খুঁজুন
                               
, ,
           

হাম-ডেঙ্গুতে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৮ অপরাহ্ণ
হাম-ডেঙ্গুতে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য

দেশে একদিকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দুই রোগের সংক্রমণ সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। বিশেষ করে হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ডেঙ্গুতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবার বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। এ সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ হাজার ১৬৪ জনের মধ্যে। পরীক্ষায় নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ৪৬ জনের শরীরে। ডেঙ্গুতে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৮১ জন।

  • হামের উপসর্গে মৃত্যু ১ হাজার ছাড়িয়েছে, ডেঙ্গুতে মৃত ৩৩৫
  • দুই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
  • সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান ও মশা নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার প্রয়োজন

এই পরিসংখ্যান বলছে, হাম ও ডেঙ্গু এখন দুটি পৃথক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা, টিকাদান এবং দ্রুত জটিল রোগী শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, সংক্রমণ নজরদারি ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু রোগীর সংখ্যা প্রকাশ নয়, মৃত্যুর পেছনের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

হামের উপসর্গে মৃত্যু বেশি, নিশ্চিত সংক্রমণের হিসাব আলাদা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৫ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪০ জনের মধ্যে। পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২ হাজার ৯৭২ জনের।

এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ১৮৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০৪ জন। বাকি ১ হাজার ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। অর্থাৎ, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যুর সংখ্যার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। তবে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ হাম—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণ এবং উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

এই পার্থক্যটি জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলে সংশ্লিষ্ট রোগের পাশাপাশি অন্য সম্ভাব্য কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পর্যাপ্ত পরীক্ষা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে বিস্তারিত পর্যালোচনা জরুরি। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগ শনাক্তকরণ ও পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে।

ঢাকায় হামের উপসর্গে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে। এ বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৮৮। এরপর সিলেটে ১৮৯, চট্টগ্রামে ৯৮, রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৮২, বরিশালে ৬৫, খুলনায় ৪৯ এবং রংপুরে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা বিভাগের মৃত্যুসংখ্যা অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং শিশুদের সুরক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু মৃত্যুর মোট সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকায় সংক্রমণের প্রকৃত তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসাসুবিধার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া এবং সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। জটিলতা দেখা দেওয়া রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ছে, দুই মাসেই প্রাণহানি প্রায় ৭১ শতাংশ
হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩৫।

মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু তুলনামূলক কম থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে এবং মে মাসে একজন মারা যান। জুনে মৃত্যু হয় ১৩ জনের, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের। অক্টোবরে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯০ জন। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, এ দুই মাসেই চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটেছে। অর্থাৎ বছরের শেষ ভাগে এসে ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এই প্রবণতা ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। শুধু বর্ষাকালে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করলেই যথেষ্ট কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তবে মৃত্যুর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান একা দিয়ে সংক্রমণ বা মৃত্যুর বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, হাসপাতালে আসার সময়, রোগের জটিলতা এবং চিকিৎসার তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।

ডেঙ্গু আর ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, বাড়ছে বিভাগীয় পর্যায়েও রোগীর চাপ
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৬ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১২৫ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১৯ জন।

বিভাগীয় হিসাবে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৪২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনায় ১৪০, বরিশালে ১২৭, রাজশাহীতে ৯৯, ময়মনসিংহে ৯২ এবং রংপুরে ৭১ জন ভর্তি হয়েছেন। এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রাজধানীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করলে চলবে না। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং জটিল রোগীর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনাও জরুরি। রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন কি না, বিপৎসংকেত শনাক্তে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না কিংবা চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হচ্ছে কি না—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর কার্যকর পথ বের করা সম্ভব।

দুই রোগ, দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ
হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এক নয়। তাই একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে দুই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। হামের ক্ষেত্রে টিকাদানের আওতা বাড়ানো, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত পরীক্ষা এবং জটিল রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে হাম ও অন্য রোগের কারণে মৃত্যুর পার্থক্য স্পষ্ট হয়।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। দুই রোগের ক্ষেত্রেই হাসপাতালের প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত জনবল এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না; এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে এবং কোন পদক্ষেপে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব—তা নির্ধারণ করতে হবে।

পরিসংখ্যানের পর এবার কার্যকর পদক্ষেপের সময়
হাম ও ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে দুটি জরুরি কাজ তুলে ধরছে। প্রথমত, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা।

হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের অসুস্থতা এবং ডেঙ্গুতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃত্যুর বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়া—দুটিই নিয়মিত নজরদারি ও সময়োপযোগী প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা দেখায়। বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা এবং ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাফল্য শুধু কতজন আক্রান্ত হলেন বা কতজন হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কতজনের মৃত্যু প্রতিরোধ করা গেল, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীরা কত দ্রুত চিকিৎসা পেলেন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কতটা অগ্রগতি হলো—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন সেই ফলাফল নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

টানা ১০ দিনের ছুটি, নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৪ অপরাহ্ণ
টানা ১০ দিনের ছুটি, নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ

শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন হাজারো মানুষ। কর্মব্যস্ত নগরজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ির পথে ছুটছেন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সরকারি ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ অবকাশ যুক্ত হওয়ায় এবার অনেকেই আগেভাগে ঢাকা ছাড়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, পূজার ছুটিকে ঘিরে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় বাড়ছে। বিভিন্ন গন্তব্যের বাসের টিকিট কাউন্টারে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে, কেউবা ছুটির দিনগুলো কাটাতে ছুটছেন আত্মীয়স্বজনের কাছে।

চলতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ২০ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পাচ্ছেন। এ ছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটির সময় আরও দীর্ঘ। সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক ছুটি ও পূজার ছুটি মিলিয়ে টানা ১০ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকছে। এ কারণে যেসব পরিবারের সন্তান স্কুলে পড়ে, তাদের জন্য একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রায় ৯ থেকে ১০ দিনের ছুটি কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন সিথি রায়। তিনি বলেন, রাজধানীতে কর্মরত মানুষের জন্য পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ খুব বেশি আসে না। কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে বছরের অন্য সময়ে বাড়ি যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এবারের দীর্ঘ ছুটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে বলে জানান তিনি। সন্তানদের গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে তাদের নিয়ে নানাবাড়ি যাচ্ছেন সিথি রায়। একই টার্মিনাল থেকে কুমিল্লাগামী যাত্রী অসিত কুমার দে বলেন, এবার পূজায় টানা ছুটি পাওয়ায় পরিবারের সবাই মিলে আগেই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। সাধারণত এক-দুই দিনের বেশি ছুটি পাওয়া যায় না। এবার দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানো যাবে। সন্তানদের স্কুলও আগেভাগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভিড় এড়াতে একটু আগেই রওনা হয়েছেন তাঁরা।

সায়েদাবাদের মতো মহাখালী বাস টার্মিনালেও দেখা গেছে বাড়ি ফেরা মানুষের ব্যস্ততা। সেখান থেকে ময়মনসিংহগামী বেসরকারি চাকরিজীবী মো. তানভীর আহমেদ জানান, সরকারি ছুটি শুরু হতে আরও দু-এক দিন বাকি থাকলেও অফিসের জমে থাকা ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি আগেই ছুটি নিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ দিনের মতো ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন তিনি। তানভীর আহমেদ বলেন, ঢাকায় একা থেকে সময় কাটানোর চেয়ে গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে পূজা ও ছুটির আনন্দ ভাগাভাগি করতেই তিনি যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছুটির সুযোগে পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পাশাপাশি অনেকেই আগেভাগে যাত্রা করছেন, যাতে ছুটির মূল সময়ে পরিবহনের অতিরিক্ত চাপ এড়ানো যায়।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যাত্রীচাপ বেড়েছে। মহাখালী বাস টার্মিনালের এক পরিবহন মালিক প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের আগেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি ছুটি শুরু হলে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। ফলে ছুটির সময় বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যস্ততা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজধানীর কর্মব্যস্ত জীবন থেকে বিরতি নিয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে খুশি অনেক নগরবাসী। দীর্ঘ ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফেরা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রত্যাশা তাঁদের যাত্রাকে আরও আনন্দমুখর করে তুলেছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। এমনকি অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য গত জুনে ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। নিহত ও আহত সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতার পরও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রান্নাঘর, আর ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ফলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যাওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সতর্কতা পাওয়ার পর ঠিক কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

টয়লেট থেকে উদ্ধার চারজনের মরদেহ

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে। নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নিহত ও আহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। আগুনে রিসোর্টের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ

অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়। আগুনে দগ্ধদের অবস্থা ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেন।

শর্টসার্কিট না রান্নাঘরের চুলা—আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য

রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এরই মধ্যে রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দুটি বক্তব্যেই আগুনের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, রান্নাঘরের চুল্লি কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

ধোঁয়ায় অন্ধকার, স্ত্রীকে নিয়ে নালায় লাফ দেন পর্যটক

আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি দেখেন, চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পাশের একটি নালায় লাফ দিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি জানান, রিসোর্টটিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তাঁরা সেখানে উঠেছিলেন। তাঁদের আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার কথা ছিল। তাঁর বর্ণনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের সামনে তৈরি হওয়া বিপজ্জনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের কারণে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং অগ্নিকাণ্ডে সম্ভাব্য দায় নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০১ অপরাহ্ণ
জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো
জীবনে আরও ভালো করতে কে না চান! কেউ চান ক্যারিয়ারে সফল হতে, কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে, আবার কেউ চান সুন্দর সম্পর্ক ও মানসিক প্রশান্তি। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ পরিশ্রম করেন, নতুন অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও অনেক সময় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। এর পেছনে কি শুধু পরিস্থিতি দায়ী, নাকি নিজের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসও অজান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও মানসিকতা তার আচরণ এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলে অনেক সময় মানুষ নতুন সুযোগ গ্রহণ করতে ভয় পান, ব্যর্থতার আশঙ্কায় পিছিয়ে যান কিংবা নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তাই জীবন বদলাতে শুধু কাজের পরিমাণ বাড়ানো নয়, নিজের ভেতরের চিন্তাভাবনাগুলোও বোঝা জরুরি।

মনের ভেতরেও চলে অদৃশ্য সফটওয়্যার

একটি কম্পিউটারের কথা ভাবুন। এর যন্ত্রাংশ যত উন্নতই হোক, সফটওয়্যারে সমস্যা থাকলে সেটির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা একই রকম। আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা, অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাগুলো আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কেউ হয়তো জীবনে সফল হতে চান, কিন্তু মনে মনে বিশ্বাস করেন, ‘আমি যথেষ্ট যোগ্য নই।’ কেউ ভালোবাসার সম্পর্ক চান, অথচ তাঁর মধ্যে কাজ করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। আবার কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চাইলেও ভাবেন, ‘আমার মতো মানুষের পক্ষে বড় কিছু করা সম্ভব নয়।’

এ ধরনের ধারণা সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এগুলো দৃঢ়ভাবে মনে গেঁথে গেলে মানুষ নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখতে পারেন। নতুন কাজ শুরু করা, ঝুঁকি নেওয়া কিংবা ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হতে পারে।

ফলে সমস্যাটি শুধু বাইরের পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।

নিজের সমালোচনা নয়, নিজেকে বোঝার চেষ্টা করুন

ভুল করলে অনেকেই নিজেদের কঠোরভাবে বিচার করেন। সামান্য ব্যর্থতাকে বড় করে দেখেন, অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। অথচ আত্ম-উন্নয়নের জন্য নিজেকে দোষারোপ করার চেয়ে নিজের আচরণ ও চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণ করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমি নিজের সম্পর্কে কী বিশ্বাস করি? কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে নিজেকে কী বলি? অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা কি এখনো আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? আমার চিন্তাভাবনা কি আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে, নাকি পিছিয়ে দিচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে বোঝা যায়, কোন ধারণাগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, আর কোনগুলো ভয়, অনুমান কিংবা অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে।

নিজেকে বোঝার অর্থ নিজের সব চিন্তাকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং কোন চিন্তা উপকারী, কোনটি অযৌক্তিক এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে দেখা।

সাফল্য পেলেই কি আত্মবিশ্বাস আসে?

অনেকেই মনে করেন, ভালো চাকরি, পদোন্নতি, অর্থসম্পদ কিংবা মানুষের প্রশংসা অর্জন করতে পারলেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দূর হবে। কিন্তু বাস্তবে বাহ্যিক সাফল্য সব সময় ভেতরের অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না।

কেউ পদোন্নতি পাওয়ার পরও ভাবতে পারেন, তিনি যথেষ্ট ভালো নন। কেউ ভালো আয় করার পরও অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অসন্তুষ্টিতে ভুগতে পারেন। আবার কেউ পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার পরও আশঙ্কা করতে পারেন, পরবর্তী সময়ে হয়তো আর সফল হতে পারবেন না।

এভাবে নিজের মূল্য প্রমাণের জন্য একের পর এক অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। তখন সাফল্য উপভোগ করার বদলে নতুন কোনো অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণে লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি নিজের প্রচেষ্টা, সামর্থ্য ও মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, মানুষের ব্যক্তিগত মূল্য শুধু তার পদ, আয়, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্জনের ওপর নির্ভর করে না।

পুরোনো বিশ্বাস কীভাবে অগ্রগতির পথে বাধা হয়

মানুষের অনেক বিশ্বাস তৈরি হয় শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের কোনো কষ্টকর ঘটনার মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় বারবার সমালোচনার মুখোমুখি হলে কেউ নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। আবার কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়ার পর কেউ ধরে নিতে পারেন, তিনি আর কখনো সফল হতে পারবেন না।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব ধারণা অভ্যাসের মতো মনের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে। একপর্যায়ে মানুষ সেগুলোকে প্রশ্ন না করেই সত্য বলে ধরে নেন।

কিন্তু অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বাস বর্তমানের বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। একসময় ব্যর্থতার ভয় কাউকে সতর্ক থাকতে সাহায্য করলেও পরবর্তী সময়ে সেই ভয় নতুন সুযোগ গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই নিজের বিশ্বাসগুলো যাচাই করা জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই ধারণার পক্ষে বাস্তব প্রমাণ কী? এর বিপরীতে কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি? এই বিশ্বাস আমাকে সাহায্য করছে, নাকি অকারণে পিছিয়ে রাখছে? চাইলে নিজের সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক কোন ধারণা তৈরি করা সম্ভব?

নিজেকে গ্রহণ করাই পরিবর্তনের শুরু

নিজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার অর্থ নিজেকে ছোট করা নয়। বরং কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা বুঝতে পারাই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা এবং ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নিজেকে অযোগ্য ভাবার পরিবর্তে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কোথায় ভুল হয়েছে এবং পরবর্তীবার কীভাবে আরও ভালো করা সম্ভব।

একই সঙ্গে নিজের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সব সময় অন্যকে সন্তুষ্ট করা কিংবা নিজেকে প্রমাণ করার চাপে থাকলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

জীবন বদলাতে ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ

নিজের মানসিকতা পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও অভ্যাস বদলাতে সময় লাগতে পারে। তবে নিয়মিত আত্মপর্যালোচনা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা যায়।

যেমন, কোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আমি পারব না’ ভাবার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি এখনো পুরোপুরি জানি না, তবে শিখতে পারি।’ কোনো ব্যর্থতার পর নিজেকে অযোগ্য ভাবার বদলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা গেল, তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

এ ধরনের পরিবর্তন সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি করা। পাশাপাশি শুধু ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক সুযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব ও অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতিও মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে নিজের চিন্তাভাবনা ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হলে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

জীবন বদলাতে তাই শুধু নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ কিংবা আরও বেশি পরিশ্রম করাই যথেষ্ট নয়। নিজের সম্পর্কে কী ভাবছি, কোন বিশ্বাস আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং কোন অভ্যাস আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কখনো কখনো পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ নতুন কিছু শুরু করা নয়; বরং নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা কোনো ধারণাকে নতুন করে প্রশ্ন করা। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে নিজেকে আরও ভালোভাবে বোঝার এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

কালের আলো/জেএন/এসএ