খুঁজুন
                               
, ,
           

মাঠজুড়ে অ্যালোভেরা, বছরে ১০০ কোটি টাকার ভেষজ বাণিজ্য

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫০ অপরাহ্ণ
মাঠজুড়ে অ্যালোভেরা, বছরে ১০০ কোটি টাকার ভেষজ বাণিজ্য

চারদিকে সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠজুড়ে অ্যালোভেরার চাষ। পাশের জমিতে শতমূলী, ঘৃতকাঞ্চন, শিমুলমূল, অশ্বগন্ধা ও রোজেলা। বাড়ির উঠানেও দেখা মেলে নানা প্রজাতির ঔষধি গাছের। এসব ভেষজ উদ্ভিদকে ঘিরেই বদলে গেছে নাটোরের লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৬ গ্রামের অর্থনীতি। স্থানীয়ভাবে ‘ঔষধি গ্রাম’ নামে পরিচিত এই জনপদে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বছরে এখানে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

একসময় অভাব-অনটনে থাকা এসব গ্রামের অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এখন ভেষজ চাষ। অ্যালোভেরাসহ বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদ উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন বহু কৃষক। কেউ শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন, কেউ আবার উৎপাদিত কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা। কৃষিনির্ভর এই জনপদে ভেষজ উদ্ভিদ এখন শুধু চাষের ফসল নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

১৬ গ্রামে ১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ চাষ

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করা হয়। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টর জমিতে অ্যালোভেরা, ৫০ হেক্টরে শিমুলমূল এবং বাকি ৩০ হেক্টরে অন্যান্য ঔষধি উদ্ভিদের চাষ হয়। এলাকাটিতে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন অ্যালোভেরা উৎপাদিত হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এই বৈচিত্র্য ভেষজ পল্লীর অর্থনীতিকে একাধিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। অ্যালোভেরা এখানকার প্রধান উৎপাদিত পণ্য হলেও শিমুলমূল, রোজেলা, অশ্বগন্ধাসহ অন্যান্য ভেষজ উদ্ভিদও কৃষকদের আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।

অ্যালোভেরার পাতা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়

ঔষধি গ্রামগুলোর মাঠে উৎপাদিত অ্যালোভেরা নিয়মিত ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরির পাশাপাশি জুস, শরবতসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে অ্যালোভেরা ব্যবহৃত হয়। এসব শিল্পে কাঁচামালের চাহিদা থাকায় স্থানীয় কৃষকেরা উৎপাদিত পাতা বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত তাইওয়ান সিন লিন এন্টারপ্রাইজও স্থানীয় অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন ভেষজ কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে পণ্য তৈরি করা হয়। এসব পণ্যের কিছু অংশ বিদেশেও রপ্তানি হয়। ফলে ভেষজ চাষের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুধু জমিতে ফসল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে আয়ের একাধিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার হাত ধরে শুরু

এই ভেষজ পল্লীর গোড়াপত্তন হয়েছিল কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার উদ্যোগে। ১৯৯৫ সালের দিকে খোলাবাড়িয়ায় নিজের বসতবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ চাষ শুরু করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করতেন গাছের চারা ও বীজ। তাঁর উদ্যোগ দেখে আশপাশের গ্রামের মানুষও ভেষজ উদ্ভিদ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রথমে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই চাষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে উৎপাদন ও ব্যবসার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। আফাজ উদ্দিন এখন আর বেঁচে নেই। তবে তাঁর শুরু করা উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এলাকার বহু পরিবার ভেষজ চাষকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। একসময় যে চাষ ছিল সীমিত উদ্যোগ, তা এখন কয়েকটি গ্রামের অর্থনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

ঢাকার চাকরি ছেড়ে অ্যালোভেরা চাষে সৌরভ

ভেষজ চাষে বদলে যাওয়া জীবনের উদাহরণ সৌরভ হোসেন। একসময় ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। পরে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে অ্যালোভেরা চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর দুই বিঘা জমিতে এই ভেষজ উদ্ভিদ চাষ হচ্ছে। সৌরভের ভাষ্য, অ্যালোভেরার যথাযথ যত্ন ও পরিচর্যা করা গেলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বাজারদরও মোটামুটি ভালো থাকায় উৎপাদিত পাতা বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাতে পারছেন তিনি। তাঁর মতো এলাকার আরও অনেক তরুণ ভেষজ উদ্ভিদ চাষে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কাছে এই কৃষিকাজ গ্রামে থেকে আয় করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। শহরে চাকরি বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকার বিকল্প হিসেবেও কেউ কেউ ভেষজ চাষকে বেছে নিচ্ছেন।

রোজেলা চাষেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা

অ্যালোভেরার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে রোজেলা চাষের আগ্রহ বাড়ছে। ২০১৭ সালে প্রথম রোজেলা চাষ শুরু করেন শহিদুল ইসলাম। এ বছর তিনি দুই একর জমিতে এই উদ্ভিদ চাষ করেছেন। শহিদুলের উদ্যোগ ও চাষের অভিজ্ঞতা দেখে এলাকার আরও অনেক কৃষক রোজেলা উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছেন। ফলে প্রচলিত ভেষজ উদ্ভিদের পাশাপাশি নতুন ফসল নিয়ে পরীক্ষার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনাময় ফসলের বাজার তৈরি হলে আয় বাড়ানোর পথ আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে উৎপাদন সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাজারের চাহিদা, বিক্রির নিশ্চয়তা এবং ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

ভেষজ থেকে গুঁড়া ও হালুয়া তৈরি

ঔষধি পল্লীর অর্থনীতি শুধু কৃষকদের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজেও যুক্ত হয়েছেন অনেকে। লক্ষ্মীপুর বাজারের ভেষজ পণ্যের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন তাঁদের একজন। তিনি জানান, নিজেদের উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে গুঁড়া ও হালুয়া তৈরি করেন। পরে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন। এ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করে। কাঁচামাল সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি তা দিয়ে তৈরি পণ্য বাজারজাত করতে পারলে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে পণ্য প্রস্তুত, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন ও বিক্রির কাজে আরও মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলামের ভাষ্য, ভেষজ উদ্ভিদ চাষের মাধ্যমে ১৫ থেকে ১৬ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এলাকার উৎপাদিত ভেষজ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। অ্যালোভেরা এখানকার অন্যতম প্রধান পণ্য, যা শরবতসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা মনে করেন, ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা বাড়ানো এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। ভেষজ উদ্ভিদের চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি উন্নত চাষপদ্ধতি, মানসম্মত চারা ও বীজ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারসংযোগ জোরদার করা গেলে এই খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।

সম্ভাবনা ধরে রাখতে প্রয়োজন গবেষণা ও প্রশিক্ষণ

নাটোরের ঔষধি গ্রামগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয় উদ্যোগ ও বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করা সম্ভব। একটি উদ্ভিদ দিয়ে শুরু হওয়া চাষ এখন প্রায় ১৫০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদে ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ, পণ্য তৈরি, পরিবহন ও বিপণন। তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ভেষজ উদ্ভিদের সঠিক পরিচিতি ও সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক চাষপদ্ধতি, পণ্যের গুণগত মান এবং বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। পাশাপাশি ঔষধি উদ্ভিদ থেকে তৈরি পণ্যের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ অনুসরণ প্রয়োজন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের বৈঠক

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ণ
আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের বৈঠক

বাংলাদেশ ও আজারবাইজানের মধ্যে বিমান যোগাযোগ, দক্ষ জনশক্তি অভিবাসন এবং জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ লক্ষ্যে আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেহুন বায়রামভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হক উপস্থিত ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে আজারবাইজানেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গতিশীল করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।

আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে তাঁর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এ ছাড়া সিআইসিএ শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান জেহুন বায়রামভ।

অন্যদিকে, চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান থেকে আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করায় আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান হুমায়ুন কবির।

বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ণ
সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ

বাংলাদেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা, উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি চাই। আমরা কেউ এখানে সাম্প্রদায়িক হতে আসিনি। আপনারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক, সবাই সমান অধিকারের অধিকারী।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সব ধর্মের মানুষের ধর্মচর্চা, উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার দিয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা যাবে না—এ কথাও সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। এরপরও দুর্গাপূজার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসা দুঃখজনক।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোনো না কোনো ধর্মের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও প্রতিটি দেশেই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস রয়েছে। নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার স্বীকৃত থাকা উচিত।

তিনি আরও বলেন, এবার দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক পূজামণ্ডপ, সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং সর্বোচ্চ ছুটি রয়েছে। উৎসব উদযাপনের ক্ষেত্রে সবাই যেন স্বাধীনতা ও আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সেটিই সরকারের প্রত্যাশা।

নাগরিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোন সময়ে নাগরিক, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার বেশি সুরক্ষিত থাকে, তা জনগণ নিজেরাই বিচার করবেন। তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কারও ভোটব্যাংক হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনারা আপনাদের বিবেকের কাছেই দায়ী থাকবেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক ধর্মের মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস, রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে, যা তাদের হৃদয়ের খুব কাছের। তাই এক ধর্মের মানুষের উচিত অন্য ধর্মের মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এবার, আগামীবার এবং ভবিষ্যতেও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গোৎসবসহ সব ধর্মীয় উৎসব স্বাধীনভাবে, সুন্দরভাবে ও মহাসমারোহে উদযাপন করবেন। এ ক্ষেত্রে সরকার সব সময় তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে।

বনানী পূজামণ্ডপের আয়োজনের প্রশংসা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশীয় সংস্কৃতি, উপাদান ও নকশা ব্যবহার করে পূজামণ্ডপটি সাজানো হয়েছে। এ উদ্যোগের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান তিনি এবং তাদের সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

চা বাগানের কুঁড়েঘর থেকে হার্ভার্ডে, শান্তার স্বপ্নজয়ের গল্প

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১০ অপরাহ্ণ
চা বাগানের কুঁড়েঘর থেকে হার্ভার্ডে, শান্তার স্বপ্নজয়ের গল্প

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা বাগানের শ্রমিক লাইনের ছোট্ট একটি ঘর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে—দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নতুন এক অধ্যায়ে পা রাখতে যাচ্ছেন শান্তা যাদব। যে পরিবারের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম, সেই পরিবারের মেয়েই এবার উচ্চশিক্ষার জন্য পেয়েছেন প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি’ প্রোগ্রামে পড়াশোনার সুযোগ তাঁর জীবনের বড় অর্জন হয়ে উঠেছে। শান্তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের গল্প নয়; এটি চা বাগানের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার বার্তা। শৈশব থেকে দেখা স্বাস্থ্যসেবার সংকট, পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার প্রতি অটুট আগ্রহ—সবকিছু মিলিয়েই তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

চা শ্রমিকের ঘর থেকে স্বপ্নের শুরু

শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব ও মা রীনা যাদব—দুজনই চা শ্রমিক। তাঁদের সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানোই ছিল কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করা পরিবারের জন্য সহজ ছিল না। তবু ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী শান্তা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। লংলা চা বাগানের স্থানীয় স্কুলে শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। এরপর কুলাউড়ার ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শান্তা নিজের জন্য তৈরি করেন নতুন সম্ভাবনার পথ।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে হার্ভার্ড

উচ্চশিক্ষার জন্য শান্তা ভর্তি হন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে। সেখান থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। এই শিক্ষাই তাঁকে জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাসেবা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয়। হার্ভার্ডে যাওয়ার আগে বিশ্বের আরও ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার প্রস্তাব পেয়েছিলেন শান্তা। তবে নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রোগ্রামটি বেছে নেন তিনি। প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি নিয়ে এই প্রোগ্রামে পড়ার সুযোগ তাঁর শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন এবং ভবিষ্যতে নিজ এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার প্রস্তুতিও তৈরি হবে তাঁর।

চা বাগানের স্বাস্থ্যসংকটই অনুপ্রেরণা

শান্তার কাছে জনস্বাস্থ্য কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়। চা বাগানে অসুস্থ হলে শ্রমিকদের চিকিৎসা পেতে কী ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়, তা তিনি কাছ থেকেই দেখেছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পেতে দূরে যেতে হওয়া এবং চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর পরিচিত বাস্তবতা। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলে। নিজের কমিউনিটির মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। হার্ভার্ডে পড়াশোনার সুযোগ তাই তাঁর কাছে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং চা বাগানের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

মেয়ের স্বপ্নে আশাবাদী ছিলেন বাবা

শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শুরুতে শান্তাকে শহরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু মেয়ের মেধা, আগ্রহ ও অধ্যবসায় দেখে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন মেয়ে চা শ্রমিকের জীবন থেকে বেরিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে। শান্তার বর্তমান অর্জন সেই দীর্ঘদিনের আশা ও পরিবারের ত্যাগের প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যে পরিবারে মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম, সেই পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়া আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যদের নিয়েও ভাবনা

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শান্তা কেবল নিজের শিক্ষাজীবন নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি। চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ সময় চা বাগানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার উদ্যোগও নেন। চা বাগানের অনেক শিক্ষার্থীর সামনে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার পথ সহজ নয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সুযোগের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন বাস্তবতায় শান্তার মতো একজন শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো অন্যদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

উচ্চশিক্ষা শেষে ফিরতে চান নিজের এলাকায়

হার্ভার্ডে পড়াশোনা শেষে নিজের এলাকায় ফিরে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চান শান্তা। তাঁর এই লক্ষ্য চা বাগানের মানুষের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এবং শৈশবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি কীভাবে নিজের এলাকার মানুষের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন, সেটিই এখন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি