পুড়ে ছাই মনসুর খান প্লাজা, অনিশ্চয়তায় শত ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ
পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলিতে অবস্থিত মনসুর খান প্লাজায় এক দিন আগেও ছিল বেচাকেনার ব্যস্ততা। ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ক্রেতাদের আনাগোনায় মুখর থাকা মার্কেটটি এখন পরিণত হয়েছে পোড়া ধ্বংসস্তূপে। আগুনে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া মালামাল। দীর্ঘদিনের ব্যবসা, পুঁজি ও জীবিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত মার্কেটের চারপাশ নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। বাইরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পোড়া মালামাল থেকে এখনো ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে আসছে। কোথাও পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া পণ্য, কোথাও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকান ও গুদামের ধ্বংসাবশেষ।
ফায়ার সার্ভিসের প্রায় সাড়ে ১২ ঘণ্টার অভিযান শেষে মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি নির্বাপণের কাজ শেষ হয়নি। ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা ধোঁয়া ও তাপের কারণে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের।
এক রাতেই বদলে গেল মার্কেটের চিত্র
মনসুর খান প্লাজায় আগের দিনও স্বাভাবিক বেচাকেনা চলছিল। কিন্তু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। যে দোকানগুলোতে পণ্য বিক্রি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটত, সেসব দোকানের অনেকগুলো এখন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত। ব্যবসায়ীদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সামনে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত দোকান ও গুদামের অবস্থা দেখতে মার্কেটে আসতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। তবে অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব করতে পারছেন না, আগুনে কত টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। পোড়া মালামালের মধ্যে নিজেদের শেষ সম্বল খুঁজছেন কেউ কেউ।
মার্কেটের একটি ব্যাগের দোকানের কর্মচারী সাজিদ জানান, সেখানে তাঁর মালিকের ব্যাগের দোকান রয়েছে। আগের দিনও দোকানে বেচাকেনা হয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সবকিছু বদলে গেছে।
সেহজাদ নামে এক ব্যবসায়ী জানান, সকালে ষষ্ঠতলায় উঠে চারপাশে পোড়া মালামাল পড়ে থাকতে দেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা ব্যবসা এভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ষষ্ঠতলা
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, মনসুর খান প্লাজার পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের গুদাম ছিল। বিশেষ করে ষষ্ঠতলার গুদামগুলোতে বিপুল পরিমাণ মালামাল মজুত থাকায় আগুন পুরোপুরি নেভানোর কাজ জটিল হয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, ষষ্ঠতলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটিতে আগুন লাগে। এসব গুদামে ছাতা, কসমেটিকস, আতরের বোতল ও আতরসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত ছিল।
গুদামগুলো পণ্যে পরিপূর্ণ থাকায় আগুন নেভানোর কাজ সহজ ছিল না বলে জানান তিনি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও গুদামের ভেতরে থাকা মালামাল সরানো এবং বিভিন্ন স্থানে পানি দেওয়ার কাজ চলতে থাকে।
মালামালের নিচে জমে থাকা তাপ নিয়ে শঙ্কা
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, গুদামে স্তূপ করে রাখা পণ্যের নিচে তাপ জমে থাকতে পারে। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও পুনরায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুদামগুলো পরীক্ষা করে পানি দেওয়ার পাশাপাশি পণ্য সরানোর কাজ চলছে।
ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া ও তাপও উদ্ধারকাজকে জটিল করে তুলেছে। ফলে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ এবং ভবনের বিভিন্ন অংশ নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করতে সময় লাগছে।
সরু রাস্তা ও পানির সংকটে ব্যাহত হয় অভিযান
অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। সরু রাস্তার কারণে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে দেরি হয়। ভবনের ভেতরে ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ না থাকা এবং দোকানের শাটার ভাঙতে বেগ পেতেও আগুন নেভানোর কাজে বাধা সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া পানির উৎস সীমিত থাকায় অভিযান পরিচালনায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, ভবনের ভেতরে বিপুল পরিমাণ দাহ্য ও অন্যান্য পণ্য মজুত থাকায় আগুন নেভানোর কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্য তলাতেও সতর্কতা, মালামাল সরাচ্ছেন কর্মচারীরা
অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনের অন্যান্য তলাতেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে বিভিন্ন দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন কর্মচারীরা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কেট ও আশপাশের দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন ডেসকোর কর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, মানুষের আশঙ্কা অনুযায়ী পুরো মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ভবনের ষষ্ঠতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর সপ্তম তলায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের প্রচেষ্টায় আশপাশের মার্কেটগুলোকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আগুনের কারণ এখনো অজানা
মনসুর খান প্লাজায় আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভবনে বিদ্যুতের সংযোগ থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না ফায়ার সার্ভিস। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
কাজী নজমুজ্জামান জানান, আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম চলমান থাকায় অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনই বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পর আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।
ব্যবসায়ীদের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মনসুর খান প্লাজার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। কত দোকান ও গুদামের পণ্য নষ্ট হয়েছে, কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা কবে নাগাদ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারবেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো স্পষ্ট নয়।
দীর্ঘদিনের পুঁজি ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী এবং কর্মচারীদের জন্য এই অগ্নিকাণ্ড বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর প্রকৃত অবস্থা, ক্ষতির পরিমাণ এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণে তদন্ত ও পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁরা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array