পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের নতুন অধ্যায়, গুরুত্ব পাচ্ছে জিয়ার ‘উই রিভল্ট’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বের বর্ণনায় নতুন সংযোজন আসছে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে। সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে এবার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পর মেজর জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হচ্ছে। এতে তাঁর ‘উই রিভল্ট’ ঘোষণা, বাঙালি সেনাসদস্যদের সংগঠিত করা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে স্থান পাচ্ছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পরিমার্জিত বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার পাশাপাশি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার প্রচার এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তাঁর পরবর্তী ঘোষণার বিবরণও রাখা হয়েছে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা আগের সংস্করণের তুলনায় আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।
- স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও কালুরঘাটের ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের বাহিনী
- বীরশ্রেষ্ঠদের অবদান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করছে এনসিটিবি
- চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষার বই
ইতিহাসের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আগামী শিক্ষাবর্ষের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও স্থান পাচ্ছে পাঠ্যবইয়ে। ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আসছে চারটি নতুন বই। সব মিলিয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি, কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষার বিভিন্ন দিক নতুনভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি।
‘উই রিভল্ট’ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা
২০২৭ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’। এ অধ্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলার খবর তারবার্তার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর পেয়ে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেন। পাঠ্যবইয়ে তাঁর বিদ্রোহের মুহূর্তটি বোঝাতে ‘উই রিভল্ট’ কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ ‘আমরা বিদ্রোহ করছি’।
এরপর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি ব্যাটালিয়নের বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একত্র করেন। বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁদের সামনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর কথা জানান তিনি। এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সামরিক প্রতিরোধ সংগঠিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হলে ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন বইয়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর ঘোষণা দেওয়ার কথাও রয়েছে। এরপর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তাঁর আরেকটি ঘোষণার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন সংস্করণে শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ঘটনা নয়, এর পেছনের প্রেক্ষাপট, সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের বিদ্রোহ এবং বেতারকেন্দ্রের মাধ্যমে ঘোষণার প্রচারের ঘটনাগুলোও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
আগের পাঠ্যবইয়ে কী ছিল
স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিভিন্ন সময়ের পাঠ্যবইয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ২০২২ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বলা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ওই বর্ণনায় স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত বইয়ে বলা হয়, ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরদিন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তবে সেখানে ‘উই রিভল্ট’ ঘোষণা, বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট এবং বাঙালি সেনাসদস্যদের সংগঠিত করার ঘটনাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন সংস্করণে এসব বিষয় যুক্ত হওয়ায় স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বের বিবরণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন সময়ের পাঠ্যবইয়ে এই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের উপস্থাপনার পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর, ব্রিগেড ও বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী
নতুন শিক্ষাবর্ষের ইতিহাসভিত্তিক বিষয়বস্তুতে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগঠন ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স সম্পর্কে তথ্য যুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা যুদ্ধ পরিচালনার কাঠামো, বিভিন্ন বাহিনীর ভূমিকা এবং সম্মুখযুদ্ধের সংগঠিত রূপ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবে। একই সঙ্গে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অবদান সম্পর্কে জানার সুযোগ বাড়বে। স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসকে শুধু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায় ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার সঙ্গে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোও পাঠ্যক্রমে স্থান পাচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও এবারের পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য দিক। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাঁর নিজের লেখার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চার বই
ইতিহাসের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশের বিষয়েও নতুন সংযোজন আসছে। চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে। ‘খেলাধুলা’ বইটি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা দিতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বইয়ের লক্ষ্য শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও উপভোগ্য করে তোলা। এ ছাড়া বাংলা ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু সংযোজন করা হচ্ছে। ফলে পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন শুধু ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এর বিস্তার ঘটছে।
ছাপা হচ্ছে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই প্রস্তুত করা হচ্ছে। এনসিটিবির পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ছাপার কার্যক্রম চলছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কিছু বই ছাপাও হয়েছে।
বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে এসব বই পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে নতুন বিষয়বস্তুগুলো আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠদান কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশেষ করে ইতিহাসের ক্ষেত্রে ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করা শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বুঝতে সহায়তা করবে।
ইতিহাসের পাঠে আরও বিস্তৃত পরিসর
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক আফসান চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাশাপাশি সমাজের ইতিহাস বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির চর্চা বেশি প্রাধান্য পায়। তাই সমাজের ইতিহাসের চর্চা বাড়ানো জরুরি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাবলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদান এবং যুদ্ধকালীন সামাজিক অভিজ্ঞতাও পাঠ্যবইয়ে গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বের বিস্তারিত বিবরণ, ‘উই রিভল্ট’ ঘোষণার উল্লেখ, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স এবং বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী যুক্ত করার উদ্যোগ ইতিহাসের পাঠকে আরও বিস্তৃত করছে। পাশাপাশি ৭ নভেম্বর ও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মতো রাজনৈতিক অধ্যায় এবং সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও কারিগরি শিক্ষার নতুন বই শিক্ষার্থীদের সামনে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কে জানার আরও সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array