ষতার সঙ্গে ধরে রাখা যায় তার ওপর।
কালের আলো/এসকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array