৩৭ উইকেট নিয়েও ব্রাত্য শামি, তবে কি বন্ধ ভারতের দরজা?
বল হাতে এখনো কার্যকর, ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত উইকেট পাচ্ছেন, ফিটনেস নিয়েও সমালোচকদের জবাব দিচ্ছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। তবু ভারতীয় জাতীয় দলে জায়গা হচ্ছে না অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ শামির। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজের দল ঘোষণার পর তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি জাতীয় দলের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই পেসারের জন্য?
শুক্রবার ( ১৬ অক্টোবর) রাতে নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য ১৫ সদস্যের টেস্ট দল ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফিরেছেন পেসার আকাশ দীপ। কিন্তু সেই তালিকায় নেই শামির নাম। অথচ কয়েক দিন ধরেই তাঁর জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে দীর্ঘ বিরতির পর ভুবনেশ্বর কুমারের দলে ফেরার খবরে শামিকে নিয়েও আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন অনেকে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
ভারতের হয়ে ৪৬২ উইকেট নেওয়া এই পেসার এখনো ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পরও কেন নির্বাচকদের বিবেচনায় আসছেন না তিনি, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
ভারতের হয়ে সর্বশেষ কবে খেলেছেন শামি?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শামির সর্বশেষ উপস্থিতি ছিল ২০২৫ সালের মার্চে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের হয়ে সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি খেলেছিলেন তিনি। আর টেস্ট ক্রিকেটে তাঁকে সর্বশেষ দেখা গেছে ২০২৩ সালের জুনে, আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে।
অর্থাৎ, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে কিছুদিন আগেও ভারতের জার্সিতে দেখা গেলেও টেস্ট দলে তাঁর অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের। অথচ লাল বলের ক্রিকেটে শামির অভিজ্ঞতা ও সুইং করানোর দক্ষতা ভারতের পেস আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত বলে মনে করেন অনেক সমর্থক।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফেরা সহজ নয়। একজন বোলারের বর্তমান ফর্মের পাশাপাশি তাঁর ফিটনেস, দীর্ঘ স্পেল বল করার সক্ষমতা এবং দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা মানানসই—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয় নির্বাচকদের।
ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত, তবু কেন উপেক্ষিত?
অজিত আগারকার প্রধান নির্বাচকের পদ ছাড়ার পর শামির প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল। নির্বাচক কমিটিতে পরিবর্তন আসার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার হয়তো জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ পাবেন এই অভিজ্ঞ পেসার। কিন্তু প্রজ্ঞান ওঝার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচক কমিটিও নিউজিল্যান্ড সফরের টেস্ট দলে তাঁকে রাখেনি।
অথচ ২০২৫-২৬ মৌসুমের রঞ্জি ট্রফিতে বেঙ্গলের হয়ে দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন শামি। সাত ম্যাচে নিয়েছেন ৩৭ উইকেট। তাঁর বোলিং গড় ছিল ১৬.৭২। ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন তিনবার।
চলতি মৌসুমের শুরুতেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই পেসার। দিল্লির বিপক্ষে রঞ্জি ম্যাচে নিয়েছেন পাঁচ উইকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন পারফরম্যান্সের পর তাঁর ফিটনেস ও সামর্থ্য নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
একজন পেসারের জন্য ধারাবাহিকভাবে উইকেট নেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক সংকেত। বিশেষ করে শামির মতো অভিজ্ঞ বোলারের ক্ষেত্রে ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন সাফল্য জাতীয় দলে ফেরার দাবিকে আরও জোরালো করে। কিন্তু নির্বাচকেরা তাঁকে কেন বিবেচনায় নিচ্ছেন না, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন, জবাব দিচ্ছেন মাঠেই
দীর্ঘদিন চোটের সমস্যায় ভুগেছেন শামি। এ কারণে তাঁর ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি এবং টেস্ট ম্যাচে দীর্ঘ সময় বোলিং করার মতো শারীরিক সক্ষমতা তিনি ফিরে পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে শামি নিজে বারবার জানিয়েছেন, তিনি খেলার জন্য প্রস্তুত। দিল্লির বিপক্ষে রঞ্জি ম্যাচের পর সাংবাদিকদের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে এই পেসার বলেন, ‘আপনারা আমার ফিটনেস দেখতে পাচ্ছেন। সেটা লিখুন। আপনারা তো আমাকে দেখছেন। আমি কী বললাম, তাতে কী হবে? আমি মাঠে আছি। খেলছি। যেখানে খেলার সুযোগ পাচ্ছি, সেখানেই খেলছি। আমার কাজ শুধু বোলিং করে যাওয়া।’
এই বক্তব্যে শামির আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি হতাশার আভাসও পাওয়া যায়। তাঁর মতে, নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় মাঠে পারফর্ম করা। তাই সুযোগ পেলেই বল হাতে নিজের কাজ করে যেতে চান তিনি।
রঞ্জি ট্রফি শুরুর আগেও শামি বলেছিলেন, ভারতের হয়ে খেলতে না পারলে তাঁর কোনো ক্ষতি নেই। তাঁর এমন মন্তব্যকে কেউ আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ দেখছেন জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে।
তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স করলেই যে আন্তর্জাতিক দলে জায়গা নিশ্চিত হবে, এমন নয়। নির্বাচকদের সিদ্ধান্তে দলের ভারসাম্য, খেলোয়াড়দের কাজের চাপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বয়স কি শামির সামনে বড় বাধা?
শামির বয়স এখন ৩৬ বছর। অভিজ্ঞতার দিক থেকে তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের পরিচিত মুখ হলেও ফাস্ট বোলারদের ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি চোটের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে একজন পেসারকে দীর্ঘ স্পেল বল করতে হয়। এক ইনিংসে বারবার বোলিংয়ে ফিরতে হয়, আবার ম্যাচের একাধিক দিন একই ধরনের শারীরিক চাপ সামলাতে হয়। ফলে নির্বাচকদের জন্য শুধু বর্তমান ফর্ম নয়, একজন বোলার পুরো সিরিজে কতটা কার্যকর থাকতে পারবেন, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
শামির ক্ষেত্রে বয়স ও চোটের অতীত নির্বাচকদের ভাবনায় আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, এ বিষয়ে নির্বাচক কমিটির পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তবে অভিজ্ঞতা, উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে শামিকে ঘিরে প্রত্যাশা যে এখনো রয়েছে, তা স্পষ্ট। তাঁর বয়স বাড়লেও বল হাতে কার্যকারিতা হারিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্যও এই পারফরম্যান্স থেকে পাওয়া যায় না।
ভুবনেশ্বর ফিরলেন, শামি কেন নয়?
ভুবনেশ্বর কুমারের প্রত্যাবর্তন শামিকে নিয়ে আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে দুজনের ক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গা এক নয়। ভুবনেশ্বর মূলত সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে, নিজের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে শামির সামনে আলোচনার বড় ক্ষেত্র টেস্ট ক্রিকেট, যেখানে একজন পেসারের শারীরিক সক্ষমতা ও দীর্ঘ সময় বোলিং করার সামর্থ্য বিশেষ গুরুত্ব পায়।
ভুবনেশ্বরের সাম্প্রতিক আইপিএল পারফরম্যান্সও তাঁর ফেরার আলোচনায় ভূমিকা রেখেছে। গত দুই মৌসুমে আইপিএলে তাঁর উইকেটসংখ্যা ছিল ৪৫। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে আলোচনায় রেখেছে।
অন্যদিকে শামি ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেটে সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের নির্বাচকদের পরিকল্পনায় জায়গা করে নিতে পারছেন না। দুই ক্রিকেটারের খেলার ধরন, ভূমিকা ও সম্ভাব্য ব্যবহার আলাদা হওয়ায় তাঁদের প্রত্যাবর্তনকে একইভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।
তবু শামির ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ঘরোয়া ক্রিকেটে এত ভালো করার পরও তাঁকে আর কী প্রমাণ করতে হবে? বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে আলোচনা চলতেই পারে।
ভারতের পেস আক্রমণে বেড়েছে প্রতিযোগিতা
ভারতীয় দলে পেস বোলারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এখন বেশ কঠিন। আকাশ দীপের মতো বোলাররা দলে জায়গা করে নিচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন ও তুলনামূলক তরুণ পেসারদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও থাকতে পারে নির্বাচকদের।
এমন পরিস্থিতিতে শামির সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু ফিটনেস প্রমাণ করা নয়; নির্বাচকদের পরিকল্পনায় নিজের জায়গা তৈরি করাও। তাঁর অভিজ্ঞতা ও অতীত পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ হলেও দল গঠনের সময় নির্বাচকেরা বর্তমান প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিতে পারেন।
তবে নিউজিল্যান্ড সিরিজের দলে শামি না থাকায় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। নির্বাচকদের পক্ষ থেকেও তাঁর বাদ পড়ার কারণ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে কি জাতীয় দলের দরজা বন্ধ শামির জন্য?
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে সুযোগ না পাওয়া শামির জন্য নিঃসন্দেহে হতাশার। বিশেষ করে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্যের পরও যখন জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ মিলছে না, তখন তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে সাত ম্যাচে ৩৭ উইকেট এবং সাম্প্রতিক পাঁচ উইকেটের পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে, ঘরোয়া ক্রিকেটে এখনো কার্যকর শামি। তিনি নিজেও কথার চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দিতে চাইছেন।
এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে তাঁর এই পারফরম্যান্স নির্বাচকদের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আনে কি না। আপাতত ভারতের টেস্ট দলে জায়গা হয়নি অভিজ্ঞ এই পেসারের। কিন্তু নির্বাচকদের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া তাঁর বাদ পড়ার পেছনে বয়স, ফিটনেস কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কোনটি সবচেয়ে বড় কারণ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
কালের আলো/এএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array