বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়
বাবা মারা যান যখন তাঁর বয়স মাত্র আড়াই বছর। তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েন মা আমেনা বেগম। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো বিলে মাছ ধরেছেন। সংসারের অভাব মেটাতে ছুটেছেন বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরেও। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যায় ঘরবাড়ি। তবু সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। মায়ের সেই সংগ্রাম আর নিজের অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে একসময় গ্রামের কলেজ থেকে সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। পড়াশোনা শেষে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। চাকরির পাশাপাশি চালিয়ে যান বিসিএসের প্রস্তুতি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন খুলনার কয়রা উপজেলার বামিয়া গ্রামের মো. শরিফুল ইসলাম। শরিফুলের এই অর্জন কেবল একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই এবং সন্তানের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকার কাহিনি।
আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানো
শরিফুল ইসলামের বাবা তফেজ উদ্দীন পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। তখন শরিফুলের বয়স মাত্র আড়াই বছর। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন আমেনা বেগম। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৪-২৫ বছর। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নতুন করে সংসার গড়ার সুযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানদের বড় করে তোলা এবং তাদের শিক্ষিত করাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেন। শুরুর দিকে শরিফুলদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর নানা। নাতিদের খাবারের ব্যবস্থা করতে সপ্তাহে একবার বাজার করে দিতেন। মেয়ের নামে এক বিঘা জমিও লিখে দিয়েছিলেন। সেই সহযোগিতা পরিবারটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের দিকে নানার মৃত্যুর পর সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যায়। সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি করে এসে পড়ে আমেনা বেগমের কাঁধে।
আইলায় ভেঙে যায় ঘর, থেমে থাকেনি লড়াই
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পানির মধ্যে উঁচু তক্তার ওপর খাট রেখে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। ২০১২ সাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পরিবারটিকে। সংসার চালাতে আমেনা বেগম কখনো বিলে মাছ ধরেছেন, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ৪০ দিনের কর্মসূচিতেও কাজ করেছেন। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু অভাবের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, তা চাননি তিনি। মায়ের এই নিরন্তর সংগ্রামই ধীরে ধীরে শরিফুলের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী না থাকলেও একসময় তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জীবন বদলানোর অন্যতম পথ শিক্ষা।
অষ্টম শ্রেণি থেকেই বদলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
শরিফুল জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি তাঁর খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। তবে অষ্টম শ্রেণির শেষ দিকে তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মায়ের কষ্ট এবং পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। এ সময় বড় ভাইয়ের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনাও তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়ান তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালে বামিয়া এমএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন শরিফুল। ফল ভালো হলেও আর্থিক সংকট তাঁর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শহরের সরকারি কলেজে পড়ার সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হন কয়রার খান সাহেব কোমর উদ্দীন ডিগ্রি কলেজে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি।
গ্রামের কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
অভাব-অনটনকে সঙ্গী করেই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় সাফল্য আসে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। ভর্তি পরীক্ষায় ৮১ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় ৩৪৪তম স্থান অর্জন করেন তিনি। সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার। গ্রামের একটি কলেজ থেকে পড়াশোনা করে দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে ঢাকায় পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজের খরচের বড় একটি অংশ জোগাতে টিউশনি করতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র এবং যেসব পরিবারের সন্তানদের তিনি পড়াতেন, তাঁদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন শরিফুল। নানা মানুষের সহায়তা ও নিজের পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।
জনতা ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতি
পড়াশোনা শেষ করে ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন শরিফুল ইসলাম। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি। কর্মব্যস্ততার মধ্যেই চালিয়ে যান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন মা আমেনা বেগম, বড় ভাই এবং স্ত্রী রাবিনা সুলতানা। পরিবারের সমর্থন তাঁকে লক্ষ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্রথম দুটি বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও হাল ছাড়েননি শরিফুল। ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে যান। পরে ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। ৪০তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান শরিফুল। তাঁর এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবারের নিরন্তর সমর্থন।
শুধু নিজের নয়, অন্য শিক্ষার্থীদের স্বপ্নও পূরণ করতে চান
শরিফুল মনে করেন, আর্থিক সংকট ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অনেকে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, একজন শিক্ষার্থীর এগিয়ে যাওয়ার পথে আর্থিক সহায়তা, পরিবারের সমর্থন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে তাঁর মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে চান তিনি। শরিফুলের লক্ষ্য, শুধু নিজের সাফল্যে থেমে না থেকে অন্যদেরও স্বপ্নপূরণে সহযোগিতা করা। কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়—এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চান তিনি।
মায়ের সংগ্রামের সার্থকতা
যে মা একসময় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, বিলে মাছ ধরেছেন, দূরে গিয়ে শ্রম দিয়েছেন—আজ তাঁর সেই সন্তান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শরিফুলের এ সাফল্য আমেনা বেগমের দীর্ঘ সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই গল্পে শুধু সাফল্যের আনন্দ নেই; আছে দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রিয়জন হারানো এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা। প্রতিটি বাধার মধ্যেও মা ও ছেলে নিজেদের স্বপ্ন আঁকড়ে রেখেছেন।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array