নিজস্ব আয় নেই, চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই—তবু চাকরির লড়াইয়ে টিকে থাকতে বারবার টাকা খরচ করতে হচ্ছে লাখো তরুণকে। একেকটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন ফি, পরীক্ষায় অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা, থাকা-খাওয়া—সব মিলিয়ে বেকার জীবনে বাড়তি আর্থিক বোঝা হয়ে উঠেছে চাকরির পরীক্ষা। প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ব্যয়ের চাপও তত বাড়ছে। ফলে মেধা ও যোগ্যতার লড়াইয়ে নামার আগেই অনেক প্রার্থীকে লড়তে হচ্ছে অর্থের সংকটের সঙ্গে।
লালমনিরহাটের নাহিদা হাসানের অভিজ্ঞতা সেই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে এখন পরিবারের সঙ্গে থেকে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রায়ই আসতে হয় ঢাকায়। সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একটি তৃতীয় শ্রেণির পদের পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া-আসা ও খাওয়া-দাওয়া মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সামনে আরও কয়েকটি পরীক্ষা। সেগুলো দিতে আবারও আলাদা সময়ে ঢাকায় আসতে হবে। অর্থাৎ চাকরি পাওয়ার আগেই শুধু পরীক্ষায় অংশ নিতে তাকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা।
- একাধিক নিয়োগে আবেদন ও বারবার ঢাকায় যাতায়াতে বাড়ছে ব্যয়
- হিমশিম খাচ্ছেন আয়হীন তরুণেরা; নিয়োগব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্ন
- প্রার্থীবান্ধব নিয়োগব্যবস্থার দাবি
নাহিদার মতো দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য চাকরিপ্রার্থীকে একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। যাদের নিয়মিত আয় নেই, তাদের জন্য প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মানে নতুন করে অর্থের সংস্থান করা। একাধিক নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ আলাদা হওয়ায় বারবার যাতায়াতের খরচও বহন করতে হয়। আবেদন ফি ও প্রস্তুতির ব্যয়ের সঙ্গে এই বাড়তি চাপ দীর্ঘদিন বেকার থাকা তরুণদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২০ লাখ ৩২ হাজার। এই বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বাড়তি ব্যয় এখন গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।
এক পদের বিপরীতে হাজারো প্রতিদ্বন্দ্বী
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার চিত্রও উদ্বেগজনক। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ২১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন। ৫০তম বিসিএসের ২ হাজার ১৫০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার প্রার্থী। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার জন।
এমন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একজন প্রার্থীকে একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে হয়, দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে হয়। অথচ চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। আবেদন থেকে পরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অর্থ ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগের সুযোগ না পাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। যাদের পারিবারিক আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য এই লড়াই আরও কঠিন।
আবেদন ফি নিয়েও প্রশ্ন
সরকারি চাকরির আবেদন ফি পুনর্নির্ধারণ করে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বিসিএস পরীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন নন-ক্যাডার পদ এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার আবেদন ফি পদভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে কয়েকশ থেকে এক হাজার টাকার বেশি আবেদন ফি দিতে হচ্ছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও তুলনামূলক বেশি ফি নেওয়ার নজির রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষকের দুটি পদের জন্য আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫০ টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে ফি ২০০ থেকে ৬০০ টাকা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদভেদে আবেদন ফি রাখা হয়েছে ৪০০ ও ৫০০ টাকা।
সুনামগঞ্জের রাজিব দের অভিযোগ, আবেদন করতেই যখন কয়েকশ থেকে হাজার টাকার বেশি খরচ হয়, তখন পরীক্ষায় অংশ নিতে যাতায়াতের জন্য আরও দুই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যয় করা অনেক বেকারের পক্ষেই কঠিন। তার প্রশ্ন, আয়হীন তরুণদের চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে কেন?
সমাধান কি বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা?
ঢাকাকেন্দ্রিক নিয়োগ পরীক্ষার কারণে রাজধানীর বাইরে থাকা প্রার্থীদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজধানীতে প্রার্থীদের অতিরিক্ত সমাগমও চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বিভাগীয় শহরগুলোয় আয়োজনের নজির রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাও একাধিক কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান মনে করেন, বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঝুঁকি থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তার মতে, লাখ লাখ প্রার্থীর ঢাকায় আসায় তাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি রাজধানীর ওপরও চাপ বাড়ছে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খানও বেকারদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শিক্ষাকে সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হলে শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন।
চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা আয়োজন, আবেদন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো গেলে তাদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। এতে দূরবর্তী জেলা থেকে বারবার ঢাকায় আসার প্রয়োজনও কমবে।
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সামর্থ্য যদি অর্থের ওপর নির্ভর করে, তাহলে যোগ্যতার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন। বেকার তরুণদের কাছে চাকরির পরীক্ষা এখন শুধু মেধা যাচাইয়ের ধাপ নয়, অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্যেরও পরীক্ষা। এই বাস্তবতা বদলাতে নিয়োগব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী, বিকেন্দ্রীকৃত ও প্রার্থীবান্ধব করার বিকল্প নেই।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]