খুঁজুন
                               
, ,
           

বিদেশে শ্রমিকের মৃত্যু: পরিসংখ্যান আছে, পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান নেই

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
বিদেশে শ্রমিকের মৃত্যু: পরিসংখ্যান আছে, পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান নেই

বিদেশের মাটিতে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি অংশকে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হচ্ছে নিথর দেহে। পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্য যাঁরা দেশ ছাড়েন, তাঁদের অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রের বিপদ, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো অজানা কারণে। কিন্তু মৃত্যুর পর দেশে ফিরছে যে মরদেহ, তার সঙ্গে আসা নথিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ থাকছে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’। ফলে প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র, ঝুঁকির ধরন এবং প্রতিরোধের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। ২৭৩ দিনে এই সংখ্যা দৈনিক গড়ে ১৪টির বেশি। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার কর্মীর মৃত্যু হয়েছে সৌদি আরবে। বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হওয়ায় দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়া। এই পরিসংখ্যান কেবল মৃত্যুর সংখ্যা নয়; এটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং মৃত্যুর পর তাঁদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

  • চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশ থেকে ফিরেছে ৪ হাজার ৬০ মরদেহ
  • দুর্ঘটনা ও তীব্র তাপের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় জোর দেওয়ার তাগিদ
  • অনিয়মিত কর্মীর মরদেহ আনতে দীর্ঘসূত্রতা

মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু কারণ কতটা জানা যাচ্ছে?
প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর নথি বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি দেখা যায়। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে আসা মরদেহের ৬৬ শতাংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে।

অথচ অভিবাসন খাতের গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিদেশে কর্মীর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই করা হয় না। সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে পাঠানো কাগজপত্রের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। ফলে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন কিংবা আত্মহত্যার পেছনে অন্য কোনো পরিস্থিতি ছিল কি না, তা অজানাই থেকে যেতে পারে।

এখানে মূল প্রশ্নটি শুধু কতজন কর্মী মারা যাচ্ছেন, তা নয়; বরং কেন মারা যাচ্ছেন এবং তাঁদের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল কি না, সেটিও। মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা না হলে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ চিহ্নিত করা, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের মৃত্যু ঠেকানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

দুর্ঘটনায় মৃত্যু: কর্মক্ষেত্রের বাইরে যাওয়াও ঝুঁকিমুক্ত নয়
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পাঁচ বছরের একটি বিশ্লেষণ পরিস্থিতির আরেকটি দিক তুলে ধরে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে আসা ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহের মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলের দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কারণে। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৬৪৯ জন মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। অর্থাৎ, কর্মীদের মৃত্যুঝুঁকি কেবল কারখানা, নির্মাণস্থল বা নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাজে যাওয়া-আসা, পণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন চলাচলের সময়ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

নোয়াখালীর ফয়েজ আহম্মেদ ও তাঁর ছোট ভাই সুজন আহম্মেদের মৃত্যু এই বাস্তবতারই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ। সৌদি আরবে খেজুর পরিবহনের কাজে যুক্ত দুই ভাই গত ১৬ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। ২৮ জুলাই তাঁদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। পরিবারের উপার্জন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত দুই সদস্যকে একসঙ্গে হারিয়ে তাঁদের বাবা আবদুল মালেকের জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। দুই ভাইয়ের দাফনের জন্য পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকা করে মোট ৭০ হাজার টাকা সহায়তা দেয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। কিন্তু এই অর্থ তাৎক্ষণিক দাফনের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করলেও পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির পূর্ণ প্রতিকার নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের তাপ কি বাড়াচ্ছে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি?
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নির্মাণসহ শ্রমঘন খাতে নিয়োজিত। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করা তাঁদের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তীব্র তাপের কারণে পানিশূন্যতা, তাপজনিত অসুস্থতা এবং কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ শরীরের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা এই ঝুঁকিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে যাঁদের কাজের ধরন অনুযায়ী দিনের দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হয়, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ পানীয় জল, ছায়াযুক্ত বিরতি এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর মৃত্যুর সঙ্গে তাপমাত্রার সম্পর্ক আছে কি না, তা নির্ধারণে চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য ও মৃত্যুর কারণের যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। প্রতিটি মৃত্যুকে শুধু স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে নথিভুক্ত করলে তাপজনিত ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বোঝা সম্ভব হবে না।

অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ দেশে ফেরাতে দীর্ঘসূত্রতা
বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। কর্মী বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেলে অথবা বিদেশে পৌঁছে বাংলাদেশি দূতাবাসে সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত হলে মরদেহ দেশে আনার ব্যয় বোর্ড বহন করে। এসব শর্ত পূরণ না হলেও পরিবার আবেদন করতে পারে; সে ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক জটিল হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ দেশে পাঠানোর আগে একাধিক দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। আবার যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব জায়গা থেকে মরদেহ ফিরিয়ে আনতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শোকাহত পরিবারকে শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা নয়, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও যেতে হয়। ফলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কর্মীর বৈধ কাগজপত্রের ঘাটতি যেন পরিবারের দুর্ভোগ বাড়িয়ে না দেয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সহায়তা আছে, কিন্তু পেতে ভোগান্তির অভিযোগ
বিদেশে মারা যাওয়া কর্মীর মরদেহ দেশে আসার পর দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি জীবনবিমার সুবিধা এবং বিদেশে পাওনা বেতন বা ক্ষতিপূরণ আদায়ে দূতাবাসের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।

বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দাফন সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। একই সময়ে আর্থিক অনুদান বাবদ ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং বিমাসুবিধা হিসেবে ৪৪ কোটি টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও বিমার অর্থ মিলিয়ে আদায় করে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। তবে এসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ পেতে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। কোনো পরিবার দ্রুত সহায়তা পেলেও অন্য পরিবারকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার জটিলতাও উদ্বেগের বিষয়।

তিন দিনের প্রশিক্ষণে কতটা প্রস্তুত হচ্ছেন কর্মীরা?
বিদেশে যাওয়ার আগে বিএমইটির মাধ্যমে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে গন্তব্য দেশের নিয়মকানুন, আচরণবিধি ও নিরাপত্তা বিষয়ে ধারণা দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, মাত্র তিন দিনের কর্মশালায় বিদেশের ভিন্ন পরিবেশে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সচেতনতা যথেষ্টভাবে গড়ে তোলা কঠিন।

বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার, দুর্ঘটনা মোকাবিলা, তীব্র গরমে কাজের সতর্কতা এবং অসুস্থ হলে কোথায় সহায়তা চাইতে হবে—এসব বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়োগকর্তার দায়িত্ব, শ্রমিকের অধিকার, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং দূতাবাসের সহায়তা নেওয়ার পদ্ধতিও স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। প্রশিক্ষণকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। কর্মী যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁর কাজের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুর মিল থাকা জরুরি।

মৃত্যুর তদন্ত ও প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা গেলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য বিদেশ থেকে আসা মৃত্যুসংক্রান্ত নথি যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সংগ্রহ, সন্দেহজনক মৃত্যুর তদন্ত এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

একই সঙ্গে দেশভিত্তিক ও খাতভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে কোন পরিবেশে, কী ধরনের কাজে এবং কী কারণে বেশি প্রাণহানি ঘটছে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বিদেশে কর্মীদের মৃত্যুর কারণ যাচাইয়ের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি দেশের শ্রমবাজার, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় সামাজিক প্রশ্ন। যাঁরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি মৃত্যুর পর মর্যাদার সঙ্গে মরদেহ ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারকে প্রাপ্য সহায়তা দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃত্যুর পরিসংখ্যান সংগ্রহের পাশাপাশি মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানকে কার্যকর ব্যবস্থার অংশ করা। কোনো মৃত্যু যদি কর্মক্ষেত্রের অনিরাপত্তা, অতিরিক্ত তাপ, অবহেলা বা নির্যাতনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তা শনাক্ত করে প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে। আর কর্মী নিয়মিত নাকি অনিয়মিত—এই পার্থক্যের কারণে তাঁর মরদেহ দেশে ফেরানো কিংবা শোকাহত পরিবারের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বৈষম্য তৈরি হওয়া উচিত নয়। প্রবাসে যাওয়া মানুষের জীবন রক্ষা এবং তাঁদের মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো—দুটি দায়িত্বই সমান গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা প্রয়োজন।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ অপরাহ্ণ
এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধ করতে বলা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। রোববার (১৮ অক্টোবর) আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ আপিল আবেদন করা হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিট খারিজ করে এনবিআরের দাবি করা কর পরিশোধের পক্ষে রায় দেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ে এনবিআরের আইনি বাধা থাকছে না বলে জানিয়েছিলেন আইনজীবীরা। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে এবার আপিল করল গ্রামীণ কল্যাণ।

গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন। এর ফলে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।আদালতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। পরে গত ১২ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর মামলাসংশ্লিষ্ট ১৫ ও ৩২ পৃষ্ঠার পৃথক পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ আপিল করেছে।

পাঁচ করবর্ষের কর দাবি নিয়ে মামলা

মামলাটি গ্রামীণ কল্যাণের পাঁচটি করবর্ষের আয়কর দাবি নিয়ে। করবর্ষগুলো হলো ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭। পুনর্মূল্যায়নের পর এসব করবর্ষের জন্য এনবিআর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর দাবি করে। ওই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি পৃথক দুটি রিট আবেদন করে। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে নতুন বেঞ্চে মামলাগুলোর শুনানি হয় এবং রুল খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। রিট খারিজ হওয়ায় এনবিআরের দাবি করা অর্থ আদায়ের পথ খুলেছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তবে গ্রামীণ কল্যাণের আপিলের পর এ বিষয়ে আপিল বিভাগে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা এখন দেখার বিষয়।

আগের রায় প্রত্যাহার করে নতুন বেঞ্চে শুনানি

এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এর আগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বপ্রণোদিতভাবে আগের একটি রায় প্রত্যাহার করে নেন। ওই রায়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। পরে মামলাটি শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়। নতুন বেঞ্চে পুনরায় শুনানি ও বিচারিক পর্যালোচনার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর রিট খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। এবার সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করেছে গ্রামীণ কল্যাণ।

আপিল বিভাগে পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

গ্রামীণ কল্যাণের আপিলের ফলে ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবি নিয়ে আইনি লড়াই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পর এখন আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। তবে আপিল আবেদন দাখিলের পর আপিল বিভাগের কোনো আদেশ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এখনো উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এনবিআরের দাবি করা অর্থ পরিশোধের বিষয়ে পরবর্তী আইনি অবস্থান নির্ধারিত হবে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট আদেশের ভিত্তিতে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

খুলনার কয়রা

৭১ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ১৪ মাসেও অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ

খুলনা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ণ
৭১ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ১৪ মাসেও অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ

খুলনার কয়রা উপজেলায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরও শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৮০ শতাংশ। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থানে নদপাড়ের মাটি ধসে পড়েছে। প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও ব্লক গণনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাশিরহাটখোলা, গাজীপাড়া ও গাববুনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বর্ধন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি শুরু হয় ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পের কাজ তদারকি করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাতক্ষীরা-২ বিভাগ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের অগ্রগতি ছিল ৭৫ শতাংশ। গত শুক্রবার পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের পর ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এর মধ্যে দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪৫০ মিটার নদীতীর রক্ষায় তিন লাখ ৮২ হাজার সিসি ব্লক ডাম্পিং এবং এক লাখ ১১ হাজার ব্লক স্থাপনের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এ পর্যন্ত তিন লাখ ২২ হাজার ব্লক ডাম্পিং করা হয়েছে। তবে প্রায় ৬০০ মিটার বাঁধে ব্লক বসানোর কাজ এখনো বাকি।

ধীরগতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে। সিসি ব্লক তৈরির সরঞ্জাম আনা ও মাঠ প্রস্তুত করতেই ছয় মাস সময় লেগেছে। পরে ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন প্রথমে কপোতাক্ষ নদের চিকন দানার বালু দিয়ে ব্লক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। এলাকাবাসীর বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। পরে বাইরে থেকে মোটা দানার বালু এনে আবার কাজ শুরু করা হয়।

প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান অভিযোগ করেন, নিম্নমানের ব্লক তৈরির বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা এবং অনিয়মের কারণেই কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। তাঁর দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সুযোগ বুঝে ব্লক তৈরি করেন এবং রাতে সেগুলো নদে ফেলা হয়। কত ব্লক তৈরি ও ডাম্পিং করা হয়েছে, সে তথ্যও এলাকাবাসীকে জানানো হয়নি।

আরেক বাসিন্দা দেবাশীষ মণ্ডল বলেন, এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই বছরেও কাজ শেষ হয়নি। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় কয়েকটি স্থানে চরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে।

একই ব্লক বারবার গণনার অভিযোগ

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ পাওয়ার পর কয়েকবার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন স্থানীয় এক শ্রমিক সরদারের সহায়তায় আবার কাজ শুরু করেন।

চেয়ারম্যানের অভিযোগ, পাউবোর টাস্কফোর্সের দল ব্লক গণনা করে চলে যাওয়ার পর সেগুলো সব সময় নদে ফেলা হয় না। একই ব্লক বারবার গণনায় দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থের অনিয়ম করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঠিকাদার ও পাউবোর বক্তব্য

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের সাইট ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রকল্পের নথিতে দৈর্ঘ্য এক হাজার ৪৫০ মিটার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সাড়ে ১১শ মিটার এলাকায় কাজ করা হবে। এর বেশির ভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

তিনি বলেন, কাশিরহাট এলাকায় কয়েকটি দোকান ও বিদ্যুতের খুঁটির কারণে কাজ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া গাজীপাড়া এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার অংশে কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের অভিযোগ অস্বীকার করে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, টাস্কফোর্সের উপস্থিতিতে ব্লক গণনা শেষে সেগুলো ডাম্পিং করা হয়। দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রকল্প এলাকার কয়েকটি স্থাপনা সরাতে সময় লাগায় কাজ পিছিয়েছে। তবে বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, ব্লক ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং নদপাড়ের মাটি ধসে পড়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করা না গেলে নদীতীর সুরক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

সুন্দরবনের পানি-মাটিতে প্লাস্টিক দূষণ, মাছে সিসা-নিকেল-তামা

খুলনা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪০ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের পানি-মাটিতে প্লাস্টিক দূষণ, মাছে সিসা-নিকেল-তামা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নদী ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর প্রভাব পড়ছে বনের জলজ প্রাণীর ওপরও। গবেষণায় শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের পশুর নদের তিন প্রজাতির মাছ—পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটায় ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এসব মাছের শরীরে সিসা, নিকেল, তামা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু পাওয়া গেছে। প্লাস্টিক দূষণ ও মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, নদী ও পলিমাটিতে জমে থাকা দূষিত উপাদান জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব উপাদান অন্য প্রাণী এবং মানুষের শরীরেও পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশন গবেষণা পরিচালনা করেছে। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণাটির খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের তিনটি নদীর পানি ও মাটির নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদী, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া নদী এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদী।

পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৫৭০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। ভোলা নদীর পানিতে প্রতি ঘনমিটারে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি কণা শনাক্ত করেন গবেষকেরা। নদীর পলিমাটিতেও পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সুন্দরবনের পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জলজ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। এসব কণা দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যচক্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

শিলা কাঁকড়ার ফুলকা ও অন্ত্রে প্লাস্টিক
খোলপেটুয়া নদী থেকে সংগ্রহ করা শিলা কাঁকড়ার নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকেরা এর ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন। কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো প্লাস্টিকের উপাদানও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করতে পারে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব কণা বড় প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারাও বিভিন্ন জটিলতার শিকার হতে পারে। তিনি আরও বলেন, নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অণুজীব ও তলদেশে বসবাসকারী প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র নষ্ট করতে পারে। এ কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে শুধু পানির সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এর প্রভাব পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে।

পশুর নদের মাছে সিসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম
সুন্দরবনের নদীগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের পাশাপাশি ভারী ধাতুর উপস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পশুর নদের মাছ নিয়ে গবেষণাটি করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গবেষণার নিবন্ধ গত বছরের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা পশুর নদের ছয়টি স্থান থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা সংগ্রহের স্থানগুলোর মধ্যে ছিল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

পরীক্ষায় মাছের শরীরে গড়ে প্রতি কেজিতে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাছের অন্ত্রে এসব ধাতুর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল; এরপর ছিল ফুলকায়। গবেষণায় উদ্ধৃত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহনশীল মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ধাতুর গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণে মাছের প্রজাতি, নমুনার ধরন ও পরিমাপের একক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব ফলাফলের ব্যাখ্যায় গবেষণায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ড বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিল্পবর্জ্যকে দূষণের অন্যতম উৎস বলছেন গবেষকেরা
গবেষণা দলের প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটিকে দূষিত করছে। একপর্যায়ে এসব দূষিত উপাদান মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় নদীর তীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাও জরুরি।

অন্যদিকে ‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে পৌঁছায়। তাঁর মতে, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

উজান থেকে প্লাস্টিক আসা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
অতীতের বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান-পরবর্তী ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমেও বনের ভেতরে ৫৬ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, উজান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আসা বন্ধ করতে যৌথ নদী কমিশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এর চারপাশের ১০ কিলোমিটার পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে প্লাস্টিকের মোড়ক নিয়ন্ত্রণ, মোংলা বন্দর ও পরিবেশগত সংকটপূর্ণ এলাকার কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেলবর্জ্য ফেলা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সুন্দরবনে প্লাস্টিক প্রবেশ বন্ধে উদ্যোগের কথা বন বিভাগের
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বন বিভাগের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই বনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের চারপাশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি