খুঁজুন
                               
, ,
           

আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে সবুজ ধানখেতে। পাশে কালভার্ট, বসার জন্য ছোট বেঞ্চ, দোলনা আর সেলফি কর্নার। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কচুখালীতে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট ক্যাফের নাম ‘শেষ বিকেলের চায়ের আড্ডা’।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মুন্সিগঞ্জ কলেজের ছয় শিক্ষার্থী নিজেদের শ্রম ও উদ্যোগে তৈরি করেছেন ক্যাফেটি। মুন্সিগঞ্জ কচুখালীতে কারিতাস কার্যালয়ের কাছে কালভার্টের পাশে, মুনসুর সরদার গ্যারেজ-হরিনগর বাজার সড়কের পাশে বাঁশ, কাঠ ও খড় দিয়ে নির্মিত এই টংঘর ক্যাফের উদ্বোধন করা হয় গত ১৪ অক্টোবর।

উদ্যোক্তা ছয় বন্ধু হলেন তায়িব, মিলন হোসেন, মেহেদী হাসান, বিপ্লব হোসেন, ইমন হোসেন ও রাকিবুল হাসান। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার আগ্রহ থেকেই একসঙ্গে কাজ শুরু করেন তাঁরা।

উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে অবসর সময়ে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। একসময় মনে হলো, শুধু আড্ডা না দিয়ে এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করা যায়। পুঁজি খুব বেশি ছিল না, তবে নিজেদের শ্রম আর ইচ্ছা ছিল। সেই ভরসাতেই ক্যাফেটি গড়ে তুলেছি।’

ছয় বন্ধু প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বাঁশ, কাঠ ও খড়ের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে নিজেরাই সাজিয়েছেন ক্যাফেটি। বাহারি সাজসজ্জার পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাদামাটা পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরিতে।

ক্যাফেতে চা-কফির পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে হালকা খাবারও। দাম রাখা হয়েছে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। অপরাজিতা ফুলের চা ও দুধ চায়ের দাম ২০ টাকা করে, মালাই চা ২৫ টাকা এবং ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা। মালাই রুটি ও ফুচকার দাম ৩০ টাকা করে। এ ছাড়া রয়েছে সেলফি কর্নার, দোলনা ও বিভিন্ন ধরনের বসার ব্যবস্থা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়; এলাকার পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখা। তাঁদের দাবি, কচুখালীর এই কালভার্ট এলাকায় আগে বখাটেদের উৎপাত ছিল। সেখানে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডও ঘটত। জায়গাটিকে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অবসর কাটানোর উপযোগী করে তুলতে তাঁরা ক্যাফেটি গড়ে তুলেছেন।

উদ্যোক্তা মো. মিলন হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই, জায়গাটি মানুষের কাছে ভালো একটি স্থান হিসেবে পরিচিত হোক। তরুণেরা এখানে আসবেন, চা খাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। জায়গাটিতে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড কমাতে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করি।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টুও উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, ছয় কলেজশিক্ষার্থীর এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাঁরা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ ভালো রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন।

স্বল্প পুঁজিতে ছয় বন্ধুর এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কচুখালীতে মানুষের অবসর কাটানোর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন একটি জায়গা, যেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জমে উঠতে পারে বন্ধুত্বের গল্প।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

চলনবিলে পাখি শিকারের মহোৎসব, জালে বন্দি শত শত পাখি

নাটোর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
চলনবিলে পাখি শিকারের মহোৎসব, জালে বন্দি শত শত পাখি

শীতের আমেজ শুরু হতেই অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি চলনবিল। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর খাল-বিল ও জলাশয়ে মাছের উপস্থিতি বাড়ায় খাবারের সন্ধানে আসছে নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি পাখি। কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে না সব পাখি। একশ্রেণির শিকারির পাতা ফাঁদে ঝাঁকে ঝাঁকে আটকা পড়ছে তারা। কোথাও জাল, কোথাও কলাপাতা ও খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি বিশেষ ঘর, আবার কোথাও বিষটোপ ব্যবহার করে চলছে পাখি শিকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিকার করা পাখির একটি অংশ নিজেদের খাবারের জন্য রাখা হলেও বাকিগুলো বিক্রি করা হয় বিভিন্ন হাট-বাজারে। এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে আইন ও প্রশাসনিক অভিযান থাকলেও নিয়মিত শিকার ঠেকানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

মাছের খোঁজে চলনবিলে অতিথি পাখি

পরিবেশবাদীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় চলনবিলের বিভিন্ন খাল, বিল ও জলাশয়ে পুঁটি, খলসে ও দারকে মাছের দেখা মিলছে। এসব মাছের আকর্ষণে সাদা বক, বালিহাঁস, মাছরাঙা, সারস ও পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলাঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে। খাবারের সন্ধানে পাখিগুলো এক বিল থেকে আরেক বিলে উড়ে বেড়ায়। বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও ফসলের মাঠে তাদের অবাধ বিচরণে প্রাণ ফিরে পায় প্রকৃতি। কিন্তু পাখির এই আগমনকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন শিকারিরা। বিভিন্ন কৌশলে ফাঁদ পেতে পাখি ধরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কলাপাতা ও খেজুরের ডালে তৈরি বিশেষ ফাঁদ

চলনবিল অঞ্চলে পাখি শিকারের অন্যতম প্রচলিত কৌশল হলো বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা, খেজুরের ডাল ও বেতের পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ ঘর বা ফাঁদ। প্রায় ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু এই ফাঁদ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে আকাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখির ঝাঁক সহজেই সেখানে বসে পড়ে। ফাঁদের সামনে বাঁশের মগডালে রাখা হয় একটি পোষা বক। আকাশে বকের ঝাঁক দেখা গেলে শিকারি পোষা বকটিকে নাচাতে থাকেন। একপর্যায়ে বকটি ডাকাডাকি শুরু করলে আশপাশের বকেরা ফাঁদের ওপর বসে। তখন ফাঁদের ভেতরে থাকা শিকারিরা একে একে পাখিগুলো ধরে খাঁচায় ভরেন। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের ফাঁদকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। চলনবিলাঞ্চলে এই কৌশলের প্রচলন বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বড়শি, বিষটোপ ও জালেও আটকা পড়ছে পাখি

শুধু বিশেষ ঘর তৈরি করেই নয়, আরও নানা উপায়ে পাখি শিকার করা হচ্ছে। বড়শির মুখে মাছ গেঁথে পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। কোথাও খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে বিষটোপ দেওয়া হচ্ছে। আবার বিলের ভেতরে ধানখেতে আড়াআড়িভাবে জাল পেতে রাখা হয়, যেখানে খাবারের সন্ধানে আসা পাখি আটকা পড়ে। এসব ফাঁদের কারণে পাখি আহত বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বিষটোপের ব্যবহার শুধু লক্ষ্য করা পাখির জন্যই নয়, অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে পাখি শিকার বন্ধের পাশাপাশি বিষটোপ ও অবৈধ ফাঁদ অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা।

রাতের অন্ধকারেও চলে শিকার, হাটে বিক্রি

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে বন্দুক ব্যবহার করেও পাখি শিকার করেন। শিকার করা পাখি নিজেদের খাওয়ার পাশাপাশি বস্তায় ভরে বিক্রি করা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়িতে খাবারের জন্য পাখি পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিকারি জানান, তাঁরা বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠে খুঁটি পুঁতে কলাপাতা ও খেজুরের ডাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করেন। পাশাপাশি বিষটোপ ব্যবহার করেও পাখি শিকার করেন। ভোরে দল বেঁধে বিলে গিয়ে শিকার করা হয়। একেকজন শিকারি ১০টি থেকে শুরু করে শতাধিক পাখিও ধরেন বলে তাঁদের ভাষ্য। শিকারিদের কেউ কেউ জানান, এসব পাখির ক্রেতা রয়েছে এবং বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যায়। তাঁদের অনেকেই পাখি শিকার যে অপরাধ, সে বিষয়ে সচেতন নন বলেও দাবি করেছেন।

দুই শতাধিক কোয়েল পাখি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল হাটে

সরেজমিনে গিয়ে সোমবার বেলা ১১টার দিকে শিকারিদের জালে বন্দি প্রায় দুই শতাধিক কোয়েল পাখি দেখা যায়। রাতের শেষ প্রহর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এসব পাখি শিকার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে সেগুলো বিক্রির জন্য হাটে নেওয়া হচ্ছিল। স্থানীয় বাজারে শিকার করা পাখির দামও প্রজাতিভেদে আলাদা। বক বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। বালিহাঁসের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আর চাকলা পাখি বিক্রি হচ্ছে জোড়া ১৯০ টাকায়। এ ছাড়া কেউ কেউ হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরেও পাখি বিক্রি করেন। প্রকাশ্যে এভাবে পাখি বিক্রির ঘটনা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও শিকার নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পরিবেশবাদীদের মতে, শিকারিদের পাশাপাশি পাখি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ,পাখি শিকার বন্ধে চলনবিলের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত কাজ করছে। তারা শিকারবিরোধী প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ফাঁদ থেকে পাখি উদ্ধার করে মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করে। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি।

সংগঠনটির সদস্যদের সহায়তায় শনিবার ভোরে নাটোরের সিংড়ায় পোষা বক ব্যবহার করে বক শিকারের অভিযোগে তিন শিকারির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দেন। অভিযান চলাকালে চলনবিলের আগমুরশন, বামিহাল, কাকিয়ান ও পূর্বভেংড়ী বিল এলাকা থেকে বক শিকারের কাজে ব্যবহৃত অর্ধশত পোষা ও শিকার করা বক উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ধানখেতে তৈরি ১০টি ‘কিল্লা ঘর’ নামের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়। পরে সিংড়ার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) উপস্থিতিতে উদ্ধার করা পাখিগুলো মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, চলনবিলের ধানখেতে ফাঁদ পেতে নিয়মিত পাখি শিকার করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, অভিযানের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হয়। পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে পাখি শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। শিকারিদের সচেতন করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ ফাঁদ অপসারণ এবং শিকার করা পাখির বেচাকেনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শীতের মৌসুমে চলনবিল পরিযায়ী পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এসব পাখি জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই নির্বিচারে পাখি শিকার অব্যাহত থাকলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ, পটুয়াখালীতে কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্য

পটুয়াখালী সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ, পটুয়াখালীতে কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্য

বেকারত্ব ঘোচাতে চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহাগ হোসেন মৃধা। মালচিং পেপার ও মাচা পদ্ধতি ব্যবহার করে ১০ একর জমিতে অসময়ে তরমুজ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। তাঁর খেতে রোপণ করা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার চারা। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ করে অন্তত ১৫ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন এই উদ্যোক্তা। ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন তিনি। খেতে থাকা বাকি তরমুজ বিক্রি করে আরও প্রায় ৮ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন সোহাগ। তাঁর এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বেকার তরুণদের কাছে আধুনিক কৃষি এখন স্বাবলম্বী হওয়ার একটি সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে সামনে আসছে।

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার দশমিনা সদর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত কাটাখালী গ্রামে সোহাগ হোসেন মৃধার এই তরমুজখেত। প্রচলিত মৌসুমের বাইরে তরমুজ উৎপাদনের লক্ষ্যে তিনি আধুনিক চাষপদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। খেতে মূলত ‘রিজেন্ট-২’ জাতের তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। সোহাগের হিসাবে, চাষাবাদে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে বিক্রি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। খেতে থাকা তরমুজ বিক্রি করে আরও প্রায় ৮ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হলে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তবে চূড়ান্ত লাভ নির্ভর করবে অবশিষ্ট তরমুজের বিক্রিমূল্য, উৎপাদন ও পরিবহনসংক্রান্ত অন্যান্য খরচ এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর।

সাধারণত নির্দিষ্ট মৌসুমে তরমুজের আবাদ বেশি হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিচর্যার মাধ্যমে মৌসুমের বাইরে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা যায়। সংশ্লিষ্ট কৃষি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নত চাষপদ্ধতি অনুসরণ করে বছরে একাধিকবার তরমুজ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার এবং উপযুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে বছরে তিনবার পর্যন্ত তরমুজ চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বাজারে দীর্ঘ সময় তরমুজ সরবরাহের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে উৎপাদনের সংখ্যা ও সাফল্য নির্ভর করে জাত, আবহাওয়া, জমির অবস্থা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় বাজার পরিস্থিতির ওপর। সোহাগের খেতে ‘রিজেন্ট-২’ জাতের তরমুজের উৎপাদন স্থানীয় কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর উদ্যোগ দেখে আশপাশের অনেক কৃষকও আধুনিক পদ্ধতিতে অসময়ে তরমুজ চাষের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

মালচিং পদ্ধতিতে জমির ওপর বিশেষ পলিথিন বা মালচিং পেপার দিয়ে তৈরি বেডে তরমুজের চারা রোপণ করা হয়। জমি প্রস্তুত করার পর বেড তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে পলিথিনে ছিদ্র করা হয়। এরপর সেখানে চারা রোপণ করা হয়। সোহাগের খেতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ব্যবস্থাপনায় বাঁশের তৈরি মাচাও ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, পলিথিনের আবরণ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি আগাছার বৃদ্ধি কমাতে এবং মাটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। ফলে সঠিক ব্যবস্থাপনায় গাছের পরিচর্যা সহজ হতে পারে। তবে মালচিং পেপার ব্যবহার করলেই সব ধরনের কীটপতঙ্গের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায় না। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হয়।

প্রচলিত পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের সময় অতিবৃষ্টি, মাটির আর্দ্রতার পরিবর্তন ও আগাছার কারণে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মালচিং পেপার ব্যবহারে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে গাছের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। মাচা পদ্ধতিতে গাছের লতাপাতা ও ফল নির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এতে খেতের পরিচর্যা এবং গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ সহজ হতে পারে। তবে মাচা তৈরির খরচ, শ্রম, সঠিক সেচ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, জমি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা যাচাই করে মালচিং ও মাচা পদ্ধতি প্রয়োগ করা গেলে তরমুজ চাষে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে।

কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহাগ হোসেন মৃধা জানান, তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। খেতে থাকা তরমুজ থেকে আরও অন্তত ৮ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন। সোহাগ বলেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং খেতের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের এই সহযোগিতা তাঁর উদ্যোগ পরিচালনায় সহায়ক হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বেকার তরুণদের উদ্দেশে সোহাগের পরামর্শ, কৃষিকে শুধু প্রচলিত পেশা হিসেবে না দেখে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। পরিকল্পিতভাবে অসময়ে তরমুজ চাষ করতে পারলে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ জানান, কৃষক সোহাগ হোসেন মৃধাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অসময়ে আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন করে কেউ এ ধরনের কৃষি উদ্যোগে যুক্ত হতে চাইলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কারিগরি পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা দেওয়া হবে। কৃষি কর্মকর্তার মতে, আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা, জমির উপযোগিতা যাচাই, মানসম্মত বীজ নির্বাচন এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বাজারজাতকরণ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনাও কৃষি উদ্যোগের সাফল্যে ভূমিকা রাখে।

পটুয়াখালীর দশমিনায় সোহাগ হোসেন মৃধার উদ্যোগ দেখাচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রচলিত কৃষির বাইরেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। ১০ একর জমিতে মালচিং পেপার ও মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে তিনি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিক্রি করেছেন। অবশিষ্ট ফসল বিক্রির মাধ্যমে তাঁর প্রত্যাশিত আয় অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাজার ও উৎপাদনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, বন্ধুত্বে বাঁধা দুই সম্প্রদায়

রাজশাহী সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, বন্ধুত্বে বাঁধা দুই সম্প্রদায়

একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি। মসজিদে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা, আর মন্দিরে পূজা-অর্চনায় মগ্ন হন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দুই ধর্মের মানুষের উপাসনালয় পাশাপাশি হলেও সেখানে নেই বিরোধের ছায়া। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পশ্চিম ঝিকরা গ্রামের এই চিত্র যেন ধর্মীয় সহাবস্থানের জীবন্ত উদাহরণ। বড়াল নদের পাড়ঘেঁষা এই জনপদে ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও মানুষের সামাজিক বন্ধন দৃঢ়। একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, নেই বিরোধ

গ্রামের কর্মকারপাড়ায় প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৫-০৬ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কালীমন্দির। এরপর থেকে সেখানে কালীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন হয়ে আসছে। পরে ২০২১ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে মন্দিরের পাশেই নির্মাণ করা হয় পশ্চিম ঝিকরা জামে মসজিদ। একই আঙিনায় দুই ধর্মের উপাসনালয় গড়ে ওঠার পর শুরুতে কারও কারও মনে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আজান, নামাজ, পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের সময় কোনো ধরনের সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তবে গত পাঁচ বছরে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

মন্দির ও মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনায় একে অপরের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়। ধর্মীয় আচার পালনের সময় শব্দ ও পরিবেশের বিষয়েও সচেতন থাকেন সংশ্লিষ্টরা। এভাবেই দৈনন্দিন জীবনে সম্প্রীতির চর্চা করছেন গ্রামের মানুষ। মন্দিরের সভাপতি উত্তম কর্মকার বলেন, এই মন্দিরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে পূজা হয়ে আসছে। পাশে মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে কোনো সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরাও ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি বলেন, ‘এই মন্দিরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে পূজা হচ্ছে। পাশে মসজিদ হওয়ার পর ভেবেছিলাম, কোনো সমস্যা হবে কি না। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আজানের সময় আমরা মাইকের শব্দ বন্ধ রাখি। পূজার সময়ও পারস্পরিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়। মুসলমান ভাইদের সঙ্গে আমাদের কখনো দ্বন্দ্ব হয়নি।’

উত্তম কর্মকারের বক্তব্যে উঠে আসে, ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ টিকে আছে।

মসজিদ ও মন্দিরের সভাপতির মধ্যে বন্ধুত্ব

পশ্চিম ঝিকরার সম্প্রীতির গল্পে বিশেষভাবে উঠে আসে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. মুশফিকুর রহমান ও মন্দিরের সভাপতি উত্তম কর্মকারের বন্ধুত্ব। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আন্তরিক। একে অপরের বাড়িতে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া এবং বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়া তাঁদের নিয়মিত জীবনের অংশ। মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি মসজিদের সভাপতি, আর আমার বন্ধু অপু মন্দিরের সভাপতি। আমরা ভিন্ন ধর্মের মানুষ হলেও একসঙ্গে আড্ডা দিই। একে অপরের দাওয়াতে যাই। ঈদে তারা আমাদের বাড়িতে আসে, পূজায় আমরাও যাই। দিন শেষে আমরা সবাই একই গ্রামের মানুষ। এটাই আমাদের বড় পরিচয়।’ তাঁদের এই বন্ধুত্ব শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং গ্রামের অন্য বাসিন্দাদের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের পাশে থাকার বিষয়টিই এখানে বেশি গুরুত্ব পায়।

ঈদ-পূজায় একে অপরের পাশে দাঁড়ান গ্রামবাসী

পশ্চিম ঝিকরার সম্প্রীতি ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজার সময় মুসলিম যুবকেরা মন্দিরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে ঈদের সময় হিন্দু যুবকেরাও মসজিদসংলগ্ন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করেন। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করা, প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান তাঁদের কাছে কেবল দুটি উপাসনালয়ের সহাবস্থান নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও মানবিকতার প্রতীক। গ্রামের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন আচরণেও এই সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায়। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রয়োজনে তাঁরা একে অপরের সহযোগিতা নেন। একই জনপদের মানুষ হিসেবে পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখার বিষয়টিকেই তাঁরা গুরুত্ব দেন।

‘সারা বাংলাদেশের জন্য উদাহরণ’

চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস পশ্চিম ঝিকরার এই সম্প্রীতির প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা উৎসবকে আরও সুন্দর করে তোলে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিম ঝিকরার এই চিত্র সারা বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ। উৎসব সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। এখানকার মানুষ তা প্রমাণ করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সম্প্রীতি অটুট রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহযোগিতার আশ্বাস স্থানীয়দের এই ইতিবাচক উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সামাজিক বন্ধন

গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিভেদ সমাজে দূরত্ব তৈরি করলেও পশ্চিম ঝিকরায় ধর্মীয় পরিচয় মানুষের সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। এক সম্প্রদায়ের আনন্দে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও শামিল হন। একইভাবে বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর চর্চাও রয়েছে। এই গ্রামের অভিজ্ঞতা দেখায়, ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বিষয় নয়; দৈনন্দিন জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই তা ধরে রাখা সম্ভব। প্রতিবেশীর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানানো এবং মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক অটুট রাখার মানসিকতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি