কাজের চাপ, পারিবারিক অশান্তি, ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—নানা কারণে প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠতে পারে ক্লান্তিকর। ব্যস্ততার মধ্যে অনেক সময় নিজের জন্য একটু সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় হাসিখুশি থাকার অভ্যাস, জমতে থাকে মানসিক চাপ। অথচ প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসে জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সবার কাছে সুখের সংজ্ঞা এক নয়। কেউ প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পান, কেউ বই পড়ে কিংবা একা নিরিবিলি সময় কাটিয়ে খুঁজে নেন মানসিক প্রশান্তি। নিজের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী দৈনন্দিন রুটিনে কিছু ইতিবাচক অভ্যাস যোগ করলে মন ভালো রাখা এবং জীবনকে আরও উপভোগ্য করে তোলা সহজ হতে পারে। স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইনের বিভিন্ন পরামর্শের আলোকে জেনে নেওয়া যাক, ভালো থাকার জন্য কোন অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে পারেন।
১. প্রতিদিন কিছুটা সময় শরীরচর্চা করুন
ব্যায়াম মানেই জিমে গিয়ে ভারী ওজন তোলা কিংবা কঠিন কোনো শরীরচর্চা করা নয়। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটা, হালকা স্ট্রেচিং কিংবা ঘরের আশপাশে কিছুক্ষণ চলাফেরা করাও শরীর ও মনের জন্য উপকারী হতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মেজাজ ভালো রাখতে, মানসিক চাপ কমাতে এবং ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে শুরুতেই শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। নিজের শারীরিক সক্ষমতা, সময় ও সুযোগ অনুযায়ী সহজ ব্যায়াম বেছে নিন। নিয়মিত শরীর সচল রাখার অভ্যাসই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২. পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন
রাতে দীর্ঘ সময় ফোনের পর্দায় চোখ রেখে সকালে ক্লান্ত শরীরে কাজে যাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সারাদিন অবসাদ, বিরক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে ছোটখাটো সমস্যাও বড় মনে হতে পারে।
সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার কমিয়ে দিন এবং শোবার ঘর আরামদায়ক রাখুন। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে সতেজ রাখার পাশাপাশি আবেগ ও মানসিক চাপ সামলাতেও সহায়তা করে।
৩. জীবনের ছোট ছোট বিষয়ের জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন
আমাদের অনেক সময় কী নেই, কী হারিয়েছি কিংবা কোন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি—এসব নিয়েই বেশি ভাবা হয়। অথচ প্রতিদিনের জীবনে এমন অনেক ছোট ঘটনা ঘটে, যেগুলো আনন্দের কারণ হতে পারে। সকালে বারান্দায় বসে এক কাপ চা পান করা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা কিংবা অপরিচিত কারও মুখে হাসি দেখা—এসব মুহূর্তও জীবনের সৌন্দর্য বাড়ায়।
প্রতিদিন এমন তিনটি বিষয় লিখে রাখতে পারেন, যেগুলোর জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। চাইলে নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন। এই অভ্যাস জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো খেয়াল করতে সাহায্য করে। তবে কৃতজ্ঞ থাকার অর্থ নিজের কষ্ট বা সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং কঠিন সময়ের মধ্যেও ভালো দিকগুলো খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করা।
৪. ঘর ও কাজের জায়গা গোছানো রাখুন
অগোছালো ঘর, ছড়িয়ে থাকা কাপড় কিংবা এলোমেলো কাজের টেবিল অনেক সময় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিদিন অল্প কিছু সময় নিজের আশপাশ গুছিয়ে রাখার অভ্যাস করুন। ছুটির দিনে আলমারি, ড্রয়ার কিংবা পড়ার টেবিল পরিষ্কার করতে পারেন। অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় রাখুন। একসঙ্গে সবকিছু করার প্রয়োজন নেই; প্রতিদিন ১০ মিনিট সময় দিলেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে পারে। পরিচ্ছন্ন ও গোছানো পরিবেশ কাজের মনোযোগ বাড়াতে এবং দৈনন্দিন জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
৫. প্রিয় মানুষদের জন্য সময় রাখুন
কাজের ব্যস্ততায় অনেক সময় বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা কাছের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। অথচ আন্তরিক সম্পর্ক মানুষের মানসিক সুস্থতা ও ভালো থাকার অনুভূতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে অন্তত একদিন প্রিয় কারও সঙ্গে কথা বলার বা দেখা করার পরিকল্পনা করতে পারেন। একসঙ্গে চা পান, কফিশপে আড্ডা কিংবা পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার মতো সাধারণ আয়োজনও সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে। তবে সবার সামাজিক চাহিদা এক নয়। কেউ মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পান, আবার কেউ নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করেন। নিজের প্রয়োজন বুঝে সম্পর্কের জন্য সময় রাখুন, পাশাপাশি অন্যের সঙ্গেও আন্তরিক যোগাযোগ বজায় রাখুন।
৬. প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটান
একটানা ঘরের ভেতরে কিংবা কর্মস্থলে সময় কাটাতে কাটাতে মন ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। এমন সময়ে কিছুক্ষণ বাইরে বের হওয়া, পার্কে হাঁটা কিংবা গাছপালায় ঘেরা জায়গায় বসে থাকা স্বস্তি দিতে পারে।
সম্ভব হলে সপ্তাহে একদিন কোনো পার্ক, নদীর তীর কিংবা সবুজ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটান। খোলা আকাশ দেখা, পাখির ডাক শোনা কিংবা নির্মল বাতাসে হাঁটার মতো সাধারণ অভিজ্ঞতাও মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে। দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ির ছাদে গাছের পরিচর্যা করা, বারান্দায় বসা কিংবা কাছের কোনো সবুজ জায়গায় হাঁটাও হতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সহজ উপায়।
৭. অন্যের জন্য ভালো কিছু করুন
অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী কাউকে সাহায্য করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা প্রিয়জনকে ছোট কোনো উপহার দেওয়া—এ ধরনের কাজ সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়ায় এবং নিজের মধ্যেও ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
এর জন্য বড় আয়োজন বা প্রচুর অর্থের প্রয়োজন নেই। কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো কিংবা পরিবারের কাজে সহযোগিতা করাও গুরুত্বপূর্ণ।তবে অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতার কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ না নিয়ে আন্তরিকভাবে ভালো কিছু করার চেষ্টা করুন।
৮. নিজের পছন্দের কাজে সময় দিন
সব সময় অন্যের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা কাজের মধ্যে ডুবে থাকা প্রয়োজন নেই। নিজের জন্যও কিছুটা সময় রাখা জরুরি। এই সময়টুকুতে এমন কিছু করুন, যা আপনাকে আনন্দ দেয় এবং মানসিকভাবে সতেজ করে।
পছন্দের বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা, রান্না করা কিংবা নিজের পছন্দের কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া হতে পারে সেই কাজের অংশ। চাইলে একা কোনো রেস্তোরাঁয় বসে পছন্দের খাবারও খেতে পারেন।নিজের সঙ্গে সময় কাটানো মানে একাকিত্বে ডুবে থাকা নয়। বরং নিজের পছন্দ, অনুভূতি ও প্রয়োজন বোঝার জন্য কিছুটা অবকাশ তৈরি করা।
৯. চিন্তা ও অনুভূতি লিখে রাখুন
কোনো বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে থাকলে মন অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এমন সময়ে নিজের চিন্তা ও অনুভূতিগুলো কাগজে লিখে রাখা উপকারী হতে পারে।
দিনের শুরুতে কিংবা ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে লিখুন—কী নিয়ে চিন্তা করছেন, কোন কাজগুলো করতে চান এবং কোন বিষয়গুলো আপনাকে আনন্দ দিয়েছে। সামনের দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি ছোট তালিকাও তৈরি করতে পারেন।
এতে চিন্তাগুলো গুছিয়ে নেওয়া এবং কোন বিষয়টি আগে সামলানো প্রয়োজন, তা বুঝতে সুবিধা হতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছেন এমন আনন্দের মুহূর্ত কিংবা জীবনের সুন্দর স্মৃতিগুলোও লিখে রাখতে পারেন।
১০. নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিন
ভালো থাকার জন্য শুধু ইতিবাচক চিন্তা করাই যথেষ্ট নয়। শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাস একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনমতো বিশ্রামের দিকে মনোযোগ দিন। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন এবং দীর্ঘদিন ধরে কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
একইভাবে নিজের মানসিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দিন। দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ, উদ্বেগ কিংবা দৈনন্দিন কাজ সামলাতে অসুবিধা হলে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলুন এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন। সব সমস্যার সমাধান একা করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
ভালো থাকার শুরু ছোট অভ্যাস থেকেই
সুখী থাকার জন্য জীবনে সবকিছু নিখুঁত হতে হবে, এমন নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ করা, নিজের শরীর ও মনের প্রয়োজন বোঝা এবং প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মধ্য দিয়েও ভালো থাকার পথ তৈরি হতে পারে।
একসঙ্গে সব অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা না করে প্রথমে নিজের পছন্দমতো দু-একটি অভ্যাস বেছে নিন। ধীরে ধীরে সেগুলো দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলুন। মনে রাখবেন, অন্যের কাছে সুখের যে সংজ্ঞা, আপনার কাছে তা একই রকম না-ও হতে পারে। তাই নিজের প্রয়োজন বুঝে নিজের মতো করে ভালো থাকার চেষ্টা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/এএএন/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]