৫৮ কোটি টাকার দুই সেতুর কাজ বন্ধ দুই বছর, ভোগান্তিতে শরীয়তপুরবাসী
শরীয়তপুরে কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মাণাধীন দুটি সেতুর কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। এর মধ্যে গত দুই বছর ধরে সেতু দুটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে জরাজীর্ণ পুরোনো সেতু দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যানবাহনকে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী, চালক ও সাধারণ মানুষ। শরীয়তপুর সদর উপজেলার প্রেমতলা এলাকায় একটি এবং সেখান থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট এলাকায় অন্য সেতুটি নির্মাণাধীন। শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, এ পথে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ চলাচল করেন।
জরাজীর্ণ সেতুতে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন
শরীয়তপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর শহর থেকে জাজিরার নাওডোবা পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কটির দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। দুই লেনের চেয়েও কম প্রশস্ত এই সড়কটি একসময় পদ্মা নদী পার হয়ে ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম পথ ছিল। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এর ওপর থাকা পুরোনো সেতু দুটির গুরুত্বও বেড়েছে।
১৯৯১ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রেমতলায় ১১০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের একটি সেতু নির্মাণ করে। একই সময়ে জাজিরার কাজীরহাট এলাকায় নির্মাণ করা হয় ৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের আরেকটি সেতু। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর ব্যবহারের ফলে সেতু দুটি এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও সেতুর মেঝে ও রেলিং থেকে রড বেরিয়ে এসেছে। সরু সেতুতে এক পাশ দিয়ে যানবাহন উঠলে বিপরীত দিক থেকে অন্য যানবাহন চলাচল করতে পারে না। এতে দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং প্রায়ই দেখা দেয় যানজট।
কাজীরহাট সেতুতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট যানজট
পুরোনো সেতুর কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন কাজীরহাট এলাকার পথ ব্যবহারকারীরা। শরীয়তপুর সুপার সার্ভিসের চালক লোকমান হোসেন জানান, প্রতিদিন তিনি একবার যাত্রী নিয়ে ঢাকায় যান এবং পরে ঢাকা থেকে শরীয়তপুরে ফিরে আসেন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শরীয়তপুর থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী যেতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু কাজীরহাট এলাকায় যানজটের কারণে তাঁর প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। লোকমান হোসেন বলেন, কাজীরহাটের পুরোনো সেতু এলাকায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত যানজটে বসে থাকতে হয়। এতে যাত্রীরা বিরক্ত হন এবং নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। গোসাইরহাট সদরের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সপ্তাহে দুই দিন ব্যবসার কাজে ঢাকায় যান। তাঁর অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বলেন, ‘ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে উঠলে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে জাজিরার নাওডোবায় পৌঁছানো যায়। তবে কাজীরহাটের পুরোনো সেতু এলাকায় যানজটে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ মিনিট ব্যয় হয়। অবশ্য প্রেমতলা সেতু এলাকায় সাধারণত যানজট হয় না।’
৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে
শরীয়তপুর শহর থেকে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে ২০২০ সালে ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। ওই প্রকল্পের আওতায় পুরোনো সেতু দুটির স্থলে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সওজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রেমতলায় ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থের এবং কাজীরহাটে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থের দুটি সেতু নির্মাণের কথা। সেতু দুটির জন্য ব্যয় ধরা হয় ৫৮ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল জামিল ইকবাল লিমিটেড ও মোজাহারুল এন্টারপ্রাইজকে যৌথভাবে নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সেতু দুটি চালু করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কাজীরহাট সেতুর প্রায় ৬০ শতাংশ এবং প্রেমতলা সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এরপর প্রায় দুই বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা তিনবার বাড়ানো হয়েছে।

চতুর্থবার সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মঙ্গলবার সরেজমিনে কাজীরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেতুটির নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নদীর মধ্যে সেতুর কিছু অংশ নির্মিত হলেও বাকি কাজ এগোয়নি। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী নির্মাণসামগ্রী পাহারা দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে প্রেমতলা সেতুর মূল কাঠামোর অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে সেতুতে ওঠার সংযোগ সড়ক, রেলিং এবং বিভিন্ন সার্ভিস লাইনের কাজ এখনো বাকি। এসব কাজ শেষ না হওয়ায় নতুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য চালু করা যাচ্ছে না।
ভূমি অধিগ্রহণ ও ব্যয়বৃদ্ধির কারণ দেখাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত কাজের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে চুক্তিমূল্যের বাইরে আরও ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ৫৮ কোটি টাকার চুক্তিমূল্যের বিপরীতে যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ৪৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার বিল তুলে নিয়েছে। তবে বাকি কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী কিংশুক মণ্ডল জানান, করোনাকালে কাজটি তাঁরা পেয়েছিলেন। কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়। এরপর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। কিংশুক মণ্ডল আরও জানান, সেতু দুটিতে কিছু অতিরিক্ত কাজ করতে হয়েছে। পাশাপাশি কয়েক দফায় নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সওজের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে বাকি কাজ শেষ করে সেতু দুটি সওজের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
দ্রুত কাজ শেষের অপেক্ষায় যাত্রীরা
কীর্তিনাশা নদীর ওপর নতুন সেতু দুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং শরীয়তপুর-জাজিরা সড়কে যান চলাচল সহজ করতে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় সেই সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। বর্তমানে পুরোনো সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যানজট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে কাজীরহাট এলাকায় সরু সেতুর কারণে সময় নষ্ট হচ্ছে ঢাকাগামী যাত্রী ও পরিবহন চালকদের।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]