খুঁজুন
                               
, ,
           

অর্থনীতি সামলাতে তিন খাতে সংস্কার চায় আইএমএফ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ণ
অর্থনীতি সামলাতে তিন খাতে সংস্কার চায় আইএমএফ

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বাংলাদেশকে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে শুধু কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ জন্য আর্থিক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোকে বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির পরামর্শ

বাংলাদেশে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কারও জরুরি।

আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতি—এই তিন ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু মুদ্রানীতি কঠোর রাখার পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যান্য দুর্বলতা দূর করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হতে পারে।

মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তেও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।

আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করার তাগিদ

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে খাতটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমএফ।

আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন এবং বিনিয়োগের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই আর্থিক খাতের সংস্কারকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ

বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি আইএমএফের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বর্তমানে এ অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর মধ্যে অন্যতম।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দিয়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বোঝানো হয়। এই অনুপাত কম থাকলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, জনসেবা সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের নিজস্ব অর্থের জোগান সীমিত হতে পারে।

আইএমএফের মতে, উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে

বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আইএমএফের সহায়তায় নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

আইএমএফ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় উঠে আসা সংস্কারের বিষয়গুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর্টিকেল ফোর পর্যালোচনার মাধ্যমে আইএমএফ সদস্যদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিমালা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন সুপারিশ দিয়ে থাকে।

সংস্কারে সহায়তা দিতে আগ্রহী আইএমএফ

জুলাইয়ের প্রতিনিধিদল সফরের পর থেকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আইএমএফ আগ্রহী।

তবে নতুন ঋণ কর্মসূচির চূড়ান্ত শর্ত, ঋণের পরিমাণ কিংবা অনুমোদনের সময়সীমা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে সৌরশক্তি

রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩১ অপরাহ্ণ
পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে সৌরশক্তি

পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে জলবিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরশক্তি থেকেও উৎপাদিত হচ্ছে বিদ্যুৎ। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা পাহাড়ি জমিতে স্থাপিত কর্ণফুলী সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। গত প্রায় সাত বছরে কেন্দ্রটি থেকে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, যার বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের এ উদ্যোগ দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

পরিত্যক্ত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

কাপ্তাই বাঁধের পাশে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রায় ২২ একর পরিত্যক্ত জমি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল। সেই জমির মধ্যে ১৯ একর জায়গায় ২০১৯ সালে স্থাপন করা হয় কর্ণফুলী সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা ৭ মেগাওয়াট। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১১১ কোটি টাকা।

কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে আগে অব্যবহৃত থাকা জমি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

সাত বছরে উৎপাদন ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট

কেন্দ্রটি থেকে গত প্রায় সাত বছরে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। এর বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি অব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্যতম সুবিধা হলো পরিচালনায় তুলনামূলক কম জনবল প্রয়োজন হয়। সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণই এর প্রধান কাজ। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমে যেতে পারে। তা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।

কম পরিচালন ব্যয়ে উৎপাদনের সম্ভাবনা

কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বেশ লাভজনক। এটি পরিচালনায় জনবল ও ব্যয় তুলনামূলক কম। নিয়মিত সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখাই মূল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ।

তিনি জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পর সৌরশক্তিতে নতুন সংযোজন

কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ৫৭ বছর পর ৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরিত্যক্ত জমির ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ প্রকল্প সৌরশক্তির মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের নতুন উৎস তৈরি করেছে।

তিনি আরও বলেন, সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। এতে অব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগও বাড়ছে।

উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে দুটি উদ্যোগ

কাপ্তাইয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দুটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা আরও ১ মেগাওয়াট বাড়ানোর কাজ চলছে। এতে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।

পাশাপাশি কাপ্তাই উপজেলার ইটভাটা এলাকায় ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলে সৌরশক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসর আরও বাড়বে।

পাহাড়ি অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা

সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে উপযোগী ও অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে যে জমি দীর্ঘদিন কোনো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না, সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে জমির উপযোগিতা, আবহাওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

সুন্দরবনের পানির নিচে অজানা ভান্ডার, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল ৭ নতুন প্রজাতি

খুলনা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের পানির নিচে অজানা ভান্ডার, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল ৭ নতুন প্রজাতি

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পানির নিচে লুকিয়ে রয়েছে জলজ প্রাণীর সমৃদ্ধ এক ভান্ডার। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ডিএনএ বারকোড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বনের জলসীমায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য নতুন পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। আগের গবেষণার তথ্যসহ সুন্দরবনে শনাক্ত মাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮২ প্রজাতিতে। পাশাপাশি চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ খোলসযুক্ত প্রাণী পাওয়া গেছে ৮৮ প্রজাতির।

তবে জীববৈচিত্র্যের এই সমৃদ্ধির বিপরীতে উদ্বেগজনক চিত্রও উঠে এসেছে গবেষণায়। গত দেড় দশকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় সাদা মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, ছোট মাছ ও পোনা আহরণ এবং বিষ প্রয়োগের মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড জলজ সম্পদের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণাটি সরকারের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হয়েছে। সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন ১৬ মাস ধরে গবেষণাটি করে। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণার খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

ডিএনএ পরীক্ষায় নতুন পাঁচ মাছ ও দুই চিংড়ি

গবেষকেরা ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য নতুন পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি শনাক্ত করেছেন। ডিএনএ বারকোডের মাধ্যমে প্রজাতির পরিচয় নির্ধারণ করায় আগে স্থানীয়ভাবে অন্য মাছের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা প্রাণীগুলোকেও আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

নতুন শনাক্ত পাঁচ প্রজাতির মাছ হলো বড় আইশ পারশে (Planiliza macrolepis), ফোটা বাটা (Crenimugil seheli), বার্মিজ এক ঠুইটা (Dermogenys burmanica), কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে (Butis humeralis) এবং ফোটা বেলে (Acentrogobius viridipunctatus)।

এ ছাড়া সুন্দরবনের পানিতে নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান মিলেছে। এগুলো হলো Cloridos scorpio ও Nematopalaemon tenuipes। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জেলেরা এসব চিংড়িকে সাধারণ ছোট নদীর চর চিংড়ির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতেন। ফলে এত দিন এগুলোর আলাদা আঞ্চলিক নাম গড়ে ওঠেনি।

গবেষণায় সুন্দরবনের ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর ডিএনএ বারকোড তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মাছ ও একটি কাঁকড়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিনব্যাংকের ডেটাবেজে আগে ছিল না। সেগুলো প্রথমবারের মতো জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সুন্দরবনে ৩৮২ প্রজাতির মাছ, খোলসযুক্ত প্রাণী ৮৮

সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে গবেষণা শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) পরিচালিত জরিপে প্রথমবারের মতো সুন্দরবনে ১৭৫ প্রজাতির মাছ শনাক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষণায় আরও প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় সুন্দরবনের জলসীমায় ২৫১ প্রজাতির মাছ এবং ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে বনে মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ ও ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

খোলসযুক্ত প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ২৭ প্রজাতির চিংড়ি, ২৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ১৬ প্রজাতির শামুক, ১৫ প্রজাতির ঝিনুক এবং অক্টোপাস ও স্কুইড মিলিয়ে পাঁচ প্রজাতি। এ ছাড়া এক প্রজাতির বার্নাকল ও এক প্রজাতির কাইটনের সন্ধান মিলেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ প্রজাতির মাছ জেলেদের জালে নিয়মিত ধরা পড়ে। তবে মৌসুমভেদে মাছের প্রাপ্যতায় পার্থক্য রয়েছে। শীতকালে পাঙাশ, কাইন মাগুর, চাকা চিংড়ি ও হরিণা চিংড়ি বেশি পাওয়া যায়। বর্ষাকালে ভাঙন, ভোল, দাঁতিনা, জাওয়া, পারশে, পায়রা, নোনা ট্যাংরা ও ভেটকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বেশি ধরা পড়ে।

রেঞ্জভিত্তিক জরিপে শরণখোলায় ১৬৪ প্রজাতির মাছ শনাক্ত হয়েছে। সাতক্ষীরা রেঞ্জে পাওয়া গেছে ১৫২ প্রজাতি, খুলনা রেঞ্জে ১৪২ এবং চাঁদপাই রেঞ্জে ১২৩ প্রজাতির মাছ।

১৫ বছরে কমেছে বড় মাছের আহরণ

গবেষণার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো, সুন্দরবনে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় মাছের আহরণ কমে যাওয়া। আইড়, ভেটকি, ভোল ও পাঙাশের মতো মাছের উৎপাদন কমছে। বিপরীতে জেলেদের জালে তুলনামূলক কম মূল্যের ছোট আকৃতির মাছ বেশি ধরা পড়ছে।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মাছ আহরণের এই নিম্নমুখী প্রবণতা তুলে ধরেছেন। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৩৬০ টন মাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৭০ টনে।

একইভাবে সাতক্ষীরা রেঞ্জে ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৭৯৭ টন মাছ সংগ্রহ করা হলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০ টনে। অর্থাৎ বিভিন্ন রেঞ্জের তথ্যেই মাছ আহরণের পরিমাণে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে।

গবেষকেরা বলছেন, ভেটকি, পোয়া, পাঙাশ ও বাগদা চিংড়ির মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি অতিরিক্ত আহরণের চাপে রয়েছে। মাছ ছোট থাকা অবস্থায় কিংবা পোনা হিসেবে জালে আটকা পড়ায় প্রজননের আগেই অনেক মাছ জলজ পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে প্রজাতির বংশবিস্তার ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনে।

বিষ প্রয়োগ ও ক্ষতিকর জালে বাড়ছে ঝুঁকি

গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় জলভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নার্সারি। উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এখানকার জলজ সম্পদ আরও বাড়ানো সম্ভব।

তিনি জানান, ছোট মাছ ও পোনা অবস্থায় অনেক প্রজাতি জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। বিষ প্রয়োগের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতি। জলজ সম্পদের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ভেটকি, পোয়া, কাইন মাগুর ও শিলা কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির আহরণের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় ক্ষতিকর জাল ও বিষ প্রয়োগ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা, মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞার সীমা পুনর্বিবেচনা এবং পারশে, নোনা ট্যাংরা ও দাঁতিনার পোনা হ্যাচারিতে উৎপাদনের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে জীবিকার প্রয়োজনে সুন্দরবনের জলজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

কুমির, ভোঁদড় ও প্লাঙ্কটনেরও সমৃদ্ধ উপস্থিতি

সুন্দরবনের জলজ পরিবেশে শুধু মাছ ও চিংড়িই নয়, রয়েছে নানা ধরনের মেরুদণ্ডী প্রাণী ও অণুজীব। গবেষণাটিতে প্রথমবারের মতো মাছ নয়—এমন জলজ মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ওপরও নিবিড় জরিপ চালানো হয়েছে।

৪২৪ কিলোমিটার নদী ও খাল জরিপ করে গবেষকেরা ৭৬টি লবণপানির কুমিরের দেখা পেয়েছেন। বিশ্বব্যাপী বিপন্ন এই প্রাণী সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে, ৪৮৭ কিলোমিটার খাল জরিপে ৫১টি দলে মোট ১৭২টি ভোঁদড় দেখা গেছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রে চার প্রজাতির পানিনির্ভর সাপ—রাজগোখরা, গোখরা, মেটে সাপ ও কুকুরমুখী জলসাপের উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। পাওয়া গেছে রামসংকে বা মেছো তক্ষক এবং স্বাদুপানির পুকুরে ১৫ প্রজাতির উভচর ব্যাঙের প্রজনন ও উপস্থিতির তথ্য।

জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্লাঙ্কটনেরও বৈচিত্র্য রয়েছে বনে। গবেষণায় সুন্দরবনের খালে ১৫১ প্রজাতির ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও ১১০ প্রজাতির জুপ্লাঙ্কটন পাওয়া গেছে। এসব ক্ষুদ্র জীব জলজ প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংরক্ষিত খালে মাছের প্রজননের সম্ভাবনা

সুন্দরবনে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার বাড়াতে ১৯৮৯ সালে ১৮টি খালকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। এসব খালে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ খালের তুলনায় সংরক্ষিত খালগুলোর পরিবেশগত অবস্থা ও পানির মান ভালো।

এসব খাল পাঙাশ, বোয়াল, কই, টাকি, ট্যাংরা, পুঁটি, বাইম ও চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। ফলে জলজ সম্পদ সংরক্ষণে এ ধরনের খালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দীর্ঘদিন পলি জমে শরণখোলা রেঞ্জের দাশেরভারণী খাল এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জের ছোট কেয়াখালী খালের মতো কয়েকটি সংরক্ষিত খাল ভরাট হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় পুরোনো ও নাব্য হারানো খালের পরিবর্তে নতুন সংরক্ষিত খাল অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন গবেষকেরা।

প্রস্তাবিত নতুন খালগুলোর মধ্যে রয়েছে খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খাল। সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ থেকে বাস্তুসংস্থানগতভাবে উপযুক্ত এসব খালকে সংরক্ষিত তালিকায় যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বন বিভাগের ক্যাম্প বা স্টেশনের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ৩০ মিটারের কম চওড়া ছোট খালগুলো এক বছর পরপর পর্যায়ক্রমে বন্ধ রাখার জন্য নতুন নীতি প্রণয়নের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

মাছের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ

সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ বিভিন্ন গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের মৎস্য বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় সুন্দরবনের ২৩ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য ছিল। জলজ সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে বনের ৫৩ দশমিক ৫২ শতাংশ এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ বাড়ার কারণেও মোট মাছ আহরণের পরিমাণ কমে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, গবেষকেরা মনে করছেন, মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে শুধু অভয়ারণ্য ঘোষণা যথেষ্ট নয়। ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি বন্ধ করা, পোনা আহরণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পের প্রস্তাবনায় গবেষণার সুপারিশগুলো যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি সুপারিশ বাস্তবায়নে তাৎক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

সুন্দরবনের জলসীমায় নতুন প্রজাতি শনাক্ত হওয়া একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়েছে, অন্যদিকে বড় মাছের আহরণ কমে যাওয়ার তথ্য জলজ সম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। গবেষকদের সুপারিশ বাস্তবায়ন, প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং ক্ষতিকর আহরণ বন্ধ করা গেলে সুন্দরবনের এই প্রাকৃতিক ভান্ডার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

দুর্গাপূজার আগে কটিয়াদীতে বসে ৫০০ বছরের ঢাকের হাট

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০১ অপরাহ্ণ
দুর্গাপূজার আগে কটিয়াদীতে বসে ৫০০ বছরের ঢাকের হাট

ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, ঢোলের তাল, সানাইয়ের সুর আর বাঁশির মূর্ছনায় মুখর চারপাশ। কোথাও ঢাক বাজিয়ে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা, কোথাও আবার চলছে পূজা আয়োজকদের সঙ্গে দরদাম। বাদ্যের তালে তালে জমে উঠেছে সুরের প্রতিযোগিতা। দুর্গাপূজার আগমনী আবহে এমনই এক ব্যতিক্রমী উৎসবের চেহারা নিয়েছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট।

কথিত আছে, প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছে এই হাট। দুর্গাপূজায় ঢাকঢোল বাজানোর জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকি ও বাদ্যবাদকেরা এখানে জড়ো হন। তাঁদের বাজনা শুনে পছন্দের দল বেছে নেন পূজার আয়োজকেরা। এরপর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দরদামের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় চুক্তিমূল্য। স্থানীয়দের দাবি, এটিই দেশের একমাত্র ঢাকের হাট।

গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া এ বছরের হাটের পর্দা নামবে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। কয়েক দিনের এই আয়োজন ঘিরে কটিয়াদী পুরোনো বাজারে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমল থেকে ঐতিহ্যের শুরু

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার চারিপাড়া গ্রামে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পূজার বাদ্যযন্ত্র বাজানোর জন্য তিনি বিক্রমপুর, বর্তমান মুন্সীগঞ্জ অঞ্চল থেকে ঢাকি ও বাদ্যকরদের আমন্ত্রণ জানান।

আমন্ত্রণ পেয়ে নৌপথে অসংখ্য ঢাকি ও বাদক দল এসে পৌঁছান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামের স্থানে। সেখানে রাজা নিজে তাঁদের বাজনা শোনেন এবং সেরা দলটি বেছে নেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই কাহিনিকেই ঢাকের হাটের সূচনাপর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় দুর্গাপূজার আয়োজন বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জমিদারের মধ্যে ঢাকের হাট কোথায় বসবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। একপর্যায়ে যাত্রাঘাট থেকে হাটের স্থান পরিবর্তন করে কটিয়াদী পুরোনো বাজারে নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এই বাজারই হয়ে ওঠে ঢাকি ও বাদ্যবাদকদের মিলনস্থল।

প্রায় পাঁচ শতাব্দীর এই ঐতিহ্য এখন কেবল বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের হাট নয়; স্থানীয় সংস্কৃতি ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এক হাটে ঢাক, ঢোল, সানাই থেকে নানা বাদ্যযন্ত্র

সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন স্থানে দল বেঁধে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন শিল্পীরা। ঢাকের সঙ্গে ঢোল, ড্রাম, সানাই, কাঁসি, মন্দিরা, ঝনঝনি ও বাঁশির সুর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বৈচিত্র্যময় আবহ। এক দল বাজনা শুরু করলে অন্য দলও নিজেদের দক্ষতা দেখাতে তালে তালে বাজিয়ে ওঠে।

পূজা আয়োজকেরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে দলগুলোর পরিবেশনা শুনছেন। কোন দলের বাজনা ভালো, কারা পূজার পুরো সময়জুড়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, কতজন সদস্য নিয়ে দলটি কাজ করবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চলছে পছন্দ ও দরদাম।

এই হাটের বড় সুবিধা হলো, পূজা আয়োজকদের একসঙ্গে অনেক দলকে দেখার ও বাজনা যাচাই করার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে বাদ্যবাদকেরাও বিভিন্ন এলাকার আয়োজকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। ফলে দুর্গাপূজার মৌসুমে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের জন্য হাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১২ হাজার থেকে লাখ টাকা ছাড়ায় চুক্তিমূল্য

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকি ও বাদ্যবাদকদের পারিশ্রমিক নির্ভর করে তাঁদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দলের সদস্যসংখ্যা এবং পরিবেশনার মানের ওপর। সাধারণত একটি দলের চুক্তিমূল্য ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। চাহিদা ও দরদাম অনুযায়ী তা এক লাখ টাকা ছাড়িয়েও যেতে পারে।

দোহারের নবাবগঞ্জ থেকে তিন সদস্যের একটি বাদক দলের নেতা হিসেবে হাটে এসেছেন সুজন মালাকার। তিনি জানান, এবার পূজার আয়োজন বেশি হওয়ায় বাদক দলের চাহিদাও বেড়েছে। তাঁর দলের জন্য কেউ কেউ ৪০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দিতে চাইলেও তাঁরা ৬০ হাজার টাকার কমে চুক্তি করতে রাজি নন।

কিশোরগঞ্জ সদর থেকে সাত সদস্যের ঢাকঢোলের দল নিয়ে এসেছেন মো. রোকন। তিনি জানান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো তাঁর মূল পেশা নয়। শখের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য তিনি এ কাজ করেন। দুর্গাপূজার মৌসুমে হাটে এসে বিভিন্ন আয়োজকের সঙ্গে চুক্তির সুযোগ পান তাঁরা।

নরসিংদীর মনোহরদী থেকে আসা বাদক দলের নেতা ফারুক মিয়া জানান, তাঁরা এক যুগ ধরে এই হাটে আসছেন। এবার তাঁর দলের জন্য কেউ কেউ ৮০ হাজার টাকা পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, এক লাখ টাকার কমে চুক্তি করবেন না।

এই দরদাম থেকেই বোঝা যায়, পূজার মৌসুমে দক্ষ বাদ্যবাদকদের চাহিদা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভালো বাজনা ও অভিজ্ঞ দলের জন্য আয়োজকেরা তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক দিতেও প্রস্তুত থাকেন।

দূরদূরান্ত থেকে আসেন পূজা আয়োজকেরা

নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে বাদক দলের সঙ্গে চুক্তি করতে হাটে এসেছেন উৎপল কুমার। তিনি বলেন, এখানে একসঙ্গে শত শত ঢাকি ও বাদ্যবাদককে পাওয়া যায়। ফলে পছন্দের দল বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি বাজনা শুনে যাচাই করার সুযোগও থাকে।

উৎপল কুমারের ভাষ্য, এই সুবিধার কারণেই তাঁরা প্রতিবছর দুর্গাপূজার জন্য ঢাকঢোলের দল ঠিক করতে ঢাকের হাটে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকি ও বাদ্যবাদকেরা জীবিকার টানে এখানে আসেন। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলার পূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরাও পছন্দের দল খুঁজতে ভিড় করেন। এভাবে হাটটি একদিকে শিল্পীদের মৌসুমি আয়ের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে পূজার আয়োজকদের জন্য সহজে দল বাছাইয়ের ব্যবস্থা করে।

দুর্গাপূজায় ঢাকের অপরিহার্যতা

দুর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক বহু পুরোনো। মহাষষ্ঠীর সূচনা থেকে পূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান এবং বিসর্জন পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ উৎসবের আবহ তৈরি করে। ঢাকের তালে পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি ও উৎসবের আমেজ যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

তাই পূজার আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রতিমা, মণ্ডপ ও অন্যান্য প্রস্তুতির পাশাপাশি ঢাকি ও বাদ্যবাদকদের দল ঠিক করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কটিয়াদীর ঢাকের হাট সেই প্রয়োজন পূরণে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে চলেছে।

শুধু অর্থ উপার্জন নয়, অনেক বাদ্যবাদকের কাছে এই আয়োজন পেশাগত দক্ষতা তুলে ধরা এবং ঐতিহ্য ধরে রাখারও একটি সুযোগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা হাটে আসেন। নিজেদের পরিবেশনার মাধ্যমে অন্য দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন এবং পূজার আয়োজকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন।

ঐতিহ্য রক্ষায় নিরাপত্তার প্রস্তুতি

কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা জানিয়েছেন, দুর্গাপূজা উদযাপনকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে এই হাট বসে। ঢাকের আওয়াজ, দরদাম আর শিল্পীদের মিলনমেলায় কটিয়াদী পুরোনো বাজার কয়েক দিনের জন্য পরিণত হয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবস্থলে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি