ক্লড এআইয়ের পরামর্শে পাহাড়ে বিপদে ১৬ বছরের কিশোর
হাইকিংয়ের রুট পরিকল্পনায় সে অ্যানথ্রপিকের তৈরি এআই চ্যাটবট ক্লড ব্যবহার করেছিল। তবে শুধু ক্লড নয়, গুগল ম্যাপসসহ অন্য অ্যাপও ব্যবহার করেছিল কিশোরটি। তার ধারণা ছিল, সে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু একপর্যায়ে মূল হাইকিং রুট থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে এমন একটি খাড়া এলাকায় পৌঁছায়, যেখান থেকে সামনে এগোনো কিংবা নিরাপদে পেছনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিপজ্জনক পাহাড়ি পথে গিয়ে আটকে পড়ে কিশোর
নর্থ শোর নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাইস গ্রাউস মাউন্টেন থেকে যাত্রা শুরু করে ক্রাউন মাউন্টেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। নর্থ শোর রেসকিউয়ের ব্যবস্থাপক পল মার্কি জানান, এই পথ বেশ কঠিন এবং সাধারণত হাইকিং শেষ করতে সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে।
কিন্তু পথে চলতে গিয়ে ব্রাইস এমন একটি বিপজ্জনক রুটে ঢুকে পড়ে, যা পর্বতারোহীদের কাছে ‘উইডোমেকার’ নামে পরিচিত। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিশোরটি জানায়, ভুলবশত সে ‘উইডোমেকার অ্যারেট’ নামের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলে গিয়েছিল।
একপর্যায়ে পাহাড়ের খাড়া দেয়ালের নিচে পাথরের সরু একটি জায়গায় আটকে পড়ে সে। সেখান থেকে নিচে পড়ে গেলে গুরুতর আহত হওয়া কিংবা প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। উদ্ধারকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল যে নিজের উদ্যোগে নিরাপদে ফিরে আসার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ব্রাইস এ ঘটনার জন্য এআইকে পুরোপুরি দায়ী করেনি। তার ধারণা ছিল, ব্যবহৃত অ্যাপগুলো তাকে সঠিক পথই দেখাচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ি পথের বাস্তব পরিস্থিতি এবং ডিজিটাল মানচিত্রের নির্দেশনার মধ্যে পার্থক্য থাকায় সে বিপদের মুখে পড়ে।
তিন ঘণ্টার অভিযানে হেলিকপ্টারে উদ্ধার

৩ অক্টোবর স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ব্রাইসের আটকে পড়ার খবর পায় নর্থ শোর রেসকিউ। দুর্গম ও খাড়া পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করায় সাধারণভাবে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ফলে উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার ও বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।
পাহাড়ের ঢাল অত্যন্ত খাড়া হওয়ায় হেলিকপ্টারটি কিশোরের অবস্থানের পাশে সরাসরি অবতরণ করতে পারেনি। এ কারণে উদ্ধারকর্মীরা কিছুটা ওপরের দিকে নেমে দড়ির সাহায্যে নিচে পৌঁছান। পরে বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে ব্রাইসকে বিপজ্জনক স্থান থেকে বের করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসেন।
উদ্ধারকারী দল জানায়, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পর কিশোরটিকে হেলিকপ্টারে তুলে ক্লিভল্যান্ড ড্যামের কাছে উদ্ধারকারী ঘাঁটিতে নেওয়া হয়। খবর পাওয়ার পর থেকে পুরো উদ্ধার অভিযানে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে।
নর্থ শোর রেসকিউয়ের ব্যবস্থাপক পল মার্কি জানান, উদ্ধারের সময় কিশোরটি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। পাহাড়ের ওই বিপজ্জনক অবস্থান থেকে জীবিত ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে সে আতঙ্কে ছিল।
ছেলের বিপদের কথা শুনে আতঙ্কিত মা
পাহাড়ে আটকে পড়ার পর ব্রাইস প্রথমে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাহায্য চায়। পুলিশ বিষয়টি নর্থ শোর রেসকিউকে জানায়। উদ্ধারকারীরা পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকার সময় সে তার মা জোয়েলের সঙ্গেও ফোনে কথা বলে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জোয়েল বলেন, তার ছেলে ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই হাইকিংয়ে বের হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার পাঠাতে হয়েছে। কোনো মা-বাবাই চান না, তাঁদের সন্তান পাহাড়ে আটকে পড়ে এমন বিপদের মধ্যে পড়ুক।

হাইকিংয়ে এআইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করার পরামর্শ
ঘটনার পর হাইকিংয়ে এআইয়ের দেওয়া নির্দেশনার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন উদ্ধারকারীরা। তাঁদের মতে, এআই চ্যাটবট তথ্য ও পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু পাহাড়ি পথের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা তার নেই। কোনো রুট দেখতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে সেখানে খাড়া ঢাল, বিপজ্জনক পাথর কিংবা চলাচলের অনুপযোগী অংশ থাকতে পারে।
এ কারণে দুর্গম এলাকায় যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য মানচিত্র, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং অভিজ্ঞ হাইকারদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আবহাওয়া, দিনের আলো, পথের কঠিনতা এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত গাইডের সহায়তা নেওয়া উচিত।
এআইয়ের দেওয়া রুট ব্যবহার করলেও সেটি বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় শুধু ডিজিটাল নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
এআইয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে বিপদে পড়ার ঘটনা নতুন নয়
ডিজিটাল মানচিত্র কিংবা এআইয়ের পরামর্শ অনুসরণ করে দুর্গম এলাকায় বিপদে পড়ার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের রোজভিলের তিন অনভিজ্ঞ হাইকার গুগল জেমিনাইয়ের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে মাউন্ট শাস্তা পর্বতে গিয়ে আটকে পড়েছিলেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের আগস্টে গুগল ম্যাপসের নির্দেশনা অনুসরণ করতে গিয়ে এক নার্সিং শিক্ষার্থী খাবার ও পানি ছাড়া সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে আটকা পড়েছিলেন।
এসব ঘটনা দেখায়, প্রযুক্তির সাহায্য ভ্রমণ পরিকল্পনাকে সহজ করতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি যাচাইয়ের বিকল্প নয়। এআইয়ের পরামর্শ ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা পরিস্থিতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তাই পাহাড়ে হাইকিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা অপরিহার্য।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array