খুঁজুন
                               
, ,
           

জামালপুরে চার সাব-রেজিস্ট্রার পদ শূন্য, আটকে যাচ্ছে জমির দলিল

জামালপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
জামালপুরে চার সাব-রেজিস্ট্রার পদ শূন্য, আটকে যাচ্ছে জমির দলিল

জামালপুরের সাত উপজেলার মধ্যে চারটিতেই দীর্ঘদিন ধরে নেই স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার। অন্য উপজেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কোনো রকমে চলছে এসব কার্যালয়ের কার্যক্রম। ফলে কোথাও সপ্তাহে এক দিন, কোথাও দুই থেকে তিন দিন জমি নিবন্ধনের কাজ হচ্ছে। নির্ধারিত দিনে সেবাগ্রহীতাদের অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বারবার যাতায়াতের কারণে ভোগান্তি বাড়ছে। জমি নিবন্ধনের পাশাপাশি পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় সেবা পেতেও সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর সদর, মেলান্দহ, বকশীগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার পদ শূন্য রয়েছে। জনবলসংকটের কারণে অন্য তিন উপজেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চার উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুর সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার শাহজাহান আলী বিপিএ গত বছরের ২০ মার্চ বদলি হন। মেলান্দহের সাব-রেজিস্ট্রার পলাশ তালুকদার বদলি হন গত বছরের ৭ এপ্রিল। ইসলামপুরের আয়েশা সিদ্দীকা ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর এবং বকশীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার চলতি বছরের ৯ জুলাই বদলি হন। এরপর থেকে এসব কার্যালয়ে স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার নেই। শূন্য পদগুলোতে স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করেই চলছে জমি নিবন্ধনসহ অন্যান্য কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একজন কর্মকর্তাকে একাধিক কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিটি অফিসে নিয়মিত উপস্থিত থাকা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সেবা নিতে আসা মানুষকে নির্দিষ্ট দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কারণে নির্ধারিত দিনে কাজ সম্পন্ন না হলে আবারও অফিসে আসতে হচ্ছে তাঁদের।

কোথাও সপ্তাহে এক দিন, কোথাও পাঁচ দিন নিবন্ধন

জামালপুরের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সময়সূচিতে। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর সদর উপজেলায় সপ্তাহে তিন দিন জমি নিবন্ধন করা হয়। মেলান্দহ, ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জে সপ্তাহে এক দিন করে এবং মাদারগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জে দুই দিন করে এ কার্যক্রম চলে। তবে সরিষাবাড়ী উপজেলায় সপ্তাহের পাঁচ দিনই জমি নিবন্ধনের কাজ চালু রয়েছে। এই অসম সময়সূচির কারণে নির্দিষ্ট দিনে সেবাগ্রহীতাদের চাপ বেড়ে যায়। জমি কেনাবেচার দলিল সম্পাদন, নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা কিংবা পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহ—প্রতিটি কাজের জন্যই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন অনেকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা একাধিক কার্যালয়ের কাজ সামলাতে গিয়ে চাপে পড়ছেন। এতে সেবার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে—কোন দিন গেলে কাজ হবে, আর কোন দিন ফিরে আসতে হবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

অফিসে গিয়ে ফিরছেন সেবাগ্রহীতারা

গত মঙ্গলবার জামালপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সেবাগ্রহীতাদের তেমন ভিড় নেই। দলিল লেখকদের অনেককে অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। বেশ কিছু চেয়ার-টেবিলও ফাঁকা পড়ে ছিল। সেবা নিতে আসা কয়েকজন কাজ সম্পন্ন করতে না পেরে ফিরে যাচ্ছিলেন। সেবাগ্রহীতারা জানান, সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন জমি নিবন্ধনের কাজ হওয়ায় ওই দিনগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মানুষ জমায়েত হন। এতে দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হন। এতে যাতায়াতের খরচের পাশাপাশি কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে। পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহ করতেও এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা।

টাকা লেনদেন শেষ, তবু জমি নিবন্ধন করতে পারেননি আবদুল করিম

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবদুল করিম জামালপুর শহরের পাথালিয়া এলাকায় এক টুকরো জমি কিনেছেন। গত রোববার জমিটি নিবন্ধন করতে এসে কাগজপত্র গোছানো ও দলিল সম্পাদনের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় তিনি সেদিন নিবন্ধন করতে পারেননি। পরে মঙ্গলবার আবারও অফিসে গিয়ে দেখেন, সাব-রেজিস্ট্রার উপস্থিত নেই। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি। কারণ, জমি কেনাবেচার টাকা লেনদেন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু নিবন্ধনের কাজ শেষ হয়নি। আবদুল করিম বলেন, স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। টাকা লেনদেন হয়ে যাওয়ার পরও নিবন্ধন সম্পন্ন না হওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

মামলার নকল তুলতে না পেরে বিপাকে সরোয়ার আলম

ইসলামপুর উপজেলার বাসিন্দা সরোয়ার আলমেরও একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানা গেছে। মামলার প্রয়োজনে তাঁর ১৯৬৪ সালের একটি দলিলের নকল প্রয়োজন। সে জন্য জামালপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এসে তিনি জানতে পারেন, সাব-রেজিস্ট্রার নেই। ফলে ওই সপ্তাহে নকল সংগ্রহ করতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। সরোয়ার আলম বলেন, আগামী সপ্তাহে মামলার তারিখ রয়েছে। এর আগে প্রয়োজনীয় নকল সংগ্রহ করে আদালতে জমা দিতে না পারলে তাঁকে আবারও তারিখ নিতে হতে পারে। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই নষ্ট হবে। পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহের মতো জরুরি কাজেও কর্মকর্তার অনুপস্থিতির প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর মতো যাঁদের আদালতের মামলা কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে দলিলের নকল প্রয়োজন, তাঁদের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করছে।

দলিল লেখক ও ক্রেতা-বিক্রেতারাও চাপে

জেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ছানোয়ার হোসেন ছানো বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় নির্দিষ্ট দিনে জমি নিবন্ধনের কাজ হচ্ছে। এতে দলিল লেখক, নকলনবিশ এবং জমির ক্রেতা-বিক্রেতা—সবাই সমস্যায় পড়ছেন। নির্ধারিত দিনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পুরোনো দলিলের নকলসহ অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। মেলান্দহ উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফাহাদুজ্জামান নবীন বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ে রেজিস্ট্রি অফিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে এক দিনে কয়েক দিনের কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা যেমন চাপে পড়ছেন, তেমনি সেবাগ্রহীতারাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাঁদের মতে, প্রতিটি কার্যালয়ে নিয়মিত কর্মকর্তা থাকলে সেবার সময়সূচি স্থিতিশীল হবে। এতে কাজের চাপ বণ্টন করা সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষকে বারবার অফিসে যাতায়াত করতে হবে না।

দ্রুত পদায়নের আশ্বাস জেলা রেজিস্ট্রারের

এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, জনবলসংকটের কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলোর কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার পদায়ন করা হলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই শূন্য পদগুলোতে কর্মকর্তা পদায়ন করা হবে। তবে কবে নাগাদ এসব পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। আপাতত অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কার্যক্রম চললেও নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দর্শনে ভক্তদের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৬ অপরাহ্ণ
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দর্শনে ভক্তদের ঢল

শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যে মর্ত্যে দেবী দুর্গার আবাহন। ধূপ-ধুনোর সুবাস, সন্ধ্যার প্রদীপের আলো এবং ভক্তদের প্রার্থনায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে শারদীয় দুর্গোৎসবের পূজামণ্ডপগুলো। মহাষষ্ঠীর সকালে দেবী ষষ্ঠীর আরাধনা, বোধন ও আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার উৎসব। সন্ধ্যায় প্রতিমা উন্মোচনের পর দেবীদর্শনে ভক্তদের ভিড় জমে রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে।

দেবীর মুখদর্শন, অঞ্জলি নিবেদন এবং পরিবার-পরিজনের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ মন্দিরে সমবেত হন। আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপ, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ এবং ঢাক-কাঁসরের সম্মিলিত ধ্বনি শারদীয় উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবীদর্শনে ভক্তদের ঢল

মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। দেবীর মুখদর্শনের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মন্দিরে আসেন ভক্তরা। সন্ধ্যারতি, ধূপ-দীপ ও কর্পূরের আলোয় পূজামণ্ডপের পরিবেশ হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তরা করজোড়ে প্রণাম জানান। কেউ অঞ্জলি নিবেদন করেন, কেউ পরিবারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে মন্দির চত্বর পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়। শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি ও ঢাকের তালে তালে দেবীকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় ধর্মীয় আবেগ ও আনন্দের আবহ। সন্ধ্যার এই আয়োজন দুর্গোৎসবের ঐতিহ্য ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক পরিচিত চিত্র তুলে ধরে।

বেলতলায় ষষ্ঠীপূজা ও দেবীর বোধনের আনুষ্ঠানিকতা

এর আগে মহাষষ্ঠীর সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে দেবী ষষ্ঠীর আরাধনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। পুরোহিতদের সংকল্প ও মন্ত্রোচ্চারণে সম্পন্ন হয় ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। মন্দির প্রাঙ্গণের বেলতলায় আয়োজন করা হয় বিল্ববৃক্ষ বা বেলগাছ পূজার বিশেষ আচার। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বেলবৃক্ষে দেবীর আবাহনের মধ্য দিয়ে তাঁর জাগরণ ও মর্ত্যে আগমনের সূচনা হয়। তাই ষষ্ঠীর পূজায় বেলতলার আচার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পূজার বেদি সাজানো হয় গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার হলুদ-কমলা মালায়। সেখানে রাখা হয় তাম্রপাত্র, কাঁসার ঘণ্টা, শঙ্খ, পুষ্পাদানি, পঞ্চপল্লব, আম্রপল্লব, আতপ চাল, নারকেল, ঘট ও বিভিন্ন ফুল। দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয় নানা ধরনের ফল ও মিষ্টি।

পুরোহিতরা পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে এবং কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে পূজার উপাচার সম্পন্ন করেন। এরপর শঙ্খধ্বনি ও ঢাক-কাঁসরের বাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। ভক্তরা হাতে ফুল ও আম্রপল্লব নিয়ে দেবীর কৃপা কামনায় প্রার্থনা করেন।

কৈলাস থেকে মর্ত্যে কন্যারূপে দেবী দুর্গা

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী দুর্গা বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে বেড়াতে আসেন। এই আগমনকে ঘিরেই প্রতিবছর ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় আনন্দ, আবেগ ও উৎসবের প্রত্যাশা। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, অসুরশক্তির কাছে পরাজিত দেবতারা যখন স্বর্গলোক থেকে বিতাড়িত হন, তখন অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে দেবতারা সম্মিলিতভাবে এক মহাশক্তির আবির্ভাব কামনা করেন। দেবতাদের তেজ থেকে আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। সেই বিশ্বাসের ধারাবাহিকতায় দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছে অশুভের বিনাশ ও শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এবারের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং প্রস্থান নৌকায়। দেবীর আগমন ও প্রস্থানের এই প্রতীকী তাৎপর্যকে সামনে রেখে ভক্তরা দেশ, সমাজ ও সব জীবের কল্যাণ কামনা করছেন।

ঢাক-ঢোলের তালে ছয় দিন উৎসবের আমেজ

মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে পূজামণ্ডপগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। প্রতিমা দর্শন, অঞ্জলি, সন্ধ্যারতি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি আলোকসজ্জা এবং মানুষের সমাগমে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে মন্দির ও মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। ভক্তদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া এবং সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করারও উপলক্ষ। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি ও শঙ্খনাদে উৎসবের পরিবেশ বজায় থাকবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

মায়ের ছাগল বিক্রির টাকায় কেনা ফোন, সেই ছেলেই এখন জাপানে মাইক্রোসফটে

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ণ
মায়ের ছাগল বিক্রির টাকায় কেনা ফোন, সেই ছেলেই এখন জাপানে মাইক্রোসফটে

আমেরিকা বাংলা ডেস্ক: ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য একটি মোবাইল ফোন কেনার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের। ছেলের শেখার আগ্রহ দেখে মা একটি ছাগল বিক্রি করে সেই ফোন কিনে দিয়েছিলেন। সেই ফোনকে মডেম হিসেবে ব্যবহার করেই প্রযুক্তির জগতে প্রবেশের পথ খুঁজে নেন কুষ্টিয়ার তরুণ মো. নাসিম আল আওয়াল। দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আজ তিনি জাপানে মাইক্রোসফটের ক্লাউড অবকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কাজে যুক্ত হয়েছেন।

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত তাঁর সাফল্যের গল্পটি দেখিয়েছে, সীমিত সুযোগের মধ্যেও শেখার আগ্রহ ও ধারাবাহিক চেষ্টা একজন মানুষকে কত দূর এগিয়ে নিতে পারে।

ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ

কুষ্টিয়ার আমলা-সদরপুর এলাকার নাসিমের ছোটবেলা থেকেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্রতি ছিল গভীর কৌতূহল। পরিচিতদের মোবাইল ফোন কিংবা টেলিভিশনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন তিনি। এই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাঁকে প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জনের পথে এগিয়ে দেয়।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ডিনেটের কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে কম্পিউটার শেখার সুযোগ পান নাসিম। পরে ভর্তি হন কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার প্রযুক্তি বিভাগে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।

মায়ের কিনে দেওয়া ফোনেই শুরু প্রযুক্তি শেখা

নাসিমের শেখার পথে বড় সহায়তা হয়ে আসে মায়ের বিক্রি করা ছাগলের টাকায় কেনা মোবাইল ফোনটি। ওই ফোনকে মডেম হিসেবে ব্যবহার করে ইন্টারনেটে যুক্ত হতেন তিনি। অনলাইনে প্রযুক্তিবিষয়ক ভিডিও দেখতেন, বিভিন্ন ফোরামে প্রশ্ন করতেন এবং নানা সমস্যার সমাধান খুঁজতেন।

প্রযুক্তি শেখার জন্য তখন তাঁর হাতে ছিল না দামি কম্পিউটার কিংবা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। কিন্তু সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে শেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই চর্চাই তাঁর দক্ষতা ও পেশাগত জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

ডিনেটে কাজ, হাজারো শিক্ষকের সঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে অভিজ্ঞতা

২০১২ সালে ডিনেটে প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন নাসিম। পরে প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ও সহকারী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় দেশের প্রায় ৩৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার শিক্ষককে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনেই সাহায্য করেনি, বরং বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কাজ করা, সমস্যা সমাধান এবং দায়িত্ব পালনের দক্ষতাও বাড়িয়েছে।

জাপানে গিয়ে প্রথমে কাজ করেন গাড়ির কারখানায়

২০১৮ সালের শেষ দিকে জাপানে পাড়ি জমান নাসিম। তবে বিদেশে পা রেখেই প্রযুক্তি খাতে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি তিনি। প্রথমে নাগোয়ার একটি গাড়ি কারখানার উৎপাদন লাইনে কাজ শুরু করেন। নতুন দেশ, ভাষা ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও চালিয়ে যান।

পরিশ্রমের পাশাপাশি নিজের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ভাষাগত সক্ষমতা উন্নত করার চেষ্টা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সুযোগ পেলে নিজের শেখা বিষয়গুলো বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো।

এনটিটি কমিউনিকেশনসে নতুন অধ্যায়

২০২০ সালের মে মাসে নাসিম জাপানের এনটিটি কমিউনিকেশনসে নেটওয়ার্ক অপারেশনস সেন্টার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে সাবমেরিন কেবলের সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত সহায়তাসংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে নেটওয়ার্ক পরিচালনা, সমস্যা শনাক্তকরণ এবং প্রযুক্তিগত সেবা দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন নাসিম।

একবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও থামেননি

বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার স্বপ্ন পূরণে একাধিকবার আবেদন করেছিলেন নাসিম। কিন্তু সব আবেদনেই সফলতা আসেনি। ২০২২ সালে মাইক্রোসফটে আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হন তিনি।

তবে সেই ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখেননি। বরং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন। নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করা, প্রয়োজনীয় বিষয়ে শেখা এবং পরবর্তী সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকার ওপর জোর দেন।

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নাসিম মাইক্রোসফট জাপানের ক্লাউড অপারেশনস অ্যান্ড ইনোভেশনস দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। সেখানে ক্লাউড অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হন তিনি।

‘আমি কখনো অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু হাল ছাড়িনি’

নিজের অর্জন সম্পর্কে নাসিমের বক্তব্য, ‘আমি কখনো অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু হাল ছাড়িনি।’

তাঁর এই বক্তব্য সাফল্যের পেছনে ধারাবাহিক চেষ্টা ও শেখার মানসিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে। সবকিছু অনুকূলে না থাকলেও নিজের লক্ষ্য ধরে রেখে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান নাসিম। বিশেষ করে চাকরির আবেদনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর হতাশ না হয়ে কীভাবে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হয়, সে বিষয়ে তরুণদের উৎসাহিত করতে আগ্রহী তিনি।

সংগ্রাম থেকে সাফল্য, তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা

নাসিম আল আওয়ালের পথচলা শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, শেখার আগ্রহ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং বারবার ব্যর্থতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার গল্প।

মায়ের বিক্রি করা ছাগলের টাকায় কেনা একটি ফোন তাঁর প্রযুক্তি শেখার যাত্রার সূচনা করেছিল। সেই যাত্রা তাঁকে নিয়ে গেছে জাপানের প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কর্মপরিবেশে। তাঁর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের তরুণদের মনে করিয়ে দেয়, সুযোগের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হতে পারে, কিন্তু শেখার আগ্রহ ও ধারাবাহিক প্রস্তুতি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

কালের আলো/এএন/এএইচ

হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের আস্থা ধরে রাখাই বিএনপির বড় পরীক্ষা

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের আস্থা ধরে রাখাই বিএনপির বড় পরীক্ষা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন বিএনপির বিজয়ে ভূমিকা রেখেছে—এমন মূল্যায়ন করছেন দলটির নেতাদের অনেকে। তাদের মতে, অতীতে যে সম্প্রদায়কে আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য ভোটভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সমীকরণে পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। এই সমর্থন ভবিষ্যতেও ধরে রাখা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে এখন গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি।

এই প্রেক্ষাপটে শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিশেষভাবে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পূজার আয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ওপর জোর দিয়েছে দলীয় নেতৃত্ব।

  • ভোটের মাঠে বদলে যাওয়া সমীকরণ ধরে রাখার লক্ষ্য
  • নির্বাচনী সমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদি ভরসায় রূপ দিতে চায় ক্ষমতাসীন দল
  • দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি নিশ্চিতে এমপি-মন্ত্রীদের মাঠে থাকার নির্দেশ তারেক রহমানের

ভোটের সমীকরণে নতুন বাস্তবতা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটকে আওয়ামী লীগের সমর্থনভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হতো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের ভোটের হিসাব-নিকাশে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে বিএনপির নেতারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন।

দলটির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির প্রতি আস্থা রেখেছেন। তবে এই সমর্থনের ব্যাপ্তি বা ভোটের পরিসংখ্যান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া পুরো সম্প্রদায়কে একটি দলের সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিএনপি এখন এই সমর্থনকে কেবল নির্বাচনী সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখছে না; বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবেও ধরে রাখতে চাইছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের সময় তৈরি হওয়া আস্থাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তারেক রহমানের নির্দেশনায় নিরাপত্তা ও আস্থার বার্তা
সরকার গঠনের পর বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। গত ১১ অক্টোবরের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, নিরাপদ মনে করায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের।

দলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্ব একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে—নির্বাচনে পাওয়া সমর্থনের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। দুর্গাপূজায় নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলীয় নির্দেশনার লক্ষ্য শুধু উৎসবের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা নয়; বরং সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি জোরদার করা।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির আমলে এটিই প্রথম শারদীয় দুর্গাপূজা। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুক্রবার সারা দেশে শুরু হওয়া এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপির আশঙ্কা, রাজনৈতিকভাবে পরাজিত কোনো পক্ষ কিংবা অন্য কোনো মহল দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে দলীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং স্থানীয় নেতাদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীদেরও নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই সতর্কতার কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, অপ্রীতিকর ঘটনার দ্রুত প্রতিক্রিয়া, গুজব প্রতিরোধ এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।

মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ওপর জোর
নেত্রকোণা-২ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য ও দলের জেলা সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুসারে স্থানীয় প্রশাসন ও পূজামণ্ডপ কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন তারা। উৎসব যাতে আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়, সেটিই তাদের প্রধান প্রত্যাশা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিএনপির গঠিত কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্যসচিব ও দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের ভাষ্য, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য সরকার ও দল সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তারেক রহমান আগেই সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রশাসক, দলীয় নেতা ও বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ইউনিট পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুও বলেছেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে তাদের পাশে থাকতে হবে। দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পূজামণ্ডপ কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নাকি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার পরীক্ষা?
বিএনপির সামনে এখন দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দুর্গাপূজাসহ ধর্মীয় উৎসবগুলোতে নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের বাইরেও হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রাখা। শুধু উৎসবের সময় নেতাদের উপস্থিতি কিংবা নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা অর্জন করা কঠিন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তৈরি করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের একটি অভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে না দেখে তাদের স্বতন্ত্র মতামত, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক পছন্দকে সম্মান করা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো সম্প্রদায়ের সমর্থন স্থায়ীভাবে কোনো দলের একক সম্পদ নয়। সেই সমর্থন নির্ভর করে রাজনৈতিক আচরণ, সুশাসন ও জনগণের অভিজ্ঞতার ওপর। হিন্দু সম্প্রদায়ের সমর্থন ধরে রাখার রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে নাগরিক হিসেবে তাদের সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা। বিএনপি যদি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও জবাবদিহির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে বর্তমান উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/জেএন/এমকে