লিভার ক্যানসারের আগাম সংকেত হতে পারে শরীরের এই ৭ পরিবর্তন
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব—এসব কারণে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি। উদ্বেগের বিষয় হলো, লিভারে চর্বি জমলেও প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অজান্তেই দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে রোগটি ধীরে ধীরে লিভারে প্রদাহ, টিস্যুতে ক্ষত এবং সিরোসিসের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে। এতে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে ফ্যাটি লিভার হলেই লিভার ক্যানসার হবে, এমন নয়। রোগের অগ্রগতি, লিভারে প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই শরীরে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ফ্যাটি লিভার থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি কীভাবে বাড়ে?
লিভারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায় না। তবে কারও কারও লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারের টিস্যুতে ক্ষত বা দাগ তৈরি হয়, যাকে ফাইব্রোসিস বলা হয়। ক্ষতি আরও বাড়লে তা সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।
সিরোসিস লিভার ক্যানসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। তবে কিছু ক্ষেত্রে সিরোসিস না থাকলেও লিভার ক্যানসার হতে পারে। তাই শুধু ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হওয়াই নয়, লিভারের সামগ্রিক অবস্থা ও রোগের অগ্রগতি সম্পর্কে জানা জরুরি।
শরীরের যে ৭ লক্ষণ অবহেলা করবেন না
ফ্যাটি লিভার ও লিভার ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ মানেই ক্যানসার নয়; অন্যান্য রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়।
১. কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় পরিবর্তন না এনেও যদি দ্রুত ওজন কমতে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস লিভারের সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হতে পারে। এ পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. ক্ষুধা কমে যাওয়া
আগের মতো খেতে ইচ্ছা না করা, দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা থাকা কিংবা অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে এর সঙ্গে ওজন কমে যাওয়া বা দুর্বলতা দেখা দিলে দেরি না করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
৩. দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা
পেটে বারবার ব্যথা হওয়া বা দীর্ঘদিন অস্বস্তি থাকা অবহেলা করা উচিত নয়। এর পেছনে হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে লিভারের অসুস্থতাসহ নানা কারণ থাকতে পারে। নিজে থেকে রোগ নির্ধারণ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানো ভালো।
৪. পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি
লিভার পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে অবস্থিত। এ জায়গায় বারবার ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি অনুভূত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন। যদিও এ ধরনের ব্যথা হলেই লিভার ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়; অন্য কারণেও একই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৫. পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া
পেটের আকার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা পেটে তরল জমে ফোলাভাব তৈরি হওয়া গুরুতর লিভার রোগের লক্ষণ হতে পারে। হঠাৎ পেট ফুলে গেলে, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে, দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
৬. চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
চোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেলে তাকে জন্ডিস বলা হয়। লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া কিংবা পিত্তনালির সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে জন্ডিস হতে পারে। এ লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৭. বিশ্রামেও ক্লান্তি না কমা
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, শরীরে শক্তি না পাওয়া যায় কিংবা দৈনন্দিন কাজ করতে কষ্ট হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। ক্লান্তির পেছনে রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, লিভারের অসুস্থতাসহ নানা কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘদিন এমন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে কী করবেন?
ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে রোগের পর্যায় ও লিভারের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভারের কার্যকারিতা, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসনোগ্রাম বা লিভারে ফাইব্রোসিসের মাত্রা নির্ণয়ের পরীক্ষাও করা হয়।
লিভারের সুস্থতা বজায় রাখতে কয়েকটি অভ্যাস সহায়ক হতে পারে—
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: প্রতিদিন হাঁটা এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- সুষম খাবার খান: অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার কমিয়ে পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।
- ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন: এসব সমস্যা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
- নিজে থেকে ওষুধ বা ভেষজ উপাদান গ্রহণ করবেন না: লিভার ভালো করার নামে কোনো ওষুধ বা ভেষজ উপাদান ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চোখ-ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া কিংবা পেট দ্রুত ফুলে ওঠার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার মানেই লিভার ক্যানসার নয়। তবে রোগটিকে অবহেলা করাও ঠিক নয়। সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array