খুঁজুন
                               
, ,
           

ইউক্রেনের অস্ত্রে স্টারলিংকের গতিসীমা, পেছনে কি ওয়াশিংটনের চাপ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৫ অপরাহ্ণ
ইউক্রেনের অস্ত্রে স্টারলিংকের গতিসীমা, পেছনে কি ওয়াশিংটনের চাপ?
ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত কিছু দ্রুতগতির ড্রোন ও অস্ত্রের জন্য স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইলন মাস্কের মহাকাশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা ডিভাইসগুলো সংযোগ হারাচ্ছে। এতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই বিধিনিষেধের পেছনে মার্কিন সরকারের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক। একই সঙ্গে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে স্টারলিংকের সংযোগে আকস্মিকভাবে নতুন গতিসীমা কার্যকর হওয়ার পর ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, উচ্চগতিতে চলা ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্ল্যাটফর্মে স্টারলিংকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও অভিযান পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরদিন বুধবার (১৪ অক্টোবর) সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক করা হলেও ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গেলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন

স্টারলিংকের নতুন নিয়মের মূল বিষয় হলো, নির্ধারিত সীমার বেশি গতিতে চলা কোনো ডিভাইসের ইন্টারনেট সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন পরিচালনা, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এবং বিভিন্ন অভিযানে যোগাযোগ বজায় রাখতে স্টারলিংকের ওপর নির্ভর করে। ফলে দ্রুতগতির সামরিক ড্রোন ও অস্ত্রের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত কিছু ড্রোন ও অস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার সময় ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতি অর্জন করতে পারে। এমন অবস্থায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে দূর থেকে ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান কিংবা অভিযানের মাঝপথে নির্দেশনা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সব অস্ত্র সংযোগ হারিয়েছে বা প্রতিটি অভিযান সরাসরি ব্যর্থ হয়েছে—এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ইউক্রেনের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্টারলিংকের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক দেশটির এমন অনেক এলাকায় যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে প্রচলিত টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামরিক ইউনিটগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন জরুরি যোগাযোগব্যবস্থাতেও এই নেটওয়ার্কের ব্যবহার রয়েছে। ফলে সংযোগের নিয়মে আকস্মিক পরিবর্তন হলে তার প্রভাব কেবল একটি প্রযুক্তিগত সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সামরিক পরিকল্পনা ও যোগাযোগের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

বিধিনিষেধের পেছনে মার্কিন সরকারের ভূমিকা?

স্টারলিংকের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে এর নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্বকে ঘিরে। ইলন মাস্কের বক্তব্য অনুযায়ী, স্টারশিল্ডের মতো সামরিক ও সরকারি ব্যবহারের ব্যবস্থাগুলোর ওপর মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব ব্যবস্থার ব্যবহার ও বিধিনিষেধের বিষয়ে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (১৪ অক্টোবর) দেওয়া বক্তব্যে মাস্ক বলেন, স্টারশিল্ড ব্যবস্থার ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগের ওপর আরোপিত সব সীমাবদ্ধতার সিদ্ধান্ত স্পেসএক্স এককভাবে নেয় না।

তবে স্টারলিংকের নির্দিষ্ট গতিসীমা আরোপের সিদ্ধান্তে মার্কিন সরকার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ইউক্রেনের অস্ত্রে নতুন এই বিধিনিষেধের পেছনে প্রযুক্তিগত, নিরাপত্তাসংক্রান্ত নাকি রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের কাজ আলাদা

ইলন মাস্কের মহাকাশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের অধীনে পরিচালিত স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড একই ধরনের সেবা নয়। স্টারলিংক মূলত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহ করে। দুর্গম অঞ্চল, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা কিংবা প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল এমন স্থানে এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, স্টারশিল্ড বিশেষভাবে সরকারি ও সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে নিরাপদ যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এই দুই ব্যবস্থার ব্যবহার, গ্রাহক এবং নিয়ন্ত্রণের কাঠামো আলাদা হওয়ায় স্টারলিংকের সাধারণ সেবা এবং সামরিক ব্যবহারের বিধিনিষেধকে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

মাস্কের বক্তব্যে স্টারশিল্ডের ওপর মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে এলেও ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে স্টারলিংকের ব্যবহার এবং নতুন গতিসীমার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন। বিশেষ করে কোন ধরনের ডিভাইসে এই নিয়ম কার্যকর হয়েছে, কতগুলো ডিভাইস সংযোগ হারিয়েছে এবং বিধিনিষেধের আওতা কতটা বিস্তৃত—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

সংযোগ স্বাভাবিক করার অনুরোধ ইউক্রেনের

নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পর ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা স্টারলিংকের সংযোগ স্বাভাবিক করার জন্য ইলন মাস্কের কাছে একের পর এক অনুরোধ জানান। এক্সে প্রকাশিত এসব বার্তায় যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সমস্যাটি ভুলবশত ঘটতে পারে অথবা এর পেছনে বড় কোনো কারিগরি জটিলতা থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। একই সঙ্গে তিনি স্টারলিংকের সংযোগ আবার চালু করার অনুরোধ জানান।

জেলেনস্কির বক্তব্যে শুরুতে বিষয়টিকে প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সম্ভাবনা তুলে ধরা হলেও ইউক্রেনের অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক সংশয়ের বিষয়টি সামনে আসে। তাঁদের মতে, যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় এমন বিধিনিষেধ আরোপের প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার দাবি ফেদোরোভের

ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরোভ জানান, বুধবার সন্ধ্যার দিকে (১৪ অক্টোবর) স্টারলিংকের ইন্টারনেট সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এরপর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে স্টারশিল্ডের ওপর গতিসীমাসংক্রান্ত কড়াকড়ি পুরোপুরি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ফেদোরোভ ইলন মাস্ককে ধন্যবাদও জানান। একই সঙ্গে তিনি এই সমর্থন অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় স্টারলিংকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং বিধিনিষেধের কারণে দেশটি কতটা উদ্বিগ্ন।

ফেদোরোভের পোস্টের প্রায় এক ঘণ্টা পর মাস্ক সেখানে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি ইউক্রেন যুদ্ধে তাঁর প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ও সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে সামরিক ও সরকারি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার বিষয়টি আবারও সামনে আসে।

তবে বুধবার সংযোগ আংশিকভাবে স্বাভাবিক হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। কোন কোন ডিভাইসে সংযোগ ফিরেছে এবং উচ্চগতির সামরিক প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে আগের সীমাবদ্ধতা বহাল রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।

একই সময়ে রাশিয়ার বড় হামলা, বাড়ে সন্দেহ

স্টারলিংকের নতুন গতিসীমা কার্যকর হওয়ার সময়েই ইউক্রেনের ওপর বড় ধরনের হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। রুশ বাহিনীর হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও।

জেলেনস্কি রাশিয়ার এই হামলাকে বড় আকারের আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পাঠানো ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোনের একটি বড় অংশ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাবাহিনী আকাশেই ধ্বংস করে দেয়। তবে কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

হামলার ফলে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। দেশটির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ড্রোন আঘাত হানার আগে তাঁদের এলাকায় সতর্কসংকেত বা সাইরেন শোনা যায়নি।

যুদ্ধের এমন পরিস্থিতিতে সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ড্রোন শনাক্ত করা, প্রতিরক্ষা ইউনিটের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর থাকা প্রয়োজন। এ কারণে স্টারলিংকের সংযোগে সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনের সামরিক পরিকল্পনার ওপর কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কাকতালীয় নয়, রাজনৈতিক যোগসূত্র দেখছে কিয়েভ

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্টনভ বুধবার সকালে (১৪ অক্টোবর) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় স্টারলিংকের গতিসীমা এবং রাশিয়ার বড় হামলার সময়গত মিল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ এবং একই সময়ে রাশিয়ার বড় ধরনের হামলা—এই দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ সীমিত।

বেসক্রেস্টনভের বক্তব্যে কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টিও উঠে আসে। তবে তাঁর সন্দেহের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। একই সময়ে দুটি ঘটনা ঘটেছে বলেই তাদের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।

ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাইরের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যুদ্ধের সময় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের নীতিমালা বা প্রবেশাধিকার পরিবর্তিত হলে তা দ্রুত সামরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির টানাপোড়েন

স্টারলিংকের বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের রাজনৈতিক সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তুষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলেনস্কির অভিযোগ, ট্রাম্পের দেওয়া জ্বালানিসংক্রান্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মত না হলে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এই দাবি নাকচ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

যুদ্ধের ময়দানে গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং সামরিক সহায়তা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সহায়তার ধরন বা পরিমাণে পরিবর্তন এলে দেশটির সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে স্টারলিংকের নতুন বিধিনিষেধকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক শুধু প্রযুক্তিগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান এবং ইউক্রেনকে সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

যুক্তরাজ্য সফরে জেলেনস্কি, সামনে জ্বালানি ইস্যু

এদিকে বুধবার (১৪ অক্টোবর) এক সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাজ্যে যান জেলেনস্কি। সেখানে রাশিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তিন লাখ টন ডিজেল আমদানি চুক্তির বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তিনি। যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ, নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে রয়েছে।

জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের অবস্থানের পার্থক্য দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্টারলিংকের নতুন বিধিনিষেধ নিয়ে কিয়েভের উদ্বেগ আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি বৃহত্তর কৌশলের অংশ?

ইউক্রেনের অস্ত্রে স্টারলিংকের গতিসীমা আরোপের ঘটনা যুদ্ধের সময় বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একটি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ, ড্রোন পরিচালনা ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে, তা এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে।

ইলন মাস্কের বক্তব্যে সামরিক ব্যবস্থার ওপর মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে এলেও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপের পেছনে কী সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া কাজ করেছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। একইভাবে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা রাজনৈতিক যোগসূত্রের সন্দেহ প্রকাশ করলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, স্টারলিংকের সংযোগসংক্রান্ত বিধিনিষেধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে কি না, ইউক্রেনের দ্রুতগতির ড্রোনগুলো আগের মতো সংযোগ পাবে কি না এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য নতুন কোনো শর্ত আরোপ করা হবে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে স্পেসএক্স, মার্কিন প্রশাসন এবং ইউক্রেনের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তথ্য ও সিদ্ধান্তের ওপর।

কালের আলো/জেএন/এসএ

বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়

খুলনা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ
বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়

বাবা মারা যান যখন তাঁর বয়স মাত্র আড়াই বছর। তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েন মা আমেনা বেগম। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো বিলে মাছ ধরেছেন। সংসারের অভাব মেটাতে ছুটেছেন বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরেও। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যায় ঘরবাড়ি। তবু সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। মায়ের সেই সংগ্রাম আর নিজের অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে একসময় গ্রামের কলেজ থেকে সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। পড়াশোনা শেষে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। চাকরির পাশাপাশি চালিয়ে যান বিসিএসের প্রস্তুতি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন খুলনার কয়রা উপজেলার বামিয়া গ্রামের মো. শরিফুল ইসলাম। শরিফুলের এই অর্জন কেবল একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই এবং সন্তানের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকার কাহিনি।

আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানো

শরিফুল ইসলামের বাবা তফেজ উদ্দীন পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। তখন শরিফুলের বয়স মাত্র আড়াই বছর। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন আমেনা বেগম। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৪-২৫ বছর। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নতুন করে সংসার গড়ার সুযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানদের বড় করে তোলা এবং তাদের শিক্ষিত করাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেন। শুরুর দিকে শরিফুলদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর নানা। নাতিদের খাবারের ব্যবস্থা করতে সপ্তাহে একবার বাজার করে দিতেন। মেয়ের নামে এক বিঘা জমিও লিখে দিয়েছিলেন। সেই সহযোগিতা পরিবারটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের দিকে নানার মৃত্যুর পর সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যায়। সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি করে এসে পড়ে আমেনা বেগমের কাঁধে।

আইলায় ভেঙে যায় ঘর, থেমে থাকেনি লড়াই

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পানির মধ্যে উঁচু তক্তার ওপর খাট রেখে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। ২০১২ সাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পরিবারটিকে। সংসার চালাতে আমেনা বেগম কখনো বিলে মাছ ধরেছেন, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ৪০ দিনের কর্মসূচিতেও কাজ করেছেন। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু অভাবের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, তা চাননি তিনি। মায়ের এই নিরন্তর সংগ্রামই ধীরে ধীরে শরিফুলের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী না থাকলেও একসময় তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জীবন বদলানোর অন্যতম পথ শিক্ষা।

অষ্টম শ্রেণি থেকেই বদলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

শরিফুল জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি তাঁর খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। তবে অষ্টম শ্রেণির শেষ দিকে তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মায়ের কষ্ট এবং পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। এ সময় বড় ভাইয়ের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনাও তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়ান তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালে বামিয়া এমএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন শরিফুল। ফল ভালো হলেও আর্থিক সংকট তাঁর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শহরের সরকারি কলেজে পড়ার সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হন কয়রার খান সাহেব কোমর উদ্দীন ডিগ্রি কলেজে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি।

গ্রামের কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

অভাব-অনটনকে সঙ্গী করেই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় সাফল্য আসে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। ভর্তি পরীক্ষায় ৮১ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় ৩৪৪তম স্থান অর্জন করেন তিনি। সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার। গ্রামের একটি কলেজ থেকে পড়াশোনা করে দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে ঢাকায় পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজের খরচের বড় একটি অংশ জোগাতে টিউশনি করতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র এবং যেসব পরিবারের সন্তানদের তিনি পড়াতেন, তাঁদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন শরিফুল। নানা মানুষের সহায়তা ও নিজের পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

জনতা ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতি

পড়াশোনা শেষ করে ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন শরিফুল ইসলাম। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি। কর্মব্যস্ততার মধ্যেই চালিয়ে যান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন মা আমেনা বেগম, বড় ভাই এবং স্ত্রী রাবিনা সুলতানা। পরিবারের সমর্থন তাঁকে লক্ষ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্রথম দুটি বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও হাল ছাড়েননি শরিফুল। ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে যান। পরে ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। ৪০তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান শরিফুল। তাঁর এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবারের নিরন্তর সমর্থন।

শুধু নিজের নয়, অন্য শিক্ষার্থীদের স্বপ্নও পূরণ করতে চান

শরিফুল মনে করেন, আর্থিক সংকট ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অনেকে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, একজন শিক্ষার্থীর এগিয়ে যাওয়ার পথে আর্থিক সহায়তা, পরিবারের সমর্থন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে তাঁর মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে চান তিনি। শরিফুলের লক্ষ্য, শুধু নিজের সাফল্যে থেমে না থেকে অন্যদেরও স্বপ্নপূরণে সহযোগিতা করা। কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়—এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

মায়ের সংগ্রামের সার্থকতা

যে মা একসময় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, বিলে মাছ ধরেছেন, দূরে গিয়ে শ্রম দিয়েছেন—আজ তাঁর সেই সন্তান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শরিফুলের এ সাফল্য আমেনা বেগমের দীর্ঘ সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই গল্পে শুধু সাফল্যের আনন্দ নেই; আছে দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রিয়জন হারানো এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা। প্রতিটি বাধার মধ্যেও মা ও ছেলে নিজেদের স্বপ্ন আঁকড়ে রেখেছেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

জাতীয় দলে ফিরতে চান জাহানারা, ফিরতে হলে মানতে হবে যে শর্ত

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪১ অপরাহ্ণ
জাতীয় দলে ফিরতে চান জাহানারা, ফিরতে হলে মানতে হবে যে শর্ত
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও পেসার জাহানারা আলম আবারও জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামতে চান। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার জাতীয় দলে ফেরার আগ্রহ জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে দলে ফিরতে হলে তাঁকে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে।

ফেরার আগ্রহ জানালেন জাহানারা

জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলেছিলেন জাহানারা। এরপর থেকে তাঁকে আর লাল-সবুজ জার্সিতে দেখা যায়নি। এবার আবারও জাতীয় দলে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই পেসার।

বিসিবির নারী বিভাগের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে জাহানারার যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জাতীয় দলে ফেরার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাহানারার ফিটনেস ও মাঠের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হবে।

ফিটনেস পরীক্ষা ও ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার শর্ত

জাহানারার জাতীয় দলে ফেরার বিষয়ে বিসিবির নারী বিভাগের চেয়ারম্যান বলেন, ‘হ্যাঁ, সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে নির্বাচকরা আছেন, সবাই দেখবেন সে ফিট আছে কি না। ফিটনেস টেস্টে তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে।’

তিনি আরও জানান, জাতীয় দলে ফেরার পরবর্তী ধাপে যেতে হলে জাহানারাকে দেশে এসে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতে হবে। সেখানে তাঁর পারফরম্যান্স ও শারীরিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করবেন নির্বাচকেরা।

রফিকুল ইসলাম বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলা এবং জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলেই জাহানারাকে দলে ফেরানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণে বিরতি

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন জাহানারা। তবে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণ দেখিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় দল থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার কথা বিসিবিকে জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর একই বছরের শেষদিকে দলের টিম ম্যানেজমেন্টের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন এই ক্রিকেটার। পরবর্তী সময়ে বিসিবি নিজস্ব স্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জাহানারার পরিসংখ্যান

২০১১ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় জাহানারা আলমের। এরপর বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে ৪৮টি এবং টি-টোয়েন্টিতে ৬০টি উইকেট শিকার করেন তিনি। অভিজ্ঞ এই পেসার দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বোলিং বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এদিকে, সামনে নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে বেশ কয়েকটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বিসিবির। এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় দলে ফেরার জন্য নিজের প্রস্তুতি ও সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে জাহানারাকে।

জাতীয় দলে ফেরার সিদ্ধান্ত এখন মাঠের পারফরম্যান্সে

বিসিবির বক্তব্য অনুযায়ী, জাহানারার জন্য জাতীয় দলের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়। তবে ফেরার পথ নির্ভর করছে তাঁর ফিটনেস, ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশগ্রহণ এবং পারফরম্যান্সের ওপর। কোন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলবেন, সে সিদ্ধান্তও তাঁকেই নিতে হবে।

দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলে ফেরার এই প্রচেষ্টায় জাহানারা কতটা সফল হন, তা নির্ধারণ করবে তাঁর মাঠের পারফরম্যান্স ও নির্বাচকদের মূল্যায়ন।

কালের আলো/এএইচ/এস এ

মেসির দুই রেকর্ডে হালান্ড-এমবাপ্পের থাবা, কে ভাঙলেন কোন কীর্তি?

ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩৬ অপরাহ্ণ
মেসির দুই রেকর্ডে হালান্ড-এমবাপ্পের থাবা, কে ভাঙলেন কোন কীর্তি?
সময়ের সেরা ফুটবলারদের আলোচনায় লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পাশাপাশি এখন নিয়মিত উচ্চারিত হয় কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডের নাম। গোল করার ধারাবাহিকতা ও রেকর্ড গড়ার ক্ষমতায় নিজেদের আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন এই দুই তারকা। এবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এক রাতেই নতুন ইতিহাস গড়লেন হালান্ড ও এমবাপ্পে। তাঁদের কীর্তিতে পেছনে পড়ে গেছে আর্জেন্টাইন মহাতারকা মেসির দুটি রেকর্ড।
৬০ ম্যাচে ৬১ গোল, হালান্ডের অবিশ্বাস্য কীর্তি
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে প্যারিস সাঁ জার্মেইয়ের (পিএসজি) বিপক্ষে জোড়া গোল করেন ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। দল ৪-২ গোলে হেরে গেলেও ব্যক্তিগত অর্জনে ইতিহাস গড়েছেন তিনি।

এই দুই গোলের সুবাদে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হালান্ডের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১। আর এই মাইলফলকে পৌঁছাতে তাঁর লেগেছে মাত্র ৬০ ম্যাচ। এর মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে দ্রুততম ৬০ গোল করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। এর আগে লিওনেল মেসি ৮০ ম্যাচে ৬০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন।

বয়সের হিসাবেও মেসিকে ছাড়িয়ে গেছেন হালান্ড। ২৬ বছর ৮৫ দিন বয়সে ৬০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন নরওয়েজীয় এই স্ট্রাইকার। মেসির ক্ষেত্রে বয়সটি ছিল ২৬ বছর ৮৬ দিন। অর্থাৎ, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে মেসিকে পেছনে ফেলেছেন হালান্ড।

১০০ ম্যাচে সবচেয়ে কম বয়সী এমবাপ্পে

একই রাতে আরেকটি রেকর্ড গড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। এএস রোমার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাঁর শততম উপস্থিতি। আর এই মাইলফলকে পৌঁছানোর পথে প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হওয়ার কীর্তি গড়েছেন তিনি।

এমবাপ্পের বয়স তখন ২৭ বছর ২৯৮ দিন। এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন মেসি, যিনি ২৮ বছর ৮৪ দিন বয়সে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০০ ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন।

শুধু শততম ম্যাচ খেলেই থামেননি এমবাপ্পে। রোমার বিপক্ষে গোল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের গোলসংখ্যা ৭২-এ নিয়ে গেছেন তিনি। এতে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় রাউল গঞ্জালেজকে পেছনে ফেলে এককভাবে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছেন ফরাসি তারকা।

রোমার মাঠে রিয়ালের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

ব্যক্তিগত রেকর্ডের রাতটি দলীয়ভাবেও স্মরণীয় হয়ে থাকল এমবাপ্পের জন্য। রোমার মাঠে একপর্যায়ে ৩-১ গোলে পিছিয়ে পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে দারুণ প্রত্যাবর্তন করে স্প্যানিশ ক্লাবটি।

শেষ আট মিনিটে তিনটি গোল করে ৪-৩ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় রিয়াল। এমবাপ্পের গোলের পাশাপাশি শেষ মুহূর্তের আক্রমণাত্মক ফুটবল ম্যাচটিকে নাটকীয় করে তোলে। ফলে শততম ম্যাচে ব্যক্তিগত রেকর্ডের সঙ্গে জয়ও উদ্‌যাপন করতে পেরেছেন ফরাসি তারকা।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গোলদাতাদের তালিকায় এমবাপ্পের অগ্রগতি

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এমবাপ্পের মোট গোল এখন ৭২। এই গোলসংখ্যা তাঁকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে তুলে দিয়েছে। তাঁর পেছনে নেমে গেছেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা রাউল গঞ্জালেজ, যাঁর গোলসংখ্যা ৭১।

এ তালিকায় এমবাপ্পের সামনে রয়েছেন আরও চার কিংবদন্তি। শীর্ষে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, ১৪১ গোল নিয়ে। দ্বিতীয় স্থানে মেসি, তাঁর গোল ১২৯টি। এরপর রবার্ট লেভানদোভস্কির ১০৯ এবং করিম বেনজেমার ৯০ গোল।

এমবাপ্পের সামনে এখন লক্ষ্য আরও ওপরে ওঠা। বয়স ও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আগামী মৌসুমগুলোতে গোলের এই ব্যবধান কমানোর সুযোগ থাকবে তাঁর সামনে।

ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে হালান্ডের নতুন রেকর্ড

পিএসজির বিপক্ষে জোড়া গোলের মাধ্যমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন হালান্ড। সিটির হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ৩৮, যা এসেছে মাত্র ৪১ ম্যাচে।

এর আগে ক্লাবটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার সার্জিও আগুয়েরোর দখলে। তিনি ৬৪ ম্যাচে ৩৬ গোল করেছিলেন। হালান্ড তুলনামূলক কম ম্যাচেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন।

তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের রাতেও দলীয়ভাবে হতাশ হতে হয়েছে সিটিকে। নিজেদের মাঠ ইতিহাদ স্টেডিয়ামে পিএসজির কাছে ৪-২ গোলে হেরে যায় তারা। প্রথমার্ধে তিন গোল হজম করার পর বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল সিটি। হালান্ডের জোড়া গোলও শেষ পর্যন্ত পরাজয় এড়াতে পারেনি।

মেসির রেকর্ডে চাপ, নতুন প্রজন্মের উত্থান

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বহু বছর ধরে গোল ও ম্যাচসংক্রান্ত নানা রেকর্ডের মালিক ছিলেন মেসি। কিন্তু হালান্ড ও এমবাপ্পের মতো নতুন প্রজন্মের তারকারা একের পর এক মাইলফলক ছুঁয়ে সেই রেকর্ডগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছেন।

হালান্ডের ক্ষেত্রে গোল করার অসাধারণ গতি তাঁকে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অন্যদিকে, এমবাপ্পে অল্প বয়সেই শততম ম্যাচ খেলার পাশাপাশি সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।

তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের বাইরেও তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে দলকে শিরোপা জেতানো। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো প্রতিযোগিতায় গোলের রেকর্ড যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতার সাফল্যও নির্ধারণ করবে তাঁদের উত্তরাধিকার।

কালের আলো/এএন/এস এ