খুঁজুন
                               
, ,
           

লাদাখের ২৮ এলাকা নিয়ে চীনের নতুন মানচিত্র, কড়া প্রতিবাদ ভারতের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১২ অপরাহ্ণ
লাদাখের ২৮ এলাকা নিয়ে চীনের নতুন মানচিত্র, কড়া প্রতিবাদ ভারতের
ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ভারতের সীমান্তবর্তী অন্তত ২৮টি অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে চীন। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের দাবি, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখ দেশটির অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ। চীন মানতে না চাইলেও এ বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হবে না।

চীনের নতুন মানচিত্র এবং লাদাখের ভূখণ্ডগত মালিকানা নিয়ে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অবস্থান সীমান্ত পরিস্থিতিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের সামরিক সংঘর্ষের স্মৃতি এবং দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে চলমান বিরোধের মধ্যে মানচিত্র প্রকাশের এই ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং লাদাখের মর্যাদা নিয়ে ভারতের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং নিজস্ব সীমানা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার চীনের নেই।

চীনের দাবি, বিতর্কিত অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে তাদের ভূখণ্ড

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত একতরফাভাবে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে। বেইজিং এ সিদ্ধান্ত কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, চীন-ভারত সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বিতর্কিত এলাকাগুলো ঐতিহাসিকভাবেই চীনের ভূখণ্ডের অংশ।

চীনের এই অবস্থানের ভিত্তিতে মাও নিং দাবি করেন, এসব এলাকায় ভারতের নেওয়া কোনো পদক্ষেপই বৈধ বা কার্যকর বলে গণ্য হবে না। নতুন মানচিত্রের মাধ্যমে চীন তার ভূখণ্ডগত দাবির অবস্থান আবারও তুলে ধরেছে বলে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

তবে সীমান্তের এসব এলাকার মালিকানা নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। উভয় দেশই বিভিন্ন অংশে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে আসছে। ফলে নতুন মানচিত্র প্রকাশের বিষয়টি কেবল ভৌগোলিক চিত্র উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের সার্বভৌমত্বের দাবি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।

ভারতের পাল্টা বক্তব্য, লাদাখ অবিচ্ছেদ্য অংশ

চীনের বক্তব্যের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানায়। নয়াদিল্লির বিবৃতিতে বলা হয়, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। চীন যতবারই এই বাস্তবতা অস্বীকার করুক না কেন, তাতে ভারতের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।

ভারতের বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সীমানা নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার বেইজিংয়ের নেই। নয়াদিল্লির মতে, চীনের নতুন মানচিত্রে কোনো অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হলেও তাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রকৃত বা আইনগত মর্যাদা পরিবর্তিত হয় না।

ভারতের এই প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, লাদাখের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রশ্নে দেশটি কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে চীনও অঞ্চলটির মর্যাদা এবং সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলের ভূখণ্ডগত মালিকানা নিয়ে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে। ফলে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে বিরোধের দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিতর্কিত এলাকার তালিকায় গোগরা ও হট স্প্রিং

চীনের নতুন মানচিত্র ঘিরে আলোচনায় এসেছে ভারতের পূর্ব লাদাখের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর তালিকায় রয়েছে গোগরা ও হট স্প্রিং। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনার সময় এই এলাকাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

এ ছাড়া আলিশা গিরি, কারুন পীর ও জোরাওয়ার পিকের মতো কৌশলগত পাহাড়, গিরিপথ ও হিমবাহের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চতা এবং সীমান্তের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে এসব স্থানের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

হিমালয় অঞ্চলের সীমান্তে পাহাড়, গিরিপথ ও উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ সামরিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব এলাকা থেকে সেনা চলাচল, নজরদারি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে মানচিত্রে অঞ্চলগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ কেবল প্রতীকী নয়; এর সঙ্গে সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত স্বার্থের বিষয়ও জড়িত।

তবে মানচিত্রে কোনো অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সেই এলাকার ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সীমান্তবিরোধের ক্ষেত্রে ভূখণ্ডগত দাবি, ঐতিহাসিক দলিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। ভারত ও চীনের বিরোধের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট

ভারত-চীন সীমান্তবিরোধের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ। ওই বছরের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ১৯৭৫ সালের পর সেটিই ছিল দুই দেশের সীমান্তে প্রথম প্রাণঘাতী সামরিক সংঘর্ষ।

ওই ঘটনায় ভারতের অন্তত ২০ জন সেনা নিহত হন। চীনের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন অস্পষ্টতা ছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমে চীনের চার সেনা নিহত হওয়ার দাবি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে চীনও তাদের সেনাদের হতাহতের কথা স্বীকার করে, যদিও দুই পক্ষের প্রকাশিত তথ্য ও বিবরণে পার্থক্য রয়েছে।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। সীমান্তে সেনা মোতায়েন, সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা ও সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গালওয়ানের ঘটনা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। এরপর সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং সংঘর্ষ এড়ানো দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। তবে ওই ঘটনার পরও সীমান্তসংক্রান্ত সব বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগের পরও নিয়ন্ত্রণরেখায় অনিশ্চয়তা

২০২০ সালের সংঘর্ষের পর ভারত ও চীন সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় সেনা প্রত্যাহার এবং উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। কিছু এলাকায় সেনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরো সীমান্তবিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের (এলএসি) অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বলে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়। তবে সীমান্তের বিভিন্ন অংশের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং নিয়ন্ত্রণরেখার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন ও নজরদারি দুই দেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন হলেও ভূখণ্ডগত দাবির বিরোধ সমাধান করা কঠিন হয়ে রয়েছে। নতুন মানচিত্র প্রকাশের ঘটনা সেই পুরোনো বিরোধকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে গোগরা ও হট স্প্রিংয়ের মতো এলাকা আলোচনায় আসায় ২০২০ সালের সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

মানচিত্র প্রকাশের কূটনৈতিক তাৎপর্য

কোনো দেশের সরকারি মানচিত্রে বিতর্কিত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করা তার ভূখণ্ডগত দাবির প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ একাই আন্তর্জাতিকভাবে কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা নির্ধারণ করে না। ভারত ও চীনের ক্ষেত্রেও নতুন মানচিত্রের বিষয়টি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি নতুন প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীন তার ঐতিহাসিক দাবির কথা তুলে ধরছে, আর ভারত লাদাখকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করে সেই দাবির বিরোধিতা করছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি স্পষ্ট হলেও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পারস্পরিক আলোচনা ও গ্রহণযোগ্য সীমান্ত সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।

দুই দেশই এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রভাব আঞ্চলিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে পড়তে পারে। সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু সামরিক সম্পর্ক নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ভারত-চীন সীমান্তবিরোধ কোন দিকে এগোবে

লাদাখের ২৮টি অঞ্চল নিয়ে চীনের নতুন মানচিত্র প্রকাশ এবং ভারতের প্রতিবাদ দুই দেশের সীমান্তবিরোধকে আবারও সামনে এনেছে। চীন তার ভূখণ্ডগত দাবিতে অনড় অবস্থান তুলে ধরেছে, আর ভারত জানিয়েছে, লাদাখের মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের অস্বীকৃতি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই কূটনৈতিক বিরোধ সীমান্তে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে এবং দুই দেশ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী পদক্ষেপ নেয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে সামরিক পর্যায়ের যোগাযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নতুন মানচিত্র প্রকাশের পর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে কী অগ্রগতি হয়, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সীমান্তের বিতর্কিত এলাকাগুলোর বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারত ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে লাদাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

কালের আলো/এসএ

 

মাঠজুড়ে অ্যালোভেরা, বছরে ১০০ কোটি টাকার ভেষজ বাণিজ্য

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫০ অপরাহ্ণ
মাঠজুড়ে অ্যালোভেরা, বছরে ১০০ কোটি টাকার ভেষজ বাণিজ্য

চারদিকে সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠজুড়ে অ্যালোভেরার চাষ। পাশের জমিতে শতমূলী, ঘৃতকাঞ্চন, শিমুলমূল, অশ্বগন্ধা ও রোজেলা। বাড়ির উঠানেও দেখা মেলে নানা প্রজাতির ঔষধি গাছের। এসব ভেষজ উদ্ভিদকে ঘিরেই বদলে গেছে নাটোরের লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৬ গ্রামের অর্থনীতি। স্থানীয়ভাবে ‘ঔষধি গ্রাম’ নামে পরিচিত এই জনপদে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বছরে এখানে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

একসময় অভাব-অনটনে থাকা এসব গ্রামের অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এখন ভেষজ চাষ। অ্যালোভেরাসহ বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদ উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন বহু কৃষক। কেউ শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন, কেউ আবার উৎপাদিত কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা। কৃষিনির্ভর এই জনপদে ভেষজ উদ্ভিদ এখন শুধু চাষের ফসল নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

১৬ গ্রামে ১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ চাষ

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করা হয়। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টর জমিতে অ্যালোভেরা, ৫০ হেক্টরে শিমুলমূল এবং বাকি ৩০ হেক্টরে অন্যান্য ঔষধি উদ্ভিদের চাষ হয়। এলাকাটিতে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন অ্যালোভেরা উৎপাদিত হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এই বৈচিত্র্য ভেষজ পল্লীর অর্থনীতিকে একাধিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। অ্যালোভেরা এখানকার প্রধান উৎপাদিত পণ্য হলেও শিমুলমূল, রোজেলা, অশ্বগন্ধাসহ অন্যান্য ভেষজ উদ্ভিদও কৃষকদের আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।

অ্যালোভেরার পাতা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়

ঔষধি গ্রামগুলোর মাঠে উৎপাদিত অ্যালোভেরা নিয়মিত ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরির পাশাপাশি জুস, শরবতসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে অ্যালোভেরা ব্যবহৃত হয়। এসব শিল্পে কাঁচামালের চাহিদা থাকায় স্থানীয় কৃষকেরা উৎপাদিত পাতা বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত তাইওয়ান সিন লিন এন্টারপ্রাইজও স্থানীয় অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন ভেষজ কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে পণ্য তৈরি করা হয়। এসব পণ্যের কিছু অংশ বিদেশেও রপ্তানি হয়। ফলে ভেষজ চাষের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুধু জমিতে ফসল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে আয়ের একাধিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার হাত ধরে শুরু

এই ভেষজ পল্লীর গোড়াপত্তন হয়েছিল কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার উদ্যোগে। ১৯৯৫ সালের দিকে খোলাবাড়িয়ায় নিজের বসতবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ চাষ শুরু করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করতেন গাছের চারা ও বীজ। তাঁর উদ্যোগ দেখে আশপাশের গ্রামের মানুষও ভেষজ উদ্ভিদ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রথমে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই চাষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে উৎপাদন ও ব্যবসার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। আফাজ উদ্দিন এখন আর বেঁচে নেই। তবে তাঁর শুরু করা উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এলাকার বহু পরিবার ভেষজ চাষকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। একসময় যে চাষ ছিল সীমিত উদ্যোগ, তা এখন কয়েকটি গ্রামের অর্থনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

ঢাকার চাকরি ছেড়ে অ্যালোভেরা চাষে সৌরভ

ভেষজ চাষে বদলে যাওয়া জীবনের উদাহরণ সৌরভ হোসেন। একসময় ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। পরে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে অ্যালোভেরা চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর দুই বিঘা জমিতে এই ভেষজ উদ্ভিদ চাষ হচ্ছে। সৌরভের ভাষ্য, অ্যালোভেরার যথাযথ যত্ন ও পরিচর্যা করা গেলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বাজারদরও মোটামুটি ভালো থাকায় উৎপাদিত পাতা বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাতে পারছেন তিনি। তাঁর মতো এলাকার আরও অনেক তরুণ ভেষজ উদ্ভিদ চাষে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কাছে এই কৃষিকাজ গ্রামে থেকে আয় করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। শহরে চাকরি বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকার বিকল্প হিসেবেও কেউ কেউ ভেষজ চাষকে বেছে নিচ্ছেন।

রোজেলা চাষেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা

অ্যালোভেরার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে রোজেলা চাষের আগ্রহ বাড়ছে। ২০১৭ সালে প্রথম রোজেলা চাষ শুরু করেন শহিদুল ইসলাম। এ বছর তিনি দুই একর জমিতে এই উদ্ভিদ চাষ করেছেন। শহিদুলের উদ্যোগ ও চাষের অভিজ্ঞতা দেখে এলাকার আরও অনেক কৃষক রোজেলা উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছেন। ফলে প্রচলিত ভেষজ উদ্ভিদের পাশাপাশি নতুন ফসল নিয়ে পরীক্ষার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনাময় ফসলের বাজার তৈরি হলে আয় বাড়ানোর পথ আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে উৎপাদন সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাজারের চাহিদা, বিক্রির নিশ্চয়তা এবং ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

ভেষজ থেকে গুঁড়া ও হালুয়া তৈরি

ঔষধি পল্লীর অর্থনীতি শুধু কৃষকদের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজেও যুক্ত হয়েছেন অনেকে। লক্ষ্মীপুর বাজারের ভেষজ পণ্যের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন তাঁদের একজন। তিনি জানান, নিজেদের উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে গুঁড়া ও হালুয়া তৈরি করেন। পরে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন। এ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করে। কাঁচামাল সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি তা দিয়ে তৈরি পণ্য বাজারজাত করতে পারলে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে পণ্য প্রস্তুত, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন ও বিক্রির কাজে আরও মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলামের ভাষ্য, ভেষজ উদ্ভিদ চাষের মাধ্যমে ১৫ থেকে ১৬ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এলাকার উৎপাদিত ভেষজ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। অ্যালোভেরা এখানকার অন্যতম প্রধান পণ্য, যা শরবতসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা মনে করেন, ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা বাড়ানো এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। ভেষজ উদ্ভিদের চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি উন্নত চাষপদ্ধতি, মানসম্মত চারা ও বীজ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারসংযোগ জোরদার করা গেলে এই খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।

সম্ভাবনা ধরে রাখতে প্রয়োজন গবেষণা ও প্রশিক্ষণ

নাটোরের ঔষধি গ্রামগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয় উদ্যোগ ও বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করা সম্ভব। একটি উদ্ভিদ দিয়ে শুরু হওয়া চাষ এখন প্রায় ১৫০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদে ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ, পণ্য তৈরি, পরিবহন ও বিপণন। তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ভেষজ উদ্ভিদের সঠিক পরিচিতি ও সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক চাষপদ্ধতি, পণ্যের গুণগত মান এবং বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। পাশাপাশি ঔষধি উদ্ভিদ থেকে তৈরি পণ্যের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ অনুসরণ প্রয়োজন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ
ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

একটি নিয়োগ পরীক্ষা, লাখো চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্ন আর কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার গোপন ব্যবস্থা। ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে পাওয়া প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি সকাল সোয়া ৬টার দিকে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর তৈরি হয় উত্তরপত্র, আর তা ছড়িয়ে পড়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের কাছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তবে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঘটনার সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে, কীভাবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছাল এবং এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তদন্ত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

  • যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নাম
  • ৮–১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন-উত্তর বিক্রির তথ্য; সাতজন গ্রেপ্তার
  • প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো অজানা

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রশ্ন থেকে উত্তরপত্র
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে জানানো তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ তাঁর মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের তুলনামূলক স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহকর্মী এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করেছে এসআরবি। পরবর্তী সময়ে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে উত্তরপত্র পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থী এবং প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে।

অর্থাৎ, তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে শুধু প্রশ্নপত্র সংগ্রহের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ছবি আদান-প্রদান, উত্তর প্রস্তুত, একাধিক ব্যক্তির মধ্যে তথ্য সরবরাহ এবং অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তদন্তের এই বর্ণনা সত্য হলে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি কোনো একক ব্যক্তির তাৎক্ষণিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রশ্ন সংগ্রহ থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত আলাদা আলাদা ভূমিকা পালনকারী একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছিল।

প্রশ্নের দাম ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা পরিচিত প্রার্থীদের কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক বেড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই অর্থের অঙ্ক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে শুধু অনিয়ম নয়, একটি লাভজনক অবৈধ ব্যবসা হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও সামনে আনে। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ এবং বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র কীভাবে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তদন্তের তথ্য সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। তবে চক্রটি মোট কতজনের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে, কত টাকা লেনদেন হয়েছে এবং অর্থের ভাগ কীভাবে বণ্টন করা হতো—এসব বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রশ্নপত্র বিক্রির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের জন্য আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতারিত চাকরিপ্রার্থী থেকে চক্রের সদস্য
মতিঝিল এলাকা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলামের সঙ্গে আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে এসআরবি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন মফিজুল ইসলাম নিজেও চাকরিপ্রার্থী। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর তিনি আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি চক্রে যোগ দেন।

এই তথ্য তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাজারে চাকরিপ্রার্থীরা যেমন সম্ভাব্য ক্রেতা, তেমনি প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তাঁদের কেউ কেউ অবৈধ কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়। তবে মফিজুলের বক্তব্য ও ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্তের ফল এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রুবেল ও মফিজুলের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা এনবিআরের কম্পিউটার

অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামের সন্ধান পান। পরে মুঠোফোনের কথোপকথন ও চ্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তি হলেন মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। এসআরবি জানিয়েছে, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এতে প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে প্রশ্নপত্রের তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কীভাবে যুক্ত হলেন?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁদের কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তবে শুধু সরকারি চাকরিতে থাকা থেকে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না। তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এনবিআরের দুই কর্মচারী নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীরের কাছে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর আগের ধাপটি এখনো স্পষ্ট নয়। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের কাছে প্রশ্নপত্রের উৎস জানতে চাওয়া হলে তাঁরা সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানিয়েছে এসআরবি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, তদন্ত শেষ হলে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।

অতএব, তদন্তের পরবর্তী ধাপে প্রশ্নপত্রের মূল কপি বা ডিজিটাল উৎস শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা যাচাই করা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া চক্রের প্রকৃত বিস্তার কিংবা দায়িত্বের স্তর নির্ধারণ করা কঠিন।

 জব্দ করা সামগ্রী কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআরবি ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চার হাজার টাকা জব্দ করেছে।

জব্দ করা এসব সামগ্রীর মধ্যে প্রবেশপত্র, সনদ, চেক ও পরিচয়পত্রের উপস্থিতি তদন্তের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এগুলোর সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির নামে প্রতারণা কিংবা আর্থিক লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

বিশেষ করে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদ উদ্ধারের বিষয়টি সামনে আসায় তদন্ত শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য পরীক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জব্দ করা কোনো সামগ্রীকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনার আগে তার উৎস, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরীক্ষা স্থগিত, বিক্ষোভ, তারপর পুনরায় আয়োজন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

পরীক্ষা স্থগিতের পর গত শনিবার পরীক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ তদন্তে সেদিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

এর মধ্যেই শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নতুন করে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। দীর্ঘ প্রস্তুতি, সময় ও অর্থ ব্যয়ের পর পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। আবার পরীক্ষা স্থগিত ও পুনরায় আয়োজনের কারণে প্রার্থীদের বাড়তি সময়, যাতায়াত ও প্রস্তুতির চাপও তৈরি হয়েছে।

কালের আলো/আরআই/এমকে

প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৪ অপরাহ্ণ
প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। চক্রটির বিরুদ্ধে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র, প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি। কার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র প্রথমে চক্রটির হাতে এসেছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত চলছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।

৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা, প্রশ্নফাঁসে স্থগিত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য গত ১০ অক্টোবর বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষা সকাল ১১টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগপ্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার পাঁচ সরকারি কর্মচারী

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তার অন্য দুজনের মধ্যে একজন চাকরিপ্রার্থী।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—

  • পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩)।
  • চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩)।
  • মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫)।
  • প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩)।
  • এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।

যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আসাদুল ইসলামকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি, পরে তৈরি হয় উত্তর

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয় বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জানান তিনি।  কাজে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে প্রশ্নপত্র প্রথম কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, নূর মোহাম্মদকে সকালে যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটি কে দিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানান তিনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। তাঁরা যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও আইডির কথা বলেছেন, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও শনাক্ত করার জন্য অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ জড়িত কি না

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততার সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের এ ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তদন্ত এগোলে এ বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন।

উদ্ধার হয়েছে স্ট্যাম্প, চেক ও বিভিন্ন সনদপত্র

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক নথি ও অন্যান্য আলামত জব্দ করেছে এসআরবি। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—

  • ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প এবং ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প।
  • প্রশ্নপত্রের এক সেট।
  • বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা।
  • ১০টি সনদপত্র এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র।
  • বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা এবং একটি ব্যাংক চেক।
  • আটটি মোবাইল ফোন।
  • ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র।
  • নগদ চার হাজার টাকা।

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, উদ্ধার হওয়া এসব আলামত তদন্তে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি অর্থ লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে ,সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মফিজুল ইসলাম চক্রের একজন সদস্যের কাছে প্রতারিত হওয়ার পর বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এবং চক্রের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে।

 

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি