খুঁজুন
                               
, ,
           

চার্জে দিনে সাড়ে ৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪২ অপরাহ্ণ
চার্জে দিনে সাড়ে ৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট। বর্তমানে ঢাকায় আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, প্রতিটি অটোরিকশা চার্জে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। সে হিসাবে সর্বনিম্ন হিসাবেও এসব যান চার্জ দিতে প্রতিদিন প্রায় ৯৬ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যার মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এই বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ হচ্ছে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনের বাইরে। রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসবের অনেকগুলো গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা, সরু গলি ও টিনশেড গ্যারেজে। কোথাও আবাসিক মিটারের সংযোগে বাণিজ্যিকভাবে রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে।

  • ঢাকায় ১০–১২ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা
  • ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন
  • আবাসিক মিটারে বাণিজ্য
  • অভিযানের পরও থামছে না অনিয়ম

রাজধানীর মুগদা, মান্ডা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজারের কয়েকটি গ্যারেজ ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কয়েকটি গ্যারেজে বৈদ্যুতিক যান চার্জিংয়ের জন্য আলাদা মিটার থাকলেও তা ব্যবহার না করে আবাসিক সংযোগে রিকশা চার্জ দেওয়ার তথ্য মিলেছে। তেজগাঁওয়ে বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে।

অটোরিকশার এই অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং শুধু বিদ্যুৎ চুরি ও রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি এসব গ্যারেজকে ঘিরে মাদক কেনাবেচা, সেবন, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্বল্প দূরত্বে কম ভাড়ার জনপ্রিয় বাহনটি এখন নগরের বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে।

১২ লাখ অটোরিকশা, নেই নির্ভরযোগ্য হিসাব
রাজধানীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে, তার হালনাগাদ ও নির্ভুল সরকারি পরিসংখ্যান নেই। বিআরটিএর হিসাব উদ্ধৃত করে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় চলছে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ। তবে কোন এলাকায় কতটি রিকশা চলছে, কতটি গ্যারেজে চার্জ হচ্ছে, কতটি নিবন্ধিত বা বৈধ—এসব তথ্য এক জায়গায় নেই।

ফলে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত রুট ঠিক করা কিংবা চার্জিং অবকাঠামোর প্রয়োজন নির্ধারণ—কোনোটিই নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে করা যাচ্ছে না। ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতারা দাবি করছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর রাজধানীতে অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। তাঁদের হিসাবে, আগে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ রিকশা থাকলেও এখন তা ১০ থেকে ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিন ৯৬ লাখ ইউনিটের হিসাব
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ১২ লাখ রিকশার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮ ইউনিট ধরলেও প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ৯৬ লাখ ইউনিট। এর মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এটি মোট সম্ভাব্য ব্যবহারের হিসাব; এর সবটাই যে অবৈধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে বৈধ ও অবৈধ—দুই ধরনের চার্জিং মিলিয়ে এই বিপুল চাহিদা যে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।

জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিকভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

বৈধ স্টেশন ৩,৩০০, অবৈধ প্রায় ৪৮ হাজার
চার্জিং ব্যবস্থার চিত্রে সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্য দেখা যায় অনুমোদিত ও অননুমোদিত স্টেশনের সংখ্যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন চলছে। বিপরীতে সারা দেশে বৈধ চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যারেজ ব্যবসার সঙ্গে চার্জিং ব্যবসা একীভূত হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্যারেজে রিকশা রাখার পাশাপাশি সেখানেই ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ফলে আলাদা চার্জিং অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে আবাসিক বা অন্য ধরনের সংযোগ ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

মুগদা, মান্ডা ও তেজগাঁওয়ের কয়েকটি গ্যারেজে দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক যান চার্জিংয়ের জন্য পৃথক মিটার থাকলেও মালিকেরা আবাসিক সংযোগে বেশি রিকশা চার্জ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এতে অনুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহারের তুলনায় কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

মিটার আছে, ব্যবহার নেই
মান্ডা এলাকার এক গ্যারেজ মালিক জানান, বিদ্যুতের বিল বাড়ার আগে তাঁর গ্যারেজে ৩০ থেকে ৩৫টি রিকশা চার্জ হতো। তখন মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। পরে রিকশার সংখ্যা কমিয়ে প্রায় ২০টি করা হলেও মাসিক খরচ দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। গ্যারেজে কোন মিটার কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি।

লালবাগের আরেক গ্যারেজ মালিকের ভাষ্য, আগে ১৬৫টি রিকশা চার্জে মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা বিদ্যুৎ খরচ হতো। এখন রিকশা কমে ৭০টিতে দাঁড়ালেও বিল আসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। গ্যারেজ মালিকদের দেওয়া এসব হিসাব বিচ্ছিন্ন। তবে এগুলো থেকে মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ও প্রকৃত চার্জিংয়ের মধ্যে সমন্বিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

কোথাও হুক, কোথাও আবাসিক লাইন
সম্প্রতি তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ চার্জিংয়ের ঘটনা পাওয়া গেছে। তেজগাঁওয়ে বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। মোহাম্মদপুরের একটি আবাসিক এলাকায় টিনশেড গ্যারেজে প্রায় ৩০টি রিকশা আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

রায়েরবাজার বালুরমাঠ এলাকায় সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, র‌্যাব ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা যৌথ অভিযান চালান। ছয়টি গ্যারেজের মধ্যে চারটিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যায় এবং সেগুলো বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, ঢাকা উদ্যান, বসিলা, বেড়িবাঁধ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, বাড্ডা, নতুনবাজার, আফতাবনগর, মুগদা, মান্ডা ও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গ্যারেজ ঘিরে বাড়ছে অপরাধের অভিযোগ

বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনিয়মের পাশাপাশি গ্যারেজগুলোকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক কেনাবেচা ও সেবনের ঘটনা নতুন নয়। চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে এসব স্থানের যোগসূত্রও পাওয়া যায়। ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক মামলার সংখ্যা বেশি। এসব এলাকায় ভ্রাম্যমাণ অপরাধীদের আনাগোনাও থাকে। কেউ অপরাধ করার পর গ্যারেজে অবস্থান নিতে পারে সহজে। গ্যারেজগুলোর অবস্থানও এ ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক গ্যারেজ আবাসিক ভবনের নিচে, টিনশেড ঘরে, দোকানের পাশে কিংবা সরু গলির ভেতরে। সেখানে রিকশা রাখা, চার্জ দেওয়া ও মানুষের যাতায়াত—সবকিছু একই জায়গায় হওয়ায় নিয়মিত নজরদারি কঠিন।

অগ্নিঝুঁকিও কম নয়
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ফলে অগ্নিঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সরু গলি বা আবাসিক ভবনের ভেতরে অপর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক অবকাঠামোয় একাধিক ব্যাটারি চার্জ হলে শর্টসার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা থাকে। এর সঙ্গে রয়েছে পুরোনো সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ঝুঁকি। ব্যবহৃত ব্যাটারি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি অনিয়ন্ত্রিত গ্যারেজে বিদ্যুৎ চুরি বা বিল ফাঁকির পাশাপাশি অগ্নি ও পরিবেশগত ঝুঁকিও জমা হচ্ছে।

অভিযান হচ্ছে, কিন্তু থামছে না
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক মাসে গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নতুন করে যাতে এসব গ্যারেজে সংযোগ দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানান, কয়েক মাস ধরে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যারেজগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ, আবাসিক লাইনে বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ চুরির বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে অভিযান-পরবর্তী পরিস্থিতিই এখন বড় প্রশ্ন। কোনো একটি গ্যারেজের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর সেখানে আবার নতুন সংযোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় না থাকলে অনিয়ম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন।

নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে গ্যারেজও
সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীকে আটটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জোনভিত্তিক আলাদা রঙ, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও কিউআর কোড রাখার কথা রয়েছে। কিউআর কোডের মাধ্যমে মালিক ও চালকের তথ্য জানা যাবে। খসড়া নীতিতে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, নির্ধারিত রুট, অনুমোদিত নকশা, নিরাপদ যন্ত্রাংশ ও বৈধ চার্জিং স্টেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগ কার্যকর হলে রিকশার প্রকৃত সংখ্যা ও চলাচলের এলাকা সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হতে পারে। কিন্তু চার্জিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে শুধু রিকশার নিবন্ধন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি অনুমোদিত গ্যারেজে কতটি রিকশা চার্জ হবে, কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, কোন মিটারে সেই ব্যবহার রেকর্ড হচ্ছে এবং বিলের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব তথ্যও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। স্বল্প দূরত্বে কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগের কারণে যাত্রীদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে এই খাতে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক চালক ও মালিকের জীবিকা। তাই হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যাটি মূলত নিয়ন্ত্রণের। রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন, রুট ব্যবস্থাপনা, গ্যারেজের অনুমোদন, চার্জিং স্টেশনের লাইসেন্স এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

কালের আলো/এমএসআই/এমকে

নোবেলজয়ীদের ছবিতে কালো রেখা আর সোনালি আভা কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৩ অপরাহ্ণ
নোবেলজয়ীদের ছবিতে কালো রেখা আর সোনালি আভা কেন?

বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি নোবেল। প্রতিবছর এই পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণার অপেক্ষায় থাকে পুরো বিশ্ব। কিন্তু বিজয়ীদের নামের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে নোবেল পুরস্কারের পরিচিত অংশ—কালো রেখায় আঁকা মুখ, আর তার পেছনে ঝলমলে সোনালি আভা।

বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, ডিজিটাল আর্কাইভ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মুহূর্তেই তৈরি করা যায় নানা ধরনের প্রতিকৃতি। তাহলে নোবেলজয়ীদের ক্ষেত্রে কেন আলোকচিত্রের বদলে বেছে নেওয়া হয়েছে হাতে আঁকা এই বিশেষ শিল্পরীতি? কেন একই ধরনের রেখা ও সোনালি পটভূমিতে তুলে ধরা হয় বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, চিকিৎসক কিংবা শান্তিতে অবদান রাখা ব্যক্তিদের মুখ?

এর উত্তর শুধু শিল্পীর নান্দনিক পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংবাদ প্রকাশের বাস্তব প্রয়োজন, একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষার বিকাশ এবং বিশ্বজুড়ে পরিচিত একটি পুরস্কারের নিজস্ব দৃশ্যমান পরিচয় গড়ে তোলার গল্প।

ছবির অভাব থেকেই শুরু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

নোবেলজয়ীদের এই বিশেষ প্রতিকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুইডিশ শিল্পী নিকলাস এলমেহেডের নাম। ২০১২ সালে নোবেল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তে অনেক বিজয়ীর ভালো মানের ছবি দ্রুত সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। বিজয়ীর নাম প্রকাশের পরপরই সংবাদমাধ্যমকে তাঁর ছবি প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু কোনো গবেষক বা বিজ্ঞানীর উপযুক্ত ছবি সহজে না পাওয়া গেলে খবর প্রকাশে সমস্যা তৈরি হয়। অনলাইনে পাওয়া ছবির মানও সব সময় সংবাদমাধ্যমের ব্যবহারের উপযোগী হয় না।

এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এলমেহেড হাতে আঁকা প্রতিকৃতি তৈরির পথ বেছে নেন। কালো রেখায় মুখের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার এই পদ্ধতিতে অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব হয় পরিচিতিমূলক ছবি। ফলে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তৈরি হতে থাকে আলাদা একটি দৃশ্যশৈলী।

একই শৈলীতে কেন তুলে ধরা হয় সব বিজয়ীকে?

নোবেলজয়ীদের প্রত্যেকের কাজ, পরিচিতি ও অর্জন আলাদা। কেউ পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সূত্র নিয়ে গবেষণা করেন, কেউ নতুন ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতির বিকাশে অবদান রাখেন, কেউ সাহিত্যে নতুন ভাবনার জন্ম দেন, আবার কেউ শান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করেন।

এত বৈচিত্র্যের পরও তাঁদের প্রতিকৃতিতে একটি অভিন্ন শৈলী বজায় রাখা হয়। এর ফলে প্রতিটি ছবি আলাদাভাবে ব্যক্তির পরিচয় বহন করলেও সবগুলো একসঙ্গে নোবেল পুরস্কারের একটি সমন্বিত দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি করে।

এটি একধরনের ব্র্যান্ডিংও। কোনো সংবাদে কালো রেখায় আঁকা মুখের সঙ্গে সোনালি আভা দেখা গেলে অনেক দর্শক সহজেই সেটিকে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন। বারবার একই ধরনের ছবি ব্যবহারের ফলে এই দৃশ্যশৈলী মানুষের মনে স্থায়ী পরিচিতি পেয়েছে।

কালো রেখার মধ্যেই মুখের পরিচয়

এই প্রতিকৃতির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর সরলতা। মুখের প্রতিটি খুঁটিনাটি আলোকচিত্রের মতো ফুটিয়ে তোলার পরিবর্তে শিল্পী গুরুত্ব দেন চোখ, নাক, ঠোঁট, চুল ও মুখের গড়নের মতো প্রধান বৈশিষ্ট্যে।

গাঢ় কালো রেখা ছবিকে দেয় দৃঢ়তা। অপ্রয়োজনীয় রং ও জটিল ছায়া কম থাকায় ছোট আকারেও মুখের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট থাকে। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট, মোবাইল স্ক্রিন কিংবা সংবাদপত্র—বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই সরলতা কার্যকর।

তবে ছবিগুলোর বিশেষত্ব শুধু সহজে চেনা যায় এমন হওয়া নয়। হাতে আঁকা রেখা প্রতিটি প্রতিকৃতিতে একটি শিল্পিত অনুভূতি যোগ করে। ফলে ছবিগুলো নিছক পরিচিতিমূলক ছবি না থেকে নিজস্ব নান্দনিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।

সোনালি আভা এল কীভাবে?

কালো রেখায় আঁকা মুখের সঙ্গে সোনালি রঙের ব্যবহার প্রতিকৃতিগুলোকে আরও স্বতন্ত্র করেছে। তবে বর্তমানের পরিচিত এই রূপ শুরু থেকেই ছিল না।

নোবেল পুরস্কারের ব্র্যান্ড পরিচয়ে সোনালি রঙের গুরুত্ব বাড়ার পর প্রতিকৃতিতেও এর ব্যবহার নতুন মাত্রা পায়। ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তাঁর প্রতিকৃতিতে আসল গোল্ড ফয়েল বা সোনার পাত ব্যবহার শুরু করেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

সোনালি রং নোবেল পদকের ঐতিহ্যের সঙ্গে দৃশ্যগত সম্পর্ক তৈরি করে। কালো রেখার সঙ্গে উজ্জ্বল সোনালি পাতের বৈপরীত্য ছবিকে দেয় আলাদা আকর্ষণ। ফলে প্রতিকৃতিগুলো সাধারণ ছবি থেকে আলাদা হয়ে ওঠে এবং দূর থেকেই সহজে নজরে পড়ে।

এখানে সোনালি আভা শুধু সাজসজ্জার উপাদান নয়; এটি নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি দৃশ্যমান সংকেত হিসেবেও কাজ করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও হাতে আঁকা প্রতিকৃতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে এখন ছবি তৈরি ও সম্পাদনার পদ্ধতি অনেক সহজ হয়েছে। কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই তৈরি করা যায় নানা ধরনের ডিজিটাল প্রতিকৃতি। এমন সময়ে নোবেলজয়ীদের হাতে আঁকা ছবিগুলো বিশেষভাবে নজর কাড়ে।

এই প্রতিকৃতি তৈরিতে কালো অ্যাক্রিলিক রং ও মার্কার দিয়ে মুখের রেখা আঁকা হয়। এরপর বিশেষ আঠার সাহায্যে যুক্ত করা হয় ধাতব সোনার পাত। অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও ছবিগুলোর পেছনে রয়েছে বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা শিল্পকর্ম।

এই হাতে তৈরি বৈশিষ্ট্য ছবিগুলোকে আরও আলাদা করে। একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট শৈলী অনুসরণ করেও প্রতিটি মুখের নিজস্বতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।

একটি প্রতিকৃতি, দুটি পরিচয়

নোবেলজয়ীদের এই ছবির দিকে তাকালে দুটি বিষয় একসঙ্গে সামনে আসে। প্রথমত, প্রতিকৃতিটি নির্দিষ্ট একজন মানুষের মুখ ও পরিচয় তুলে ধরে। দ্বিতীয়ত, একই শিল্পরীতির কারণে ছবিটি নোবেল পুরস্কারের বৃহত্তর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

এ কারণেই প্রতিকৃতিগুলো শুধু বিজয়ীর ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না; নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা ঘিরে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহেরও একটি পরিচিত দৃশ্যমান উপাদান হয়ে উঠেছে।

একসময় দ্রুত ছবি সংগ্রহের সমস্যার সমাধান হিসেবে শুরু হওয়া উদ্যোগ এখন শিল্প, সংবাদ উপস্থাপন ও ব্র্যান্ড পরিচয়ের সমন্বিত উদাহরণ। প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এই শৈলী সময়ের সঙ্গে নিজস্ব ঐতিহ্য তৈরি করেছে।

নোবেলজয়ীদের কালো রেখায় আঁকা মুখ আর সোনালি আভা তাই কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন, শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা এবং একটি বিশ্বখ্যাত পুরস্কারকে আলাদা করে চেনানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্রতিবছর বিজয়ীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিকৃতিগুলোও সামনে আসে—আর সেই পরিচিত দৃশ্যই মনে করিয়ে দেয়, কখনো কখনো একটি ছোট সমাধানও সময়ের সঙ্গে বড় ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে।

কালের আলো/জেএন

আন্তর্জাতিক আইন থেকে মহাবিশ্বের রহস্য—২০২৬ সালের নোবেলজয়ীদের গল্প

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৩ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক আইন থেকে মহাবিশ্বের রহস্য—২০২৬ সালের নোবেলজয়ীদের গল্প

বিশ্বের জ্ঞান, মানবতা ও সৃজনশীলতার জগতে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি নোবেল পুরস্কার। প্রতিবছর এই পুরস্কারের মাধ্যমে সামনে আসে এমন কিছু মানুষের নাম, যাঁদের গবেষণা, সাহিত্যকর্ম কিংবা মানবাধিকারের পক্ষে দীর্ঘ সংগ্রাম পৃথিবীকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারেও সেই বৈচিত্র্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মহাবিশ্বের গভীর থেকে আসা অতি ক্ষুদ্র কণার সন্ধান, জীবন্ত মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার নতুন প্রযুক্তি, রাসায়নিক বিক্রিয়ার জটিল রহস্য উন্মোচন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে দীর্ঘ লড়াই—বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন এবারের বিজয়ীরা।

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ঘোষণা করা হয়েছে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার। এ সম্মান পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই। এর আগে সপ্তাহজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও সাহিত্যে পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারের ঘোষণা আসবে ১২ অক্টোবর। ফলে এবারের নোবেল সপ্তাহে এখন পর্যন্ত পাঁচটি বিভাগের বিজয়ীর নাম জানা গেছে।

শান্তিতে নোবেল: আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে নাভি পিল্লাই

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাঁকে এ পুরস্কার দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় বর্ণবৈষম্যের সময়। ১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল অঞ্চলে আইন পেশায় যুক্ত হওয়া প্রথম নারী হিসেবে পরিচিতি পান এবং পরে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হন। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই, রাজনৈতিক বন্দীদের অধিকার এবং নিপীড়নের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

রুয়ান্ডার গণহত্যাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন পিল্লাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচারিক কাজ যৌন সহিংসতা ও গণহত্যার আইনি ব্যাখ্যা বিকাশে ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেও আলোচনায় আসেন তিনি। কমিশনটি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল; ইসরায়েল সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে পিল্লাইয়ের নোবেলপ্রাপ্তি আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে নোবেল কমিটির ঘোষিত কারণ তাঁর শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা—এ পুরস্কারকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

নোবেল কমিটির বক্তব্যের মূল সুর হলো, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন চাপের মুখে, তখন আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি রক্ষার প্রচেষ্টা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন সেই প্রচেষ্টারই একটি উদাহরণ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল: আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার নতুন পথ

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরবিদ্যায় ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেল। আলো-সংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তির বিকাশে তাঁদের অবদানের জন্য এ সম্মান দেওয়া হয়েছে।

অপটোজেনেটিকস এমন একটি গবেষণাপদ্ধতি, যার সাহায্যে নির্দিষ্ট আলো ব্যবহার করে জীবন্ত কোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা যায়। বিশেষ করে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ কীভাবে কাজ করে, একে অপরের সঙ্গে সংকেত আদান-প্রদান করে এবং আচরণ বা অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই গবেষণার একটি মূল ভিত্তি হলো আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন। শৈবালের মতো জীবের মধ্যে পাওয়া কিছু প্রোটিন আলো পেলে আয়ন চলাচলের পথ খুলে দিতে বা বন্ধ করতে পারে। গবেষকেরা এসব প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গড়ে তুলেছেন। এতে গবেষণাগারে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে তাদের ভূমিকা বোঝা সম্ভব হয়েছে।

আগে স্নায়ুতন্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট অংশের কার্যক্রম এবং আচরণের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা ছিল জটিল কাজ। অপটোজেনেটিকস গবেষকদের সেই প্রক্রিয়া আরও সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে। স্নায়ুবিজ্ঞান, মস্তিষ্কের রোগ নিয়ে গবেষণা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নয়নে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব রয়েছে।

তবে এই স্বীকৃতির অর্থ এই নয় যে অপটোজেনেটিকস ইতিমধ্যেই সব স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা হয়ে গেছে। বরং মস্তিষ্কের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান অর্জন এবং ভবিষ্যতের গবেষণার নতুন পথ তৈরিতে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল: দক্ষিণ মেরুর বরফে মহাবিশ্বের অদৃশ্য বার্তাবাহক

২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন। আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে তাঁর নির্ণায়ক অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য তাঁকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে।

নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র উপপরমাণবিক কণা। এদের বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে বিপুলসংখ্যক নিউট্রিনো পৃথিবী ও আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেও অধিকাংশ সময় তা শনাক্ত করা যায় না। এই কারণে নিউট্রিনোকে অনেক সময় ‘ভূতুড়ে কণা’ও বলা হয়।

কিন্তু এই কণাগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও শক্তিশালী ঘটনাগুলো সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার বিশেষ মাধ্যম। নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশের পরিবেশ এবং অন্য উচ্চশক্তির মহাজাগতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিউট্রিনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

হালজেনের নেতৃত্ব ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে গড়ে ওঠে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে আলো শনাক্তকারী সেন্সর। কোনো নিউট্রিনো বরফের মধ্যে থাকা পদার্থের সঙ্গে বিরলভাবে মিথস্ক্রিয়া করলে যে আলোর ঝলক তৈরি হয়, সেটি শনাক্ত করে বিজ্ঞানীরা কণাটির বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে ধারণা পান।

এই পর্যবেক্ষণব্যবস্থা মহাজাগতিক নিউট্রিনোর গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলেছে। দূরবর্তী মহাবিশ্ব থেকে আসা এসব কণা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু শক্তিশালী ঘটনার খোঁজ পেতে পারেন, যেগুলো প্রচলিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে সহজে ধরা পড়ে না।

হালজেনের পুরস্কার তাই শুধু একটি যন্ত্র নির্মাণের স্বীকৃতি নয়; এটি মহাবিশ্বকে জানার নতুন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি। আলোর পরিবর্তে নিউট্রিনোর সংকেত ব্যবহার করে মহাকাশের রহস্য অনুসন্ধানের যে পথ তৈরি হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এখনও বিস্তৃত।

রসায়নে নোবেল: অণুর আয়নার মতো দুই রূপের রহস্য

২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অঁরি বি. কাগাঁ ও কেনসো সোয়াই। অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে অরৈখিক প্রভাব ও স্বয়ং-অনুঘটনের আবিষ্কারের জন্য তাঁদের এ সম্মান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের গবেষণা এমন একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করেছে—কেন কোনো কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একই অণুর দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপের মধ্যে একটি বেশি তৈরি হয়?

কিছু অণুর গঠন আমাদের দুই হাতের মতো। ডান ও বাম হাত দেখতে কাছাকাছি হলেও একটিকে অন্যটির ওপর পুরোপুরি মেলানো যায় না। রসায়নে এ ধরনের গঠনকে কাইরাল বা কাইরালিটি-সম্পন্ন বলা হয়। একই রাসায়নিক উপাদান থাকলেও অণুর এই দুই রূপ জীবন্ত শরীরে ভিন্ন আচরণ করতে পারে।

জীববিজ্ঞানে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক জৈব অণু, ওষুধ এবং জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিক যৌগের কার্যকারিতা তাদের ত্রিমাত্রিক গঠনের ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো বিক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত একটি রূপ বেশি পরিমাণে তৈরি করার পদ্ধতি উন্নত করা রসায়নের বড় চ্যালেঞ্জ।

কাগাঁ ও সোয়াইয়ের গবেষণা অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে অরৈখিক প্রভাব এবং স্বয়ং-অনুঘটনের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। স্বয়ং-অনুঘটনের ক্ষেত্রে কোনো বিক্রিয়ার উৎপন্ন পদার্থই সেই বিক্রিয়ার অগ্রগতিতে অনুঘটকের মতো ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে বিক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট রূপ আরও বেশি তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

এই মৌলিক ধারণাগুলো ওষুধ তৈরি, জৈব অণুর সংশ্লেষণ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাজ রসায়নবিদদের দেখিয়েছে, অণুর গঠন ও বিক্রিয়ার গতিপ্রকৃতির সূক্ষ্ম সম্পর্ক বুঝতে পারলে কাঙ্ক্ষিত রাসায়নিক ফল অর্জনের নতুন উপায় পাওয়া সম্ভব।

সাহিত্যে নোবেল: অ্যান কারসনের সৃজনশীল লেখালেখির স্বীকৃতি

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অ্যান কারসন। তাঁর সাহসী ও অভিনব সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে সুইডিশ অ্যাকাডেমি এ পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

কারসন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক হিসেবে পরিচিত। তাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, দর্শন, প্রেম, স্মৃতি, শোক ও মানুষের অন্তর্জগতের মতো বিষয় নতুন আঙ্গিকে উঠে আসে। কবিতা, গদ্য ও গবেষণামূলক লেখার প্রচলিত সীমানা অতিক্রম করে তিনি নিজস্ব ভাষা ও নির্মাণশৈলী তৈরি করেছেন।

তাঁর কাজের বিশেষত্ব হলো, পুরোনো সাহিত্য ও দর্শনের উপাদানকে সমসাময়িক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা। কখনো কবিতা, কখনো প্রবন্ধ, কখনো অনুবাদ কিংবা বিভিন্ন সাহিত্যরীতির মিশ্রণে তিনি পাঠকের সামনে পরিচিত বিষয়কে নতুনভাবে হাজির করেন।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার শুধু জনপ্রিয়তা বা বই বিক্রির স্বীকৃতি নয়; লেখকের সাহিত্যিক অবদান, সৃজনশীলতা এবং ভাষা ও ভাবনার জগতে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থানকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারসনের পুরস্কার সেই স্বতন্ত্র সাহিত্যভাষা ও প্রচলিত আঙ্গিক নিয়ে তাঁর নিরীক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

অর্থনীতিতে নোবেল: ঘোষণা আসছে ১২ অক্টোবর

২০২৬ সালের নোবেল সপ্তাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা বাকি রয়েছে অর্থনীতিতে। ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

এই পুরস্কারটি আলফ্রেড নোবেলের মূল উইলে উল্লিখিত পাঁচটি নোবেল পুরস্কারের অংশ ছিল না। ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেরিজেস রিক্সব্যাংক, তাদের ৩০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অর্থনীতিতে এ স্মারক পুরস্কার চালু করে। পরের বছর থেকে এটি দেওয়া শুরু হয়।

অর্থনীতিতে পুরস্কারটি সাধারণত এমন গবেষণাকে স্বীকৃতি দেয়, যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কার্যক্রম, বাজার, দারিদ্র্য, বৈষম্য, কর্মসংস্থান কিংবা মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়। তবে ২০২৬ সালের বিজয়ীর নাম ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এ বিভাগে কারা পুরস্কার পাচ্ছেন, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

নোবেল পুরস্কারের পেছনের ইতিহাস

সুইডিশ উদ্ভাবক, প্রকৌশলী ও শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের উইল থেকে নোবেল পুরস্কারের যাত্রা শুরু। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের আয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম পুরস্কারগুলো দেওয়া হয় ১৯০১ সালে।

পরবর্তীকালে অর্থনীতিতে স্মারক পুরস্কার যুক্ত হয়। তবে গণিত, ইতিহাস বা সাংবাদিকতার মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের জন্য আলাদা নোবেল পুরস্কার নেই। নোবেল পুরস্কারের নির্দিষ্ট বিভাগগুলোতেই সংশ্লিষ্ট কমিটি ও প্রতিষ্ঠান বিজয়ী নির্বাচন করে।

২০২৬ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিটি বিভাগে পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা নির্ধারণ করেছে। পুরস্কারজয়ীরা পদক, সনদ ও অর্থমূল্য পান। আনুষ্ঠানিক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান ১০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যা আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী।

পাঁচ বিভাগে পাঁচ ধরনের অবদান, সামনে অর্থনীতির ঘোষণা

২০২৬ সালের নোবেলজয়ীদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও একটি বিষয় তাঁদের এক জায়গায় যুক্ত করেছে—মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ানো। নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন; ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেলের গবেষণা জীবন্ত মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার নতুন পথ তৈরি করেছে; হালজেন মহাবিশ্বের দূরবর্তী উৎস থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্তের গবেষণায় অবদান রেখেছেন; কাগাঁ ও সোয়াই রাসায়নিক বিক্রিয়ার মৌলিক রহস্য উন্মোচনে কাজ করেছেন; আর অ্যান কারসন সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র সৃজনশীল ভাষার জন্য সম্মানিত হয়েছেন।

নোবেল পুরস্কারের গুরুত্ব শুধু বিজয়ীদের নাম ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। এসব স্বীকৃতি একই সঙ্গে তুলে ধরে, মানবসমাজ কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে, কোন গবেষণাকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে এবং ন্যায়বিচার ও সৃজনশীলতার কোন প্রচেষ্টাকে বিশ্বজুড়ে মূল্য দেওয়া হচ্ছে।

এবারের নোবেল সপ্তাহের শেষ বড় ঘোষণা অর্থনীতিতে। ১২ অক্টোবর সেই নাম জানা গেলে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের সব বিভাগের বিজয়ীদের তালিকা পূর্ণ হবে।

কালের আলো/জেএন

৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা তবু ঋণে ভাটা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৭ অপরাহ্ণ
৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা তবু ঋণে ভাটা

৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা। বিতরণ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৬৮১ কোটি। অর্থাৎ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য যে বিপুল অর্থের ঘোষণা, তার সিংহভাগই এখনো উদ্যোক্তার হাতে পৌঁছেনি। ১৫টি স্কিমে মোট বরাদ্দের মাত্র ১১ শতাংশের কিছু বেশি বিতরণ হয়েছে। আরও ৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন। ফলে অর্থ আছে, চাহিদাও আছে—কিন্তু ঋণ ছাড়ের গতি নেই।

সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর ২০ হাজার কোটি টাকার স্কিমে। বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। বরাদ্দের শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। যে অর্থে বন্ধ কারখানার চাকা ঘোরার কথা, সেই অর্থের প্রায় পুরোটা এখনো ব্যাংকেই আটকে আছে।

  • ১৫ স্কিমে বিতরণ ৬ হাজার ৬৮১ কোটি
  • বন্ধ শিল্প চালুর ২০ হাজার কোটিতে ছাড় মাত্র ৫০ কোটি
  • খেলাপির ভয়ে ব্যাংকের সতর্কতা

টাকা আছে, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নেই
ব্যাংকারদের বক্তব্য, প্রণোদনার অর্থের অভাব নেই; সংকট ঝুঁকি নেওয়ার। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ যখন তীব্র, তখন পুরনো ঋণে জর্জরিত কিংবা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানে নতুন অর্থ ঢালতে ব্যাংকগুলো স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে।

কারখানা চালু করলেই উৎপাদন শুরু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন অর্থায়নের পর বাজারে প্রতিষ্ঠানটি টিকবে কি না, পুরনো ঋণ কীভাবে সামলাবে, ভবিষ্যতে নগদ প্রবাহ তৈরি হবে কি না—সবই খতিয়ে দেখছে ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান বলেন, বন্ধ শিল্পে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি বেশি। পুরনো ঋণ ও খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানকে নতুন অর্থায়নের আগে তার ভবিষ্যৎ সক্ষমতা যাচাই জরুরি।

যে স্কিমে টাকা, সেখানেই পার্থক্য
প্রণোদনার সব খাত অবশ্য সমানভাবে স্থবির নয়। ৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে গেছে প্রায় ৪ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির স্কিমে বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি।

অন্যদিকে, ৩ হাজার কোটি টাকার কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ, ১ হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ২ হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি স্কিমে এখনো এক টাকাও বিতরণ হয়নি। অর্থাৎ যে খাতে ঋণ ফেরতের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, সেখানে ব্যাংকের গতি আছে। আর যেসব খাতে নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করানোর ঝুঁকি বেশি, সেখানেই আটকে আছে অর্থ।

উদ্যোক্তাও আটকে শর্তের জালে
ব্যাংকের ঝুঁকি-ভীতির সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্যোক্তাদের কাগজপত্র ও জামানতসংক্রান্ত জটিলতা। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব দুর্বল, ব্যাংকিং রেকর্ড অসম্পূর্ণ কিংবা পর্যাপ্ত জামানত নেই। ফলে আবেদন করেও অনুমোদনের শেষ ধাপে গিয়ে অনেকে আটকে যাচ্ছেন।

প্রণোদনা পেতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা অনিষ্পন্ন আছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের শর্ত। ফলে ব্যবসা রক্ষায় আইনি লড়াইয়ে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়ার পথ আরও কঠিন হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট তাসকিন আহমেদের মতে, উদ্যোক্তাদের অনীহার চেয়ে ব্যাংকের অতিরিক্ত কড়াকড়ি ও নীতিগত জটিলতাই বড় বাধা।

দ্রুত দিলে খেলাপি, দেরি হলে লক্ষ্যভ্রষ্ট
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ। সরকার চায় দ্রুত ঋণ বিতরণ; কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের সতর্কতা—শুধু বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে চালু করার প্রয়োজন আছে বলেই ঋণ দেওয়া যাবে না। নতুন অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি টেকসই হবে কি না, সেটিই আগে দেখতে হবে। নইলে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণই পরে খেলাপি ঋণের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে