দেশব্যাপী ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা-অর্চনা চলার কথা জানিয়ে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির বিপিএম। একই সঙ্গে পূজাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে জনগণকে গুজবের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইজিপি এসব কথা বলেন।
- প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের প্রত্যয় মো. আলী হোসেন ফকিরের
- নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ
তাঁর বক্তব্যে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পূজা উদযাপন কমিটির সমন্বয়, গুজব প্রতিরোধ এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বক্তব্যের সামগ্রিক তাৎপর্য হচ্ছে—ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও জনআস্থা বজায় রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
সমন্বিত প্রচেষ্টায় নিরাপত্তা, বিসর্জন পর্যন্ত সুষ্ঠু উদযাপনের প্রত্যয়
আইজিপি বলেন, ‘সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশব্যাপী ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা-অর্চনা চলছে। এটা সম্ভব হয়েছে পূজা কমিটির সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে, তারা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছেন।’ তিনি প্রকাশ করে বলেন, প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে পূজা উদযাপিত হবে।
আইজিপির বক্তব্যে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ ও আয়োজকদের পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের মতো বড় আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

গুজব প্রতিরোধে সচেতনতার গুরুত্ব
পূজাকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষের বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টার বিষয়ে সতর্ক করে আইজিপি বলেন, ‘পূজাকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। জনগণকে গুজব থেকে সচেতন থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেবী দুর্গার মতোই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে লড়াই করে যেতে হবে।’
ধর্মীয় উৎসবের সময় গুজব ও যাচাইবিহীন তথ্য সামাজিক উত্তেজনা তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনার অসম্পূর্ণ বিবরণ, পুরোনো ছবি বা ভিডিও কিংবা ভিত্তিহীন দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
এ কারণে আইজিপির সতর্কবার্তার তাৎপর্য শুধু গুজব থেকে দূরে থাকার আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তথ্য যাচাই করে দায়িত্বশীল আচরণ করার প্রয়োজনীয়তাও এর সঙ্গে যুক্ত। কোনো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে সেটি প্রচার না করা, সন্দেহজনক ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং উত্তেজনামূলক বক্তব্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
ধর্ম, মত ও বর্ণের ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইজিপি বলেন, ‘আমরা যে ধর্মের, যে মতের, যে বর্ণের-ই হই না কেন; দেশটি আমাদেরই। সকল অপশক্তি নির্মূল করে একটি সুখী, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধময় বাংলাদেশ গঠন করা আমাদের লক্ষ্য।’ তাঁর এই বক্তব্যে নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যের ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একটি বহুধর্মীয় সমাজে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত। আইজিপি তাই দুর্গাপূজার নিরাপত্তার তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা জরুরি।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা
পুলিশের কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া এবং ওই সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে আইজিপি বলেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পাঁচ-সাত দিন পুলিশের কোনো কার্যক্রম ছিল না। তখন কারো নিরাপত্তা ছিল না, সবাই আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি বহু রকমের অঘটন ঘটেছে। আপনাদের সহযোগিতায় সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ পুলিশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সকল অপশক্তি, সকল অন্যায়, বৈষম্য দূর করে আমরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সকলের জীবন-মান উন্নয়ন করতে সক্ষম হবো।’ মূলত পুলিশ প্রধানের এই বক্তব্যে ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে পুলিশের পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটের সময় পুলিশের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছিল এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে জনসাধারণের সহযোগিতায় পুলিশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পূজা উদযাপন পরিষদের সন্তোষ, নিরাপত্তায় সমন্বয়ের স্বীকৃতি
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, পুলিশ সকল পূজামণ্ডপ নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে দিয়েছে। ফলে নিরাপদে পূজা উদযাপিত হচ্ছে। পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের এই বক্তব্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের সন্তুষ্টির প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি পুলিশ ও পূজা আয়োজকদের মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]