১০ অক্টোবর দিল্লির রাজপথে ‘জেন জ়ি’ ঝড়?
দিল্লির রাজপথ কি ফের উত্তাল হতে চলেছে? ১০ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কক্রোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিকে ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই সামনে। দলের দাবি, এটি নিছক কোনও রাজনৈতিক দলের বিক্ষোভ নয়; যুবসমাজ ও জেন জ়ি-র গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার বৃহত্তর প্রতিবাদ। ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে ফর্ম ৬—প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার এই বিষয়গুলোকেই নাগরিকের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে পরিণত করে আন্দোলনের পরিধি বাড়াতে চাইছে তারা।
যন্তর মন্তর শুধু জায়গা নয়, প্রতিরোধের প্রতীক
দলের সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাশের বক্তব্যে কর্মসূচির কৌশলও স্পষ্ট। যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে জমায়েতের পরিকল্পনা থাকলেও পুলিশ বাধা দিলে যে জায়গায় থামানো হবে, সেখানেই বসে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনও স্থান নয়, প্রতিবাদের ধারাবাহিকতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। নেতাদের আগাম আটক বা গ্রেফতারের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন সৌরভ। তাঁর বার্তা, প্রশাসনিক পদক্ষেপে আন্দোলন থামবে না। এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে নিছক প্রতীকী বিক্ষোভ হিসেবে দেখছে না কক্রোচ জনতা পার্টি। বরং পুলিশি বাধা বা গ্রেফতারকেও আন্দোলনের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ করে তোলার প্রস্তুতি রয়েছে।
- সেনা পরিবারের উঠান থেকে বাম ছাত্ররাজনীতির সামনের সারিতে
- নির্বাচন কমিশন-বিরোধী আন্দোলনে নতুন মুখ নেহা বোরা
ফর্ম ৬ থেকে ভোটাধিকার—ইস্যুর বিস্তার
আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকা এবং ফর্ম ৬। দলের অভিযোগ, ফর্ম ৬ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া পর্যবেক্ষণের অসঙ্গতি রয়েছে। এই দাবির আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি বা সংশোধনের প্রক্রিয়া সরাসরি নাগরিকের ভোটাধিকারকে স্পর্শ করে।
আন্দোলনকারীরা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাকে তাই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে নিয়ে যেতে চাইছেন। ১০ অক্টোবরের কর্মসূচির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে, এই ইস্যু রাজনৈতিক দলের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ নাগরিকের উদ্বেগে পরিণত হয় কি না তার ওপর।
নিটের মঞ্চ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে
এই আন্দোলনের আবহে নেহা বোরার উপস্থিতি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। নিট নিয়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গত জুন-জুলাইয়ে যন্তর মন্তরের আন্দোলনে টানা ২৩ দিনের অনশনে অংশ নিয়ে জাতীয় স্তরে পরিচিতি পান জেএনইউর এই পিএইচডি গবেষক। কয়েক মাসের মধ্যেই ফের রাজপথে তিনি। এবার লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ২ ও ৩ অক্টোবর দিল্লির বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের হাতে আটকও হন নেহা।
একই সঙ্গে থিয়েটারকর্মী ও এআইএসএর সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা এখন ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ। রাজনৈতিক বক্তব্যে থিয়েটারের প্রভাবও লক্ষণীয়—আবেগ, গল্প বলার ভঙ্গি এবং মঞ্চসুলভ উপস্থাপনা তাঁকে অন্য অনেক ছাত্রনেতার থেকে আলাদা করেছে।
সেনা পরিবারের উঠান থেকে বাম রাজনীতির ময়দান
নেহার রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তাঁর পারিবারিক পটভূমি। উত্তরাখণ্ডের খতিমায় জন্ম। বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় ছোটবেলা কেটেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শিলিগুড়িতে পড়াশোনার সময় শিল্প, বিতর্ক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা ও অরুন্ধতী রায়ের লেখার সঙ্গে পরিচয় তাঁর চিন্তার জগতে প্রভাব ফেলে। পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে যোগ দিয়ে বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
১০ অক্টোবর কি নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করবে?
আগামী ১০ অক্টোবরের গুরুত্ব তাই শুধু জমায়েতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে ক্ষোভকে কতটা বৃহত্তর নাগরিক অসন্তোষে রূপ দেওয়া যায়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। সেই জায়গায় নেহা বোরার মতো তরুণ মুখের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনীতিতে প্রজন্ম বদলের লক্ষণ শুধু নতুন সংগঠনের উত্থানে দেখা যায় না; পুরনো প্রশ্নকে নতুন ভাষায় তুলে ধরার মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে। ভোটার তালিকা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন যদি সত্যিই জেন জ়ি-র রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়, তবে ১০ অক্টোবরের দিল্লির রাজপথ শুধু আরেকটি বিক্ষোভের সাক্ষী থাকবে না—তা হয়ে উঠতে পারে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
কালের আলো/জিএম/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array