কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি করবে সরকার
কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কৃষকের উৎপাদনসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার বা রেজিস্ট্রি তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তাঁর মতে, উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে একদিকে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত দামের চাপ থেকেও ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে বিষমুক্ত, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে গবেষক ও বিজ্ঞানীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কৃষি গবেষণায় যুগান্তকারী উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ সম্মাননার ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন মন্ত্রী।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান।
কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ
কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন নিশ্চিত করতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া জরুরি। কিন্তু দেশের কৃষি খাতে অন্যতম বড় সমস্যা হলো উৎপাদিত পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা। উৎপাদন বেশি হলে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। আবার বাজারে সরবরাহ কমে গেলে একই পণ্য ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। উৎপাদন খরচ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে ফসল ফলানোর পরও অনেক সময় তাঁরা ন্যায্য দাম পান না। অন্যদিকে মধ্যবর্তী পর্যায়ের বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের বিভিন্ন সমস্যার কারণে ভোক্তাদেরও বাড়তি মূল্য দিতে হয়। মন্ত্রী বলেন, এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি স্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
মৌসুমে ফসলের দাম পড়ে, পরে বাড়ে
কৃষিপণ্যের বাজারে দামের ওঠানামার উদাহরণ হিসেবে টমেটোর কথা তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে টমেটো অনেক বেশি দামে বিক্রি হলেও ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত টমেটো খেতেই পচে নষ্ট হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। আবার পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমে গেলে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এ ধরনের সংকট তৈরি হয়। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পণ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও সঠিক সময়ে বাজারে সরবরাহ করা হবে, সেটিও কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কৃষকের উৎপাদনের তথ্য নিয়ে তৈরি হবে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি
কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, কোন কৃষক কী ধরনের পণ্য কতটুকু উৎপাদন করছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্য বা রেজিস্ট্রি সরকারের কাছে থাকবে। এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে উৎপাদনের পরিমাণ, সম্ভাব্য সরবরাহ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হবে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কোন এলাকায় কোন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি হচ্ছে, কোথায় সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং কোন পণ্যের জন্য সংরক্ষণ বা বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষিমন্ত্রীর মতে, উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে কৃষিপণ্যের বেচাকেনায় টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্য সংগ্রহ, হালনাগাদ, সংরক্ষণ এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে বাজার ব্যবস্থাপনার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর।
নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্গানিক ও নন-জিএমও কৃষিপণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশকে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে আরও মনোযোগী হতে হবে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এশিয়ার জলবায়ু ও পরিবেশগত বাস্তবতায় শতভাগ অর্গানিক চাষাবাদ চ্যালেঞ্জিং হলেও কীটনাশকমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের তরুণ শিক্ষিত প্রজন্ম ও নতুন উদ্যোক্তারা কৃষিতে যুক্ত হয়ে যে সাফল্য দেখাচ্ছেন, তা আশাব্যঞ্জক। কৃষিতে নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

উদ্ভাবনী বিজ্ঞানীদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা
কৃষি গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন স্বীকৃতির ব্যবস্থার কথাও জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্ভাবনকারী বিজ্ঞানী ও তাঁদের দলকে এককালীন সম্মাননা দেওয়ার পাশাপাশি মূল উদ্ভাবককে আমৃত্যু বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি বিকাশে গবেষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্ভাবনের যথাযথ স্বীকৃতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে পারে। এ ছাড়া অবসর-পরবর্তী সুযোগ-সুবিধা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। কৃষি উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে টেকসই কৃষির আহ্বান
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ এবং পৃথিবী গড়ে তুলতে কৃষি গবেষক, বিজ্ঞানী, কৃষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array