সৌদিতে যুদ্ধের আতঙ্কে ওমরাহযাত্রীরা বিপাকে
মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে কাবা শরিফকে ঘিরে তাওয়াফ করছেন হাজারো মুসল্লি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত ও হামলার আশঙ্কায় এবার তাঁদের অনেকের পবিত্র এই যাত্রা ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। বিমান চলাচলে বিঘ্ন, ফ্লাইট বাতিল এবং নিরাপত্তা সতর্কতার কারণে ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ওমরাহযাত্রী, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীরা।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি বিমানবন্দর টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। হামলার সময় বিমানবন্দরে ওমরাহযাত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। এতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর পাশাপাশি ২৪ জন আহত হওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব হতাহতের তথ্য এবং হামলার স্থান ও পরিস্থিতি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পবিত্র যাত্রার মধ্যে যুদ্ধের আতঙ্ক
ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থানরত মুসল্লিদের উদ্বেগের প্রধান কারণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেশটিতে গেছেন। তাঁদের জন্য একদিকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা, অন্যদিকে নিরাপদে থাকা ও দেশে ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক মুসল্লি বলেন, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোনে বারবার সতর্কবার্তা আসছে, যা তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি সৌদি আরবসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনাও করেন।
যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের সময় ভ্রমণকারীদের উদ্বেগ শুধু সরাসরি হামলার আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন, ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প পরিবহন না পাওয়ার মতো বিষয়ও তাঁদের দুর্ভোগ বাড়ায়।
মক্কা-মদিনা ঘিরে স্বস্তি থাকলেও যাত্রাপথে অনিশ্চয়তা
ইসলামের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনায় ওমরাহ পালন করতে আসা মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এই দুই শহরকে লক্ষ্যবস্তু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
মক্কা ও মদিনায় সরাসরি হামলার খবর না থাকলেও সেখানে পৌঁছাতে কিংবা সেখান থেকে দেশে ফিরতে অনেক যাত্রীকে অন্য শহরের বিমানবন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে রিয়াদসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে তার প্রভাব ওমরাহযাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনাতেও পড়তে পারে।
এ কারণে যাত্রীরা শুধু পবিত্র শহরগুলোর পরিস্থিতি নয়, বরং তাঁদের ফ্লাইটের রুট, ট্রানজিট বিমানবন্দর এবং দেশে ফেরার সম্ভাব্য ব্যবস্থাও নিয়ে চিন্তিত।
ফ্লাইট বাতিল ও সময়সূচি পরিবর্তনে বাড়ছে ভোগান্তি
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলেও। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বিভিন্ন ফ্লাইট বাতিল কিংবা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
ফ্লাইট বাতিল হলে যাত্রীদের নতুন টিকিট সংগ্রহ, হোটেলে অতিরিক্ত অবস্থান এবং খাবারসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক মুসল্লি, শিশুদের নিয়ে ভ্রমণকারী পরিবার এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ যাত্রীদের জন্য এমন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দোহা ও দুবাইগামী স্থলপথের পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। বিকল্প পথে যাতায়াতের চাহিদা বাড়লে পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে কোন রুটে কতটা ভাড়া বেড়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
ফ্লাইট না পেয়ে ভ্রমণ স্থগিত করছেন অনেকে
সৌদি আরবে অবস্থানরত আরেক মুসল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের কয়েকজনের ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করতে হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাঁর কয়েকজন বন্ধু সৌদি আরবে আসতে পারেননি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন যাঁদের ভ্রমণের তারিখ নির্ধারিত, হোটেল বুকিং করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে ফেরার প্রয়োজন রয়েছে। ওমরাহযাত্রীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিদেশি কর্মীরাও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।
বিশেষ করে যাঁদের ভিসার মেয়াদ, কর্মস্থলে যোগদানের সময় কিংবা দেশে ফেরার সঙ্গে জরুরি পারিবারিক বিষয় জড়িত, তাঁদের জন্য ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা বাড়তি চাপ তৈরি করে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ভ্রমণ ব্যয়ও বাড়তে পারে।
সৌদি ভ্রমণে সতর্কতা জারি বিভিন্ন দেশের
আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশ সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভ্রমণ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজ নিজ দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও ভ্রমণের আগে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইনস, সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশি দূতাবাসের হালনাগাদ নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন। গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইহীন তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা জরুরি।
উদ্বেগের মধ্যে ওমরাহযাত্রীদের অপেক্ষা
ওমরাহ মুসলমানদের কাছে গভীর ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অর্থ সঞ্চয় করে কিংবা পরিবারের সঙ্গে পরিকল্পনা করে এই সফরে যান। ফলে যাত্রার মাঝপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি বা ফ্লাইট বাতিলের খবর তাঁদের জন্য মানসিক ও আর্থিক—দুই ধরনের চাপ তৈরি করে।
একদিকে পবিত্র মক্কা ও মদিনায় ইবাদত সম্পন্ন করার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নিরাপদে যাতায়াত ও দেশে ফেরার নিশ্চয়তা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন যাত্রীরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অনেকেরই ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সব মিলিয়ে, আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বিমান চলাচল, পর্যটন, ব্যবসা এবং ধর্মীয় ভ্রমণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা, হতাহতের সংখ্যা এবং দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
কালের আলো/জেএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array