খুঁজুন
                               
, ,
           

৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা তবু ঋণে ভাটা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৭ অপরাহ্ণ
৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা তবু ঋণে ভাটা

৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা। বিতরণ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৬৮১ কোটি। অর্থাৎ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য যে বিপুল অর্থের ঘোষণা, তার সিংহভাগই এখনো উদ্যোক্তার হাতে পৌঁছেনি। ১৫টি স্কিমে মোট বরাদ্দের মাত্র ১১ শতাংশের কিছু বেশি বিতরণ হয়েছে। আরও ৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন। ফলে অর্থ আছে, চাহিদাও আছে—কিন্তু ঋণ ছাড়ের গতি নেই।

সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর ২০ হাজার কোটি টাকার স্কিমে। বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। বরাদ্দের শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। যে অর্থে বন্ধ কারখানার চাকা ঘোরার কথা, সেই অর্থের প্রায় পুরোটা এখনো ব্যাংকেই আটকে আছে।

  • ১৫ স্কিমে বিতরণ ৬ হাজার ৬৮১ কোটি
  • বন্ধ শিল্প চালুর ২০ হাজার কোটিতে ছাড় মাত্র ৫০ কোটি
  • খেলাপির ভয়ে ব্যাংকের সতর্কতা

টাকা আছে, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নেই
ব্যাংকারদের বক্তব্য, প্রণোদনার অর্থের অভাব নেই; সংকট ঝুঁকি নেওয়ার। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ যখন তীব্র, তখন পুরনো ঋণে জর্জরিত কিংবা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানে নতুন অর্থ ঢালতে ব্যাংকগুলো স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে।

কারখানা চালু করলেই উৎপাদন শুরু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন অর্থায়নের পর বাজারে প্রতিষ্ঠানটি টিকবে কি না, পুরনো ঋণ কীভাবে সামলাবে, ভবিষ্যতে নগদ প্রবাহ তৈরি হবে কি না—সবই খতিয়ে দেখছে ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান বলেন, বন্ধ শিল্পে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি বেশি। পুরনো ঋণ ও খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানকে নতুন অর্থায়নের আগে তার ভবিষ্যৎ সক্ষমতা যাচাই জরুরি।

যে স্কিমে টাকা, সেখানেই পার্থক্য
প্রণোদনার সব খাত অবশ্য সমানভাবে স্থবির নয়। ৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে গেছে প্রায় ৪ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির স্কিমে বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি।

অন্যদিকে, ৩ হাজার কোটি টাকার কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ, ১ হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ২ হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি স্কিমে এখনো এক টাকাও বিতরণ হয়নি। অর্থাৎ যে খাতে ঋণ ফেরতের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, সেখানে ব্যাংকের গতি আছে। আর যেসব খাতে নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করানোর ঝুঁকি বেশি, সেখানেই আটকে আছে অর্থ।

উদ্যোক্তাও আটকে শর্তের জালে
ব্যাংকের ঝুঁকি-ভীতির সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্যোক্তাদের কাগজপত্র ও জামানতসংক্রান্ত জটিলতা। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব দুর্বল, ব্যাংকিং রেকর্ড অসম্পূর্ণ কিংবা পর্যাপ্ত জামানত নেই। ফলে আবেদন করেও অনুমোদনের শেষ ধাপে গিয়ে অনেকে আটকে যাচ্ছেন।

প্রণোদনা পেতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা অনিষ্পন্ন আছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের শর্ত। ফলে ব্যবসা রক্ষায় আইনি লড়াইয়ে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়ার পথ আরও কঠিন হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট তাসকিন আহমেদের মতে, উদ্যোক্তাদের অনীহার চেয়ে ব্যাংকের অতিরিক্ত কড়াকড়ি ও নীতিগত জটিলতাই বড় বাধা।

দ্রুত দিলে খেলাপি, দেরি হলে লক্ষ্যভ্রষ্ট
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ। সরকার চায় দ্রুত ঋণ বিতরণ; কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের সতর্কতা—শুধু বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে চালু করার প্রয়োজন আছে বলেই ঋণ দেওয়া যাবে না। নতুন অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি টেকসই হবে কি না, সেটিই আগে দেখতে হবে। নইলে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণই পরে খেলাপি ঋণের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

সমুদ্র থেকে জীবিকা, কুয়াকাটার পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা

পটুয়াখালী সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
সমুদ্র থেকে জীবিকা, কুয়াকাটার পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা

সমুদ্রসৈকত, ঝাউবন, লেম্বুরবন, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর, মিশ্রীপাড়া ও রাখাইন সংস্কৃতি—প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এমন বৈচিত্র্য নিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। একসময় যেখানে ছিল হাতেগোনা কয়েকটি ছোট দোকান ও সীমিত আবাসন, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা ও নানা ধরনের পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা।

পর্যটন ঘিরে বদলেছে অনেক মানুষের জীবনযাত্রা, তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। তবে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সবার জীবনে সমানভাবে আসেনি সমৃদ্ধি।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটকেরা কুয়াকাটায় আসেন। তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের ব্যবসা। কেউ চালান হোটেল, কেউ রেস্তোরাঁ, আবার কেউ অটোরিকশা চালিয়ে, ছবি তুলে কিংবা শুঁটকি ও শামুক-ঝিনুকের তৈরি পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পর্যটকদের আনাগোনা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখার পাশাপাশি অবহেলিত ও বেকার মানুষের জন্যও উপার্জনের সুযোগ তৈরি করেছে।

১৯৯৮ সালে কুয়াকাটাকে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণা করার আগেই সেখানে ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছিল। এসব দোকানে মূলত চা ও হালকা খাবার বিক্রি হতো। রাতে থাকার ভালো ব্যবস্থা ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি হোটেল ছিল গোলপাতার ছাউনি ও বাঁশের বেড়া দেওয়া দোচালা ঘরের মতো। তখন মাঝেমধ্যে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর সদস্য ও আশপাশের মানুষ সেখানে যাতায়াত করতেন।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়ন ও কুয়াকাটা পৌর এলাকা ঘিরে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটেছে। একসময় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল কুয়াকাটা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের আলীপুর বাজার। সেখানে স্থানীয় খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যেত।

২০০০ সালের দিকে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা আবাসিক হোটেল নির্মাণে উদ্যোগী হন। সৈকত ও বেড়িবাঁধের মাঝেও গড়ে ওঠে ছোট ছোট দোকান। পরে পর্যটনের সম্ভাবনা দেখে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানি জমি কিনতে শুরু করেন। একে একে তৈরি হয় খাবারের হোটেল, রেস্তোরাঁ, ঝিনুকের দোকান ও নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বাড়তে থাকে জমির দাম।

এ পরিবর্তনের ফলে স্থানীয়দের একাংশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। একসময় তিন চাকার ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো ব্যক্তিদের কেউ কেউ এখন বহুতল হোটেলের মালিক। পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় যুক্ত হয়ে অনেকে বেকারত্ব কাটিয়ে উঠেছেন। বেড়েছে শিক্ষার সুযোগ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছে।

তবে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। উপকূলজুড়ে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোর অনেকের জীবনে এখনো রয়ে গেছে নানা সংকট।

দূরদূরান্ত থেকে আসা একজন পর্যটক কুয়াকাটায় নেমে অটোরিকশায় হোটেলে যান, রেস্তোরাঁয় খাবার খান, সৈকতে ঘোরেন, ছবি তোলেন কিংবা সমুদ্রে গোসল করেন। কেউ ঘুরে দেখেন গঙ্গামতি ও লেম্বুরবন, কেউ যান মিশ্রীপাড়া বা অন্য কোনো দর্শনীয় স্থানে। ফেরার সময় অনেকে কেনেন শুঁটকি, শামুক-ঝিনুকের তৈরি পণ্য কিংবা স্থানীয় হস্তশিল্প।

দেখতে সাধারণ একটি ভ্রমণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন হোটেলকর্মী, বাবুর্চি, ওয়েটার, অটোরিকশাচালক, ট্যুর গাইড, ফটোগ্রাফার, দোকানি, শুঁটকি ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ বহু মানুষ। পর্যটকের ব্যয় তাই শুধু একটি হোটেল বা রেস্তোরাঁর আয় নয়; তা বিভিন্ন পেশার মানুষের জীবিকায়ও অবদান রাখে।

বর্তমানে কুয়াকাটায় আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বড় একটি পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। সৈকতের পাশাপাশি ঝাউবন, লেম্বুরবন, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর ও মিশ্রীপাড়ার মতো স্থানগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

পর্যটকেরা যত বেশি সময় অবস্থান করেন, স্থানীয় অর্থনীতিতে তাঁদের ব্যয়ের সুযোগও তত বাড়ে। এক দিনের পর্যটকের তুলনায় দুই-তিন দিন অবস্থান করা পর্যটক সাধারণত আবাসন, খাবার, পরিবহন ও কেনাকাটায় বেশি ব্যয়ের সুযোগ পান। তাই পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ানো কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।

কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বাইরের প্রতিষ্ঠানসহ বর্তমানে এখানে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব হোটেলে প্রায় ৩০ হাজার পর্যটকের থাকার ধারণক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হলেও, হোটেলের শ্রেণি, কক্ষসংখ্যা ও পর্যটকদের তথ্যের সমন্বিত হিসাব ছাড়া প্রকৃত ধারণক্ষমতা নির্ধারণ কঠিন।

একটি হোটেল পরিচালনার সঙ্গে ব্যবস্থাপক, অভ্যর্থনাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বাবুর্চি, ওয়েটার, ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি লন্ড্রি, খাবার সরবরাহ, মাছ-মাংস, শাকসবজি, পানীয়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারীরাও এ অর্থনীতির অংশ।

পর্যটন মৌসুমে এসব প্রতিষ্ঠানে কাজের চাপ বাড়ে। বিশেষ করে শীতকাল, সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদ, দুর্গাপূজা ও দীর্ঘ সরকারি ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়লে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনসেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। রাস পূজার সময় পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে।

কুয়াকাটায় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ স্থানীয় খাবার ও সামুদ্রিক মাছ। কাঁকড়া, চিংড়ি, কোরাল ও রূপচাঁদার মতো মাছ রেস্তোরাঁগুলোর জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে। পর্যটকদের চাহিদা বাড়লে রেস্তোরাঁর বিক্রির পাশাপাশি মাছ বিক্রেতা, জেলে, আড়তদার ও সবজি বিক্রেতাদের ব্যবসার সুযোগও বাড়ে।

এ ছাড়া শুঁটকি, আচার, শামুক-ঝিনুকের তৈরি সামগ্রী ও স্থানীয় পণ্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। সৈকতে সূর্যাস্ত কিংবা সমুদ্রের সামনে ছবি তোলার জন্য অনেক পর্যটক স্থানীয় ফটোগ্রাফারদের সহায়তা নেন। অটোরিকশাচালক ও ট্যুর গাইডদের জন্যও তৈরি হয় বাড়তি আয়ের সুযোগ।

কুয়াকাটার বিশেষ সম্পদ এর রাখাইন সংস্কৃতি। মিশ্রীপাড়া ও রাখাইন পল্লিকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ ঐতিহ্য, তাঁত, হস্তশিল্প ও স্থানীয় সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এ ঐতিহ্যকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে রাখাইন নারীদের তৈরি তাঁত ও হস্তশিল্পের পণ্য পর্যটকদের কাছে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারলে তাঁদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। একইভাবে হোটেল ও রিসোর্টের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, বিছানার চাদর এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী স্থানীয়ভাবে সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে কলাপাড়া ও মহিপুরসহ আশপাশের এলাকার কৃষক, জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারেন।

কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না; সেবার মান, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। সৈকত ও বনাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়াতে স্থানীয় সংস্কৃতি, প্রকৃতি, খাবার ও ঐতিহ্যকে সমন্বিতভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, জেলে পরিবার এবং স্থানীয় নারীদের পর্যটন অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে পর্যটনের আয় আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার আগে ছিল একটি গ্রাম। রাখাইনদের বসবাস অবশ্য অনেক আগে থেকেই ছিল। একসময় কলাপাড়া উপজেলা সদরে যেতে নৌকা বা ছোট একতলা লঞ্চ ব্যবহার করতে হতো, আর স্থানীয় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল ভ্যান।

তাঁর ভাষ্য, তখন জমিতে তেমন ফসল হতো না। সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপের ব্যবস্থা না থাকায় সরকারি খাস পুকুরের পানির ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কুয়াকাটায় ডাব, ফুচকা, চা-বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। একসময় পাতার ঘরে বসবাস করা অনেক মানুষ এখন পাকা দালানে বসবাস করছেন।

কুয়াকাটা এখন আর শুধু সমুদ্র দেখার জায়গা নয়। সমুদ্র, বন, চর, রাখাইন সংস্কৃতি, বৌদ্ধ ঐতিহ্য, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্প মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক পর্যটন গন্তব্য। এ সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলে পর্যটকদের ভ্রমণ আরও সমৃদ্ধ হবে, একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগও বাড়বে।

পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা বিনোদন ও অবকাশযাপনের স্থান; আর স্থানীয়দের কাছে এটি সংসার চালানো ও ভবিষ্যৎ গড়ার সম্ভাবনা। এই দুই প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে পর্যটনের সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যু, কলকাতায় চিকিৎসাধীন ছিলেন রোটন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪৬ অপরাহ্ণ
ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যু, কলকাতায় চিকিৎসাধীন ছিলেন রোটন

নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন মারা গেছেন। ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স কত হয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৭টার দিকে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন রোটন। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সদস্য জয়নাল আবেদীন। তিনি জানান, রোটনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে।

মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন মাহমুদ হাসান রিপন।

ছাত্রলীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার পর রোটন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও যুক্ত হন। তিনি চট্টগ্রামের রাউজানের বাসিন্দা। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন তিনি।

২০২১ সালে আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত হন মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দলীয় পরিমণ্ডলে পরিচিতি পান তিনি।

দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় চিকিৎসাধীন ছিলেন রোটন। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

১৫ বছর ধরে আবর্জনা কুড়িয়ে চলে ফিরোজের সংসার

রংপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩১ অপরাহ্ণ
১৫ বছর ধরে আবর্জনা কুড়িয়ে চলে ফিরোজের সংসার

প্রতিদিন বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলে দেওয়া হয় কাগজ, প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা ধরনের বর্জ্য। অনেকের কাছে এসব শুধুই আবর্জনা। কিন্তু সেই ফেলে দেওয়া জিনিসের মধ্যেই কেউ খুঁজে নেন বেঁচে থাকার অবলম্বন। রোদ-বৃষ্টি, দুর্গন্ধ আর নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বর্জ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করেই চলে তাঁদের সংসার।

এমনই জীবনসংগ্রামের নাম ফিরোজ মিয়া। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা বর্জ্যের স্তূপে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজতে দেখা যায় তাঁকে। পরনে মলিন পোশাক, মাথায় সবুজ টুপি আর চোখে চশমা—চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত সামগ্রীর মধ্যেই তাঁর জীবিকার সন্ধান।

৪৫ বছর বয়সী ফিরোজ মিয়া রংপুর নগরের মুন্সিপাড়া এলাকার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বস্তিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। অভাবের তাড়নায় গত ১৫ বছর ধরে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

ফিরোজের মতো অনেক মানুষের প্রতিদিন কাটে অন্যের ফেলে দেওয়া জিনিসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কিছু খুঁজে। কেউ সংগ্রহ করেন পুরোনো কাগজ ও বই, কেউ প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য অন্যান্য সামগ্রী। পরে এসব জিনিস ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁদের সংসার।

তাঁদের কাছে বর্জ্যের স্তূপ কেবল ময়লা-আবর্জনা নয়, বরং উপার্জনের একটি উৎস। প্রতিকূল পরিবেশে পরিশ্রম করে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়েই খাবার কেনা, ঘরভাড়া দেওয়া এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন তাঁরা।

ফিরোজের জীবনসংগ্রাম নগরজীবনের আড়ালে থাকা প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরে। যাঁদের শ্রমে ফেলে দেওয়া অনেক সামগ্রী আবার ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে, তাঁদের জীবনেই রয়ে যায় অনিশ্চয়তা। যথাযথ কর্মসংস্থান ও সামাজিক সহায়তার সুযোগ পেলে তাঁদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

অন্যের ফেলে দেওয়া জিনিস সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করার মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের সংগ্রহ করা কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য সামগ্রী পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এতে বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই কাজে যুক্ত অনেক মানুষের নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ। মিশ্র বর্জ্যের মধ্যে থাকা ধারালো বস্তু, দূষিত সামগ্রী ও ক্ষতিকর পদার্থ থেকে দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। তারপরও জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় তাঁদের।

নগরীর উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক প্রশস্ত করা, ভবন নির্মাণ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন নয়; উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। যাঁরা প্রতিদিন বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের কাজকে অবহেলা না করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এ জন্য বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, সংগ্রহকারীদের নিরাপত্তাসামগ্রী সরবরাহ এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কাজ আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব।

রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মিজুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আমরা প্রতিদিন অপ্রয়োজনীয় মনে করে যেসব জিনিস ফেলে দিই, সেগুলোর কোনো কোনোটি অন্য একজন মানুষের এক বেলার খাবার জোগাড়ের উপায়। তাই বর্জ্য ফেলার আগে ভাবা প্রয়োজন—আমাদের কাছে যা মূল্যহীন, অন্য কারও কাছে তা-ই হয়তো বেঁচে থাকার অবলম্বন।

রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে বর্জ্যের স্তূপে বসে থাকা ফিরোজ মিয়ার দৃশ্যটি সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। একটি শহর কতটা উন্নত, তা শুধু তার রাস্তাঘাটের সৌন্দর্য কিংবা স্থাপনা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শহর তার প্রান্তিক মানুষকে কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে পারছে, তার মধ্যেও উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি