খুঁজুন
                               
, ,
           

বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়

খুলনা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ
বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়

বাবা মারা যান যখন তাঁর বয়স মাত্র আড়াই বছর। তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েন মা আমেনা বেগম। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো বিলে মাছ ধরেছেন। সংসারের অভাব মেটাতে ছুটেছেন বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরেও। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যায় ঘরবাড়ি। তবু সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। মায়ের সেই সংগ্রাম আর নিজের অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে একসময় গ্রামের কলেজ থেকে সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। পড়াশোনা শেষে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। চাকরির পাশাপাশি চালিয়ে যান বিসিএসের প্রস্তুতি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন খুলনার কয়রা উপজেলার বামিয়া গ্রামের মো. শরিফুল ইসলাম। শরিফুলের এই অর্জন কেবল একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই এবং সন্তানের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকার কাহিনি।

আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানো

শরিফুল ইসলামের বাবা তফেজ উদ্দীন পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। তখন শরিফুলের বয়স মাত্র আড়াই বছর। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন আমেনা বেগম। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৪-২৫ বছর। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নতুন করে সংসার গড়ার সুযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানদের বড় করে তোলা এবং তাদের শিক্ষিত করাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেন। শুরুর দিকে শরিফুলদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর নানা। নাতিদের খাবারের ব্যবস্থা করতে সপ্তাহে একবার বাজার করে দিতেন। মেয়ের নামে এক বিঘা জমিও লিখে দিয়েছিলেন। সেই সহযোগিতা পরিবারটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের দিকে নানার মৃত্যুর পর সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যায়। সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি করে এসে পড়ে আমেনা বেগমের কাঁধে।

আইলায় ভেঙে যায় ঘর, থেমে থাকেনি লড়াই

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পানির মধ্যে উঁচু তক্তার ওপর খাট রেখে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। ২০১২ সাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পরিবারটিকে। সংসার চালাতে আমেনা বেগম কখনো বিলে মাছ ধরেছেন, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ৪০ দিনের কর্মসূচিতেও কাজ করেছেন। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু অভাবের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, তা চাননি তিনি। মায়ের এই নিরন্তর সংগ্রামই ধীরে ধীরে শরিফুলের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী না থাকলেও একসময় তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জীবন বদলানোর অন্যতম পথ শিক্ষা।

অষ্টম শ্রেণি থেকেই বদলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

শরিফুল জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি তাঁর খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। তবে অষ্টম শ্রেণির শেষ দিকে তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মায়ের কষ্ট এবং পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। এ সময় বড় ভাইয়ের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনাও তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়ান তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালে বামিয়া এমএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন শরিফুল। ফল ভালো হলেও আর্থিক সংকট তাঁর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শহরের সরকারি কলেজে পড়ার সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হন কয়রার খান সাহেব কোমর উদ্দীন ডিগ্রি কলেজে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি।

গ্রামের কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

অভাব-অনটনকে সঙ্গী করেই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় সাফল্য আসে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। ভর্তি পরীক্ষায় ৮১ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় ৩৪৪তম স্থান অর্জন করেন তিনি। সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার। গ্রামের একটি কলেজ থেকে পড়াশোনা করে দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে ঢাকায় পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজের খরচের বড় একটি অংশ জোগাতে টিউশনি করতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র এবং যেসব পরিবারের সন্তানদের তিনি পড়াতেন, তাঁদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন শরিফুল। নানা মানুষের সহায়তা ও নিজের পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

জনতা ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতি

পড়াশোনা শেষ করে ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন শরিফুল ইসলাম। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি। কর্মব্যস্ততার মধ্যেই চালিয়ে যান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন মা আমেনা বেগম, বড় ভাই এবং স্ত্রী রাবিনা সুলতানা। পরিবারের সমর্থন তাঁকে লক্ষ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্রথম দুটি বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও হাল ছাড়েননি শরিফুল। ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে যান। পরে ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। ৪০তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান শরিফুল। তাঁর এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবারের নিরন্তর সমর্থন।

শুধু নিজের নয়, অন্য শিক্ষার্থীদের স্বপ্নও পূরণ করতে চান

শরিফুল মনে করেন, আর্থিক সংকট ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অনেকে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, একজন শিক্ষার্থীর এগিয়ে যাওয়ার পথে আর্থিক সহায়তা, পরিবারের সমর্থন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে তাঁর মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে চান তিনি। শরিফুলের লক্ষ্য, শুধু নিজের সাফল্যে থেমে না থেকে অন্যদেরও স্বপ্নপূরণে সহযোগিতা করা। কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়—এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

মায়ের সংগ্রামের সার্থকতা

যে মা একসময় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, বিলে মাছ ধরেছেন, দূরে গিয়ে শ্রম দিয়েছেন—আজ তাঁর সেই সন্তান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শরিফুলের এ সাফল্য আমেনা বেগমের দীর্ঘ সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই গল্পে শুধু সাফল্যের আনন্দ নেই; আছে দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রিয়জন হারানো এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা। প্রতিটি বাধার মধ্যেও মা ও ছেলে নিজেদের স্বপ্ন আঁকড়ে রেখেছেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

পাকা সড়ক-ব্রিজে খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার, বদলাচ্ছে দৌলতপুরের চর

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১৯ অপরাহ্ণ
পাকা সড়ক-ব্রিজে খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার, বদলাচ্ছে দৌলতপুরের চর

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ কাটিয়ে উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা দেখছে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চরাঞ্চল। যমুনা, কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীবেষ্টিত বাচামারা, বাঘুটিয়া, চরকাটারী ও জিয়নপুরের মানুষের কাছে একসময় পাকা সড়ক ও ব্রিজে চলাচল ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। বর্ষা, নদীভাঙন আর কাঁচা-ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাঁদের। এখন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়ক পাকা ও ব্রিজ নির্মাণের ফলে বদলাতে শুরু করেছে এই জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা। একসময় যে পথে পায়ে হেঁটে চলাচল করাই ছিল কষ্টসাধ্য, সেই পথেই এখন চলছে হ্যালো বাইক, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন। কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল সহজে হাটবাজারে নিতে পারছেন। পাশাপাশি দৌলতপুর, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ সদর ও পার্শ্ববর্তী নাগরপুরের মানুষের যাতায়াতও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

নদীভাঙনের চরের আঁকাবাঁকা পথ এখন পাকা

যমুনার ভাঙনের পর জেগে ওঠা চরের ওপর দিয়ে বাচামারা যাওয়ার একমাত্র আঁকাবাঁকা সড়কটি দীর্ঘদিন ছিল বেহাল অবস্থায়। ভাঙাচোরা ও অনুন্নত এই পথে মানুষের চলাচল যেমন কঠিন ছিল, তেমনি কৃষিপণ্য পরিবহনেও নানা বাধার মুখে পড়তে হতো। এলজিইডির উদ্যোগে সড়কটি পাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে সিসি ব্লক বসিয়ে যোগাযোগপথটিকে আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে। এর ফলে চরাঞ্চলের কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল ও অন্যান্য পণ্য তুলনামূলক সহজে হাটবাজারে পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেও এসেছে স্বস্তি। আগে যেখানে পথের দুরবস্থার কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হতো, সেখানে এখন সড়ক উন্নয়নের সুফল পাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ছয়টি বড় ব্রিজে সহজ হচ্ছে যোগাযোগ

দৌলতপুরের চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে এলজিইডির আওতায় নির্মিত ছয়টি বড় ব্রিজ। চকমিরপুর-কলিয়া সড়কের গাজী ছাইল, উলাইল ও কালিদহ এলাকায় তিনটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে কলিয়া-ধামশ্বর সড়কের পুরাতন ধামশ্বর, ধামশ্বর মাজারসংলগ্ন এলাকা এবং নতুন ধামশ্বর বাজার এলাকায় নির্মিত হয়েছে আরও তিনটি ব্রিজ। এসব ব্রিজের ফলে বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যাতায়াতের পথ সহজ হয়েছে। নদী-খাল ও নিচু এলাকার কারণে আগে যে পথে চলাচলে বাড়তি সময় ও কষ্ট হতো, সেখানে এখন যানবাহন চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্রিজগুলো চালু হওয়ায় দৌলতপুরের পাশাপাশি সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ সদর এবং টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের যাতায়াতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

১৫ বছরের দুর্ভোগের কথা জানালেন চালকেরা

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণ কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ভোগান্তি কমারও একটি বড় কারণ। হ্যালো বাইকচালক আবুল কাশেম ও আব্দুল আলী বলেন, গত ১৫ বছর ধরে এই সড়কে চলাচল করতে গিয়ে তাঁদের পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হতো। রাস্তার অবস্থা এমন ছিল যে যানবাহন চলাচল করতে পারত না। এখন সড়কের কাজ হওয়ায় হ্যালো বাইক, অটোরিকশা ও বড় যানবাহন চলাচল করছে। এতে তাঁদের যাতায়াত ও জীবিকার কাজ অনেক সহজ হয়েছে। তিল্লি গ্রামের এক পথযাত্রীও ব্রিজ নির্মাণে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, ব্রিজটি হওয়ায় এলাকার মানুষের উপকার হয়েছে। এখন সহজেই বিভিন্ন যানবাহনে চলাচল করা যাচ্ছে। তবে গ্রামগঞ্জের যেসব কাঁচা রাস্তা এখনো সংস্কার বা পাকা করা হয়নি, সেগুলোও উন্নয়নের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সড়কের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক অবকাঠামোয় উন্নয়ন

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসনিক অবকাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। লাউতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মান্দারতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাঘুটিয়া ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ এবং খলসী-শ্যামগঞ্জ সড়কসহ বেশ কয়েকটি পাকা সড়ক ও ব্রিজের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ ও যোগাযোগের সুযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা পাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের আওতায় রাস্তাঘাট, কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান, ঈদগাহ ও মন্দিরসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর প্রায় ৮০টি উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

উন্নয়ন হলেও নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধের দাবি

সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণে যোগাযোগের দুর্ভোগ কমলেও চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান উদ্বেগ এখনো নদীভাঙন। নদীবেষ্টিত এই এলাকার মানুষের কাছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই চলমান উন্নয়নের পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাচামারা গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুর রউফ মিঠু বলেন, চরাঞ্চলবাসীর প্রধান দাবি এখন নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ। পাশাপাশি আমতলী নদীর ওপর প্রস্তাবিত ব্রিজটি নির্মিত হলে চারটি ইউনিয়নের সরাসরি সড়ক যোগাযোগে নতুন অধ্যায় সূচিত হবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আমতলী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করা গেলে এলাকার যোগাযোগের আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রায় শতকোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শেষ ও চলমান

দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী খন্দকার এনামুস সালেহীন জানান, সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের দিকনির্দেশনা এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল উদ্দিনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রায় শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে এবং কিছু কাজ চলমান রয়েছে। তিনি জানান, আমতলী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য জায়গা নির্বাচন ও মাটি পরীক্ষার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রস্তাবিত ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চরাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনার অপেক্ষা

দৌলতপুরের চরাঞ্চলে পাকা সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণ মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিপণ্য পরিবহন, স্থানীয় বাজারে যাতায়াত এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব অবকাঠামো নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণই যথেষ্ট নয়। নদীভাঙন প্রতিরোধ, চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করা এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে যোগাযোগের সুবিধা সম্প্রসারণও জরুরি। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মানিকগঞ্জের চরাঞ্চলে উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত হবে এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে জনপদটি এগিয়ে যাওয়ার নতুন সুযোগ পাবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আহতদের সেবা দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ, সেই রীপার পাশে তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১১ অপরাহ্ণ
আহতদের সেবা দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ, সেই রীপার পাশে তারেক রহমান

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের স্বেচ্ছায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন নার্স রীপা ফ্রান্সিসকো গোমেজ। শরীরে ৪৭টি সীসার ছররা ও দুটি রাবার বুলেটের আঘাত নিয়ে সেই থেকে শারীরিক নানা জটিলতার সঙ্গে লড়ছেন তিনি। তাঁর ডান চোখের কোটরে গুরুতর আঘাত লাগে, আর একটি বুলেট আটকে যায় মস্তিষ্কের ১৪ সেন্টিমিটার গভীরে। এবার এই জুলাইযোদ্ধার খোঁজখবর নিতে নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীপা গোমেজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও জীবনসংগ্রাম নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্র নজরে আসার পর তারেক রহমান তাঁর খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় রীপার বাসায় যায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর একটি প্রতিনিধিদল।

রীপার বাসায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রতিনিধিদল

প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুন। এ সময় তাঁরা রীপা ফ্রান্সিসকো গোমেজের শারীরিক অবস্থার সার্বিক খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জানা গেছে, রীপা গোমেজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র সম্প্রতি তারেক রহমানের নজরে আসে। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে এই জুলাইযোদ্ধার খোঁজখবর নিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সদস্য মাসুদ রানা লিটন, ফরহাদ আলী সজীব, রুবেল আমিন এবং ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল মিসবাহসহ অন্যরা।

আহতদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ

রীপা ফ্রান্সিসকো গোমেজ পেশায় একজন নার্স। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর রামপুরা ব্রিজের কাছে আহত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন তিনি। অন্যদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সেই সময়েই গুলিবিদ্ধ হন রীপা। ওই দিন ৪৭টি সীসার ছররা গুলি ও দুটি রাবার বুলেটের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। তাঁর ডান চোখের কোটরে লাগে সবচেয়ে গুরুতর আঘাত। একটি বুলেট মস্তিষ্কের ১৪ সেন্টিমিটার গভীরে আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আহতদের সেবা দিতে এগিয়ে যাওয়া এই স্বাস্থ্যকর্মীর নিজের জীবনই কঠিন শারীরিক সংকটের মুখে পড়ে।

দৃষ্টিশক্তির জটিলতা, প্রতিনিয়ত চিকিৎসার চাপ

সেই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে দৃষ্টিশক্তির জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন রীপা। গুলির আঘাতের পরবর্তী প্রভাব তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তুলেছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের সুযোগও কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত চিকিৎসার ব্যয়। একদিকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন, অন্যদিকে সীমিত কর্মক্ষমতা ও আয়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাঁর।

চিকিৎসার খরচ জোগাতে এখনো রোগীদের সেবা

শারীরিক অসুস্থতা ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও থেমে নেই রীপার জীবনসংগ্রাম। নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে এখনো অন্য রোগীদের সেবা করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তিনি। যিনি একসময় সংকটের মুহূর্তে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁকেই এখন নিজের চিকিৎসা ও জীবন চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রীপা গোমেজের ঘটনা গণ-অভ্যুত্থানের সময় আহতদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেরাই আহত হয়ে পড়া মানুষের ত্যাগ ও পরবর্তী জীবনের বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। গুরুতর আঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, চিকিৎসার ব্যয় এবং কর্মজীবনে সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁকে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

এআইয়ের যুগে লেখকের নিজস্বতা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে?

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১০ অপরাহ্ণ
এআইয়ের যুগে লেখকের নিজস্বতা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে?

একসময় একটি কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাসের পেছনে থাকত দীর্ঘ ভাবনা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কল্পনা আর শব্দের সঙ্গে লেখকের নিরন্তর লড়াই। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় কয়েক মুহূর্তেই তৈরি করা যাচ্ছে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এমনকি উপন্যাসের খসড়াও। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি লেখালেখিকে সহজ করেছে, খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে লেখকের নিজস্বতা, সৃজনশীলতা ও মৌলিক সাহিত্যচর্চা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে?

প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে লেখালেখির ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কেউ এআই ব্যবহার করছেন ভাবনা গুছিয়ে নিতে, কেউ ভাষা সম্পাদনা করতে, আবার কেউ গল্পের প্লট কিংবা কবিতার খসড়া তৈরিতেও নিচ্ছেন প্রযুক্তির সহায়তা। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে, সহজ হচ্ছে তথ্য সাজানো ও লেখার প্রাথমিক কাঠামো তৈরি। বিশেষ করে নতুন লেখকদের কাছে এআই হয়ে উঠতে পারে লেখালেখির একটি সহায়ক মাধ্যম।

কিন্তু লেখার ভাষা সুন্দর হলেই কি তা হয়ে ওঠে নিজস্ব সৃষ্টি? নাকি একটি লেখার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে লেখকের জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও স্বতন্ত্র চিন্তার মধ্যে? এআইনির্ভর লেখালেখির বিস্তারের সঙ্গে এই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

লেখকের স্বতন্ত্র কণ্ঠ কি হারিয়ে যাবে?
একজন লেখকের পরিচয় শুধু তাঁর ব্যবহৃত শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর চিন্তার ধরন, অভিজ্ঞতার গভীরতা, সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনুভূতি প্রকাশের নিজস্ব পদ্ধতিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। একই বিষয় নিয়ে লেখা হলেও দুই লেখকের ভাষা ও উপলব্ধিতে পার্থক্য থাকে।

এআই সাধারণত নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ থেকে শেখা ধরন এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা তৈরি করে। ফলে এর তৈরি লেখায় ভাষাগত সাবলীলতা থাকলেও সব ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জটিল অনুভূতি কিংবা স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টির গভীরতা প্রতিফলিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

তবে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া মানেই লেখকের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলা নয়। লেখক যদি নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেন, তাহলে প্রযুক্তি তাঁর কাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। বিপরীতে, এআইয়ের তৈরি লেখা যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিজের নামে প্রকাশ করলে মৌলিকতা ও লেখকসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

মৌলিকতা ও কপিরাইট নিয়ে নতুন উদ্বেগ
এআই দিয়ে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে মৌলিকতার পাশাপাশি কপিরাইট ও লেখকত্বের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। একটি লেখা কতটা মানুষের নিজস্ব অবদান, কতটা প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি—তা নির্ধারণ সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে সাহিত্য প্রতিযোগিতা, পুরস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিষয়টি নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন তৈরি করছে।

এআইয়ের তৈরি কোনো লেখা অন্যের প্রকাশিত রচনার সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে মিলে গেলে কিংবা তাতে ভুল তথ্য যুক্ত হলে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি লেখা প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, ভাষা পরিমার্জন এবং মৌলিকতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও সাহিত্য সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। এআই ব্যবহারের নীতিমালা, লেখকের অবদানের স্বীকৃতি এবং প্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহারের তথ্য প্রকাশের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে বিভ্রান্তি কমতে পারে।

তরুণ লেখকদের জন্য সুযোগ, নাকি নির্ভরতার ফাঁদ?
নতুন লেখকদের জন্য এআই একদিকে যেমন সহায়ক, অন্যদিকে অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন, সম্পাদনা কিংবা লেখার কাঠামো সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়া শেখার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু প্রতিটি ভাবনা ও বাক্য তৈরির দায়িত্ব প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিলে লেখকের নিজস্ব ভাষা ও চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

লেখালেখির দক্ষতা তৈরি হয় নিয়মিত চর্চা, পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ, ভুল থেকে শেখা এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে। এআই তাৎক্ষণিকভাবে একটি খসড়া তৈরি করে দিতে পারলেও একজন লেখকের দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাস, জীবনবোধ ও সৃজনশীল বিকাশের বিকল্প হতে পারে না।

প্রযুক্তি কি সৃজনশীলতার প্রতিদ্বন্দ্বী?
এআইকে কেবল লেখকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। গবেষণা, তথ্য সাজানো, প্রাথমিক সম্পাদনা, অনুবাদে সহায়তা কিংবা নতুন ধারণা নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে লেখক সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান।

তবে সাহিত্য কেবল তথ্য ও শব্দের বিন্যাস নয়। মানুষের অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা, দ্বন্দ্ব, স্মৃতি, কল্পনা এবং সময়কে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যকে অর্থবহ করে তোলে। ফলে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি লেখকের নিজস্ব বিচারবোধ ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখকের নিজস্বতা রক্ষায় কী প্রয়োজন?
এআইয়ের যুগে লেখকের নিজস্বতা ধরে রাখতে নিয়মিত বই পড়া, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা, ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রযুক্তির তৈরি খসড়াকে চূড়ান্ত লেখা হিসেবে গ্রহণ না করে নিজের চিন্তা ও ভাষায় পুনর্গঠন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে প্রকাশক, সম্পাদক, সাহিত্য সংগঠন ও পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এআই ব্যবহারের বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা। এতে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি লেখকের মৌলিক অবদান, স্বচ্ছতা ও সৃজনশীল স্বাধীনতাও গুরুত্ব পাবে।

সব মিলিয়ে, এআইয়ের অগ্রযাত্রা লেখালেখির জগতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রযুক্তি লেখার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে, কিন্তু একজন লেখকের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে। তাই এআইয়ের যুগে লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলা নয়; বরং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও নিজের কণ্ঠ, চিন্তা ও সৃজনশীল স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা।

কালের আলো/জেএন/এসএ