বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণাসহ সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবি
টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তাবলীগ জামাতের ধর্মীয় কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের মাওলানা সাদ অনুসারী পক্ষ। একই সঙ্গে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, বিভিন্ন এলাকার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি এবং মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার জন্য প্রশাসনিক নিরাপত্তা চেয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়। তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের (মাওলানা সাদ অনুসারী) মিডিয়া সমন্বয়ক মো. সায়েম বিজ্ঞপ্তিটি পাঠান।
বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণার দাবি
সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের সুনির্দিষ্ট তারিখ দ্রুত ঘোষণা এবং আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ। পাশাপাশি ইজতেমা ময়দান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের বক্তব্য, ইজতেমা আয়োজন ও ময়দান ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ নিরসন করা যায় এবং ধর্মীয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়।
২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতার তদন্ত দাবি
টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানকেন্দ্রিক ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ। এসব ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এসব ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তকারী সংস্থা যেন রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ সালে ইসমাইল মণ্ডল ও শামসুদ্দিন বেলাল এবং ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বেলাল হোসেন ও মিজানুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৯ সালে কিশোরগঞ্জে আব্দুর রহিম রাজন এবং ২০২৩ সালে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় শামসুল হকের মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ। তবে বিজ্ঞপ্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবিগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান
তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সম্প্রতি ‘ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ’ নাম ব্যবহার করে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সাদপন্থীরা দাবি করেন, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাবলীগ জামাতের প্রতিনিধিত্ব করেন না।
বিজ্ঞপ্তিতে তাঁদের বক্তব্যকে ‘অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করা হয়। সাদপন্থীদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে উসকে দিচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়নি। তাবলীগ জামাতের ধর্মীয় কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ বিষয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ।
ইজতেমা ময়দান নিয়ে আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি যৌথ সভায় ইজতেমা ময়দান খালি করার বিষয়ে লিখিত সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে সাদপন্থীরা উল্লেখ করছেন। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ ছাড়া ১৭ ডিসেম্বর রাতে ডা. আসগরের নামে প্রচারিত একটি কথিত অডিও রেকর্ডের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অডিওটির সত্যতা বা এ বিষয়ে কোনো তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। সাদপন্থীরা বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি
দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ এবং দখলসংক্রান্ত অভিযোগ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ। একই সঙ্গে মসজিদগুলোতে তাবলীগের নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে তাবলীগের নিয়মিত আমল পরিচালনায় বাধা, মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ এবং এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি প্রচারণা ধর্মীয় পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মার্কাজ মসজিদসংক্রান্ত বিরোধ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা এবং তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত হস্তক্ষেপ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবির মূল বিষয়গুলো হলো—
১. টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার সুনির্দিষ্ট তারিখ দ্রুত ঘোষণা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ইজতেমা ময়দানকেন্দ্রিক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা।
৩. তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
৪. বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
৫. দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা।
৬. মসজিদে তাবলীগের ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array