বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলেও মানুষের মৌলিক নাগরিক সুবিধার সংকট কাটেনি। বিদ্যুৎ, উন্নত চিকিৎসাসেবা, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্কের অভাবে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের। জরুরি রোগীকে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে নিতে হয়। অন্যদিকে, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন জুমচাষিরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুরুকপাতা বাজার ও পোয়ামুহুরী পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের পরও বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে ইউনিয়নটি। সন্ধ্যা নামলেই বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করতে হয় কুপির আলোয়। কিছু পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অনেককে এখনো কেরোসিনের বাতির ওপর নির্ভর করতে হয়।
স্থানীয় খামলাই ম্রো বলেন, ‘সড়ক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক এখনো পৌঁছায়নি। কিছু ঘরে সৌরবিদ্যুৎ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বাধ্য হয়ে কেরোসিনের বাতির ওপর নির্ভর করতে হয়।’
স্বাস্থ্যসেবার সংকটও প্রকট। স্থানীয় বাসিন্দা মেনদন ম্রো ও পোয়ামুহুরীর অঞ্জনা ত্রিপুরা জানান, রাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। চিকিৎসকের কাছে যেতে কিংবা সাধারণ পরীক্ষা করাতে অনেক সময় সারাদিন লেগে যায়। জন্মনিবন্ধনের মতো নাগরিক সেবা নিতে যাতায়াতেই একটি পরিবারের এক হাজার টাকার বেশি খরচ হতে পারে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে কুরুকপাতা। ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের দূরবর্তী এলাকায় গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট না থাকায় শিক্ষার পাশাপাশি সরকারি সেবা গ্রহণেও সমস্যায় পড়ছেন বাসিন্দারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, কুরুকপাতা ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১১ হাজার ২১৬। পাহাড়ের ১৪২টি পাড়ায় প্রধানত ম্রো, ত্রিপুরা ও মারমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন।
ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবন না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায়ও সমস্যা হচ্ছে। কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানান, নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আলীকদম সদর এলাকায় কক্ষ ভাড়া নিয়ে পরিষদের প্রশাসনিক কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম বাধা জমি ও বনাঞ্চলসংক্রান্ত জটিলতা। ১৮৮০ সালে মাতামুহুরী নদীর অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাকে ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের গেজেট প্রকাশিত হলেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমানা ও আইনি অবস্থানের কারণে স্থায়ী ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে জটিলতা রয়েছে।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, ‘রিজার্ভ ফরেস্টের কারণে বন বিভাগের আপত্তিতে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণে আইনি জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সনদ (এনওসি) নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
ইউএনও আরও জানান, কুরুকপাতায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের পরও কুরুকপাতার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় মৌলিক সেবার ঘাটতি রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের আইনি জটিলতা নিরসন না হলে পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কাটানো কঠিন হবে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]