খুঁজুন
                               
, ,
           

রাশিয়ায় প্লেগ আতঙ্ক, সত্যিই কি ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী সংক্রমণ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
রাশিয়ায় প্লেগ আতঙ্ক, সত্যিই কি ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী সংক্রমণ?

বিশ্বজুড়ে নতুন মহামারির আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই রাশিয়ায় প্লেগের সম্ভাব্য সংক্রমণ ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। সাইবেরিয়ায় প্লেগ নিয়ে কাজ করা একটি গবেষণাগারের ২৮ বছর বয়সী নারী কর্মীর রহস্যজনক নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর পর হাসপাতালের কর্মী, রোগী ও তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারও। তবে ওই নারীর মৃত্যুর কারণ প্লেগ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—রাশিয়ায় কি সত্যিই নতুন করে প্লেগ ছড়াচ্ছে, নাকি সীমিত একটি ঘটনাকে ঘিরে বাড়ছে আতঙ্ক?

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ইরকুতস্কে অবস্থিত সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টিপ্লেগ ইনস্টিটিউটে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন দারিয়া শিপিলোভা। চলতি মাসের শুরুতে ‘রহস্যজনক নিউমোনিয়া’য় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

গবেষণাগারে কর্মীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য

দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর পর তাঁকে যে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, সেখানকার কর্মী ও রোগীদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারের অন্য কর্মী এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ, ওই নারী এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, যেখানে প্লেগের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করা হয়। এ ধরনের গবেষণাগারে জীবাণু যেন বাইরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য সাধারণত কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিশেষজ্ঞ জেনিফার নুজ্জো নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এ ঘটনার কিছু বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। তাঁর মতে, গবেষণাগারে কাজের সময় যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং জীবাণুর সংস্পর্শে আসার পর দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা পেলে ওই কর্মীর প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

প্লেগ কি এখনো মানুষের জন্য হুমকি?

প্লেগ কোনো নতুন রোগ নয়। ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই ব্যাকটেরিয়া ভয়াবহ মহামারির জন্ম দিয়েছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এ মহাদেশটির অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

তবে প্লেগ এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক শ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হন। মাদাগাস্কার ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সংক্রমণের ঘটনা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশেও বিচ্ছিন্নভাবে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড় অথবা আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এ রোগ মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। তবে রোগের ধরন অনুযায়ী সংক্রমণের প্রক্রিয়া ও ঝুঁকি ভিন্ন হয়।

প্লেগের তিন ধরন, সবচেয়ে বিপজ্জনক কোনটি?

প্লেগের প্রধান তিনটি ধরন রয়েছে—বিউবনিক, সেপ্টিসেমিক ও নিউমোনিক।

বিউবনিক প্লেগ: সংক্রমণের এই ধরনে ব্যাকটেরিয়া লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে এ রোগ হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, জ্বর ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

সেপ্টিসেমিক প্লেগ: ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়লে এ ধরনের প্লেগ হয়। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

নিউমোনিক প্লেগ: প্লেগের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনগুলোর একটি এটি। এ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে নির্গত সংক্রামক ক্ষুদ্র কণার সাহায্যে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে।

দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুকে ঘিরে উদ্বেগের একটি কারণ হলো, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে নিউমোনিয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে নিউমোনিয়া হলেই সেটি প্লেগ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য।

রাশিয়ার নীরবতায় বাড়ছে উদ্বেগ

ঘটনার পর রুশ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। গবেষণাগারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল কি না, ওই নারী কীভাবে অসুস্থ হলেন এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্য কেউ আক্রান্ত হয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যের অভাব উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে নতুন কোনো সংক্রামক রোগের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে বিশ্বজুড়ে সতর্কতা বেড়েছে। বিশেষ করে রোগের উৎস, সংক্রমণের ধরন ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেরিতে প্রকাশিত হলে সন্দেহ ও গুজব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার বলেন, এ বিষয়ে রাশিয়ার আরও বিস্তারিত তথ্য জানানো উচিত। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

অন্যদিকে, রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দারিয়া শিপিলোভাকে প্লেগের টিকা দেওয়া হয়েছিল এবং গবেষণাগারে কোনো জরুরি পরিস্থিতি শনাক্ত হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য, ইরকুতস্ক শহর ও আশপাশের অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য মহামারির কোনো ঝুঁকি নেই।

তবে ওই নারীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং গবেষণাগারে সংক্রমণের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

টিকা ও চিকিৎসা কতটা কার্যকর?

প্লেগের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা না করা হলে বিশেষ করে নিউমোনিক প্লেগ দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে এ রোগের চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।

প্লেগের টিকা নিয়েও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত বা উপলভ্য টিকা সব ধরনের প্লেগের বিরুদ্ধে কতটা সুরক্ষা দেয়, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য সীমিত। তাই টিকা নেওয়ার তথ্য থাকলেও তা দিয়ে সংক্রমণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্লেগ কি জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল?

ইতিহাসে প্লেগের জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ও বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, চতুর্দশ শতাব্দীতে মঙ্গোল বাহিনী ক্রিমিয়ার কাফা শহরে প্লেগে আক্রান্ত মানুষের মরদেহ নিক্ষেপ করেছিল। তবে এ ঘটনার সঙ্গে ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়ে পড়ার সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও মহামারিবিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জৈবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে পালিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির দাবি ছিল, তৎকালীন সরকার গুটিবসন্ত ও প্লেগের জীবাণু মজুত করেছিল। তবে এসব দাবি কয়েক দশক আগের ঘটনা নিয়ে, বর্তমান রাশিয়ার গবেষণাগারে কী ঘটেছে তার প্রমাণ নয়।

তাহলে কি নতুন মহামারির আশঙ্কা রয়েছে?

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাশিয়ায় প্লেগের ব্যাপক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর কারণ প্লেগ বলে নিশ্চিত হলেও, তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয় না।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো ঘটনার অস্পষ্টতা, গবেষণাগারের নিরাপত্তা এবং রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্যের অভাব। একই সঙ্গে প্লেগের মতো রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

সুতরাং, আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত। মৃত্যুর কারণ, সম্ভাব্য সংক্রমণের উৎস এবং কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির প্রকৃত ঝুঁকি আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

কালের আলো/জেএন

প্রযুক্তিনির্ভর ডাকসেবা সম্প্রসারণে জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৭ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তিনির্ভর ডাকসেবা সম্প্রসারণে জোর

সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’ প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশে বিশ্ব ডাক দিবস ২০২৬ উদযাপন করা হয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশ ও ই-কমার্সের প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাক বিভাগকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত সেবাব্যবস্থায় রূপান্তরের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ডাক ভবনে ডাক অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এ তাগিদ দেন।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি। ডাক অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. সিরাজ উদ্দিন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বিদ্যমান ডাক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ই-কমার্স লজিস্টিকস, পার্সেল পরিবহন, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য ডাক বিভাগের সেবাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

তাঁরা আরও বলেন, ডাক বিভাগের আধুনিকায়নে তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভায় ডাক বিভাগের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে ছয়টি অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—ডিজিটাল ডাকঘর প্রতিষ্ঠা, সমন্বিত ডাক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, ই-কমার্স লজিস্টিকস হাব তৈরি, ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ, তথ্যনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব ডাকব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী ‘ডাকসেবা সপ্তাহ’ পালন করা হবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ফিলাটেলিক প্রদর্শনী ও ডাকসেবাবিষয়ক মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৯ ও ১০ অক্টোবর সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম ছাড়া ডাক বিভাগের সব পর্যায়ের কার্যালয়ে ডাকসেবা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সমন্বিত ও আধুনিক ডাক নেটওয়ার্ক দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

সোনার পথ বদলেছে, বদলেছে পাচারের ছক

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
সোনার পথ বদলেছে, বদলেছে পাচারের ছক

সোনার চোরাচালানে এখন আর শুধু বার, বিস্কুট কিংবা কোমরে বাঁধা প্যাকেটের ওপর নির্ভর করছে না পাচারকারীরা। ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাতে বদলে যাচ্ছে কৌশল, বদলাচ্ছে সোনার আকৃতি ও লুকানোর জায়গা। কখনো পেস্ট বানিয়ে পায়ুপথে, কখনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কাপড়ে মিশিয়ে, আবার কখনো বিমানকর্মীর জুতার ভেতর ঢুকিয়ে আনা হচ্ছে সোনা। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনার পেস্ট সেই বদলে যাওয়া কৌশলেরই নতুন উদাহরণ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সোনা উদ্ধারের তথ্য জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওইদিন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে আসা এয়ার অ্যারাবিয়ার একটি ফ্লাইটে সোনা চোরাচালানের গোপন তথ্য পায় ঢাকা কাস্টম হাউস। এর ভিত্তিতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি শুরু করেন সংস্থাটির গোয়েন্দারা।

  • পায়ুপথে ডিম্বাকৃতির পেস্ট, জুতায় ৮০ বার
  • পোশাকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়ও চালান
  • নতুন কৌশলে চোরাচালানের বিস্তার

একপর্যায়ে ওই ফ্লাইটে আসা আরমান উদ্দীন সিদ্দিক নামের এক যাত্রী ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষ করে ব্যাগেজ বেল্ট-২-এ এলে তাঁকে সন্দেহের ভিত্তিতে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তাঁর পায়ুপথে বিশেষভাবে লুকানো সাদা স্কচটেপে মোড়ানো ডিম্বাকৃতির তিনটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। প্যাকেটগুলোর ভেতরে ছিল সোনার পেস্ট।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্যাকেটে ৪৩০ গ্রাম করে মোট ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনার পেস্ট ছিল। সোনার বিশুদ্ধতা ২৪ ক্যারেট। পেস্টগুলো পরিশোধনের পর আনুমানিক এক কেজি সোনা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ ঘটনায় ওই যাত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস।

বার থেকে পেস্ট, বদলাচ্ছে কৌশল
শাহজালালে সোনা আটকের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—চোরাচালানকারীরা প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে সোনা বহনের নতুন নতুন কৌশল খুঁজছে। কখনো সোনা আনা হচ্ছে বার বা বিস্কুট আকারে, আবার কখনো গলিয়ে পেস্ট কিংবা গুঁড়ায় রূপান্তর করা হচ্ছে। পোশাকের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে মিশিয়ে আনার ঘটনাও ঘটেছে।

এই কৌশল পরিবর্তনের পেছনে মূল লক্ষ্য তল্লাশি এড়িয়ে চালান গন্তব্যে পৌঁছানো। সোনার প্রচলিত আকৃতি বদলে ফেললে সাধারণ তল্লাশিতে তা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ফলে চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু ধাতব বস্তু শনাক্তের প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

গত বছর এপ্রিলেও দুবাই থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসা এক যাত্রীর পোশাক থেকে সোনার মতো গুঁড়া উদ্ধার করা হয়েছিল। চার জোড়া অন্তর্বাস, একটি প্যান্ট ও তিনটি টি-শার্টে ওই পদার্থ লুকানো ছিল। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের পর সেখান থেকে প্রায় ২ কেজি ৪১৭ গ্রাম সোনা পাওয়া যায়।

জুতার ভেতর ৯ কেজির বেশি সোনা
চোরাচালানে শুধু সাধারণ যাত্রী নয়, বিমানকর্মীদেরও ব্যবহার করার নজির রয়েছে। ঢাকা কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটের দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর থেকে ৮০টি সোনার বার (০৪ অক্টোবর) উদ্ধার করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।

বারগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। আনুমানিক বাজারমূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বিশেষ কায়দায় জুতার ভেতরে বারগুলো লুকানো হয়েছিল। এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, বিমানবন্দরে চোরাচালানের ঝুঁকি শুধু বহিরাগত যাত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উড়োজাহাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করার চেষ্টা করছে চোরাচালানকারীরা। ফলে নিরাপত্তা ও নজরদারির আওতা শুধু যাত্রী তল্লাশিতে সীমাবদ্ধ রাখলে ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

টয়লেট-সিটের নিচেও চালান
সোনা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। সব ক্ষেত্রে বাহকের শরীর বা লাগেজে সোনা পাওয়া যাচ্ছে না। কখনো উড়োজাহাজের টয়লেট, কখনো সিটের নিচের অংশ, আবার কখনো বিমানবন্দরের ভেতরের নির্দিষ্ট স্থানে সোনা রেখে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

এতে বোঝা যায়, চোরাচালান শুধু একজন বাহকের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং নির্দিষ্ট রুট, সহযোগী এবং বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে চালান পরিচালনার চেষ্টা থাকতে পারে। তাই যাত্রী তল্লাশির পাশাপাশি উড়োজাহাজ, বিমানকর্মী ও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

গোপন তথ্যই বড় চালান ধরার চাবি
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে গোপন তথ্য ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারির গুরুত্বও স্পষ্ট। সর্বশেষ সোনার পেস্ট উদ্ধারের ক্ষেত্রেও আগাম তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি শুরু করেছিল ঢাকা কাস্টম হাউসের গোয়েন্দারা।

বিপুলসংখ্যক যাত্রীর মধ্য থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে ভ্রমণপথ, আচরণ, লাগেজের ধরন ও পূর্ববর্তী তথ্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তথ্য বিনিময় বাড়ানো গেলে চোরাচালানের নতুন কৌশল শনাক্ত করার সুযোগও বাড়বে।

উদ্ধার বাড়ছে, প্রশ্ন থাকছে নেটওয়ার্ক নিয়ে
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে ৫৩ দশমিক ৭২৭ কেজি সোনা উদ্ধার হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার হয়েছে।

তবে একটি চালান আটক করাই চোরাচালান বন্ধের শেষ কথা নয়। একটি চালান ধরা পড়ার পর একই চক্র নতুন পদ্ধতিতে আবার চেষ্টা করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণের পাশাপাশি চোরাচালানের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অর্থের উৎস খুঁজে বের করা এবং দেশে-বিদেশে জড়িত সহযোগীদের চিহ্নিত করাও জরুরি।

নতুন কৌশলের বিপরীতে নজরদারি
ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান সর্বশেষ ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে সোনার বার, বিস্কুট ও জামাকাপড়ে লুকানো সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

চোরাচালানকারীরা যখন সোনার আকৃতি ও বহনের পদ্ধতি বদলাচ্ছে, তখন নজরদারির কৌশলও সেই অনুযায়ী বদলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সর্বশেষ পায়ুপথে ডিম্বাকৃতির সোনার পেস্ট উদ্ধারের ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

শাহজালালে উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনা তাই শুধু একটি চালান আটকের ঘটনা নয়। এটি দেখাচ্ছে, চোরাচালানের কৌশল ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে একটি পদ্ধতি বন্ধ হওয়ার পর আরেকটি পদ্ধতি সামনে আসার আগেই তা শনাক্ত করতে হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় আরও সমন্বিত, তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি প্রয়োজন।

কালের আলো/জিএন/এমকে

খতিব ইস্যুতে উত্তপ্ত বায়তুল মোকাররম, জুমার পর বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:২৯ অপরাহ্ণ
খতিব ইস্যুতে উত্তপ্ত বায়তুল মোকাররম, জুমার পর বিক্ষোভ

CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v62), quality = 100?

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেককে অপসারণের দাবির প্রতিবাদে তাঁর পক্ষে বিক্ষোভ করেছেন একদল মুসল্লি। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জুমার নামাজ শেষে মসজিদের উত্তর গেটে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

বিক্ষোভে ওলামা দল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মুসল্লিরা অংশ নেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা খতিবের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর আদর্শের বিরুদ্ধে স্লোগানও দেন তাঁরা।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, জাতীয় মসজিদের খতিবকে অপসারণের চেষ্টার পেছনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা মুফতি আব্দুল মালেককে স্বপদে বহাল রেখে তাঁর ইমামতিতে নামাজ আদায়ের দাবি জানান।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বলেন, ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়; বরং ইসলাম সব মুসলমানের। মুফতি আব্দুল মালেক জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ এবং কওমি আলেমদের একাংশের দলটির সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হওয়ার সমালোচনা করেন মুফতি আব্দুল মালেক। তাঁর বক্তব্যের পর জামায়াতপন্থীদের একাংশ সমালোচনা শুরু করে। তাঁদের কেউ কেউ খতিবের অপসারণের দাবিও জানান। এ নিয়ে বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ আদায়ের আহ্বানও জানানো হয়।

অন্যদিকে, মুফতি আব্দুল মালেকের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন ইসলামি দলের নেতাকর্মীরা। কওমি ধারার অনেক আলেমও তাঁর পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার সকাল থেকেই জাতীয় মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও জুমার নামাজ আদায় করতে আসেন। তবে দিনটিতে শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

মুফতি আব্দুল মালেক দেশের পরিচিত গবেষক আলেমদের একজন। আরব বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও তাঁর পদে পরিবর্তন আনা হয়নি।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি