হাম-ডেঙ্গুতে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য
দেশে একদিকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দুই রোগের সংক্রমণ সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। বিশেষ করে হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ডেঙ্গুতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবার বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। এ সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ হাজার ১৬৪ জনের মধ্যে। পরীক্ষায় নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ৪৬ জনের শরীরে। ডেঙ্গুতে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৮১ জন।
- হামের উপসর্গে মৃত্যু ১ হাজার ছাড়িয়েছে, ডেঙ্গুতে মৃত ৩৩৫
- দুই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
- সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান ও মশা নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার প্রয়োজন
এই পরিসংখ্যান বলছে, হাম ও ডেঙ্গু এখন দুটি পৃথক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা, টিকাদান এবং দ্রুত জটিল রোগী শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, সংক্রমণ নজরদারি ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু রোগীর সংখ্যা প্রকাশ নয়, মৃত্যুর পেছনের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
হামের উপসর্গে মৃত্যু বেশি, নিশ্চিত সংক্রমণের হিসাব আলাদা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৫ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪০ জনের মধ্যে। পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২ হাজার ৯৭২ জনের।
এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ১৮৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০৪ জন। বাকি ১ হাজার ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। অর্থাৎ, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যুর সংখ্যার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। তবে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ হাম—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণ এবং উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
এই পার্থক্যটি জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলে সংশ্লিষ্ট রোগের পাশাপাশি অন্য সম্ভাব্য কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পর্যাপ্ত পরীক্ষা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে বিস্তারিত পর্যালোচনা জরুরি। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগ শনাক্তকরণ ও পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে।
ঢাকায় হামের উপসর্গে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে। এ বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৮৮। এরপর সিলেটে ১৮৯, চট্টগ্রামে ৯৮, রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৮২, বরিশালে ৬৫, খুলনায় ৪৯ এবং রংপুরে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকা বিভাগের মৃত্যুসংখ্যা অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং শিশুদের সুরক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু মৃত্যুর মোট সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকায় সংক্রমণের প্রকৃত তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসাসুবিধার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া এবং সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। জটিলতা দেখা দেওয়া রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ছে, দুই মাসেই প্রাণহানি প্রায় ৭১ শতাংশ
হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩৫।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু তুলনামূলক কম থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে এবং মে মাসে একজন মারা যান। জুনে মৃত্যু হয় ১৩ জনের, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের। অক্টোবরে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯০ জন। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, এ দুই মাসেই চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটেছে। অর্থাৎ বছরের শেষ ভাগে এসে ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই প্রবণতা ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। শুধু বর্ষাকালে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করলেই যথেষ্ট কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তবে মৃত্যুর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান একা দিয়ে সংক্রমণ বা মৃত্যুর বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, হাসপাতালে আসার সময়, রোগের জটিলতা এবং চিকিৎসার তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।
ডেঙ্গু আর ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, বাড়ছে বিভাগীয় পর্যায়েও রোগীর চাপ
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৬ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১২৫ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১৯ জন।
বিভাগীয় হিসাবে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৪২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনায় ১৪০, বরিশালে ১২৭, রাজশাহীতে ৯৯, ময়মনসিংহে ৯২ এবং রংপুরে ৭১ জন ভর্তি হয়েছেন। এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রাজধানীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করলে চলবে না। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং জটিল রোগীর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনাও জরুরি। রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন কি না, বিপৎসংকেত শনাক্তে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না কিংবা চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হচ্ছে কি না—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর কার্যকর পথ বের করা সম্ভব।
দুই রোগ, দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ
হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এক নয়। তাই একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে দুই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। হামের ক্ষেত্রে টিকাদানের আওতা বাড়ানো, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত পরীক্ষা এবং জটিল রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে হাম ও অন্য রোগের কারণে মৃত্যুর পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। দুই রোগের ক্ষেত্রেই হাসপাতালের প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত জনবল এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না; এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে এবং কোন পদক্ষেপে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব—তা নির্ধারণ করতে হবে।
পরিসংখ্যানের পর এবার কার্যকর পদক্ষেপের সময়
হাম ও ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে দুটি জরুরি কাজ তুলে ধরছে। প্রথমত, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা।
হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের অসুস্থতা এবং ডেঙ্গুতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃত্যুর বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়া—দুটিই নিয়মিত নজরদারি ও সময়োপযোগী প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা দেখায়। বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা এবং ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাফল্য শুধু কতজন আক্রান্ত হলেন বা কতজন হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কতজনের মৃত্যু প্রতিরোধ করা গেল, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীরা কত দ্রুত চিকিৎসা পেলেন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কতটা অগ্রগতি হলো—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন সেই ফলাফল নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array