বলিউডে অভিনয় করে পেয়েছেন তারকাখ্যাতি, অসংখ্য ভক্তের ভালোবাসা এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি। তাঁদের সিনেমা বক্স অফিসে সাফল্য পেয়েছে, গান ও নাচ মাতিয়েছে দর্শকদের। কিন্তু জনপ্রিয় এই তারকাদের সবাই ভারতের নাগরিক নন। কেউ ব্রিটিশ, কেউ মার্কিন, কেউ কানাডীয়, আবার কেউ শ্রীলঙ্কা বা ফ্রান্সের নাগরিক। ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েও বিদেশি নাগরিকত্ব ধরে রাখা এসব তারকাকে নিয়ে ভক্তদের কৌতূহলও কম নয়।
আলিয়া ভাট: মুম্বাইয়ে জন্ম, নাগরিকত্ব ব্রিটিশ
বলিউডের বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী আলিয়া ভাট। ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রীর নাগরিকত্ব ব্রিটিশ। তাঁর মা সোনি রাজদানের জন্ম যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে। পারিবারিক সূত্রেই আলিয়ার ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
২০১২ সালে করণ জোহরের ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় আলিয়ার। এরপর ‘হাইওয়ে’, ‘রাজি’, ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’ এবং ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’র মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের জন্য প্রশংসা ও পুরস্কারও পেয়েছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর শক্ত অবস্থান থাকলেও নাগরিকত্বের কারণে তিনি প্রায়ই আলোচনায় আসেন।
ক্যাটরিনা কাইফ: বলিউডের জনপ্রিয় মুখ, ব্রিটিশ নাগরিক
বলিউডের বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম সফল অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফ। হংকংয়ে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রী ব্রিটিশ নাগরিক। ২০০৩ সালে ‘বুম’ সিনেমার মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তাঁর।
এরপর ‘নমস্তে লন্ডন’, ‘এক থা টাইগার’, ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ এবং ‘ধুম থ্রি’র মতো সিনেমায় অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ক্যাটরিনা। নাচ, পর্দায় উপস্থিতি ও অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে অভিনয়ের কারণে তাঁর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও তাঁর নাগরিকত্ব যুক্তরাজ্যের।
জ্যাকলিন ফার্নান্দেজ: জন্ম বাহরাইনে, নাগরিকত্ব শ্রীলঙ্কার
জ্যাকলিন ফার্নান্দেজের জন্ম বাহরাইনে। তিনি শ্রীলঙ্কার নাগরিক এবং মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিনোদনজগতে পরিচিতি পান। পরে বলিউডে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
‘মার্ডার টু’, ‘কিক’, ‘হাউসফুল টু’ এবং ‘রেস থ্রি’র মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের দৃশ্যে নাচ ও পারফরম্যান্সের মাধ্যমেও দর্শকদের নজর কেড়েছেন জ্যাকলিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে পরিচিত মুখ হলেও তাঁর নাগরিকত্ব শ্রীলঙ্কার।
নোরা ফাতেহি: কানাডা থেকে বলিউডে জনপ্রিয়তা
নাচের দক্ষতা ও পর্দায় আকর্ষণীয় উপস্থিতির কারণে বলিউডে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন নোরা ফাতেহি। কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী কানাডীয় নাগরিক। মরক্কীয় বংশোদ্ভূত নোরা নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে ভারতীয় বিনোদনজগতে নিজের জায়গা করে নেন।
‘দিলবার’ ও ‘ও সাকি সাকি’র মতো গানে তাঁর পারফরম্যান্স ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও কাজ করেছেন তিনি। ভারতীয় সিনেমার গানে নাচের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিতি পেয়েছেন নোরা। তবে তাঁর নাগরিকত্ব কানাডার।
ইমরান খান: ভারতীয় বংশোদ্ভূত, মার্কিন নাগরিক
‘জানে তু ইয়া জানে না’ সিনেমার মাধ্যমে তরুণ দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাওয়া অভিনেতা ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের ম্যাডিসনে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই অভিনেতা ২০০৮ সালে বলিউডে অভিষেকের পর দ্রুত পরিচিতি পান।
‘আই হেট লাভ স্টোরিজ’, ‘দিল্লি বেলি’ ও ‘মেরে ব্রাদার কি দুলহান’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন ইমরান। বিশেষ করে রোমান্টিক ও কমেডি চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করে জনপ্রিয়তা পেলেও তাঁর নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
নার্গিস ফাখরি: নিউইয়র্কে জন্ম, নাগরিকত্ব মার্কিন
মার্কিন নাগরিক নার্গিস ফাখরির জন্ম নিউইয়র্কের কুইন্সে। মডেলিংয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পর ২০১১ সালে ইমতিয়াজ আলীর ‘রকস্টার’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। সিনেমাটিতে রণবীর কাপুরের বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকের নজরে আসেন তিনি।
পরে ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’, ‘ম্যায় তেরা হিরো’ ও ‘হাউসফুল থ্রি’র মতো সিনেমায় কাজ করেন নার্গিস। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশন নিয়েও ভক্তদের আগ্রহ রয়েছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করলেও তাঁর নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
অ্যামি জ্যাকসন: ব্রিটিশ অভিনেত্রীর ভারতীয় সিনেমায় যাত্রা
ব্রিটিশ অভিনেত্রী অ্যামি জ্যাকসন ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন। তামিল, তেলুগু ও হিন্দি ভাষার সিনেমায় কাজ করে নিজের অভিনয়জীবন বিস্তৃত করেছেন তিনি।
‘এক দিওয়ানা থা’ ও ‘সিং ইজ ব্লিং’-এর মতো হিন্দি সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন অ্যামি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি তাঁকে একাধিক অঞ্চলের দর্শকের কাছে পরিচিত করেছে। তবে তাঁর নাগরিকত্ব ব্রিটিশ।
কল্কি কোয়েচলিন: ভারতে জন্ম, ফরাসি নাগরিকত্ব
ভারতে জন্ম নেওয়া অভিনেত্রী কল্কি কোয়েচলিন ফরাসি নাগরিক। ২০০৯ সালে ‘দেব ডি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউডে পরিচিতি পান তিনি। প্রচলিত ধারার বাইরের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত কল্কি।
‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’, ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’ এবং ‘গলি বয়’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। মূলধারার সিনেমার পাশাপাশি স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজেও কাজ করেছেন কল্কি। ভারতীয় চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন কাজ করলেও তাঁর নাগরিকত্ব ফরাসি।
অক্ষয় কুমার: কানাডার নাগরিকত্ব ছেড়ে ভারতীয় নাগরিক
একসময় কানাডার নাগরিকত্বের কারণে আলোচনায় ছিলেন বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমার। তবে অন্যদের থেকে তাঁর ঘটনা আলাদা। ২০২৩ সালে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব ফিরে পান। এর আগে তাঁর কানাডীয় নাগরিকত্ব ছিল।
‘খিলাড়ি’, ‘হেরা ফেরি’, ‘ভুলভুলাইয়া’, ‘টয়লেট: এক প্রেম কথা’সহ নানা ঘরানার সিনেমায় অভিনয় করে বলিউডের অন্যতম সফল অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন অক্ষয়। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি। তাঁর নাগরিকত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
বলিউডে তারকাখ্যাতি, নাগরিকত্বে বৈচিত্র্য
বলিউডের জনপ্রিয়তা শুধু ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশ ও সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে আসা শিল্পীরা হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ করে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁদের কারও জন্ম ভারতে, কারও জন্ম অন্য দেশে; আবার নাগরিকত্বও একেকজনের একেক রকম।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকা আর সেই দেশের চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ করা এক বিষয় নয়। বলিউডে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেই কেউ ভারতীয় নাগরিক হয়ে যান না। একইভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলেও ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করতে বাধা নেই। অভিনয়, নাচ ও পর্দায় উপস্থিতির মাধ্যমে এসব শিল্পী প্রমাণ করেছেন, চলচ্চিত্রের জগতে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কালের আলো/জেএন/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array