খুঁজুন
                               
, ,
           

কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি করবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি করবে সরকার

কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কৃষকের উৎপাদনসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার বা রেজিস্ট্রি তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তাঁর মতে, উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে একদিকে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত দামের চাপ থেকেও ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে বিষমুক্ত, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে গবেষক ও বিজ্ঞানীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কৃষি গবেষণায় যুগান্তকারী উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ সম্মাননার ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন মন্ত্রী।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন নিশ্চিত করতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া জরুরি। কিন্তু দেশের কৃষি খাতে অন্যতম বড় সমস্যা হলো উৎপাদিত পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা। উৎপাদন বেশি হলে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। আবার বাজারে সরবরাহ কমে গেলে একই পণ্য ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। উৎপাদন খরচ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে ফসল ফলানোর পরও অনেক সময় তাঁরা ন্যায্য দাম পান না। অন্যদিকে মধ্যবর্তী পর্যায়ের বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের বিভিন্ন সমস্যার কারণে ভোক্তাদেরও বাড়তি মূল্য দিতে হয়। মন্ত্রী বলেন, এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি স্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

মৌসুমে ফসলের দাম পড়ে, পরে বাড়ে

কৃষিপণ্যের বাজারে দামের ওঠানামার উদাহরণ হিসেবে টমেটোর কথা তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে টমেটো অনেক বেশি দামে বিক্রি হলেও ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত টমেটো খেতেই পচে নষ্ট হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। আবার পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমে গেলে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এ ধরনের সংকট তৈরি হয়। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পণ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও সঠিক সময়ে বাজারে সরবরাহ করা হবে, সেটিও কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কৃষকের উৎপাদনের তথ্য নিয়ে তৈরি হবে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি

কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, কোন কৃষক কী ধরনের পণ্য কতটুকু উৎপাদন করছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্য বা রেজিস্ট্রি সরকারের কাছে থাকবে। এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে উৎপাদনের পরিমাণ, সম্ভাব্য সরবরাহ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হবে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কোন এলাকায় কোন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি হচ্ছে, কোথায় সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং কোন পণ্যের জন্য সংরক্ষণ বা বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষিমন্ত্রীর মতে, উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে কৃষিপণ্যের বেচাকেনায় টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্য সংগ্রহ, হালনাগাদ, সংরক্ষণ এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে বাজার ব্যবস্থাপনার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর।

নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্গানিক ও নন-জিএমও কৃষিপণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশকে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে আরও মনোযোগী হতে হবে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এশিয়ার জলবায়ু ও পরিবেশগত বাস্তবতায় শতভাগ অর্গানিক চাষাবাদ চ্যালেঞ্জিং হলেও কীটনাশকমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের তরুণ শিক্ষিত প্রজন্ম ও নতুন উদ্যোক্তারা কৃষিতে যুক্ত হয়ে যে সাফল্য দেখাচ্ছেন, তা আশাব্যঞ্জক। কৃষিতে নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

উদ্ভাবনী বিজ্ঞানীদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা

কৃষি গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন স্বীকৃতির ব্যবস্থার কথাও জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্ভাবনকারী বিজ্ঞানী ও তাঁদের দলকে এককালীন সম্মাননা দেওয়ার পাশাপাশি মূল উদ্ভাবককে আমৃত্যু বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি বিকাশে গবেষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্ভাবনের যথাযথ স্বীকৃতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে পারে। এ ছাড়া অবসর-পরবর্তী সুযোগ-সুবিধা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। কৃষি উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে টেকসই কৃষির আহ্বান

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ এবং পৃথিবী গড়ে তুলতে কৃষি গবেষক, বিজ্ঞানী, কৃষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। এমনকি অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য গত জুনে ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। নিহত ও আহত সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতার পরও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রান্নাঘর, আর ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ফলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যাওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সতর্কতা পাওয়ার পর ঠিক কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

টয়লেট থেকে উদ্ধার চারজনের মরদেহ

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে। নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নিহত ও আহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। আগুনে রিসোর্টের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ

অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়। আগুনে দগ্ধদের অবস্থা ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেন।

শর্টসার্কিট না রান্নাঘরের চুলা—আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য

রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এরই মধ্যে রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দুটি বক্তব্যেই আগুনের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, রান্নাঘরের চুল্লি কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

ধোঁয়ায় অন্ধকার, স্ত্রীকে নিয়ে নালায় লাফ দেন পর্যটক

আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি দেখেন, চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পাশের একটি নালায় লাফ দিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি জানান, রিসোর্টটিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তাঁরা সেখানে উঠেছিলেন। তাঁদের আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার কথা ছিল। তাঁর বর্ণনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের সামনে তৈরি হওয়া বিপজ্জনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের কারণে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং অগ্নিকাণ্ডে সম্ভাব্য দায় নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০১ অপরাহ্ণ
জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো
জীবনে আরও ভালো করতে কে না চান! কেউ চান ক্যারিয়ারে সফল হতে, কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে, আবার কেউ চান সুন্দর সম্পর্ক ও মানসিক প্রশান্তি। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ পরিশ্রম করেন, নতুন অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও অনেক সময় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। এর পেছনে কি শুধু পরিস্থিতি দায়ী, নাকি নিজের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসও অজান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও মানসিকতা তার আচরণ এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলে অনেক সময় মানুষ নতুন সুযোগ গ্রহণ করতে ভয় পান, ব্যর্থতার আশঙ্কায় পিছিয়ে যান কিংবা নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তাই জীবন বদলাতে শুধু কাজের পরিমাণ বাড়ানো নয়, নিজের ভেতরের চিন্তাভাবনাগুলোও বোঝা জরুরি।

মনের ভেতরেও চলে অদৃশ্য সফটওয়্যার

একটি কম্পিউটারের কথা ভাবুন। এর যন্ত্রাংশ যত উন্নতই হোক, সফটওয়্যারে সমস্যা থাকলে সেটির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা একই রকম। আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা, অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাগুলো আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কেউ হয়তো জীবনে সফল হতে চান, কিন্তু মনে মনে বিশ্বাস করেন, ‘আমি যথেষ্ট যোগ্য নই।’ কেউ ভালোবাসার সম্পর্ক চান, অথচ তাঁর মধ্যে কাজ করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। আবার কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চাইলেও ভাবেন, ‘আমার মতো মানুষের পক্ষে বড় কিছু করা সম্ভব নয়।’

এ ধরনের ধারণা সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এগুলো দৃঢ়ভাবে মনে গেঁথে গেলে মানুষ নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখতে পারেন। নতুন কাজ শুরু করা, ঝুঁকি নেওয়া কিংবা ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হতে পারে।

ফলে সমস্যাটি শুধু বাইরের পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।

নিজের সমালোচনা নয়, নিজেকে বোঝার চেষ্টা করুন

ভুল করলে অনেকেই নিজেদের কঠোরভাবে বিচার করেন। সামান্য ব্যর্থতাকে বড় করে দেখেন, অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। অথচ আত্ম-উন্নয়নের জন্য নিজেকে দোষারোপ করার চেয়ে নিজের আচরণ ও চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণ করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমি নিজের সম্পর্কে কী বিশ্বাস করি? কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে নিজেকে কী বলি? অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা কি এখনো আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? আমার চিন্তাভাবনা কি আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে, নাকি পিছিয়ে দিচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে বোঝা যায়, কোন ধারণাগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, আর কোনগুলো ভয়, অনুমান কিংবা অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে।

নিজেকে বোঝার অর্থ নিজের সব চিন্তাকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং কোন চিন্তা উপকারী, কোনটি অযৌক্তিক এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে দেখা।

সাফল্য পেলেই কি আত্মবিশ্বাস আসে?

অনেকেই মনে করেন, ভালো চাকরি, পদোন্নতি, অর্থসম্পদ কিংবা মানুষের প্রশংসা অর্জন করতে পারলেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দূর হবে। কিন্তু বাস্তবে বাহ্যিক সাফল্য সব সময় ভেতরের অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না।

কেউ পদোন্নতি পাওয়ার পরও ভাবতে পারেন, তিনি যথেষ্ট ভালো নন। কেউ ভালো আয় করার পরও অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অসন্তুষ্টিতে ভুগতে পারেন। আবার কেউ পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার পরও আশঙ্কা করতে পারেন, পরবর্তী সময়ে হয়তো আর সফল হতে পারবেন না।

এভাবে নিজের মূল্য প্রমাণের জন্য একের পর এক অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। তখন সাফল্য উপভোগ করার বদলে নতুন কোনো অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণে লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি নিজের প্রচেষ্টা, সামর্থ্য ও মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, মানুষের ব্যক্তিগত মূল্য শুধু তার পদ, আয়, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্জনের ওপর নির্ভর করে না।

পুরোনো বিশ্বাস কীভাবে অগ্রগতির পথে বাধা হয়

মানুষের অনেক বিশ্বাস তৈরি হয় শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের কোনো কষ্টকর ঘটনার মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় বারবার সমালোচনার মুখোমুখি হলে কেউ নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। আবার কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়ার পর কেউ ধরে নিতে পারেন, তিনি আর কখনো সফল হতে পারবেন না।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব ধারণা অভ্যাসের মতো মনের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে। একপর্যায়ে মানুষ সেগুলোকে প্রশ্ন না করেই সত্য বলে ধরে নেন।

কিন্তু অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বাস বর্তমানের বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। একসময় ব্যর্থতার ভয় কাউকে সতর্ক থাকতে সাহায্য করলেও পরবর্তী সময়ে সেই ভয় নতুন সুযোগ গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই নিজের বিশ্বাসগুলো যাচাই করা জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই ধারণার পক্ষে বাস্তব প্রমাণ কী? এর বিপরীতে কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি? এই বিশ্বাস আমাকে সাহায্য করছে, নাকি অকারণে পিছিয়ে রাখছে? চাইলে নিজের সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক কোন ধারণা তৈরি করা সম্ভব?

নিজেকে গ্রহণ করাই পরিবর্তনের শুরু

নিজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার অর্থ নিজেকে ছোট করা নয়। বরং কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা বুঝতে পারাই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা এবং ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নিজেকে অযোগ্য ভাবার পরিবর্তে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কোথায় ভুল হয়েছে এবং পরবর্তীবার কীভাবে আরও ভালো করা সম্ভব।

একই সঙ্গে নিজের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সব সময় অন্যকে সন্তুষ্ট করা কিংবা নিজেকে প্রমাণ করার চাপে থাকলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

জীবন বদলাতে ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ

নিজের মানসিকতা পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও অভ্যাস বদলাতে সময় লাগতে পারে। তবে নিয়মিত আত্মপর্যালোচনা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা যায়।

যেমন, কোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আমি পারব না’ ভাবার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি এখনো পুরোপুরি জানি না, তবে শিখতে পারি।’ কোনো ব্যর্থতার পর নিজেকে অযোগ্য ভাবার বদলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা গেল, তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

এ ধরনের পরিবর্তন সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি করা। পাশাপাশি শুধু ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক সুযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব ও অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতিও মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে নিজের চিন্তাভাবনা ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হলে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

জীবন বদলাতে তাই শুধু নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ কিংবা আরও বেশি পরিশ্রম করাই যথেষ্ট নয়। নিজের সম্পর্কে কী ভাবছি, কোন বিশ্বাস আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং কোন অভ্যাস আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কখনো কখনো পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ নতুন কিছু শুরু করা নয়; বরং নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা কোনো ধারণাকে নতুন করে প্রশ্ন করা। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে নিজেকে আরও ভালোভাবে বোঝার এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

কালের আলো/জেএন/এসএ

কর্ণফুলী টানেলের ফিজিবিলিটি থেকে লোকসান, খতিয়ে দেখবে সংসদীয় কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৫৭ অপরাহ্ণ
কর্ণফুলী টানেলের ফিজিবিলিটি থেকে লোকসান, খতিয়ে দেখবে সংসদীয় কমিটি

দেশের আলোচিত মেগা প্রকল্প কর্ণফুলী টানেলের বিপুল আর্থিক লোকসানের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। প্রকল্পটির প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে লোকসানের পেছনের কারণ চিহ্নিত করতে চায় কমিটি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদগুলোতে নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, কোন পদে কী ধরনের জনবল প্রয়োজন এবং তাঁদের কর্মভার কী হবে, তা কৌশলগতভাবে নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংসদ সচিবালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কর্ণফুলী টানেলের লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখবে কমিটি

বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আর্থিক লোকসান। প্রকল্পটির প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায় এবং বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কমিটির সদস্যরা আলোচনা করেন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই কতটা যথাযথ ছিল, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা ছিল কি না এবং বর্তমানে লোকসানের পেছনে কী কী কারণ কাজ করছে—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে আলোচনা করতে পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি তোলা হবে।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া ও আর্থিক লোকসানের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার বিষয়ে কমিটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য দিয়ে কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫৬ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ পর্যালোচনা

বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলমান ১ হাজার ১৫৩টি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংসদীয় কমিটির সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে গৃহীত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র তুলে ধরে প্রকল্পগুলোর বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ২৫৬টি প্রকল্পের মেয়াদ কেন বাড়ানো হয়েছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি উন্নয়ন কার্যক্রমের সময়ানুবর্তিতা ও ব্যয়ের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, আমদানিনির্ভরতা, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শুরু করা।

এ ছাড়া সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়া এবং একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা চূড়ান্তের পথে

উন্নয়ন প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালকদের সময়মতো নিয়োগ ও সঠিকভাবে পদায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতার কারণে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের গতি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে।

সংসদীয় কমিটিকে জানানো হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগসংক্রান্ত নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

কমিটির আলোচনায় প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার পাশাপাশি প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ২২১ শূন্য পদে নিয়োগের নির্দেশ

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে শূন্য পদ পূরণের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের ২২১টি শূন্য পদের বিপরীতে বিভিন্ন গ্রেডে ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এ পরিস্থিতিতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন। তবে তাঁর নির্দেশনায় শুধু শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী জনবল বণ্টন এবং কর্মভার নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ কোন পদে কতজন জনবল প্রয়োজন, কোন দায়িত্বগুলো অগ্রাধিকার পাবে এবং বিদ্যমান জনবল দিয়ে কীভাবে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব—এসব বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর তাগিদ

বৈঠকে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দেশের সব অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল পৌঁছে দিতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, স্থানীয় বাস্তবতা এবং জনসাধারণের উপকারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।

কমিটির মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, সময়মতো অর্থ ছাড় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়ানো সম্ভব।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যারা

জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কাজী রফিকুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম এবং মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ অংশ নেন।

এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব এবং মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি