খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রাচীন গ্রিক পুরাণ থেকে আধুনিক প্রেম, অ্যান কারসনের অনন্য সাহিত্যভুবন

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০১ অপরাহ্ণ
প্রাচীন গ্রিক পুরাণ থেকে আধুনিক প্রেম, অ্যান কারসনের অনন্য সাহিত্যভুবন

প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্র, আধুনিক মানুষের প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট—এই ভিন্ন জগতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। ধ্রুপদি সাহিত্যের গভীর পাঠ এবং প্রচলিত সাহিত্যরীতির বাইরে গিয়ে লেখার স্বতন্ত্র ভঙ্গির জন্য পরিচিত এই সাহিত্যিক ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রাচীন পুরাণের চরিত্রগুলো কেবল অতীতের গল্পের অংশ হয়ে থাকে না; বরং সমকালীন মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও অস্তিত্বের সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়।

কারসনের সাহিত্যজগতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি অটোবায়োগ্রাফি অব রেড। গ্রিক পুরাণের লাল ডানাওয়ালা দানব গেরিয়নের কাহিনিকে আধুনিক প্রেম, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে রূপ দিয়েছেন তিনি। প্রচলিত পুরাণে যে চরিত্রকে দানব হিসেবে দেখা হয়, কারসনের লেখায় সেই চরিত্রই হয়ে ওঠে গভীর অনুভূতিসম্পন্ন এক মানুষ, যে নিজের ভিন্নতা নিয়ে সমাজের সঙ্গে লড়াই করে এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে নিজেকে বুঝতে চায়।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে আধুনিক মানুষের মনোজগৎ

অ্যান কারসনের সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা, পুরাণ, কবিতা ও নাটক। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি সাহিত্য পড়িয়েছেন তিনি। প্রাচীন সাহিত্য অনুবাদের পাশাপাশি নিজের কবিতা, প্রবন্ধ ও নিরীক্ষাধর্মী গদ্যে অতীতের উপাদানকে নতুন অর্থে ব্যবহার করেছেন।

কৈশোরে গ্রিক কবি সাফোর কবিতার সঙ্গে পরিচয় তাঁর সাহিত্যজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি বইয়ের দোকানে সাফোর কবিতার গ্রিক-ইংরেজি সংস্করণ খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। গ্রিক ভাষার প্রতি আকর্ষণ এবং কবিতার খণ্ডিত অংশের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি তাঁকে ভাষাটি গভীরভাবে শেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

পরবর্তী সময়ে সাফোর টিকে থাকা কবিতার খণ্ডাংশ অনুবাদ করে ২০০০ সালে প্রকাশ করেন ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব সাফো। বইটিতে প্রাচীন কবিতার অসম্পূর্ণ অংশগুলোর মধ্য দিয়ে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক অনুভূতির যে জগৎ ফুটে ওঠে, তা কারসনের অনুবাদদৃষ্টির পরিচয় বহন করে।

গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিস, সফোক্লিস ও এসকাইলাসের রচনাও তাঁর সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ। এসব নাটক অনুবাদের পাশাপাশি তিনি প্রাচীন সাহিত্যকে নতুন কাঠামো ও ভাষাভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর কাজ কেবল অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রাচীন সাহিত্যকে সমকালীন পাঠকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সৃজনশীল প্রয়াসে পরিণত হয়েছে।

‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’: এক দানবের ভেতরে মানুষের গল্প

কারসনের বহুল আলোচিত বই অটোবায়োগ্রাফি অব রেড একটি কাব্যোপন্যাস। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরিয়ন গ্রিক পুরাণের সেই লাল ডানাওয়ালা দানব, যাকে বীর হারকিউলিস হত্যা করে। প্রাচীন কাহিনিতে গেরিয়ন মূলত হারকিউলিসের অভিযানের একটি প্রতিপক্ষ। কিন্তু কারসন চরিত্রটির দিকে তাকিয়েছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে।

তিনি যেন প্রশ্ন তুলেছেন—যাকে পৃথিবী দানব বলে চিহ্নিত করে, তার নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার গল্পটি কেমন?

এই প্রশ্ন থেকেই গেরিয়ন কারসনের উপন্যাসে নতুন জীবন পায়। সে হয়ে ওঠে এমন এক কিশোর, যে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে। তার পিঠে রয়েছে লাল ডানা, যা সে পোশাকের নিচে লুকিয়ে রাখে। ডানাগুলো কেবল পুরাণের অলৌকিক উপাদান নয়; এগুলো তার স্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয় এবং সমাজের কাছে নিজের প্রকৃত সত্তা প্রকাশ করতে না পারার প্রতীক।

গেরিয়নের পরিবারেও রয়েছে নিঃসঙ্গতা ও ভয়ের অভিজ্ঞতা। বড় ভাইয়ের নির্যাতন এবং নিজের ভিন্নতা আড়াল করে রাখার চাপ তাকে ক্রমে অন্তর্মুখী করে তোলে। চারপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে না পারার অভিজ্ঞতা তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ায়।

নিজের ভেতরের জগৎকে বোঝার জন্য গেরিয়ন ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। ক্যামেরার মাধ্যমে সে চারপাশের পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখতে এবং অভিজ্ঞতাগুলো ধরে রাখতে চায়। অন্যদের চোখে যা সাধারণ দৃশ্য, তার কাছে তা হয়ে ওঠে অনুভূতি ও অর্থের নতুন ক্ষেত্র।

হারকিউলিসের প্রেম ও প্রত্যাখ্যানের ক্ষত

গেরিয়নের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে হারকিউলিসের সঙ্গে পরিচয়ের পর। কৈশোরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গেরিয়ন নিজের আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। কিন্তু সম্পর্কটি স্থায়ী হয় না। হারকিউলিস অন্য একজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেরিয়নকে ছেড়ে চলে যায়।

এই প্রত্যাখ্যান গেরিয়নের কাছে কেবল প্রেম হারানোর অভিজ্ঞতা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্ন। সে যেন নিজের ভিন্নতাকে ভালোবাসার অযোগ্য হওয়ার কারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

কারসনের উপন্যাসে লাল ডানার প্রতীকটি এখানেই বিশেষ তাৎপর্য পায়। গেরিয়নের ডানা যেমন তার স্বাতন্ত্র্যকে প্রকাশ করে, তেমনি তা আড়াল করার চেষ্টা তার নিজের পরিচয়কে গোপন রাখার মানসিক চাপেরও প্রতিফলন। ডানাকে লুকিয়ে রাখা মানে নিজের এমন একটি অংশকে আড়াল করা, যেটিকে সে একদিকে ভালোবাসে, অন্যদিকে সামাজিক প্রত্যাখ্যানের ভয়ে প্রকাশ করতে সাহস পায় না।

এইভাবে প্রাচীন পুরাণের একটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে কারসন আধুনিক মানুষের প্রেম, যৌনপরিচয়, আত্মসম্মান ও বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। গেরিয়নের গল্পে ব্যক্তিগত কষ্টের পাশাপাশি রয়েছে সেই সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত, যেখানে প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা মানুষকে প্রায়ই নিজের পরিচয় আড়াল করে চলতে হয়।

লাল ডানা কি শেষ পর্যন্ত মুক্তির প্রতীক?

গেরিয়নের জীবনে হারকিউলিসের প্রত্যাখ্যান দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করলেও তার গল্প শেষ পর্যন্ত কেবল বেদনার মধ্যে আটকে থাকে না। সময়ের ব্যবধানে পুরোনো সম্পর্কের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি সে নিজের পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে বোঝার সুযোগ পায়।

কাহিনির শেষভাগে গেরিয়নের জীবনে গ্রহণযোগ্যতার একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা আসে। হারকিউলিসের নতুন সঙ্গী আনকাশ তার লাল ডানা দেখে তাকে প্রত্যাখ্যান না করে গ্রহণ করে। এই অভিজ্ঞতা গেরিয়নের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এত দিন যে বৈশিষ্ট্যকে সে লজ্জা ও ভয়ের সঙ্গে লুকিয়ে রেখেছিল, অন্য একজনের কাছে সেটিই ঘৃণার কারণ হয় না।

উপন্যাসের শেষ দিকে আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে গেরিয়নের ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার চিত্রটি আত্মমুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আগুন, ডানা ও উড্ডয়নের এই চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে সে যেন নিজের পরিচয়কে আর অপরাধ হিসেবে দেখতে চায় না। অন্যের স্বীকৃতির জন্য নিজের অস্তিত্ব অস্বীকার করার পরিবর্তে সে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে গ্রহণ করতে শেখে।

এই মুক্তি অবশ্য কেবল একটি প্রেমের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার বিষয় নয়। এটি নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ভয়, লজ্জা ও অপরাধবোধের সঙ্গে বোঝাপড়ারও গল্প। কারসনের সাহিত্যিক কৃতিত্ব হলো, তিনি পুরাণের পরিচিত চরিত্রকে ব্যবহার করে এমন একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন, যা সমকালীন পাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক।

ভাষা ও আঙ্গিকে স্বতন্ত্র অ্যান কারসন

অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের বিশেষত্ব শুধু বিষয়বস্তুতে নয়, লেখার আঙ্গিকেও। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, নাট্যরূপ ও দৃশ্যভিত্তিক উপস্থাপনার মধ্যে তিনি প্রায়ই প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম করেন। তাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য যেমন উপস্থিত থাকে, তেমনি থাকে আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত সংকট ও অনুভূতির জটিলতা।

তাঁর রচনায় পাঠককে সব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া হয় না। বরং খণ্ডিত স্মৃতি, সংক্ষিপ্ত বাক্য, পৌরাণিক অনুষঙ্গ এবং ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যরীতির সংমিশ্রণে তৈরি হয় বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। ফলে তাঁর লেখা একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান ও আবেগের জগৎ হয়ে ওঠে।

সাফোর কবিতা অনুবাদ থেকে শুরু করে গ্রিক ট্র্যাজেডির পুনর্নির্মাণ কিংবা অটোবায়োগ্রাফি অব রেড—সব ক্ষেত্রেই কারসন প্রাচীন সাহিত্যকে কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দেখেননি। বরং সেসব রচনার মধ্যে এমন অনুভূতি ও প্রশ্ন খুঁজেছেন, যা সময়ের পরিবর্তনেও মানুষের জীবনে ফিরে আসে।

ব্যক্তিগত জীবন, অসুস্থতা ও সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতা

কানাডায় জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন শিক্ষকতা, গবেষণা, অনুবাদ ও লেখালেখিতে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, মিশিগান ইউনিভার্সিটি ও বার্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে ধ্রুপদি সাহিত্য পড়িয়েছেন তিনি। তাঁর সাহিত্যজীবন প্রমাণ করে, প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গভীর গবেষণাও আধুনিক সৃজনশীলতার নতুন পথ তৈরি করতে পারে।

জীবনের পরবর্তী সময়ে পারকিনসনস রোগের সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ের কথাও সামনে এসেছে। এই স্নায়বিক রোগ চলাফেরা ও হাতের সূক্ষ্ম কাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। তবু তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের পাঠ, অনুসন্ধান এবং প্রচলিত রীতিকে নতুনভাবে দেখার প্রবণতা।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার তাঁর সাহিত্যকর্মের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুরস্কারটির অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থের একাংশ চিকিৎসাসেবামূলক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসকে দেওয়ার এবং বাকি অর্থের একটি অংশ দিয়ে এক বন্ধুকে বাড়ি কিনতে সহায়তা করার কথা ভেবেছেন তিনি।

পুরাণের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের গল্প

অ্যান কারসনের সাহিত্যভুবনে প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্রগুলো নতুন অর্থে ফিরে আসে। গেরিয়নের লাল ডানা হয়ে ওঠে ভিন্নতার প্রতীক; হারকিউলিসের প্রত্যাখ্যান প্রকাশ করে প্রেম ও আত্মসম্মানের জটিলতা; আর শেষের উড্ডয়ন ইঙ্গিত দেয় নিজের পরিচয়কে গ্রহণ করার সম্ভাবনার দিকে।

এই কারণেই অটোবায়োগ্রাফি অব রেড কেবল পুরাণের আধুনিক পুনর্কথন নয়। এটি এমন এক সাহিত্যিক অনুসন্ধান, যেখানে প্রশ্ন করা হয়—মানুষকে কে বা কারা দানব হিসেবে চিহ্নিত করে, ভালোবাসার জন্য কেন কাউকে নিজের পরিচয় লুকাতে হয়, আর অন্যের স্বীকৃতি ছাড়াও কি নিজের অস্তিত্বকে গ্রহণ করা সম্ভব?

অ্যান কারসনের সাহিত্য সেই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেয় না। বরং পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ফিরে তাকাতে আহ্বান জানায়। প্রাচীন গ্রিসের একটি দানবের লাল ডানার মধ্য দিয়ে তিনি তাই আধুনিক মানুষের হৃদয়ের গল্প বলেন—যেখানে প্রেম আছে, প্রত্যাখ্যান আছে, নিঃসঙ্গতা আছে, আবার নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে।

কালের আলো/জেএন/এসএ

ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ
ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

একটি নিয়োগ পরীক্ষা, লাখো চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্ন আর কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার গোপন ব্যবস্থা। ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে পাওয়া প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি সকাল সোয়া ৬টার দিকে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর তৈরি হয় উত্তরপত্র, আর তা ছড়িয়ে পড়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের কাছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তবে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঘটনার সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে, কীভাবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছাল এবং এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তদন্ত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

  • যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নাম
  • ৮–১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন-উত্তর বিক্রির তথ্য; সাতজন গ্রেপ্তার
  • প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো অজানা

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রশ্ন থেকে উত্তরপত্র
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে জানানো তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ তাঁর মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের তুলনামূলক স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহকর্মী এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করেছে এসআরবি। পরবর্তী সময়ে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে উত্তরপত্র পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থী এবং প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে।

অর্থাৎ, তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে শুধু প্রশ্নপত্র সংগ্রহের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ছবি আদান-প্রদান, উত্তর প্রস্তুত, একাধিক ব্যক্তির মধ্যে তথ্য সরবরাহ এবং অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তদন্তের এই বর্ণনা সত্য হলে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি কোনো একক ব্যক্তির তাৎক্ষণিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রশ্ন সংগ্রহ থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত আলাদা আলাদা ভূমিকা পালনকারী একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছিল।

প্রশ্নের দাম ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা পরিচিত প্রার্থীদের কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক বেড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই অর্থের অঙ্ক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে শুধু অনিয়ম নয়, একটি লাভজনক অবৈধ ব্যবসা হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও সামনে আনে। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ এবং বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র কীভাবে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তদন্তের তথ্য সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। তবে চক্রটি মোট কতজনের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে, কত টাকা লেনদেন হয়েছে এবং অর্থের ভাগ কীভাবে বণ্টন করা হতো—এসব বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রশ্নপত্র বিক্রির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের জন্য আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতারিত চাকরিপ্রার্থী থেকে চক্রের সদস্য
মতিঝিল এলাকা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলামের সঙ্গে আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে এসআরবি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন মফিজুল ইসলাম নিজেও চাকরিপ্রার্থী। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর তিনি আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি চক্রে যোগ দেন।

এই তথ্য তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাজারে চাকরিপ্রার্থীরা যেমন সম্ভাব্য ক্রেতা, তেমনি প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তাঁদের কেউ কেউ অবৈধ কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়। তবে মফিজুলের বক্তব্য ও ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্তের ফল এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রুবেল ও মফিজুলের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা এনবিআরের কম্পিউটার

অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামের সন্ধান পান। পরে মুঠোফোনের কথোপকথন ও চ্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তি হলেন মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। এসআরবি জানিয়েছে, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এতে প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে প্রশ্নপত্রের তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কীভাবে যুক্ত হলেন?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁদের কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তবে শুধু সরকারি চাকরিতে থাকা থেকে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না। তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এনবিআরের দুই কর্মচারী নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীরের কাছে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর আগের ধাপটি এখনো স্পষ্ট নয়। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের কাছে প্রশ্নপত্রের উৎস জানতে চাওয়া হলে তাঁরা সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানিয়েছে এসআরবি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, তদন্ত শেষ হলে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।

অতএব, তদন্তের পরবর্তী ধাপে প্রশ্নপত্রের মূল কপি বা ডিজিটাল উৎস শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা যাচাই করা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া চক্রের প্রকৃত বিস্তার কিংবা দায়িত্বের স্তর নির্ধারণ করা কঠিন।

 জব্দ করা সামগ্রী কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআরবি ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চার হাজার টাকা জব্দ করেছে।

জব্দ করা এসব সামগ্রীর মধ্যে প্রবেশপত্র, সনদ, চেক ও পরিচয়পত্রের উপস্থিতি তদন্তের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এগুলোর সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির নামে প্রতারণা কিংবা আর্থিক লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

বিশেষ করে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদ উদ্ধারের বিষয়টি সামনে আসায় তদন্ত শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য পরীক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জব্দ করা কোনো সামগ্রীকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনার আগে তার উৎস, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরীক্ষা স্থগিত, বিক্ষোভ, তারপর পুনরায় আয়োজন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

পরীক্ষা স্থগিতের পর গত শনিবার পরীক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ তদন্তে সেদিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

এর মধ্যেই শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নতুন করে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। দীর্ঘ প্রস্তুতি, সময় ও অর্থ ব্যয়ের পর পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। আবার পরীক্ষা স্থগিত ও পুনরায় আয়োজনের কারণে প্রার্থীদের বাড়তি সময়, যাতায়াত ও প্রস্তুতির চাপও তৈরি হয়েছে।

কালের আলো/আরআই/এমকে

প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৪ অপরাহ্ণ
প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। চক্রটির বিরুদ্ধে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র, প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি। কার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র প্রথমে চক্রটির হাতে এসেছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত চলছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।

৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা, প্রশ্নফাঁসে স্থগিত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য গত ১০ অক্টোবর বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষা সকাল ১১টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগপ্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার পাঁচ সরকারি কর্মচারী

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তার অন্য দুজনের মধ্যে একজন চাকরিপ্রার্থী।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—

  • পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩)।
  • চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩)।
  • মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫)।
  • প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩)।
  • এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।

যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আসাদুল ইসলামকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি, পরে তৈরি হয় উত্তর

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয় বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জানান তিনি।  কাজে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে প্রশ্নপত্র প্রথম কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, নূর মোহাম্মদকে সকালে যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটি কে দিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানান তিনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। তাঁরা যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও আইডির কথা বলেছেন, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও শনাক্ত করার জন্য অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ জড়িত কি না

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততার সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের এ ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তদন্ত এগোলে এ বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন।

উদ্ধার হয়েছে স্ট্যাম্প, চেক ও বিভিন্ন সনদপত্র

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক নথি ও অন্যান্য আলামত জব্দ করেছে এসআরবি। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—

  • ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প এবং ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প।
  • প্রশ্নপত্রের এক সেট।
  • বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা।
  • ১০টি সনদপত্র এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র।
  • বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা এবং একটি ব্যাংক চেক।
  • আটটি মোবাইল ফোন।
  • ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র।
  • নগদ চার হাজার টাকা।

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, উদ্ধার হওয়া এসব আলামত তদন্তে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি অর্থ লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে ,সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মফিজুল ইসলাম চক্রের একজন সদস্যের কাছে প্রতারিত হওয়ার পর বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এবং চক্রের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে।

 

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

গাজীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৫ অপরাহ্ণ
‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

দেশে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও হাসিনার সরকারের মতো হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে গাজীপুর মহানগরী জামায়াতের উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। বক্তব্যে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণভোটকে অস্বীকার করছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। তাঁর ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে সরকারের গন্তব্যও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হবে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে। গত নির্বাচনের আগে একটি দল নির্বাচনের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, বর্তমানে সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার পরিবর্তে দ্বিগুণ বেড়েছে। জামায়াত আমিরের অভিযোগ, বর্তমান সরকার আগের সরকারের পথ অনুসরণ করছে। গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, সে সময় জামায়াতে ইসলামী ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ছিল শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি দেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। তবে তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের সময়ে বৈষম্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে আগের সরকারের মতো দলীয়করণ, লুটতরাজ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভাগ বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। শফিকুর রহমানের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে বৈষম্য দূর করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে আরেক লুটেরার হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বেও ঐক্যের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ উপেক্ষা করার কারণে মুসলিম বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শফিকুর রহমান দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীকে নিরাপত্তার স্থল হিসেবে মনে করে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি।

গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আব্দুর রউফ, নির্বাহী সদস্য মাওলানা শাহজাহান, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বশীল খলিলুর রহমান মাদানি, সাবেক জেলা আমির আবুল হাশেম খান এবং জেলা আমির জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মহানগর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আমেনা বেগম, নায়েবে আমির খায়রুল হাসান, মহানগর সেক্রেটারি আ স ম ফারুক, সহকারী সেক্রেটারি আফজাল হোসেনসহ বিভাগীয় নেতারা। মহানগর কর্মপরিষদ, বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও সম্মেলনে অংশ নেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি