বছরের প্রথম নয় মাসে পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পাওয়া বাংলা ছবির মধ্যে কিছু দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে, আবার কিছু ছবি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য দুর্গাপূজার সময়টি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের ছুটিতে মণ্ডপে ঘোরা, আড্ডা ও খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি সিনেমা দেখাও অনেকের পরিকল্পনার অংশ। সেই দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টানতে এবার চারটি সিনেমা নিয়ে হাজির হচ্ছেন টালিউডের পরিচিত নির্মাতা ও তারকারা।
দেব–শুভশ্রীর প্রত্যাবর্তন, পরিচালনায়ও দেব
চারটি ছবির মধ্যে ‘দেশু৭’ ঘিরে অন্যতম বড় আকর্ষণ দেব ও শুভশ্রীর জুটি। গত বছরের আগস্টে ‘ধূমকেতু’ মুক্তির পর আবারও এই জুটিকে পর্দায় দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকেরা। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁদের একসঙ্গে পর্দায় ফেরার বিষয়টি ভক্তদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
তবে এবারের ছবিতে দেবের দায়িত্ব শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ নয়। ‘দেশু৭’ দিয়ে পরিচালক হিসেবেও অভিষেক হচ্ছে তাঁর। পাশাপাশি ছবিটির প্রযোজকও তিনি। অর্থাৎ অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনা—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বই সামলাচ্ছেন দেব। ফলে এবারের দুর্গাপূজা তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ছবিতে দেব ও শুভশ্রীর সঙ্গে অভিনয় করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। আরও রয়েছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার, রজতাভ দত্ত, কাঞ্চন মল্লিক ও অপরাজিতা আঢ্য। রোমান্স ও অ্যাকশনের মিশেলে নির্মিত ছবিটি ১৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা।
দেব–শুভশ্রীর জনপ্রিয়তা এবং নতুন পরিচালক হিসেবে দেবের কাজ—দুটি বিষয়ই ছবিটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ বাড়াতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত গল্প ও নির্মাণ কতটা দর্শককে আকৃষ্ট করতে পারে, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
কেরালায় রহস্যভেদে একেনবাবু
দেব–শুভশ্রীর রোমান্স ও অ্যাকশনের বিপরীতে রহস্য আর হাস্যরসের স্বাদ নিয়ে আসছে ‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’। জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র একেনবাবুকে আবারও পর্দায় দেখা যাবে অনির্বাণ চক্রবর্তীর অভিনয়ে।
ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে এক বিজ্ঞানীর অপহরণকে কেন্দ্র করে। ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে কেরালায় পৌঁছান একেনবাবু। তদন্তের পাশাপাশি তাঁর পরিচিত রসবোধ ও মজার পরিস্থিতিও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসভিএফ প্রযোজিত এই ছবিতে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী, সুব্রত দত্ত, অম্বরীশ ভট্টাচার্য ও কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। রহস্যকাহিনির সঙ্গে হাস্যরসের সংমিশ্রণ এবং একেনবাবুর পরিচিত চরিত্র—দুটিই ছবিটির প্রধান আকর্ষণ।
বিশেষ করে পূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া দর্শকদের কাছে ছবিটি ভালো বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে ১৫ অক্টোবর মুক্তির কথা রয়েছে ‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’র। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা পরদিন।
‘বহুরূপী’র সাফল্যের পর আরও বড় পরিসরে ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’
২০২৪ সালের দুর্গাপূজায় মুক্তি পাওয়া ‘বহুরূপী’ সাফল্যের পর এবার এর নতুন পর্ব নিয়ে ফিরছেন নির্মাতা নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। নতুন ছবির নাম ‘বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু’। আগের ছবির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এবারও পূজার ছুটিকে মুক্তির জন্য বেছে নিয়েছেন তাঁরা।
আগের পর্বে বিক্রম প্রামাণিকের গল্প দর্শকের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল। নতুন ছবিতে ডাকাতির ঘটনা আরও বড় পরিসরে তুলে ধরার ইঙ্গিত দিয়েছেন নির্মাতারা। অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী এই ছবিতে অভিনয় করেছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, সোহিনী সরকার ও কৌশানি মুখোপাধ্যায়।
ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ যিশু সেনগুপ্ত ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি অবস্থান। আগের ছবির সাফল্য নতুন পর্বের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করলেও দর্শকের প্রত্যাশাও এবার বেশি। পরিচিত গল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নির্মাতারা কতটা নতুনত্ব আনতে পারেন, সেটিই হবে ছবিটির সাফল্যের অন্যতম নির্ধারক।
উইন্ডোজ প্রযোজিত ‘বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু’ ১৫ অক্টোবর মুক্তি পাওয়ার কথা।
শরৎচন্দ্রের জীবন ও রাজনৈতিক চেতনায় সৃজিতের ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’
অ্যাকশন, রোমান্স ও গোয়েন্দা রহস্যের বাইরে ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে আসছেন নির্মাতা সৃজিত মুখোপাধ্যায়। তাঁর ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ছবিতে শরৎচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন টোটা রায়চৌধুরী। তাঁর সাজপোশাক ও চরিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে।
নন্দী মুভিজ প্রযোজিত ছবিটিতে আরও অভিনয় করেছেন আবির চট্টোপাধ্যায় ও মিমি চক্রবর্তী। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক চেতনা, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নির্ভীক ব্যক্তিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা।
ছবিটির মূল অনুপ্রেরণা শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ‘পথের দাবী’। ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ভাবনা ও বিপ্লবী চেতনার কারণে উপন্যাসটি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের বিরাগভাজন হয়েছিল। ১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়।
‘পথের দাবী’ প্রকাশের শতবর্ষকে সামনে রেখে নির্মিত ছবিটি ইতিহাস ও সাহিত্যপ্রেমী দর্শকদের আগ্রহের কারণ হতে পারে। ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ ১৫ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা।
পূজার বক্স অফিসে শেষ হাসি কার?
চারটি ছবির গল্প, ঘরানা ও তারকাদের উপস্থিতি আলাদা। ‘দেশু৭’ ভরসা করছে দেব–শুভশ্রীর জনপ্রিয়তা এবং দেবের নতুন পরিচালকের পরিচয়ের ওপর। ‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’ এগিয়ে থাকতে পারে রহস্য ও হাস্যরসের সমন্বয়ে। ‘বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু’ কাজে লাগাতে চাইবে আগের ছবির সাফল্য, আর ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ দর্শক টানতে পারে ইতিহাস ও সাহিত্যনির্ভর কাহিনির মাধ্যমে।
তবে তারকাখ্যাতি কিংবা আগের ছবির সাফল্যই বক্স অফিসের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে না। দর্শকের মুখে মুখে প্রশংসা, গল্পের গ্রহণযোগ্যতা এবং উৎসবের দিনগুলোতে প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিতিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উদ্বোধনী দিনের ভিড়ের পর কোন ছবি দর্শকের মন জয় করে এগিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array