খুঁজুন
                               
, ,
           

হলুদ কার্ডের বদলে হাতে মোবাইল! ফুটবলে আসছে নতুন প্রযুক্তি

ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:২০ অপরাহ্ণ
হলুদ কার্ডের বদলে হাতে মোবাইল! ফুটবলে আসছে নতুন প্রযুক্তি
ফুটবল মাঠে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর দৃশ্য বহু বছর ধরেই খেলাটির পরিচিত অংশ। কোনো খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে কিংবা মাঠ থেকে বহিষ্কার করতে রেফারির হাতে কার্ড ওঠার মুহূর্তে বদলে যায় ম্যাচের পরিস্থিতি। তবে সেই পরিচিত দৃশ্যেই এবার প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগানোর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাগজের হলুদ কার্ডের পরিবর্তে মুঠোফোনের মতো দেখতে একটি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করেছেন এক রেফারি। এ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

বৃহস্পতিবার (১৫অক্টোবর) উরুগুয়ে কাপের ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের মধ্যকার ম্যাচে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। প্রচলিত হলুদ কার্ডের পরিবর্তে তিনি হাতে থাকা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্ক্রিন ব্যবহার করে খেলোয়াড়কে সতর্ক করেন। ভিডিওটি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এটাই কি ফুটবলের ভবিষ্যৎ?

তবে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল কার্ড দেখানোর দৃশ্য বদলে দেওয়া নয়। বরং ম্যাচ চলাকালে রেফারির নেওয়া শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা এবং ম্যাচ শেষে প্রশাসনিক প্রতিবেদন তৈরির কাজ সহজ করাই এর মূল লক্ষ্য।

কেন কাগজের কার্ডের বদলে ডিজিটাল ডিভাইস?

ফুটবলে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সাধারণত সেই সিদ্ধান্তের তথ্য লিখে রাখতে হয়। কোন খেলোয়াড় কার্ড পেয়েছেন, ম্যাচের কত মিনিটে ঘটনাটি ঘটেছে এবং কী কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য ম্যাচের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হয়। পরে এসব তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়।

এই প্রক্রিয়াকে সহজ করতেই ডিজিটাল কার্ডের ধারণা এসেছে। নতুন ডিভাইসটির মাধ্যমে ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা নির্দিষ্ট সময়সহ বা টাইমস্ট্যাম্প দিয়ে রেকর্ড করা যায়। ফলে মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর হাতে লিখে তথ্য নথিভুক্ত করা এবং পরে সেগুলো আবার ডিজিটাল সিস্টেমে স্থানান্তরের প্রয়োজন কমতে পারে।

প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে ‘রেফে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ফুটবলে একমাত্র যে বিষয়টি এখনো অ্যানালগ রয়েছে, আমরা সেখানে প্রযুক্তি নিয়ে আসতে কাজ করছি।’

অর্থাৎ, ফুটবলের অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও কার্ড দেখানোর পর সংশ্লিষ্ট তথ্য নথিভুক্ত করার প্রচলিত প্রক্রিয়াটি আধুনিকায়নের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন এই প্রকল্পের উদ্যোক্তারা।

তিন বছরেরও বেশি আগে শুরু হয় ভাবনা

ডিজিটাল স্ক্রিনে কার্ড দেখানোর ধারণাটি হঠাৎ করেই আসেনি। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা মাউরো সাকো ও তাঁর সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা তিন বছরেরও বেশি সময় আগে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, রেফারিরা কেন এখনো হাতে লিখে সতর্কবার্তা ও শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য নথিভুক্ত করেন? পরে সেই তথ্য আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তর করতে হয় কেন?

এই প্রক্রিয়ার বিকল্প খুঁজতে গিয়েই ডিজিটাল কার্ডের ধারণা সামনে আসে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, রেফারির হাতে এমন একটি ডিভাইস দেওয়া, যা দিয়ে মাঠে সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

নতুন ডিভাইসটি উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করছেন নির্মাতারা। এর ফলে ম্যাচ পরিচালনার পর রেফারিদের প্রশাসনিক কাজের চাপও কমতে পারে।

রেফারির কাছে সুবিধাজনক, কিন্তু হারাচ্ছে কার্ড দেখানোর নাটকীয়তা

পরীক্ষামূলক ডিভাইসটি ব্যবহার করে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। তাঁর কাছে যন্ত্রটি ব্যবহার করা আরামদায়ক মনে হয়েছে এবং এর সফটওয়্যারও দ্রুত কাজ করেছে। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে কার্ড দেখানোর যে দৃশ্যমান নাটকীয়তা রয়েছে, ডিজিটাল স্ক্রিনে তা কিছুটা কমে যায় বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

ভারেলার ভাষায়, ‘দ্রুত কার্ড দেখানোর সেই জাদুকরি ব্যাপারটি কিছুটা হারিয়ে যায়, তবে আমার মনে হয় এটি আমাদের অনেক সাহায্য করবে, বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে।’

ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ড শুধু শাস্তির সংকেত নয়, ম্যাচের উত্তেজনা ও নাটকীয়তারও একটি অংশ। রেফারি পকেট থেকে কার্ড বের করে উঁচিয়ে ধরলে খেলোয়াড়, দর্শক ও টেলিভিশনের সামনে থাকা দর্শকেরা তা সহজেই বুঝতে পারেন। কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে একই তথ্য দেখানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এ কারণে প্রযুক্তিটি প্রশাসনিক কাজ সহজ করলেও মাঠে কার্ড দেখানোর প্রচলিত অভিজ্ঞতা কতটা অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সূর্যের আলোয় স্ক্রিন দেখা নিয়ে সমস্যা

ডিজিটাল কার্ডের পরীক্ষামূলক ব্যবহারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্ক্রিনের দৃশ্যমানতা। এর আগে ডিভাইসটির একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল, কারণ সূর্যের আলোয় স্ক্রিনের তথ্য স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল না।

বৃহস্পতিবারের (১৫অক্টোবর) ম্যাচেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। মাঠে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ ডিভাইসটির মাধ্যমে রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে সমস্যায় পড়েন।

প্রযুক্তিটি সফল করতে হলে রেফারির পাশাপাশি মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছেও কার্ডের রং এবং সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে হবে। বিশেষ করে হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের রং যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা জরুরি, যাতে শাস্তির ধরন নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।

প্রকল্পটির সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা বলেন, ‘এটি এমন একটি প্রকল্প, যাতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। টিভির চেয়ে মাঠে এটি ভালো দেখা গেছে। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো সব দর্শকের জন্য এর মান উন্নত করা। হলুদ কার্ডকে হলুদ হতে হবে, লাল কার্ডকে লাল হতে হবে এবং মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছে তা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হতে হবে।’

দৃশ্যমানতা বাড়াতে যুক্ত হতে পারে এলইডি লাইট

ডিভাইসটির কার্যকারিতা বাড়াতে এর নির্মাতারা বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। দর্শকেরা যেন দূর থেকেও কার্ডের রং ও সিদ্ধান্ত সহজে বুঝতে পারেন, সে জন্য ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি লাইটিং যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তিটির উন্নয়নে শুধু স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। মাঠের আলো, সূর্যের অবস্থান, দর্শকের বসার জায়গা এবং টেলিভিশনের ক্যামেরায় দৃশ্যটি কতটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ডিভাইসটির ব্র্যান্ড নিবন্ধিত হয়েছে এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্টও নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ডেভেলপারদের ভিত্তি চীনে।

তবে প্রযুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন মাঠ ও আলোক পরিস্থিতিতে ডিভাইসটি কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ডিজিটাল কার্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ ফুটবলে প্রযুক্তির আরও বিস্তৃত ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের সহজবোধ্যতা এবং ঐতিহ্য নষ্ট হতে পারে।

ডিয়েগো দে লা পেনা বলেন, ‘আমরা নানা ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য দেখেছি। এমনকি আমরা মিম দেখে হেসেছিও। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ এটি নিয়ে কথা বলছে। যেকোনো নতুন উদ্ভাবনেই কিছুটা সময় লাগে।’

প্রযুক্তিটির উদ্যোক্তাদের মতে, নতুন কোনো ব্যবস্থা চালু করতে গেলে শুরুতে প্রশ্ন ও সমালোচনা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এসব প্রতিক্রিয়া থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিয়ে ডিভাইসটির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।

ফিফা ও কনমেবলের স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্য

ডিজিটাল কার্ডের নির্মাতারা ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত করে দক্ষিণ আমেরিকা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করছেন।

তবে এখন পর্যন্ত এটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। ফিফা বা কনমেবল প্রযুক্তিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে—এমন তথ্য নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবহারের আগে ডিভাইসটির কার্যকারিতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং মাঠ ও টেলিভিশনে দৃশ্যমানতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে ডিজিটাল কার্ড ফুটবলে প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ হতে পারে, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের তথ্য আরও নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে প্রচলিত কার্ডের পরিচিত রূপ, তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা এবং ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তিটির সমন্বয় ঘটানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রযুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ফুটবলের স্থায়ী অংশ হবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আপাতত পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও উন্নয়নের মধ্য দিয়েই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

কালের আলো/এএন/এসএ

টানা ১০ দিনের ছুটি, নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৪ অপরাহ্ণ
টানা ১০ দিনের ছুটি, নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ

শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন হাজারো মানুষ। কর্মব্যস্ত নগরজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ির পথে ছুটছেন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সরকারি ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ অবকাশ যুক্ত হওয়ায় এবার অনেকেই আগেভাগে ঢাকা ছাড়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, পূজার ছুটিকে ঘিরে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় বাড়ছে। বিভিন্ন গন্তব্যের বাসের টিকিট কাউন্টারে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে, কেউবা ছুটির দিনগুলো কাটাতে ছুটছেন আত্মীয়স্বজনের কাছে।

চলতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ২০ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পাচ্ছেন। এ ছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটির সময় আরও দীর্ঘ। সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক ছুটি ও পূজার ছুটি মিলিয়ে টানা ১০ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকছে। এ কারণে যেসব পরিবারের সন্তান স্কুলে পড়ে, তাদের জন্য একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রায় ৯ থেকে ১০ দিনের ছুটি কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন সিথি রায়। তিনি বলেন, রাজধানীতে কর্মরত মানুষের জন্য পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ খুব বেশি আসে না। কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে বছরের অন্য সময়ে বাড়ি যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এবারের দীর্ঘ ছুটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে বলে জানান তিনি। সন্তানদের গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে তাদের নিয়ে নানাবাড়ি যাচ্ছেন সিথি রায়। একই টার্মিনাল থেকে কুমিল্লাগামী যাত্রী অসিত কুমার দে বলেন, এবার পূজায় টানা ছুটি পাওয়ায় পরিবারের সবাই মিলে আগেই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। সাধারণত এক-দুই দিনের বেশি ছুটি পাওয়া যায় না। এবার দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানো যাবে। সন্তানদের স্কুলও আগেভাগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভিড় এড়াতে একটু আগেই রওনা হয়েছেন তাঁরা।

সায়েদাবাদের মতো মহাখালী বাস টার্মিনালেও দেখা গেছে বাড়ি ফেরা মানুষের ব্যস্ততা। সেখান থেকে ময়মনসিংহগামী বেসরকারি চাকরিজীবী মো. তানভীর আহমেদ জানান, সরকারি ছুটি শুরু হতে আরও দু-এক দিন বাকি থাকলেও অফিসের জমে থাকা ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি আগেই ছুটি নিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ দিনের মতো ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন তিনি। তানভীর আহমেদ বলেন, ঢাকায় একা থেকে সময় কাটানোর চেয়ে গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে পূজা ও ছুটির আনন্দ ভাগাভাগি করতেই তিনি যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছুটির সুযোগে পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পাশাপাশি অনেকেই আগেভাগে যাত্রা করছেন, যাতে ছুটির মূল সময়ে পরিবহনের অতিরিক্ত চাপ এড়ানো যায়।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যাত্রীচাপ বেড়েছে। মহাখালী বাস টার্মিনালের এক পরিবহন মালিক প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের আগেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি ছুটি শুরু হলে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। ফলে ছুটির সময় বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যস্ততা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজধানীর কর্মব্যস্ত জীবন থেকে বিরতি নিয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে খুশি অনেক নগরবাসী। দীর্ঘ ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফেরা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রত্যাশা তাঁদের যাত্রাকে আরও আনন্দমুখর করে তুলেছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। এমনকি অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য গত জুনে ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। নিহত ও আহত সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতার পরও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রান্নাঘর, আর ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ফলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যাওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সতর্কতা পাওয়ার পর ঠিক কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

টয়লেট থেকে উদ্ধার চারজনের মরদেহ

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে। নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নিহত ও আহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। আগুনে রিসোর্টের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ

অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়। আগুনে দগ্ধদের অবস্থা ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেন।

শর্টসার্কিট না রান্নাঘরের চুলা—আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য

রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এরই মধ্যে রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দুটি বক্তব্যেই আগুনের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, রান্নাঘরের চুল্লি কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

ধোঁয়ায় অন্ধকার, স্ত্রীকে নিয়ে নালায় লাফ দেন পর্যটক

আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি দেখেন, চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পাশের একটি নালায় লাফ দিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি জানান, রিসোর্টটিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তাঁরা সেখানে উঠেছিলেন। তাঁদের আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার কথা ছিল। তাঁর বর্ণনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের সামনে তৈরি হওয়া বিপজ্জনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের কারণে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং অগ্নিকাণ্ডে সম্ভাব্য দায় নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০১ অপরাহ্ণ
জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো
জীবনে আরও ভালো করতে কে না চান! কেউ চান ক্যারিয়ারে সফল হতে, কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে, আবার কেউ চান সুন্দর সম্পর্ক ও মানসিক প্রশান্তি। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ পরিশ্রম করেন, নতুন অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও অনেক সময় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। এর পেছনে কি শুধু পরিস্থিতি দায়ী, নাকি নিজের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসও অজান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও মানসিকতা তার আচরণ এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলে অনেক সময় মানুষ নতুন সুযোগ গ্রহণ করতে ভয় পান, ব্যর্থতার আশঙ্কায় পিছিয়ে যান কিংবা নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তাই জীবন বদলাতে শুধু কাজের পরিমাণ বাড়ানো নয়, নিজের ভেতরের চিন্তাভাবনাগুলোও বোঝা জরুরি।

মনের ভেতরেও চলে অদৃশ্য সফটওয়্যার

একটি কম্পিউটারের কথা ভাবুন। এর যন্ত্রাংশ যত উন্নতই হোক, সফটওয়্যারে সমস্যা থাকলে সেটির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা একই রকম। আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা, অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাগুলো আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কেউ হয়তো জীবনে সফল হতে চান, কিন্তু মনে মনে বিশ্বাস করেন, ‘আমি যথেষ্ট যোগ্য নই।’ কেউ ভালোবাসার সম্পর্ক চান, অথচ তাঁর মধ্যে কাজ করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। আবার কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চাইলেও ভাবেন, ‘আমার মতো মানুষের পক্ষে বড় কিছু করা সম্ভব নয়।’

এ ধরনের ধারণা সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এগুলো দৃঢ়ভাবে মনে গেঁথে গেলে মানুষ নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখতে পারেন। নতুন কাজ শুরু করা, ঝুঁকি নেওয়া কিংবা ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হতে পারে।

ফলে সমস্যাটি শুধু বাইরের পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।

নিজের সমালোচনা নয়, নিজেকে বোঝার চেষ্টা করুন

ভুল করলে অনেকেই নিজেদের কঠোরভাবে বিচার করেন। সামান্য ব্যর্থতাকে বড় করে দেখেন, অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। অথচ আত্ম-উন্নয়নের জন্য নিজেকে দোষারোপ করার চেয়ে নিজের আচরণ ও চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণ করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমি নিজের সম্পর্কে কী বিশ্বাস করি? কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে নিজেকে কী বলি? অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা কি এখনো আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? আমার চিন্তাভাবনা কি আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে, নাকি পিছিয়ে দিচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে বোঝা যায়, কোন ধারণাগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, আর কোনগুলো ভয়, অনুমান কিংবা অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে।

নিজেকে বোঝার অর্থ নিজের সব চিন্তাকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং কোন চিন্তা উপকারী, কোনটি অযৌক্তিক এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে দেখা।

সাফল্য পেলেই কি আত্মবিশ্বাস আসে?

অনেকেই মনে করেন, ভালো চাকরি, পদোন্নতি, অর্থসম্পদ কিংবা মানুষের প্রশংসা অর্জন করতে পারলেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দূর হবে। কিন্তু বাস্তবে বাহ্যিক সাফল্য সব সময় ভেতরের অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না।

কেউ পদোন্নতি পাওয়ার পরও ভাবতে পারেন, তিনি যথেষ্ট ভালো নন। কেউ ভালো আয় করার পরও অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অসন্তুষ্টিতে ভুগতে পারেন। আবার কেউ পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার পরও আশঙ্কা করতে পারেন, পরবর্তী সময়ে হয়তো আর সফল হতে পারবেন না।

এভাবে নিজের মূল্য প্রমাণের জন্য একের পর এক অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। তখন সাফল্য উপভোগ করার বদলে নতুন কোনো অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণে লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি নিজের প্রচেষ্টা, সামর্থ্য ও মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, মানুষের ব্যক্তিগত মূল্য শুধু তার পদ, আয়, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্জনের ওপর নির্ভর করে না।

পুরোনো বিশ্বাস কীভাবে অগ্রগতির পথে বাধা হয়

মানুষের অনেক বিশ্বাস তৈরি হয় শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের কোনো কষ্টকর ঘটনার মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় বারবার সমালোচনার মুখোমুখি হলে কেউ নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। আবার কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়ার পর কেউ ধরে নিতে পারেন, তিনি আর কখনো সফল হতে পারবেন না।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব ধারণা অভ্যাসের মতো মনের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে। একপর্যায়ে মানুষ সেগুলোকে প্রশ্ন না করেই সত্য বলে ধরে নেন।

কিন্তু অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বাস বর্তমানের বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। একসময় ব্যর্থতার ভয় কাউকে সতর্ক থাকতে সাহায্য করলেও পরবর্তী সময়ে সেই ভয় নতুন সুযোগ গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই নিজের বিশ্বাসগুলো যাচাই করা জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই ধারণার পক্ষে বাস্তব প্রমাণ কী? এর বিপরীতে কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি? এই বিশ্বাস আমাকে সাহায্য করছে, নাকি অকারণে পিছিয়ে রাখছে? চাইলে নিজের সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক কোন ধারণা তৈরি করা সম্ভব?

নিজেকে গ্রহণ করাই পরিবর্তনের শুরু

নিজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার অর্থ নিজেকে ছোট করা নয়। বরং কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা বুঝতে পারাই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা এবং ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নিজেকে অযোগ্য ভাবার পরিবর্তে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কোথায় ভুল হয়েছে এবং পরবর্তীবার কীভাবে আরও ভালো করা সম্ভব।

একই সঙ্গে নিজের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সব সময় অন্যকে সন্তুষ্ট করা কিংবা নিজেকে প্রমাণ করার চাপে থাকলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

জীবন বদলাতে ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ

নিজের মানসিকতা পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও অভ্যাস বদলাতে সময় লাগতে পারে। তবে নিয়মিত আত্মপর্যালোচনা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা যায়।

যেমন, কোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আমি পারব না’ ভাবার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি এখনো পুরোপুরি জানি না, তবে শিখতে পারি।’ কোনো ব্যর্থতার পর নিজেকে অযোগ্য ভাবার বদলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা গেল, তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

এ ধরনের পরিবর্তন সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি করা। পাশাপাশি শুধু ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক সুযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব ও অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতিও মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে নিজের চিন্তাভাবনা ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হলে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

জীবন বদলাতে তাই শুধু নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ কিংবা আরও বেশি পরিশ্রম করাই যথেষ্ট নয়। নিজের সম্পর্কে কী ভাবছি, কোন বিশ্বাস আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং কোন অভ্যাস আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কখনো কখনো পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ নতুন কিছু শুরু করা নয়; বরং নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা কোনো ধারণাকে নতুন করে প্রশ্ন করা। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে নিজেকে আরও ভালোভাবে বোঝার এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

কালের আলো/জেএন/এসএ