৭ বছর পর ত্রিদেশীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি—এক ফরম্যাটের খেলা শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে অন্য ফরম্যাটের লড়াই। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ, আইসিসির সূচি, বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপের মতো বড় প্রতিযোগিতা মিলিয়ে প্রায় সারা বছরই মাঠে থাকতে হচ্ছে টাইগারদের। এবার সেই ব্যস্ত সূচিতে যুক্ত হচ্ছে তিন জাতির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। দীর্ঘ সাত বছর পর দেশের বাইরে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ে।
সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দলকে। সেই ম্যাচের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও মাঠে নামার প্রস্তুতি বাংলাদেশের। আজ ১৭ অক্টোবর শুরু হচ্ছে তিন জাতির টুর্নামেন্ট। সূচি অনুযায়ী, শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে প্রতিযোগিতায় নিজেদের যাত্রা শুরু করবে লিটন দাসের দল।
তবে এবারের লড়াই বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জিম্বাবুয়ের কাছে ওয়ানডে সিরিজে হারের স্মৃতি ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও এটি। একই সঙ্গে দীর্ঘ বিরতির পর ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতায় নিজেদের সামর্থ্য যাচাই করার মঞ্চ।
সাত বছর পর দেশের বাইরে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্ট
বাংলাদেশ সর্বশেষ দেশের বাইরে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্ট খেলেছিল ২০১৯ সালে। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আয়ারল্যান্ডে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল টাইগাররা। স্বাগতিক আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
সেই টুর্নামেন্টে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার দল। বিশ্বকাপের আগে সেই সাফল্য বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এর আগে ২০১৮ সালে দেশের মাটিতেও ত্রিদেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ। সেখানে প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে। তবে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি টাইগাররা। ফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল মাশরাফির দলকে।
সব মিলিয়ে দেশের বাইরে সাত বছর পর এবং দেশের মাটিতে সর্বশেষ ত্রিদেশীয় ওয়ানডে প্রতিযোগিতার আট বছর পর আবারও এমন টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ বিরতির পর এই প্রতিযোগিতায় দলের পারফরম্যান্স কেমন হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জিম্বাবুয়ের কাছে সর্বশেষ সিরিজ হার বাড়াচ্ছে চাপ
ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে এই দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওয়ানডে পারফরম্যান্স অবশ্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ।
হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম ম্যাচে ২৫ রানে জয় পায় জিম্বাবুয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে ১৩ রানের জয়ে সিরিজ নিশ্চিত করে স্বাগতিকেরা। শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ সাত উইকেটের জয় পেলেও তাতে সিরিজ হার এড়ানো সম্ভব হয়নি।
সেই সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই নানা দুর্বলতা সামনে এসেছিল। বিশেষ করে জিম্বাবুয়ের পেসারদের গতিময় বোলিং সামলাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। ব্র্যাড ইভান্স, মাসাকাদজা চিভাঙ্গাসহ জিম্বাবুয়ের পেস আক্রমণ বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের ওপর চাপ তৈরি করেছিল।
এবার তাই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আগের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তিন জাতির টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে জয় পেলে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। অন্যদিকে হার দিয়ে শুরু হলে টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
আরব আমিরাতের উইকেট কি বাংলাদেশের জন্য সুবিধা এনে দেবে?
জিম্বাবুয়ে সফরে বাংলাদেশের সমস্যার অন্যতম কারণ ছিল হারারে স্পোর্টস ক্লাবের উইকেট। সেখানে পেসাররা বাড়তি গতি ও বাউন্স পেয়েছেন। সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে জিম্বাবুয়ের বোলাররা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলেছিলেন।
তবে আরব আমিরাতের উইকেটের চরিত্র ভিন্ন হতে পারে। সেখানে তুলনামূলক মন্থর ও ব্যাটিং-সহায়ক পিচ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে হারারের মতো বাড়তি বাউন্স ও গতির সুবিধা জিম্বাবুয়ের পেসাররা নাও পেতে পারেন।
এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, প্রতিপক্ষের পেসারদের বাড়তি গতি ও বাউন্সের কারণে আগের সিরিজে যে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, আরব আমিরাতের উইকেটে সেই চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে উইকেটের প্রকৃত আচরণ, আবহাওয়া এবং ম্যাচের পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত দুই দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য তাই শুরু থেকেই উইকেট বুঝে খেলা গুরুত্বপূর্ণ হবে। অপ্রয়োজনীয় শট এড়িয়ে ইনিংস গড়ে তুলতে পারলে বড় সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বোলারদেরও পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষকে সহজে রান তুলতে না দেওয়া যায়।
শুধু পেস নয়, স্পিনেও পার্থক্য গড়ার সুযোগ
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে পেসারদের পাশাপাশি স্পিনাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। আরব আমিরাতের উইকেট যদি তুলনামূলক মন্থর হয়, তাহলে স্পিনারদের জন্যও কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হারারে সফরে তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম, নাহিদ রানা, মেহেদী হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন ও মোসাদ্দেক হোসেনদের নিয়ে গড়া বোলিং আক্রমণ নিয়েও জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হেরেছিল বাংলাদেশ। তাই শুধু বোলারদের নাম কিংবা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের বড় শট খেলার প্রবণতা কাজে লাগিয়ে উইকেট তুলে নেওয়া বাংলাদেশের বোলারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে রান আটকে রেখে চাপ তৈরি করতে পারলে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করা সম্ভব।
তবে আগের সিরিজে জিম্বাবুয়ের বোলারদের কাছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা যে সমস্যায় পড়েছিলেন, সেটিও ভুলে গেলে চলবে না। প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে শুরু থেকেই সামলে নেওয়ার ওপর ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
ব্যস্ত সূচির মধ্যে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামনে এখন একের পর এক আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির পাশাপাশি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হচ্ছে দলকে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপের মতো প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সিরিজও রয়েছে সূচিতে।
লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত, তানজিদ হাসান তামিম, তাওহিদ হৃদয়, মুশফিকুর রহিম, তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, নাহিদ রানা ও হাসান মাহমুদদের মতো ক্রিকেটারদের ব্যস্ত সময় কাটছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।
এই ব্যস্ততার মধ্যে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট বাংলাদেশের জন্য নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা যাচাই করার আরেকটি সুযোগ। একই সঙ্গে দলের সমন্বয়, ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা এবং বোলিং আক্রমণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যাবে এই প্রতিযোগিতায়।
শুরুতেই জয়ের লক্ষ্য বাংলাদেশের
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সিরিজ হার বাংলাদেশের সামনে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে নতুন টুর্নামেন্টে আগের ফলাফলই যে আবার ফিরে আসবে, এমন নয়। ভিন্ন মাঠ, ভিন্ন উইকেট এবং নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ রয়েছে দুই দলেরই।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ব্যাটিংয়ে দায়িত্বশীলতা দেখানো, বোলিংয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ফিল্ডিংয়ে ভুল কমানো। তিন বিভাগেই ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় তুলে নেওয়া সম্ভব।
দীর্ঘ সাত বছর পর দেশের বাইরে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। তাই শুরুটা ভালো করা শুধু পয়েন্টের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পুরো টুর্নামেন্টে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্যও প্রয়োজনীয়। এখন দেখার বিষয়, আরব আমিরাতের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে লিটন দাসের দল কেমন করে এবং সাম্প্রতিক সিরিজ হারের জবাব দিতে পারে কি না।
কালের আলো/এএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array