বন্দরের গতি বাড়াতে এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড
দীর্ঘ টানাপোড়েন, শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিতর্কের পর অবশেষে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। ১৫ বছরের এ চুক্তির আওতায় টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো ও মালিকানা থাকছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই; ডিপি ওয়ার্ল্ড পালন করবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম চুক্তিতে সই করেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এ প্রক্রিয়ায় লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
- ১৫ বছরের চুক্তি সই; আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিতে ১,০০০ কোটির বেশি বিনিয়োগ
- থাকবে কঠোর কর্মদক্ষতা নজরদারি
চুক্তির শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। পাশাপাশি প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে নির্ধারিত বার্ষিক ফি ও রাজস্বের অংশ। কর্মদক্ষতার নির্ধারিত সূচক পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বন্দরের ৪০ শতাংশের বেশি কনটেইনার
প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি। পাঁচটি জেটি নিয়ে গড়ে ওঠা এ টার্মিনালেই বন্দরের ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের ১৪টি রয়েছে। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার ৪০ শতাংশের বেশি এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এনসিটির পরিচালনায় পরিবর্তন শুধু একটি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা বদল নয়; এর প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রপ্তানি, পণ্য খালাসের গতি, লজিস্টিকস ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর।
এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে চাই : নৌপরিবহনমন্ত্রী
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক লজিস্টিকস সংযোগের মাধ্যমে এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তিনি বলেন, বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা সরকারের বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য।
ডিপি ওয়ার্ল্ড: বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করব
ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এনসিটির পরিচালনা স্বত্ব দেওয়ায় তারা বাংলাদেশ সরকার ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, বাণিজ্য ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দেশের এই অগ্রযাত্রায় সহায়তা করতে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার ভাষ্য, অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে।
লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমবে : বন্দর চেয়ারম্যান
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, পিপিপির মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌ ও বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই অংশীদারত্ব। তিনি বলেন, দেশের বাণিজ্য ও লজিস্টিকস ব্যবস্থায় এনসিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চুক্তির ফলে টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়বে, লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার হবে। তার মতে, পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল হলে দেশীয় শিল্পের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
বাণিজ্যে চাই বৈশ্বিক গতি : আশিক চৌধুরী
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, দেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। এনসিটির পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা সেই লক্ষ্যে একটি বড় পদক্ষেপ। তিনি বলেন, দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য প্রবেশদ্বারে আরও দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী সংযোগ ও উন্নত সেবার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বন্দরব্যবস্থাকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণের উপযোগী সক্ষমতায় উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
২০১৯ থেকে ঝুলে থাকা প্রক্রিয়ার অবসান
এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। পিপিপি কাঠামোয় আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগে ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগটি পুনরুজ্জীবিত করে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বেছে নেয়। কিন্তু তীব্র বিরোধিতা ও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে প্রক্রিয়াটি আটকে যায়। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। পরে বর্তমান সরকার আবার আলোচনা শুরু করে চুক্তিটি সম্পন্ন করে।
মালিকানা বন্দরের, পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এনসিটির জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড পাবে শুধু পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব। নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকলও আগের মতো বহাল থাকবে। চুক্তিতে কেপিআই, নিয়মিত প্রতিবেদন, মনিটরিং ও নিরীক্ষার মাধ্যমে কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array