পদ্মায় নাব্য সংকট, ডুবোচরে বদলেছে স্রোত কমেছে ইলিশ
পদ্মা নদীতে নাব্য সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। শরীয়তপুরের জাজিরার মাঝিরঘাট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল। পরিবর্তন হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে নৌযান চলাচল, কমছে ইলিশ আহরণ এবং বাড়ছে নদীভাঙনের আশঙ্কা। বিপাকে পড়েছেন জেলে, নৌযান চালক ও নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত দুই বছরে পদ্মার মাঝপথে বেশ কয়েকটি বড় ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। জাজিরা অংশে নদীর নতুন চ্যানেল তৈরি হওয়ায় মূল প্রবাহের গতিপথও অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে। আগে যেসব পথে সহজে নৌযান চলাচল করত, সেখানে চর জেগে ওঠায় এখন বড় নৌযানকে ঘুরপথে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে ডুবোচরে আটকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সুরেশ্বর-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চ এমভি সুরেশ্বরের মাস্টার জানান, নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় নৌযান চালানো আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্ষায় তীব্র স্রোতের কারণে নৌযান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। আবার বর্ষা শেষে পলি জমে ডুবোচর তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে নৌযান আটকে যায়। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও সময়ের অপচয় হচ্ছে।
নদীর গভীরতা ও স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণেও। স্থানীয় জেলেরা জানান, আগে পদ্মার এই অংশে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই ভালো পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সারা দিন নদীতে থেকেও আগের তুলনায় অনেক কম মাছ মিলছে। এতে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে বিকল্প পেশার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেক জেলেকে।
জাজিরার মাঝিরঘাট এলাকার জেলে মনা বেপারি ও নড়িয়ার সুরেশ্বরের জেলে সুমন বকাউল বলেন, তিন দশক ধরে পদ্মায় মাছ ধরছেন তাঁরা। কিন্তু এখন আগের মতো বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যায় না। তাঁদের মতে, নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠা এবং স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, নদীতে পলি জমে বড় বড় চর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শরীয়তপুরের পদ্মা অংশে একসময় ইলিশের ব্যাপক বিচরণ থাকলেও নদীর গভীরতা ও প্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
তিনি বলেন, শরীয়তপুরে পদ্মার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ডুবোচর অপসারণ জরুরি।
নদীর মাঝপথে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় পদ্মার মূল স্রোত এখন বিভিন্ন স্থানে ডান তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা বাড়ছে। কোথাও কোথাও নদীর গভীরতা ৫ থেকে ১০ ফুটে নেমে এসেছে, আবার কিছু অংশে তা ৫০০ ফুটেরও বেশি। গভীরতার এই তারতম্যে নদীর প্রবাহে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নড়িয়া উপজেলার চরআত্রার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বিল্লাল মাঝি বলেন, নদীর মূল স্রোত তাঁদের এলাকা ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন বেড়েছে। গত কয়েক বছরে তাঁর প্রায় চার বিঘা কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়েছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর ভাঙন কিছুটা কমলেও বর্তমানে স্রোতের চাপ আবার বেড়েছে। স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এ অঞ্চলে নদীভাঙনে অন্তত ২০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সজল পারভেজ বলেন, নদীর নাব্য বজায় রাখতে ড্রেজিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। নদীর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে মাঝিরঘাট থেকে সুরেশ্বর পর্যন্ত হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, উজান থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি এসে পদ্মার বিভিন্ন অংশে জমা হয়। বিশেষ করে বর্ষা শেষে নদীর তলদেশে পলি জমে ডুবোচর ও নতুন চর সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গভীরতা কমে যাচ্ছে।
সূত্রটি জানায়, মাঝিরঘাট পদ্মা সেতুর জিরো পয়েন্ট থেকে সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদীপথে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি সুরেশ্বর থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীপথে পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ও মেঘনাবেষ্টিত শরীয়তপুরে মোট ৭১ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। এর মধ্যে নড়িয়া উপজেলার ৫ কিলোমিটার এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ কিলোমিটারসহ মোট ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নদীর গভীরতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা না গেলে ইলিশসহ দেশীয় প্রজাতির মাছের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র আরও সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে নৌ চলাচলের ঝুঁকি ও নদীভাঙনের শঙ্কা বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিকল্পিত ড্রেজিং এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array