খুঁজুন
                               
, ,
           

পর্যটনের স্বপ্ন দেখছে চলনবিল, কিন্তু হারাচ্ছে নিজের প্রাণ

নাটোর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ণ
পর্যটনের স্বপ্ন দেখছে চলনবিল, কিন্তু হারাচ্ছে নিজের প্রাণ

বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, ভেসে চলা নৌকা আর আকাশভরা মেঘ। শরতে নীল আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে বিলের পানিতে, হেমন্তে বিলপাড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের সোনালি আভা। শীতের সকালে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভেসে আসে অতিথি পাখির ডাক। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় চলনবিলের রূপ, কিন্তু প্রকৃতির এই বিশাল জলাভূমির আকর্ষণ ফুরায় না।

নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চলনবিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্য আহরণ, নৌচলাচল ও জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। এখন এই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনা—প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। তৈরি হতে পারে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, বাড়তে পারে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পথে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। নদী-খাল ভরাট, জলাভূমি দখল, পলি জমা, পানিপ্রবাহে বাধা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ চলনবিলের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দিচ্ছে। ফলে পর্যটনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে বিলের প্রকৃতি, পানি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা।

ঋতু বদলায়, বদলায় চলনবিলের সৌন্দর্য

চলনবিল কোনো একক জলাশয় নয়। নদী, খাল, ছোট-বড় বিল এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি মিলিয়ে এটি একটি বৃহৎ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। আত্রাই, বড়াল, গুমানীসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল এই অঞ্চলের জলপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ভরে উঠলে তৈরি হয় এক অনন্য জলজ ভূদৃশ্য।

নৌকায় চলতে চলতে কখনো মনে হয় নদীপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার কখনো চারপাশের জলরাশি চোখে তৈরি করে সীমাহীন জলরাজ্যের অনুভূতি। কোথাও জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, কোথাও নৌকার সারি, আবার কোথাও বিলের পানির সঙ্গে মিশে থাকা গ্রামের দৃশ্য—সব মিলিয়ে চলনবিলের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। শুধু বর্ষাকাল নয়, বছরের অন্য সময়েও এ অঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শরৎ ও হেমন্তে জল, আকাশ, ফসলি জমি এবং গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। শীতকালে পাখি ও জলাভূমির পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং গ্রামীণ জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এই বৈচিত্র্যই চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনার বড় ভিত্তি। এখানে কৃত্রিম বিনোদনকেন্দ্রের চেয়ে প্রকৃতি, জলপথ ও স্থানীয় জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ বেশি।

পর্যটন হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ভরসা

পরিকল্পিত পর্যটন চালু হলে চলনবিলের আশপাশের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নিরাপদ নৌভ্রমণ, স্থানীয় গাইডের সেবা, বিলের মাছ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার, কৃষিপণ্য বিক্রি, হস্তশিল্প এবং লোকসংস্কৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে ছোট ছোট ব্যবসা। স্থানীয় তরুণেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে নৌভ্রমণের গাইড, পর্যটন সহায়ক কিংবা পরিবেশ পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারেন। গ্রামের পরিবারগুলো নিজেদের তৈরি খাবার, স্থানীয় পণ্য ও হস্তশিল্প বিক্রির মাধ্যমে আয় করতে পারে। স্থানীয় লোকগান, গ্রামীণ উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রাকে পরিচিত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ যেন স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়। বাইরের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিলপাড়ের বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন কেবল দর্শনার্থী আকর্ষণের উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে পর্যটনকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আগে প্রয়োজন পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাঁদের ভ্রমণ যেন স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে যুক্ত হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

দখল, ভরাট ও পানিপ্রবাহের বাধায় বদলে যাচ্ছে বিল

পর্যটনের সম্ভাবনার বিপরীতে চলনবিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নদী-খাল ভরাট, পলি জমা, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং নির্বিচারে পুকুর খননের মতো কর্মকাণ্ড পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহার এবং জলজ উদ্ভিদের অস্বাভাবিক বিস্তারও কিছু এলাকায় মাছের আবাসস্থল ও নৌচলাচলের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের ওপর। কোথাও বর্ষার পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে পারে, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে নদী-খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ধরনের পরিবর্তন চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের আকর্ষণকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জলাভূমির স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শুধু পর্যটন নয়, এই অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকাও চাপে পড়ে। তাই চলনবিলের পরিবেশগত সমস্যা সমাধানকে পর্যটন উন্নয়নের বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পরিবেশ রক্ষাই হওয়া উচিত পর্যটন পরিকল্পনার প্রথম শর্ত।

পর্যটনের নামে নতুন সংকট তৈরি করা যাবে না

পর্যটন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে গিয়ে যদি বিলপাড়ে অপরিকল্পিত কংক্রিটের স্থাপনা গড়ে ওঠে, প্লাস্টিক বর্জ্য জমে, শব্দদূষণ বাড়ে কিংবা নির্বিচারে মোটরচালিত নৌযান চলাচল শুরু হয়, তাহলে পর্যটনের উন্নয়নই একসময় পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পর্যটকদের চাপ সামলাতে গিয়ে পাখির আবাসস্থল, মাছের প্রজননক্ষেত্র ও জলজ উদ্ভিদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে চলনবিলের সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্যই হারিয়ে যাবে, যা মানুষকে এখানে টানতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জীবিকার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাই চলনবিলে পর্যটন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃতিনির্ভর পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোথায় নৌভ্রমণ করা যাবে, কোথায় পর্যটকদের প্রবেশ সীমিত রাখা প্রয়োজন, কীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে এবং কোন এলাকাগুলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাকৃতিক চরিত্র যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ কমানো এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

নৌপথ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে পরিকল্পনা

চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রথমেই প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও নিরাপদ নৌপথ চিহ্নিত করা। নৌযানের নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, প্রশিক্ষিত চালক, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ঘাট নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন বিশ্রামস্থল, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা, বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইড হিসেবে যুক্ত করলে পর্যটকেরা চলনবিলের ইতিহাস, প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেন।

পর্যটনের পরিকল্পনায় স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প ও লোকসংস্কৃতিরও জায়গা থাকা প্রয়োজন। এতে ভ্রমণ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পর্যটকেরা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় মানুষের মতামত এবং জলাভূমির বহনক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। যে এলাকায় পর্যটকের চাপ প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, সেখানে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

নদী-খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া সম্ভাবনা টেকসই হবে না

চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে নদী ও খালের নাব্যতা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা জরুরি। অবৈধ দখল ও ভরাটের অভিযোগ যাচাই, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নদী-খাল পুনরুদ্ধার, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জলাভূমির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিলের পানির অবস্থা, মাছের প্রজননক্ষেত্র, পাখির আবাসস্থল ও মৌসুমি জলপ্রবাহ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটন কার্যক্রমের উপযুক্ত সময় ও স্থান নির্ধারণ করা গেলে প্রকৃতির ওপর চাপ কমিয়ে পর্যটন পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ ও মৎস্যসংশ্লিষ্ট দপ্তর, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, গবেষক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পরিকল্পনা তৈরির সময় বিলপাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।

চলনবিলের সৌন্দর্যই হোক পর্যটনের মূল আকর্ষণ

চলনবিলের আসল সৌন্দর্য কোনো কৃত্রিম রিসোর্ট বা বড় স্থাপনায় নয়। এর আকর্ষণ দিগন্তজোড়া জলে, আকাশের প্রতিবিম্বে, নৌকার ছইয়ে, পাখির ডানায়, জেলের জালে এবং কৃষকের মাঠে। এই প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার সমন্বয়ই চলনবিলকে অন্য অনেক পর্যটনস্থানের চেয়ে আলাদা পরিচিতি দিতে পারে। এ কারণে পর্যটনের নামে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে ফেলার পরিবর্তে প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই পর্যটন গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নিরাপদ নৌভ্রমণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। চলনবিলকে ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন অবশ্যই দেখা যায়। পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে এই জলাভূমি প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে বিলের পানি, নদী-খাল, মাছ, পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ অপরাহ্ণ
এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধ করতে বলা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। রোববার (১৮ অক্টোবর) আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ আপিল আবেদন করা হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিট খারিজ করে এনবিআরের দাবি করা কর পরিশোধের পক্ষে রায় দেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ে এনবিআরের আইনি বাধা থাকছে না বলে জানিয়েছিলেন আইনজীবীরা। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে এবার আপিল করল গ্রামীণ কল্যাণ।

গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন। এর ফলে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।আদালতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। পরে গত ১২ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর মামলাসংশ্লিষ্ট ১৫ ও ৩২ পৃষ্ঠার পৃথক পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ আপিল করেছে।

পাঁচ করবর্ষের কর দাবি নিয়ে মামলা

মামলাটি গ্রামীণ কল্যাণের পাঁচটি করবর্ষের আয়কর দাবি নিয়ে। করবর্ষগুলো হলো ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭। পুনর্মূল্যায়নের পর এসব করবর্ষের জন্য এনবিআর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর দাবি করে। ওই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি পৃথক দুটি রিট আবেদন করে। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে নতুন বেঞ্চে মামলাগুলোর শুনানি হয় এবং রুল খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। রিট খারিজ হওয়ায় এনবিআরের দাবি করা অর্থ আদায়ের পথ খুলেছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তবে গ্রামীণ কল্যাণের আপিলের পর এ বিষয়ে আপিল বিভাগে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা এখন দেখার বিষয়।

আগের রায় প্রত্যাহার করে নতুন বেঞ্চে শুনানি

এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এর আগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বপ্রণোদিতভাবে আগের একটি রায় প্রত্যাহার করে নেন। ওই রায়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। পরে মামলাটি শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়। নতুন বেঞ্চে পুনরায় শুনানি ও বিচারিক পর্যালোচনার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর রিট খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। এবার সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করেছে গ্রামীণ কল্যাণ।

আপিল বিভাগে পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

গ্রামীণ কল্যাণের আপিলের ফলে ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবি নিয়ে আইনি লড়াই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পর এখন আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। তবে আপিল আবেদন দাখিলের পর আপিল বিভাগের কোনো আদেশ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এখনো উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এনবিআরের দাবি করা অর্থ পরিশোধের বিষয়ে পরবর্তী আইনি অবস্থান নির্ধারিত হবে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট আদেশের ভিত্তিতে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

খুলনার কয়রা

৭১ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ১৪ মাসেও অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ

খুলনা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ণ
৭১ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ১৪ মাসেও অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ

খুলনার কয়রা উপজেলায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরও শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৮০ শতাংশ। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থানে নদপাড়ের মাটি ধসে পড়েছে। প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও ব্লক গণনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাশিরহাটখোলা, গাজীপাড়া ও গাববুনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বর্ধন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি শুরু হয় ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পের কাজ তদারকি করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাতক্ষীরা-২ বিভাগ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের অগ্রগতি ছিল ৭৫ শতাংশ। গত শুক্রবার পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের পর ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এর মধ্যে দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪৫০ মিটার নদীতীর রক্ষায় তিন লাখ ৮২ হাজার সিসি ব্লক ডাম্পিং এবং এক লাখ ১১ হাজার ব্লক স্থাপনের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এ পর্যন্ত তিন লাখ ২২ হাজার ব্লক ডাম্পিং করা হয়েছে। তবে প্রায় ৬০০ মিটার বাঁধে ব্লক বসানোর কাজ এখনো বাকি।

ধীরগতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে। সিসি ব্লক তৈরির সরঞ্জাম আনা ও মাঠ প্রস্তুত করতেই ছয় মাস সময় লেগেছে। পরে ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন প্রথমে কপোতাক্ষ নদের চিকন দানার বালু দিয়ে ব্লক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। এলাকাবাসীর বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। পরে বাইরে থেকে মোটা দানার বালু এনে আবার কাজ শুরু করা হয়।

প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান অভিযোগ করেন, নিম্নমানের ব্লক তৈরির বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা এবং অনিয়মের কারণেই কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। তাঁর দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সুযোগ বুঝে ব্লক তৈরি করেন এবং রাতে সেগুলো নদে ফেলা হয়। কত ব্লক তৈরি ও ডাম্পিং করা হয়েছে, সে তথ্যও এলাকাবাসীকে জানানো হয়নি।

আরেক বাসিন্দা দেবাশীষ মণ্ডল বলেন, এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই বছরেও কাজ শেষ হয়নি। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় কয়েকটি স্থানে চরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে।

একই ব্লক বারবার গণনার অভিযোগ

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ পাওয়ার পর কয়েকবার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন স্থানীয় এক শ্রমিক সরদারের সহায়তায় আবার কাজ শুরু করেন।

চেয়ারম্যানের অভিযোগ, পাউবোর টাস্কফোর্সের দল ব্লক গণনা করে চলে যাওয়ার পর সেগুলো সব সময় নদে ফেলা হয় না। একই ব্লক বারবার গণনায় দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থের অনিয়ম করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঠিকাদার ও পাউবোর বক্তব্য

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের সাইট ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রকল্পের নথিতে দৈর্ঘ্য এক হাজার ৪৫০ মিটার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সাড়ে ১১শ মিটার এলাকায় কাজ করা হবে। এর বেশির ভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

তিনি বলেন, কাশিরহাট এলাকায় কয়েকটি দোকান ও বিদ্যুতের খুঁটির কারণে কাজ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া গাজীপাড়া এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার অংশে কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের অভিযোগ অস্বীকার করে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, টাস্কফোর্সের উপস্থিতিতে ব্লক গণনা শেষে সেগুলো ডাম্পিং করা হয়। দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রকল্প এলাকার কয়েকটি স্থাপনা সরাতে সময় লাগায় কাজ পিছিয়েছে। তবে বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, ব্লক ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং নদপাড়ের মাটি ধসে পড়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করা না গেলে নদীতীর সুরক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

সুন্দরবনের পানি-মাটিতে প্লাস্টিক দূষণ, মাছে সিসা-নিকেল-তামা

খুলনা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪০ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের পানি-মাটিতে প্লাস্টিক দূষণ, মাছে সিসা-নিকেল-তামা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নদী ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর প্রভাব পড়ছে বনের জলজ প্রাণীর ওপরও। গবেষণায় শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের পশুর নদের তিন প্রজাতির মাছ—পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটায় ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এসব মাছের শরীরে সিসা, নিকেল, তামা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু পাওয়া গেছে। প্লাস্টিক দূষণ ও মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, নদী ও পলিমাটিতে জমে থাকা দূষিত উপাদান জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব উপাদান অন্য প্রাণী এবং মানুষের শরীরেও পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশন গবেষণা পরিচালনা করেছে। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণাটির খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের তিনটি নদীর পানি ও মাটির নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদী, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া নদী এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদী।

পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৫৭০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। ভোলা নদীর পানিতে প্রতি ঘনমিটারে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি কণা শনাক্ত করেন গবেষকেরা। নদীর পলিমাটিতেও পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সুন্দরবনের পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জলজ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। এসব কণা দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যচক্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

শিলা কাঁকড়ার ফুলকা ও অন্ত্রে প্লাস্টিক
খোলপেটুয়া নদী থেকে সংগ্রহ করা শিলা কাঁকড়ার নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকেরা এর ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন। কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো প্লাস্টিকের উপাদানও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করতে পারে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব কণা বড় প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারাও বিভিন্ন জটিলতার শিকার হতে পারে। তিনি আরও বলেন, নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অণুজীব ও তলদেশে বসবাসকারী প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র নষ্ট করতে পারে। এ কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে শুধু পানির সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এর প্রভাব পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে।

পশুর নদের মাছে সিসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম
সুন্দরবনের নদীগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের পাশাপাশি ভারী ধাতুর উপস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পশুর নদের মাছ নিয়ে গবেষণাটি করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গবেষণার নিবন্ধ গত বছরের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা পশুর নদের ছয়টি স্থান থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা সংগ্রহের স্থানগুলোর মধ্যে ছিল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

পরীক্ষায় মাছের শরীরে গড়ে প্রতি কেজিতে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাছের অন্ত্রে এসব ধাতুর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল; এরপর ছিল ফুলকায়। গবেষণায় উদ্ধৃত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহনশীল মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ধাতুর গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণে মাছের প্রজাতি, নমুনার ধরন ও পরিমাপের একক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব ফলাফলের ব্যাখ্যায় গবেষণায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ড বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিল্পবর্জ্যকে দূষণের অন্যতম উৎস বলছেন গবেষকেরা
গবেষণা দলের প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটিকে দূষিত করছে। একপর্যায়ে এসব দূষিত উপাদান মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় নদীর তীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাও জরুরি।

অন্যদিকে ‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে পৌঁছায়। তাঁর মতে, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

উজান থেকে প্লাস্টিক আসা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
অতীতের বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান-পরবর্তী ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমেও বনের ভেতরে ৫৬ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, উজান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আসা বন্ধ করতে যৌথ নদী কমিশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এর চারপাশের ১০ কিলোমিটার পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে প্লাস্টিকের মোড়ক নিয়ন্ত্রণ, মোংলা বন্দর ও পরিবেশগত সংকটপূর্ণ এলাকার কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেলবর্জ্য ফেলা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সুন্দরবনে প্লাস্টিক প্রবেশ বন্ধে উদ্যোগের কথা বন বিভাগের
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বন বিভাগের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই বনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের চারপাশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি