জামালপুরের সাত উপজেলার মধ্যে চারটিতেই দীর্ঘদিন ধরে নেই স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার। অন্য উপজেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কোনো রকমে চলছে এসব কার্যালয়ের কার্যক্রম। ফলে কোথাও সপ্তাহে এক দিন, কোথাও দুই থেকে তিন দিন জমি নিবন্ধনের কাজ হচ্ছে। নির্ধারিত দিনে সেবাগ্রহীতাদের অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বারবার যাতায়াতের কারণে ভোগান্তি বাড়ছে। জমি নিবন্ধনের পাশাপাশি পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় সেবা পেতেও সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর সদর, মেলান্দহ, বকশীগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার পদ শূন্য রয়েছে। জনবলসংকটের কারণে অন্য তিন উপজেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চার উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুর সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার শাহজাহান আলী বিপিএ গত বছরের ২০ মার্চ বদলি হন। মেলান্দহের সাব-রেজিস্ট্রার পলাশ তালুকদার বদলি হন গত বছরের ৭ এপ্রিল। ইসলামপুরের আয়েশা সিদ্দীকা ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর এবং বকশীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার চলতি বছরের ৯ জুলাই বদলি হন। এরপর থেকে এসব কার্যালয়ে স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার নেই। শূন্য পদগুলোতে স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করেই চলছে জমি নিবন্ধনসহ অন্যান্য কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একজন কর্মকর্তাকে একাধিক কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিটি অফিসে নিয়মিত উপস্থিত থাকা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সেবা নিতে আসা মানুষকে নির্দিষ্ট দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কারণে নির্ধারিত দিনে কাজ সম্পন্ন না হলে আবারও অফিসে আসতে হচ্ছে তাঁদের।
কোথাও সপ্তাহে এক দিন, কোথাও পাঁচ দিন নিবন্ধন
জামালপুরের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সময়সূচিতে। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর সদর উপজেলায় সপ্তাহে তিন দিন জমি নিবন্ধন করা হয়। মেলান্দহ, ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জে সপ্তাহে এক দিন করে এবং মাদারগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জে দুই দিন করে এ কার্যক্রম চলে। তবে সরিষাবাড়ী উপজেলায় সপ্তাহের পাঁচ দিনই জমি নিবন্ধনের কাজ চালু রয়েছে। এই অসম সময়সূচির কারণে নির্দিষ্ট দিনে সেবাগ্রহীতাদের চাপ বেড়ে যায়। জমি কেনাবেচার দলিল সম্পাদন, নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা কিংবা পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহ—প্রতিটি কাজের জন্যই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা একাধিক কার্যালয়ের কাজ সামলাতে গিয়ে চাপে পড়ছেন। এতে সেবার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে—কোন দিন গেলে কাজ হবে, আর কোন দিন ফিরে আসতে হবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
অফিসে গিয়ে ফিরছেন সেবাগ্রহীতারা
গত মঙ্গলবার জামালপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সেবাগ্রহীতাদের তেমন ভিড় নেই। দলিল লেখকদের অনেককে অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। বেশ কিছু চেয়ার-টেবিলও ফাঁকা পড়ে ছিল। সেবা নিতে আসা কয়েকজন কাজ সম্পন্ন করতে না পেরে ফিরে যাচ্ছিলেন। সেবাগ্রহীতারা জানান, সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন জমি নিবন্ধনের কাজ হওয়ায় ওই দিনগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মানুষ জমায়েত হন। এতে দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হন। এতে যাতায়াতের খরচের পাশাপাশি কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে। পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহ করতেও এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা।
টাকা লেনদেন শেষ, তবু জমি নিবন্ধন করতে পারেননি আবদুল করিম
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবদুল করিম জামালপুর শহরের পাথালিয়া এলাকায় এক টুকরো জমি কিনেছেন। গত রোববার জমিটি নিবন্ধন করতে এসে কাগজপত্র গোছানো ও দলিল সম্পাদনের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় তিনি সেদিন নিবন্ধন করতে পারেননি। পরে মঙ্গলবার আবারও অফিসে গিয়ে দেখেন, সাব-রেজিস্ট্রার উপস্থিত নেই। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি। কারণ, জমি কেনাবেচার টাকা লেনদেন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু নিবন্ধনের কাজ শেষ হয়নি। আবদুল করিম বলেন, স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। টাকা লেনদেন হয়ে যাওয়ার পরও নিবন্ধন সম্পন্ন না হওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
মামলার নকল তুলতে না পেরে বিপাকে সরোয়ার আলম
ইসলামপুর উপজেলার বাসিন্দা সরোয়ার আলমেরও একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানা গেছে। মামলার প্রয়োজনে তাঁর ১৯৬৪ সালের একটি দলিলের নকল প্রয়োজন। সে জন্য জামালপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এসে তিনি জানতে পারেন, সাব-রেজিস্ট্রার নেই। ফলে ওই সপ্তাহে নকল সংগ্রহ করতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। সরোয়ার আলম বলেন, আগামী সপ্তাহে মামলার তারিখ রয়েছে। এর আগে প্রয়োজনীয় নকল সংগ্রহ করে আদালতে জমা দিতে না পারলে তাঁকে আবারও তারিখ নিতে হতে পারে। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই নষ্ট হবে। পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহের মতো জরুরি কাজেও কর্মকর্তার অনুপস্থিতির প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর মতো যাঁদের আদালতের মামলা কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে দলিলের নকল প্রয়োজন, তাঁদের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করছে।
দলিল লেখক ও ক্রেতা-বিক্রেতারাও চাপে
জেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ছানোয়ার হোসেন ছানো বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় নির্দিষ্ট দিনে জমি নিবন্ধনের কাজ হচ্ছে। এতে দলিল লেখক, নকলনবিশ এবং জমির ক্রেতা-বিক্রেতা—সবাই সমস্যায় পড়ছেন। নির্ধারিত দিনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পুরোনো দলিলের নকলসহ অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। মেলান্দহ উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফাহাদুজ্জামান নবীন বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ে রেজিস্ট্রি অফিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে এক দিনে কয়েক দিনের কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা যেমন চাপে পড়ছেন, তেমনি সেবাগ্রহীতারাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাঁদের মতে, প্রতিটি কার্যালয়ে নিয়মিত কর্মকর্তা থাকলে সেবার সময়সূচি স্থিতিশীল হবে। এতে কাজের চাপ বণ্টন করা সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষকে বারবার অফিসে যাতায়াত করতে হবে না।
দ্রুত পদায়নের আশ্বাস জেলা রেজিস্ট্রারের
এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, জনবলসংকটের কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলোর কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার পদায়ন করা হলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই শূন্য পদগুলোতে কর্মকর্তা পদায়ন করা হবে। তবে কবে নাগাদ এসব পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। আপাতত অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কার্যক্রম চললেও নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
Array