হুতিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন সৌদি যুবরাজ
ইস্তাম্বুলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলুর বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কোনো আগ্রহ দেখাননি। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে তীব্র জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাতেও মেলেনি সৌদির সম্মতি
ইসরায়েলের প্রস্তাবের বিষয়ে সৌদি আরবের সম্মতি আদায়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল বলে হারেৎজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল সৌদি আরবকে পাশে পেতে চাইলেও রিয়াদ এ ধরনের সহযোগিতায় যুক্ত হতে রাজি হয়নি।
এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। একদিকে হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সহযোগিতার রাজনৈতিক ও জনমতগত পরিণতি বিবেচনা করতে হচ্ছে দেশটির নেতৃত্বকে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কৌশলগত হিসাব ছিল ইসরায়েলের
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত আরেকটি সূত্রের দাবি, সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চেয়েছিল ইসরায়েল। এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথও সহজ করতে পারত। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সেই সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন সংকট একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। সৌদি আরবের অবস্থান অনুযায়ী, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি নিশ্চিত না হলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
এই অবস্থান সৌদি আরবের কূটনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুর গুরুত্ব তুলে ধরে। ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বা সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা থাকলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রিয়াদ তার ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে আসতে চায় না। ফলে সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে কেবল নিরাপত্তার হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন; এর সঙ্গে সৌদি আরবের আঞ্চলিক নেতৃত্ব, জনমত এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থানও জড়িত।
সৌদি আরবে হুতিদের হামলায় বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
সৌদি আরবের ওপর হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের খবরটি সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং বিমান চলাচলও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো একটি হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। পরদিন রোববার (১১ অক্টোবর ২০২৬) একই বিমানবন্দরে আরেকটি হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ১১ জন।
বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা এবং সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সৌদি নেতৃত্বের অনাগ্রহের কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বোঝা যায়, হুতিদের মোকাবিলার প্রশ্নে রিয়াদের সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করছে না; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ২০১৪ সালে
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূচনা হয় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে (সেপ্টেম্বর ২০১৪), যখন হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির রাজধানী সানা এবং বেশ কয়েকটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে এবং সংঘাত ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ২০১৫ সালের মার্চে (মার্চ ২০১৫) দেশটির গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। এর মধ্য দিয়ে সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘ সংঘর্ষ ইয়েমেনের পাশাপাশি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলে।
হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের কারণে সৌদি আরব বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা দেশটির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক হামলার খবর সেই উদ্বেগকে আবারও সামনে এনেছে।
যুদ্ধবিরতির পরও কাটেনি সংঘাতের আশঙ্কা
দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালের এপ্রিলে (এপ্রিল ২০২২) জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর ফলে কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হয়ে আসে। সংঘাতের তীব্রতা কমে যাওয়ায় ইয়েমেন ও আশপাশের অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
তবে যুদ্ধবিরতির পরও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইয়েমেনের সংঘাতের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থাকায় পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকেই গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে (জুলাই ২০২৬) এ অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো সেই অস্থিরতারই প্রতিফলন।
এ অবস্থায় সৌদি আরবের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে হুতিদের হামলা প্রতিরোধ এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পড়া ঠেকাতে কূটনৈতিক হিসাবও সামলাতে হবে। ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঘটনা সেই জটিল পরিস্থিতিরই একটি অংশ।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি অবস্থানই বড় বাধা
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রশ্নে সৌদি আরবের ঘোষিত অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে একই রয়েছে। রিয়াদ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানকে এ ধরনের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার মতো উদ্যোগও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।
সৌদি নেতৃত্বের আশঙ্কা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হলে দেশের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। হারেৎজের প্রতিবেদনে যুবরাজের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পেছনে এ ধরনের জনমতের বিষয়টিই বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও নিরাপত্তা সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নে মতপার্থক্য এবং সৌদি জনগণের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এ প্রক্রিয়াকে জটিল করে রেখেছে।
সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার খবর এবং ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক বৈধতা, জনমত এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক লক্ষ্যও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
তবে সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখন পর্যন্ত দেশটির কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সুনির্দিষ্ট কারণ ও পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত।
সব মিলিয়ে, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সৌদি আরবকে পাশে পাওয়ার ইসরায়েলি উদ্যোগ আপাতত সফল হয়নি বলে হারেৎজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান, সৌদি জনমত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব—এই তিনটি বিষয় ভবিষ্যতে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: আনাদোলু
কালের আলো/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
Array