১ হাজার কোটি টাকার পায়রা সেতু থমকে, দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
পটুয়াখালীর পায়রা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতু ঘিরে স্বপ্ন ছিল দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের। সেতুটি নির্মিত হলে পটুয়াখালীর সঙ্গে পিরোজপুর, খুলনা ও মোংলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ার কথা। ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। এখনো শুরু হয়নি মূল সেতুর পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ।
প্রায় ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে একদিকে পড়ে আছে অর্ধনির্মিত অবকাঠামো ও মরিচাধরা নির্মাণযন্ত্র, অন্যদিকে নদীর দুই পাড়ের মানুষকে প্রতিদিন পারাপার হতে হচ্ছে নৌযানে। কেন থেমে আছে সেতুর কাজ, তা নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও রয়েছে স্পষ্ট বিরোধ। ঠিকাদার বলছে, নকশার চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে কাজ এগোচ্ছে না। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক বলছেন, সরকারের অর্থায়নে ঘাটতি নেই; ঠিকাদারের অর্থসংকট ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের কারণেই কাজ বন্ধ রয়েছে।
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে থমকে মূল কাজ
২০২০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের পর পায়রা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির সংশোধিত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ২৬ শতাংশ। মাঠপর্যায়ে ১০ দশমিক ৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা টোল ও অফিস ভবন এবং নির্মাণ ইয়ার্ড। এ ছাড়া ছয়টি টেস্ট পাইল, ৬০টি সার্ভিস পাইল, ছয়টি পাইল ক্যাপ ও তিনটি পিয়ার কলাম নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেতুর মূল নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেড় বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। নির্মাণস্থলে পড়ে রয়েছে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অর্ধনির্মিত অবকাঠামো। এত বড় প্রকল্পের কাজ কেন থেমে আছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মহলেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নকশা পরিবর্তনে বাড়ে জটিলতা, সময় যায় আরও ১৮ মাস
প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশাসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়নেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া কিছু নকশা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ঠিকাদার ও পরামর্শকের মধ্যে সমন্বয় ও সমঝোতার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের সংশোধিত চুক্তিতে সড়কের বাঁক মসৃণ করা, সেতুর স্প্যানের দৈর্ঘ্য বাড়ানো এবং টোল মনিটরিং সুবিধায় পরিবর্তন আনা হয়। নতুন শর্ত পূরণ করতে ঠিকাদারকে নকশা নতুন করে তৈরি করতে হয়। এতে আরও প্রায় ১৮ মাস সময় চলে যায়।
নকশা চূড়ান্ত করা নিয়ে এই দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে বর্তমানে নকশার অনুমোদন কতটা সম্পন্ন হয়েছে এবং কাজ পুনরায় শুরু করতে আর কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নিয়ে ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
ঠিকাদারের দাবি, নকশা প্রস্তুত; অর্থসংকট সাময়িক
সেতু নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী ফারহান খান চৌধুরী বলেন, পায়রা সেতু বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম সেতু এবং এর নকশা তৈরির কাজও করছে তাঁদের প্রতিষ্ঠান।
তাঁর ভাষ্য, প্রকৌশলীরা ইতোমধ্যে নকশার ড্রয়িং সম্পন্ন করেছেন। নকশার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে বাকি কাজ শেষ করা হবে। ভায়াডাক্টের পাইলের কাজ শেষ হয়েছে এবং কিছু অংশে পাইল ও পাইল ক্যাপ নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বর্ষাকাল শেষ হলে বাকি কাজ শুরু করে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেন এই কর্মকর্তা। অর্থনৈতিক সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন খাতেই অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। তাঁদের প্রতিষ্ঠানের অর্থসংকট সাময়িক এবং দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠার আশা করছেন তাঁরা।
সাব-কন্ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে লেনদেন প্রসঙ্গে ফারহান খান চৌধুরী জানান, কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ পরিশোধ করা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের লেনদেন চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।
প্রকল্প পরিচালকের দাবি, অর্থসংকট ঠিকাদারের; চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ
পায়রা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. তোফাজ্জল হোসেন ঠিকাদারের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, সরকারের তহবিলে কোনো ঘাটতি নেই; বরং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থসংকট রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েকটি বিষয়ে দাবি উত্থাপন করেছে এবং সেগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাজ করবে না বলে জানিয়েছে। তাঁর মতে, এভাবে কাজ বন্ধ রাখা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, চুক্তিতে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ঠিকাদারের উত্থাপিত দাবি নিষ্পত্তির জন্য বোর্ড গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তোফাজ্জল হোসেন আরও জানান, নকশার যেসব বিষয়ে আগে মতপার্থক্য ছিল, সেগুলোতে সমঝোতা হয়েছে এবং নকশা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মূল সেতুর সাব-স্ট্রাকচার ও ভায়াডাক্টের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাই শুধু নকশার সমস্যার কারণে কাজ করা যাচ্ছে না—এমন বক্তব্য সঠিক নয় বলে মনে করেন প্রকল্প পরিচালক।
তাঁর অভিযোগ, কম দর দিয়ে কাজ নেওয়ার কারণে লোকসানের আশঙ্কা থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রেখেছে। তবে এটি প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য; ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নকশা ও অর্থসংক্রান্ত সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তি বাতিল হলে বাড়তে পারে সময় ও ব্যয়
প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত কাজ শুরু না করলে কর্তৃপক্ষ চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি, নকশা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষের বিরোধ মিলিয়ে নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চুক্তি বাতিল বা নতুন ঠিকাদার নিয়োগের সিদ্ধান্ত হলে নতুন করে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় নিতে পারে।
ফলে সেতু নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সহজ করা—এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
সেতু না থাকায় বাড়ছে যাতায়াতের খরচ
পায়রা নদীর দুই পাড়ের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত এখনো নির্ভর করছে ট্রলার ও স্পিডবোটের ওপর। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই বেশি ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহন, জরুরি প্রয়োজনে নদী পারাপার এবং রাতের যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

কৃষক মজিবর মৃধা বলেন, সেতু না থাকায় নদীর দুই পাড়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। কৃষিপণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ বাড়ছে। জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হতেও বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারে জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। আর স্পিডবোটে জনপ্রতি ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত লাগে। রাতের বেলা কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় পারাপারের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি খরচও বেড়ে যায়।
একটি সেতু নির্মিত হলে এসব দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি পটুয়াখালীর সঙ্গে পিরোজপুর, খুলনা ও মোংলার সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় সেই সম্ভাবনা এখনো অধরা।
অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন, উত্তর চান নদীর দুই পাড়ের মানুষ
পায়রা সেতু প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, টোল ও অফিস ভবন নির্মাণ এবং প্রাথমিক অবকাঠামোর কিছু কাজ সম্পন্ন হলেও মূল সেতুর নির্মাণকাজে স্থবিরতা কাটেনি। একদিকে নকশা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা, অন্যদিকে অর্থসংকট ও চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি জটিল অবস্থায় রয়েছে।
আইএমইডির মূল্যায়নে নকশা ও সমন্বয়সংক্রান্ত সমস্যার কথা উঠে এসেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থনৈতিক চাপের কথা বলছে, আর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারের অর্থসংকট ও চুক্তি লঙ্ঘনকে কাজ বন্ধ থাকার কারণ হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে এসব বিরোধের বাইরে নদীর দুই পাড়ের মানুষের চাওয়া একটাই—সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু হোক এবং শেষ হোক। ১ হাজার ৪২ কোটি টাকার প্রকল্পে অগ্রগতি বাড়িয়ে প্রতিশ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, আর কত দিন ট্রলার-স্পিডবোটে নদী পার হতে হবে? কবে পায়রা নদীর ওপর দাঁড়াবে প্রতিশ্রুত সেতু?
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array