মানুষ ভুল করে, পাপে জড়িয়ে পড়ে। কখনো অনুশোচনায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করে, আবার কখনো শয়তানের প্ররোচনা কিংবা নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায় একই পাপে ফিরে যায়। এভাবে বারবার ভুল করার কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—একই পাপের জন্য বারবার তওবা করলে কি আল্লাহ ক্ষমা করবেন? তওবা করার পর জীবনে বিপদ এলে কি তা আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ? ইসলামের শিক্ষা হলো, পাপের পর অনুশোচনা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার চেষ্টা কখনো ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। তবে তওবা হতে হবে আন্তরিক এবং তা কবুল হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।
তওবা ভেঙে গেলে কি আবার তওবা করা যাবে?
‘তওবা’ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। ইসলামের পরিভাষায় তওবা হলো পাপ ও আল্লাহর অবাধ্যতা ছেড়ে তাঁর নির্দেশিত পথে ফিরে আসা এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।
অনেক সময় মানুষ তওবা করার পরও দুর্বলতার কারণে আবার পাপে জড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কেউ লজ্জা, হতাশা কিংবা অপরাধবোধে আর তওবা করতে চান না। অথচ পাপের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়া উচিত নয়। বরং ভুল বুঝতে পারলে নতুন করে অনুশোচনা করা, পাপ থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোনো বান্দা পাপ করে তওবা করার পর আবার পাপ করলে এবং পুনরায় তওবা করলে তার কি লজ্জিত হওয়া উচিত? উত্তরে তিনি বলেন, শয়তান তো এটাই চায় যে মানুষ তওবা করা ছেড়ে দিক। তাই কখনো তওবা করা বন্ধ করা উচিত নয়।
ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনু রজব আল-হাম্বলি (রহ.)-এর জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম গ্রন্থে এ বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মূল শিক্ষা হলো, অতীতের ভুল যেন মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ করতে থাকা এবং পরে ক্ষমা চাওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করা যাবে। আন্তরিক তওবার জন্য পাপ ছাড়ার চেষ্টা এবং ভবিষ্যতে তা থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প থাকা জরুরি।
পাপকে ছোট করে দেখা কেন বিপজ্জনক?
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি নিজের পাপকে হালকাভাবে নেন না। ছোট মনে হওয়া ভুলও যে আল্লাহর অবাধ্যতা হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক থাকেন। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি নিজের পাপকে তুচ্ছ মনে করে এবং তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে না, তার আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সহিহ বুখারির ৬৩০৮ নম্বর হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিনের পাপ সম্পর্কে ভীতির অনুভূতিকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় করছে, পাহাড়টি যেকোনো মুহূর্তে তার ওপর ভেঙে পড়তে পারে। বিপরীতে, পাপকে তুচ্ছ মনে করা ব্যক্তির কাছে তা নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া মাছির মতো।
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, পাপের ব্যাপারে আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। একই সঙ্গে নিজের ভুলের কারণে হতাশ হয়ে আল্লাহর ক্ষমা চাওয়াও বন্ধ করা যাবে না। ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নিজেকে সংশোধন করাই গুরুত্বপূর্ণ।
তওবা করার পর বিপদ এলে কী করবেন?
কখনো আন্তরিকভাবে তওবা করার পরও মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, আর্থিক সংকট কিংবা নানা ধরনের পরীক্ষা আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মনে করেন, হয়তো তাঁদের তওবা কবুল হয়নি। কিন্তু শুধু বিপদ-আপদ দেখা দেওয়ার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
জীবনের প্রতিকূলতা নানা কারণে আসতে পারে। একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংকটের সময়ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সৎ পথে অবিচল থাকার চেষ্টা করা।
তওবা কোনো দুনিয়াবি সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই তওবার পর কষ্ট এলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং নিজের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকা উচিত।
শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বললেই কি তওবা হয়?
তওবা শুধু মুখে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা কিংবা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এর সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা ও কাজের পরিবর্তন থাকা প্রয়োজন।
পবিত্র কোরআনের সুরা তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তওবার মধ্যে আন্তরিকতা থাকতে হবে। যে পাপ থেকে ফিরে আসার জন্য ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, তা ছেড়ে দেওয়ার বাস্তব প্রচেষ্টাও থাকতে হবে।
কেউ যদি মুখে ক্ষমা চাইলেও মনে মনে একই পাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখেন, তাহলে তাঁর তওবার আন্তরিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে আন্তরিকভাবে পাপ ছাড়ার সংকল্প করার পর মানবিক দুর্বলতায় কেউ আবার ভুল করে ফেললে, তাঁর উচিত নতুন করে তওবা করা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
তওবা কবুল হওয়ার ৫টি শর্ত
ইসলামি শিক্ষায় তওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্তের কথা বলা হয়েছে। এগুলো পূরণের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের ভুল সংশোধন করে আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করতে পারেন।
১. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তওবা করা
তওবা হতে হবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। মানুষের প্রশংসা পাওয়া, সামাজিক লোকলজ্জা এড়ানো কিংবা দুনিয়াবি সুবিধা লাভের জন্য নয়; বরং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসার আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই তওবা করতে হবে।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাইয়িনার ৫ নম্বর আয়াতে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তওবার ক্ষেত্রেও এই আন্তরিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
তওবার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করা। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে অন্তরে যে অনুতাপ তৈরি হয়, তা মানুষকে ভুল থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করে।
অনুশোচনা শুধু সাময়িক আবেগ নয়; এর মাধ্যমে নিজের আচরণ পরিবর্তনের ইচ্ছাও তৈরি হওয়া উচিত। অতীতের ভুল উপলব্ধি করে ভবিষ্যতে একই পথে না ফেরার চেষ্টা তওবার গুরুত্বকে বাস্তব রূপ দেয়।
৩. পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়া
যে পাপের জন্য তওবা করা হচ্ছে, তা ছেড়ে দেওয়া জরুরি। কেউ যদি অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করেন, প্রতারণা করেন কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। তাঁকে অন্যায় কাজ বন্ধ করতে হবে এবং সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হলে তা ফেরত দিতে হবে। কারও প্রতি অপবাদ, অন্যায় বা ক্ষতি করে থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর অধিকার পুনরুদ্ধার ও ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। মানুষের হক নষ্ট করার বিষয়টি তাই তওবার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
একইভাবে ফরজ ইবাদতে অবহেলা হয়ে থাকলে তা সংশোধনের জন্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা
তওবার সময় অন্তরে দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে যে ভবিষ্যতে ওই পাপে আর ফিরে যাওয়া হবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রেখে তওবা করা আন্তরিক তওবার পরিপন্থী।
তবে মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আন্তরিক সংকল্প থাকা সত্ত্বেও পরে দুর্বলতার কারণে কেউ একই পাপে জড়িয়ে পড়লে, তার আগের তওবা যে অবশ্যই বাতিল হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। বরং নতুন পাপের জন্য নতুন করে তওবা করতে হবে এবং পাপ থেকে দূরে থাকার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
যে পরিবেশ, অভ্যাস কিংবা সঙ্গ মানুষকে বারবার পাপের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
৫. তওবার সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসা
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্ত এসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তওবার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়ে পরিণতি নিশ্চিতভাবে সামনে চলে এলে তখনকার তওবা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে।
সুরা নিসার ১৮ নম্বর আয়াতে এমন ব্যক্তিদের কথা বলা হয়েছে, যারা পাপ করতে থাকে এবং মৃত্যুর উপস্থিতিতে বলে, ‘এখন আমি তওবা করছি।’
কোরআনের সুরা ইউনুসের ৯০-৯১ নম্বর আয়াতে ফেরাউনের মৃত্যুমুখী অবস্থায় ইমান আনার ঘোষণার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া সহিহ হাদিসে কেয়ামতের বড় আলামত হিসেবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের কথা এসেছে। এ আলামত প্রকাশের পর নতুন করে ইমান গ্রহণ বা তওবা করার সুযোগ আর আগের মতো থাকবে না বলে ইসলামি বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
এসব শিক্ষা মানুষকে তওবা পিছিয়ে না দিয়ে জীবিত থাকতেই নিজের ভুল সংশোধনের তাগিদ দেয়।
মহানবী (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন
তওবা শুধু পাপী মানুষের জন্য প্রয়োজন—বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার ও তওবা করতেন। সহিহ মুসলিমের ২৭০২ নম্বর হাদিসে তিনি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে তওবা করার কথা বলেছেন। সহিহ বুখারির ৬৩০৭ নম্বর হাদিসে দিনে ৭০ বারেরও বেশি ক্ষমা প্রার্থনার কথাও বর্ণিত হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার একজন মুমিনের নিয়মিত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির অংশ। মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারলে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে এবং জীবনকে সংশোধনের চেষ্টা করলে তার আত্মিক উন্নতির পথ তৈরি হয়।
হতাশা নয়, তওবা হোক জীবনের নিয়মিত অভ্যাস
পাপ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়া উচিত নয়। একই ভুল বারবার হয়ে গেলে তা থেকে ফিরে আসার চেষ্টা বন্ধ না করে বরং পাপের কারণ খুঁজে বের করা, অনুশোচনা করা এবং নিজেকে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তবে তওবাকে পাপ করার অনুমতি হিসেবে দেখা যাবে না। প্রকৃত তওবার লক্ষ্য হলো অন্যায় ছেড়ে দেওয়া, আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা। আন্তরিক তওবার পরও কেউ দুর্বলতায় ভুল করলে আবার আল্লাহর কাছে ফিরে আসবেন—কিন্তু প্রতিবারই পাপ থেকে বাঁচার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করতে হবে।
তওবা তাই কোনো এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সারাজীবন নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, সৎকাজে ফিরে আসা এবং ভুল সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন মুমিন তাঁর রহমত ও ক্ষমার আশা করতে পারেন।
কালের আলো/জে এন/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array