কর্ণফুলী টানেলের ফিজিবিলিটি থেকে লোকসান, খতিয়ে দেখবে সংসদীয় কমিটি
দেশের আলোচিত মেগা প্রকল্প কর্ণফুলী টানেলের বিপুল আর্থিক লোকসানের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। প্রকল্পটির প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে লোকসানের পেছনের কারণ চিহ্নিত করতে চায় কমিটি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদগুলোতে নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, কোন পদে কী ধরনের জনবল প্রয়োজন এবং তাঁদের কর্মভার কী হবে, তা কৌশলগতভাবে নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংসদ সচিবালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কর্ণফুলী টানেলের লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখবে কমিটি
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আর্থিক লোকসান। প্রকল্পটির প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায় এবং বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কমিটির সদস্যরা আলোচনা করেন।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই কতটা যথাযথ ছিল, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা ছিল কি না এবং বর্তমানে লোকসানের পেছনে কী কী কারণ কাজ করছে—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে আলোচনা করতে পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি তোলা হবে।
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া ও আর্থিক লোকসানের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার বিষয়ে কমিটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য দিয়ে কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫৬ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ পর্যালোচনা
বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলমান ১ হাজার ১৫৩টি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংসদীয় কমিটির সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে গৃহীত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র তুলে ধরে প্রকল্পগুলোর বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ২৫৬টি প্রকল্পের মেয়াদ কেন বাড়ানো হয়েছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি উন্নয়ন কার্যক্রমের সময়ানুবর্তিতা ও ব্যয়ের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, আমদানিনির্ভরতা, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শুরু করা।
এ ছাড়া সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়া এবং একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা চূড়ান্তের পথে
উন্নয়ন প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালকদের সময়মতো নিয়োগ ও সঠিকভাবে পদায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতার কারণে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের গতি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে।
সংসদীয় কমিটিকে জানানো হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগসংক্রান্ত নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
কমিটির আলোচনায় প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার পাশাপাশি প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ২২১ শূন্য পদে নিয়োগের নির্দেশ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে শূন্য পদ পূরণের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের ২২১টি শূন্য পদের বিপরীতে বিভিন্ন গ্রেডে ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
এ পরিস্থিতিতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন। তবে তাঁর নির্দেশনায় শুধু শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী জনবল বণ্টন এবং কর্মভার নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ কোন পদে কতজন জনবল প্রয়োজন, কোন দায়িত্বগুলো অগ্রাধিকার পাবে এবং বিদ্যমান জনবল দিয়ে কীভাবে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব—এসব বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর তাগিদ
বৈঠকে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দেশের সব অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল পৌঁছে দিতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, স্থানীয় বাস্তবতা এবং জনসাধারণের উপকারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।
কমিটির মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, সময়মতো অর্থ ছাড় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়ানো সম্ভব।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যারা
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কাজী রফিকুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম এবং মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ অংশ নেন।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব এবং মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেন।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array