খুঁজুন
                               
, ,
           

মেরিন ড্রাইভের টুপটুপ রিসোর্টে আগুন, ভেতর থেকে উদ্ধার ৫ মরদেহ

কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
মেরিন ড্রাইভের টুপটুপ রিসোর্টে আগুন, ভেতর থেকে উদ্ধার ৫ মরদেহ

কক্সবাজারের ইনানীতে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে এ আগুনের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ ঘটনায় আরও হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রাথমিকভাবে নিহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। তবে তাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সকাল ৭টায় আগুন, উদ্ধার অভিযান চলছে

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৭টার দিকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ঘটনাস্থলে উদ্ধার কার্যক্রম চলছিল। রিসোর্টের ভেতরে আরও কেউ আটকে আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রিসোর্ট পুড়ে ছাই, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অজানা

অগ্নিকাণ্ডে টুপটুপ রিসোর্টটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। তবে আগুন কীভাবে লেগেছে, কতক্ষণ ধরে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে এবং অগ্নিকাণ্ডে মোট কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আগুন লাগার কারণ জানতে তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের খোঁজে প্রশ্ন

ঘটনার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন পালিয়ে গেছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের অবস্থান বা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত, স্বজনদের কাছে খবর পৌঁছানো এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উদ্ধার অভিযান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বক্তব্যের মাধ্যমে ঘটনার আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যেতে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

অবহেলায় ধ্বংসের পথে বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
অবহেলায় ধ্বংসের পথে বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি

সিরাজগঞ্জের চলনবিলের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নানা কিংবদন্তি। এই জনপদের কোথাও দাঁড়িয়ে আছে দেড়শ বছরের পুরোনো তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, কোথাও আবার ধ্বংসস্তূপ আর লতাপাতার আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে কয়েকশ বছরের ঐতিহাসিক ইমামবাড়ি। একসময় ধর্মীয় সাধনা ও ইসলাম প্রচারের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থাপনা আজ সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।

তাড়াশ উপজেলার বারুহাস গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত দেল মাহমুদ চৌধুরী জামে মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিত। ১৮৭৫ সালে নির্মিত এই মসজিদ প্রায় দেড়শ বছর ধরে এলাকার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বহন করছে। অন্যদিকে, শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত বারুহাস ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। অবশিষ্ট অংশেও দেখা দিয়েছে জীর্ণতার ছাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের দাবি, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল লোককথা হয়েই থেকে যাবে।

দেড়শ বছরের পুরোনো তিন গম্বুজ মসজিদ

বারুহাস গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত দেল মাহমুদ চৌধুরী জামে মসজিদটি ১৮৭৫ সালে নির্মিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা এখনো এলাকার মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের কেন্দ্র। পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ এখানে আসেন। মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে মোগল আমলের স্থাপত্যরীতির ছাপ রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। চুন-সুরকির গাঁথুনি, পুরু দেয়াল, তিনটি বড় গম্বুজ এবং পোড়ামাটির নকশা এর স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে। ছাদের ওপর তিনটি গম্বুজের পাশাপাশি আটটি পিলারের ওপর রয়েছে তিনটি বড় মিনার ও পাঁচটি ছোট মিনার। কাঠের তৈরি তিনটি দরজাও বহন করছে পুরোনো নির্মাণশৈলীর স্মৃতি।

প্রায় চার শতক জায়গার ওপর নির্মিত মসজিদটির ভেতরের অংশ তুলনামূলক ছোট। প্রতি সারিতে প্রায় ২০ জন করে তিন সারিতে ৬০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরে খোলা বারান্দায় আরও দুই সারিতে নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ ও কারুকাজ দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে চৌধুরী পরিবারের পুরোনো বাড়ি ও পারিবারিক কবরস্থান। আশপাশের ভদ্রাবতী নদী ও খালের পরিবেশ স্থাপনাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও মসজিদটি ধর্মীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রেখেছেন স্থানীয়রা

বারুহাস গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ১৮৭৫ সালে তাঁদের পূর্বপুরুষ দেল মাহমুদ চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। পূর্বপুরুষদের মতো তাঁরাও এখানে নামাজ আদায় করছেন। সরকারি উদ্যোগে মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. নাছিম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ খন্দকার বলেন, মসজিদটি তাঁদের গ্রামের ঐতিহ্য ও গর্বের বিষয়। সরকারি অনুদান পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মেরামতের কাজ করা সম্ভব হবে।

মসজিদের বর্তমান ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মো. খবির উদ্দিন জানান, তিনি ৩১ বছর ধরে এই মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভাষ্য, শুক্রবার জুমার নামাজের দিন মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম চালু থাকলেও মসজিদটির ঐতিহাসিক স্থাপত্য রক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। সংস্কারের ক্ষেত্রে মূল নকশা, পুরোনো নির্মাণসামগ্রী ও অলংকরণের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

জৌলুস হারিয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের ইমামবাড়ি

বারুহাসের আরেক ঐতিহাসিক নিদর্শন শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ইমামবাড়ি। স্থানীয় লোককথা ও ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে এই স্থাপনা ও এর আশপাশের এলাকা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ইয়েমেন থেকে আগত সুফি-সাধক হযরত শাহ ইমাম (রহ.) চলনবিলের বারুহাস এলাকায় বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করেন। পরবর্তী সময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলা পরিদর্শনে এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। শাহ ইমামের ইবাদত ও বসবাসের সুবিধার্থে কয়েকটি পাকা ঘর নির্মাণ এবং একটি পুকুর খননের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও প্রচলিত রয়েছে। পাশাপাশি ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁকে করমুক্ত জমি দেওয়ার কথাও স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়।

এই স্থাপনাগুলোকে ঘিরেই গড়ে ওঠে বারুহাস ইমামবাড়ি। তবে এর সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য নেই। স্থানীয়ভাবে এটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো নিদর্শন হিসেবে পরিচিত হলেও এর বয়স ও ইতিহাস নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একসময় ইমামবাড়ি এলাকায় মসজিদসহ একাধিক স্থাপনা ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। বর্তমানে সেগুলোর অধিকাংশই বিলুপ্ত। টিকে থাকা পুরোনো স্থাপনাগুলোর দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। ইট-সুরকির গাঁথুনিতে জন্মেছে লতাপাতা ও গাছগাছালি। নষ্ট হয়ে গেছে স্থাপনার অনেক কারুকাজ। একসময়ের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানটি এখন কার্যত অবহেলিত।

পুকুর ও জমি দখলের অভিযোগ

ইমামবাড়ির আশপাশে রয়েছে পুরোনো সমাধি ও একটি বড় পুকুর। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুর ও সংশ্লিষ্ট জমির কিছু অংশ বেদখল হয়ে গেছে। তাঁদের দাবি, জমির প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে দখলসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা এখন আর নেই। সমাধির সামনের প্রায় সাড়ে আট বিঘা আয়তনের পুকুরটিও দখলের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে জমি উদ্ধার ও স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হলে এলাকার ইতিহাস রক্ষা পাবে।

স্থানীয়ভাবে ইমামবাড়ির দেখভালের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নেই বলে জানা গেছে। তবে আশপাশের বাসিন্দা মো. কাবুল সরকার ও রেজা (ফারুক) মেম্বারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয়রা স্থাপনাটির স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। স্থানীয়দের মতে, অবশিষ্ট স্থাপনা ও জমির বর্তমান অবস্থা নিরূপণ, সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং দখলের অভিযোগ যাচাইয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণকাজ শুরু করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি স্থাপনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

বারুহাসের নামকরণ ঘিরেও রয়েছে নানা জনশ্রুতি

বারুহাসের পরিচয় কেবল প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামটির নামকরণ নিয়েও প্রচলিত রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, নায়েব শেখ বাহারউদ্দিন ‘বারু শেখ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নাম থেকেই বারুহাস নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। স্থানীয় ইতিহাসে আরও বলা হয়, প্রায় পাঁচশ বছর আগে ইয়েমেন থেকে আগত শেখ বংশের লোকজন ভদ্রাবতী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। চলনবিলের উর্বর ভূমি ও নদীপথের যোগাযোগ এই জনপদের বিকাশে ভূমিকা রাখে। মোগল আমলে শাহ ইমামকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটেছিল বলেও স্থানীয়দের বিশ্বাস।

এলাকাটিতে জমিদারবাড়ি, পুরোনো মসজিদ, ইমামবাড়ি ও বেহুলার কূপের মতো বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানের কথাও প্রচলিত রয়েছে। এসব নিদর্শনকে ঘিরে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী বারুহাস মেলা, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তবে লোককথা, স্থানীয় স্মৃতি ও নথিভিত্তিক ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে এসব স্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করাও জরুরি। তা না হলে স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি এগুলো ঘিরে থাকা ঐতিহাসিক তথ্য ও জনশ্রুতির অনেক অংশও হারিয়ে যেতে পারে।

সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানাল প্রশাসন

এলাকাবাসীর দাবি, প্রথমে ইমামবাড়ির অবশিষ্ট স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর জরিপের মাধ্যমে জমির সীমানা চিহ্নিত করে দখলসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করার পাশাপাশি চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদের মূল স্থাপত্য অক্ষুণ্ণ রেখে সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও চান তাঁরা। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো অতীত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক ও বাহক। এগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং পূর্বপুরুষদের শিল্পবোধ, স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে আসছে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, বারুহাসের ঐতিহাসিক ইমামবাড়ি ও তিন গম্বুজ মসজিদের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে মসজিদটির ইতিহাস, নির্মাণশৈলী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আগে উদ্যোগ জরুরি

বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, চলনবিল অঞ্চলের অতীত জনজীবন, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অংশ। একদিকে দেড়শ বছরের পুরোনো মসজিদে এখনো নিয়মিত নামাজ আদায় হচ্ছে, অন্যদিকে কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা হারিয়ে গেছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

পানির প্রবাহ নেই, তবু সড়ক খুঁড়ে তিন কালভার্ট নির্মাণ!

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
পানির প্রবাহ নেই, তবু সড়ক খুঁড়ে তিন কালভার্ট নির্মাণ!

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে সীমান্ত সড়ক সংস্কার প্রকল্পে পাকা সড়ক কেটে নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, সড়কের যেসব স্থানে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গায় দৃশ্যমান কোনো খাল, ছড়া কিংবা পানির প্রবাহ নেই। অথচ পাশেই পানি নিষ্কাশনের জন্য আগে থেকেই কালভার্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবতা যাচাই ছাড়া এসব কাজ করা হলে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে।

তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাবি, এখন পানি চলাচলের পথ দৃশ্যমান না হলেও বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নামলে এসব স্থানে পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন হতে পারে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পাঁচ কিলোমিটার সড়কে ব্যয় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা

ঘটনাটি ঘটছে তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়া বাজার পর্যন্ত সীমান্ত সড়ক সংস্কারকাজে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন এ প্রকল্পে পাঁচটি সেতু ও ১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কালভার্ট নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩১ টাকা। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নুর কনস্ট্রাকশন ইতিমধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সড়কের যেসব স্থানে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের চিহ্ন না থাকলে এসব স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী? আগে থেকে থাকা কালভার্টগুলো সংস্কার বা কার্যকর রাখার পাশাপাশি নতুন কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

ফসলি জমির মাঝখানে সড়ক খুঁড়ে নির্মাণকাজ

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়ামুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ চলছে। রাজাই গ্রামের অংশে সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এরই মধ্যে একটি স্থানে বিটুমিনের আস্তরণ কেটে বড় গর্ত করা হয়েছে। কোথাও কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এলাকার ভূপ্রকৃতি ও দৃশ্যমান পানিপ্রবাহের সঙ্গে নতুন কালভার্ট নির্মাণের বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এসব স্থানে আগে কখনো পানি চলাচল করতে দেখেননি তাঁরা। পাশের ছড়া দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রয়েছে।

অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কালভার্টগুলোর সামনে ও পেছনে খাল খনন করে দেওয়া হবে। এর ফলে কালভার্টের নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারবে বলে তাঁদের দাবি। তবে নতুন করে খাল খনন করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা তৈরি করার পরিকল্পনা থাকলে, সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, নকশা এবং বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান স্থানীয়রা।

‘এই জায়গা দিয়ে কখনো পানি চলতে দেখিনি’

সীমান্তের চানপুর গ্রামের বাসিন্দা দীন ইসলাম বলেন, সড়কের যেসব স্থানে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গা দিয়ে কখনো পানি চলাচল করতে দেখেননি তাঁরা। পাশের ছড়া ও পানি নিষ্কাশনের জন্য আগে থেকেই কালভার্ট রয়েছে। তারপরও নতুন করে কালভার্ট নির্মাণের বিষয়টি তাঁদের কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। রাজাই গ্রামের বাসিন্দা মো. জহুর আলী বলেন, নতুন কালভার্ট নির্মাণের স্থানটি তুলনামূলকভাবে উঁচু। সেখানে আগে মানুষের বসতিও ছিল। ওই স্থান দিয়ে কখনো পানি চলাচল করতে দেখেননি তাঁরা। তাঁর অভিযোগ, কালভার্ট নির্মাণের আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা পরামর্শ করা হয়নি। স্থানীয়দের বক্তব্য, সড়ক উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়নকাজে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের প্রতিটি স্থাপনার প্রয়োজনীয়তা এবং এলাকার বাস্তব পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

সড়ক প্রশস্ত করতে জমি চলে যাওয়ার অভিযোগ

কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে স্থানীয়দের রেকর্ডভুক্ত ব্যক্তিগত জমির একটি অংশ সড়কের আওতায় চলে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে জমির মালিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। উত্তর বড়দল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কফিল উদ্দিন বলেন, কড়ইগড়া-ট্যাকেরঘাট সড়কটি পাকিস্তান আমলে নির্মিত। সরকার সীমান্ত সড়ক উন্নয়নের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করছে, যা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে কারও জমি সড়কের আওতায় পড়লে জমির মালিকেরা যেন ক্ষতিপূরণ পান, সে বিষয়ে তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সড়ক প্রশস্তকরণে সরকারি জমির সীমানা নির্ধারণ এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির দাবি যাচাইয়ের বিষয়টি এখন স্থানীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জমির মালিকদের দাবি ও সরকারি নথির মধ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা যাচাই করে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকৌশলীর দাবি, বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনে প্রয়োজন হবে কালভার্ট

তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, কড়ইগড়া-ট্যাকেরঘাট সড়কটি একটি সীমান্ত সড়ক। বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় এর নির্মাণকাজ চলছে। কাজ শেষ হলে নেত্রকোনা জেলা থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় সীমান্তপথে সড়ক যোগাযোগ উন্নত হবে। তিনি জানান, সড়কটি বর্তমানে ১২ ফুট প্রশস্ত। নির্মাণকাজ শেষ হলে শোল্ডারসহ এর প্রস্থ ২৪ ফুট হবে। সরকারি ম্যাপে সড়কের প্রশস্ততা ৪৮ ফুট রয়েছে বলেও জানান তিনি। জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, সড়ক নির্মাণকাজের ২০ শতাংশ স্থানে পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্যাপ বা ফাঁকা ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

‘বর্ষায় পানি না নামলে সড়ক ভেঙে যেতে পারে’

সুনামগঞ্জ এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি খাস জায়গায় সড়কের জন্য ৪৮ ফুট জায়গা রয়েছে। যাঁরা ব্যক্তিগত জমির দাবি করছেন, তাঁদের দাবির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে এসব স্থানে পানির প্রবাহ দৃশ্যমান না হলেও বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢল নামলে পানি চলাচলের পথ প্রয়োজন হবে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ভেঙে যেতে পারে।

প্রকৌশল বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনায় বর্ষাকালীন পানি নিষ্কাশন ও পাহাড়ি ঢলের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্নের নিরসনে কোন স্থানে কতটা পানি প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কী ধরনের নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান কালভার্টের সক্ষমতা কতটুকু—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নকাজে প্রয়োজন পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা

সীমান্ত সড়কের উন্নয়ন স্থানীয় যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকৌশলগত যৌক্তিকতা এবং স্থানীয় মানুষের জমির অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো স্থানে কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট নকশা, পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

ডিজিটাল সুরের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র

দিনাজপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
ডিজিটাল সুরের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের জনপ্রিয়তায় ক্রমেই কমছে হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা। এতে সংকটে পড়েছেন বংশপরম্পরায় বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের সঙ্গে যুক্ত কারিগররা। চার পুরুষ ধরে এই পেশায় থাকা রবিন দাসের কণ্ঠেও এখন আনন্দের চেয়ে আক্ষেপই বেশি। আশঙ্কা করছেন, তাঁর হাত ধরেই হয়তো থেমে যাবে পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

ফুলবাড়ী পৌর শহরের ব্যস্ততম ননী গোপাল মোড়ে অবস্থিত ‘স্বপন তবলা ঘর’। দোকানটিতে সাজানো রয়েছে তবলা, ডুগি, ঢোল, করতাল ও দোতারাসহ বিভিন্ন দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। একসময় এসব বাদ্যযন্ত্রের সুরে গ্রামবাংলার মেলা, যাত্রাপালা, কীর্তন, বাউল আসর ও সামাজিক অনুষ্ঠান মুখর হয়ে উঠত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।

দোকানটির মালিক রবিন দাস। তাঁর ভাষ্য, পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম হিসেবে তিনি এই পেশায় যুক্ত। তাঁর বাবার দাদু কাজটি শুরু করেছিলেন। পরে দাদু ও বাবার কাছ থেকে তিনি বাদ্যযন্ত্র তৈরি এবং মেরামতের কাজ শেখেন। ছোটবেলা থেকেই দোকান ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর বেড়ে ওঠা।

রবিন জানান, একসময় ফুলবাড়ী ছাড়াও আশপাশের উপজেলা এবং দূরদূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ তাঁর দোকানে বাদ্যযন্ত্র কিনতে আসতেন। তবলা, ডুগি, ঢোল, করতাল ও দোতারার ভালো চাহিদা ছিল। এখন সেই চাহিদা আর নেই। তৈরি করে রাখা বাদ্যযন্ত্র অনেক সময় মাসের পর মাস দোকানে পড়ে থাকে।

বর্তমানে বিয়ে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আয়োজনে ডিজিটাল কিবোর্ড, অর্কেস্ট্রা এবং আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও বিক্রি দুটিই কমেছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে কারিগরদের আয়-রোজগারেও।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে রবিন বলেন, এই পেশায় এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ছেলেমেয়েদের তিনি এ কাজে যুক্ত করতে চান না। তাদের পড়ালেখা করিয়ে চাকরি বা অন্য কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ফুলবাড়ী পৌর বাজারের ‘দাস মিউজিক্যালস’-এর কর্ণধার ও সংগীত শিক্ষক প্রবীর কুমার দাস বাবু। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতার কারণে হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। কারিগর রেখে এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বিক্রি করেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না। তাই দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি তাঁর দোকানেও জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ও ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্র।

তবে এই সংকট শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা কারিগরি জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তবলার কাঠামো তৈরি, ঢোলের চামড়ার টান ঠিক করা কিংবা দোতারার সুর মেলানোর মতো দক্ষতা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও হাতে-কলমে চর্চার মাধ্যমে অর্জিত হয়।

দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কমতে থাকলে এসব দক্ষতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরির পদ্ধতি।

ফুলবাড়ীর ‘স্বপন তবলা ঘর’ ও ‘দাস মিউজিক্যালস’-এর অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে সময়ের পরিবর্তনে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের বাজার কতটা চাপে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও কারিগরি দক্ষতা ধরে রাখার উদ্যোগ না থাকলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি